পিলখানা হত্যাযজ্ঞ: সেই কালো দিন আজ: হত্যা মামলা শেষ পর্যায়ে

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ৮:৫২ : পূর্বাহ্ণ

বিজিবি’র সদর দফতরে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের সেই কালো দিন আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার)। ইতিহাসে দিনটি চিহ্নিত হয়ে আছে ‘পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস’ হিসেবে।

উচ্চ আদালতে পিলখানা হত্যা মামলাটির পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে এ বছরের ৮ জানুয়ারি। অন্যদিকে, একই ঘটনায় চলমান বিস্ফোরক আইনের মামলাটির কার্যক্রম নিম্ন আদালতে এখনও শেষ হয়নি। এ মামলাটি বর্তমানে মহানগর দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে বিস্ফোরক আইনের মামলাটি শেষ করা যাবে বলে রাষ্ট্রপক্ষ আশাবাদী।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর সদর দফতর পিলখানায় ইতিহাসের নির্মম হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয় ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি। তখন বিজিবি’র নাম ছিল বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস)। ওই দু’দিন বিপথগামী কিছু বিডিআর সদস্য বিডিআরের তখনকার মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হননি। তারা পিলখানায় স্বজনদের কাছে বেড়াতে আসা নারী ও শিশুসহ আরও ১৭ জনকেও নির্মমভাবে হত্যা করে। এই ১৭ জনের মধ্যে ডিজি শাকিল আহমেদের স্ত্রীসহ সাতজন বেসামরিক ব্যক্তি, ৯ জন বিডিআর সদস্য ও ধানমন্ডি এলাকায় দায়িত্বরত অবস্থায় বিডিআরের গুলিতে নিহত একজন সেনা সদস্য রয়েছেন।

হত্যাযজ্ঞ ছাড়াও চালানো হয় লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। বিডিআরের তখনকার ঢাকা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মুজিবসহ অনেক সেনা সদস্যকে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হয় ম্যানহোলে। ঘটনার পর লালবাগ থানায় ডিএডি তৌহিদুল আলমসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। পরে মামলাটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১০ সালের ১২ জুলাই পিলখানা হত্যা মামলায় ৮২৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এছাড়াও বিস্ফোরক আইনে ৭৮৭ জনকে অভিযুক্ত করে আলাদা একটি অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। এরপর সম্পূরক চার্জশিটে আরও ২৬ জনকে আসামি করা হলে বিস্ফোরক মামলায় আসামির সংখ্যা করা হয়। তবে বিস্ফোরক আইনের চার্জশিটে শুধুমাত্র বিডিআর সদস্যদেরই আসামি করা হয়। বর্তমানে এ মামলার আসামি রয়েছে ৮০৪ জন।

পরে রাজধানীর বকশিবাজারে মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিশেষ এজলাসে এই দু’টি মামলার একসঙ্গে বিচারকাজ শুরু হয় ২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে হত্যা মামলাটির রায় দেন এই বিচারিক আদালত। এরপর হত্যা মামলাটি হাইকোর্টে গেলে আপিল করেন আসামি পক্ষ। আপিল শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর আপিলের রায় দেন বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের বেঞ্চ। এ বছরের ৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে। এই রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। এছাড়া যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয় ১৮৫ জনকে। ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। খালাস দেওয়া হয় ৪৫ জনকে। নিম্ন ও উচ্চ আদালতে হত্যা মামলার সাড়ে ৮শ’ আসামির মধ্যে খালাস পান ২৭৮ জন। মামলার বিচার চলাকালে মারা যান ৪ জন। বর্তমানে এ মামলার আসামি হচ্ছেন ৮৪৬ জন। মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় মোট ৫৬৮ জনের।

অন্যদিকে, বিস্ফোরক আইনের মামলাটি এখনও বিচারাধীন সেই নিম্ন আদালতে। বকশিবাজারের মহানগর দায়রা জজ আদালতের সেই বিশেষ এজলাসে মাসে এক থেকে দু’টি তারিখ পরে মামলাটির শুনানির। এ মামলার বর্তমান বিচারক মহানগর দায়রা জজ মো. ইমরুল কায়েস। এক হাজার ৩৪৫ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে মাত্র ১৪৬ জনের। হাজারের বেশি সাক্ষী থাকলেও সবার সাক্ষ্য নেওয়া প্রয়োজন হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিস্ফোরক মামলাটির পরবর্তী ধার্য তারিখ রয়েছে আগামী ৮ মার্চ (২০২০)।

ঘটনার পর বাহিনীর নিজস্ব আইনেও পিলখানাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫৭টি বিদ্রোহ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ওইসব মামলায় ছয় হাজারেরও বেশি বিডিআর সদস্যকে আসামি করা হয়। ৫৭টি বিদ্রোহ মামলায় বিডিআরের নিজস্ব আইনে গঠিত বিশেষ আদালতে পাঁচ হাজার ৯২৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর সদর রাইফেল ব্যাটালিয়নের ৭২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়ার মধ্য দিয়ে ৫৭টি বিদ্রোহের মামলার নিষ্পত্তি করা হয়। শুধুমাত্র বিদ্রোহ মামলায় যারা আসামি ছিলেন তাদের বেশিরভাগই সাজা খেটে একই ঘটনায় দু’টি মামলার দু’রকম গতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ। তিনি বলেন, হত্যা মামলাটি প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু, বিস্ফোরক মামলাটির সাক্ষ্যই গ্রহণ শেষ করা যায়নি নিম্ন আদালতে। এতে আসামিরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে যে ২৭৮ জন আসামি হত্যা মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন তারাও বের হতে পারছেন না এই মামলাটির কারণে। নানা আইনি জটিলতায় জামিনও পাচ্ছেন না তারা।

তবে বিস্ফোরক মামলাটির রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিস্ফোরক মামলা পরিচালনায় আমাদের কোনও গাফিলতি নেই। নানা কারণে বিলম্বিত হলেও আগামী এক বছরের মধ্যে এ মামলাটি  নিম্ন আদালতে শেষ করা যাবে বলে আমি আশাবাদী।’

প্রসঙ্গত, পিলখানা হত্যাযজ্ঞ মামলার দু’টি অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, ঘটনার সময় পুরো পিলখানায় বিডিআরের সদস্য ছিলেন ছয় হাজার ৯০৩ জন। দরবার হলে ৯৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ বিডিআরের দুই হাজার ৪৮৩ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। বিদ্রোহের সময় দুই হাজার ৪১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র থেকে বিদ্রোহীরা গুলি করেছিল। এর মধ্যে এক হাজার ৮৪৫টি রাইফেল, ৫২৮টি সাব মেশিন গান, ২৩টি পিস্তল ও ১৮টি এলএমজি ছিল।

দিনটি উপলক্ষে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও সেনা সদর নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বিজিবি ও আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিভিন্ন কর্মসূচির কথা জানানো হয়েছে।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তখনকার বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস) ও বর্তমানে বিজিবির সদর দফতর পিলখানায় সংঘটিত হয় বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ। এই দুদিনে বিপথগামী কিছু  বিডিআর সদস্য ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা এবং নারী ও শিশুসহ আরও  ১৭ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

আইএসপিআর জানায়, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শহীদ সেনাসদস্যদের শাহাদাত বার্ষিকী পালন করা হবে। এ উপলক্ষে বনানী সামরিক কবরস্থানে শহীদ সেনা সদস্যদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে সকাল ৯টায়।

পিলখানা ট্র্যাজেডি

অন্যদিকে, বিজিবি’র সদর দফতর পিলখানা থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শহীদদের স্মরণে কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় পিলখানায় বিজিবির সদর দফতরসহ সব রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় কোরান খতম করা হবে। বিজিবি’র সব মসজিদে এবং বিওপি পর্যায়ে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

এছাড়া, সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় ২৫ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) ৯টায় বনানী সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধানরা (সম্মিলিতভাবে), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব এবং বিজিবি মহাপরিচালক (একত্রে) শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এছাড়া দিনটি পালন উপলক্ষে বিজিবি’র যেসব স্থানে রেজিমেন্টাল পতাকা উত্তোলন হয়, সেসব স্থানে বিজিবি পতাকা অর্ধনমিত থাকবে এবং বিজিবি’র সবসদস্য কালো ব্যাজ পরিধান করবে।

পরদিন ২৬ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) বিকাল সাড়ে ৪টায় আসরের নামাজের পর পিলখানা কেন্দ্রীয় মসজিদে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। ওই দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, বিজিবি মহাপরিচালক, শহীদদের নিকটাত্মীয়রা, পিলখানায় কর্মরত সব অফিসার, জুনিয়র কর্মকর্তা, অন্যান্য পদবির সৈনিক এবং বেসামরিক কর্মচারীরা অংশ নেবেন।


সর্বশেষ সংবাদ