সন্ধ্যায় কোচিং-প্রাইভেট; সন্তানের নিরাপত্তা কতটুকু ?

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১০:১৬ : অপরাহ্ণ

আবদুল কুদ্দুস রানা … দুপুর ১টা অথবা বিকাল চারটা। তৃতীয়-চতুর্থ অথবা পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস শেষ করে দুর্বল-ক্লান্ত শরীরে কয়েক কেজি ওজনের বইয়ের বোঝা পিঠে বহন করে খানিকটা বাঁকা হয়ে যখন আদরের ছেলে-অথবা মেয়েটা হেঁটে হেঁটে স্কুলের গেটের দিকে আসতে দেখেন, বাবা অথবা মা হিসাবে তখন আপনার কেমন লাগে ?

আমারতো বুকটা ফেটে যায়। কারণ আমার ছেলেটাও পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। সকাল সাতটায় তাকে ঘুম থেকে উঠতে হয়। ৯টায় পৌঁছতে হয় স্কুলে। দুপুর একটায় মধাহ্ন বিরতী। আবার ক্লাস। বিকাল সোয়া তিনটায় স্কুল ছুটি। তারপর বাসায়। তারপর আবার প্রাইভেট। রাতে বাড়ি ফিরে আবার পড়াশোনা-বাড়ির কাজসহ আরও কত কিছু যে তাকে সামলাতে হয়! খেলাধুলা-আড্ডা-দৌঁড়ঝাঁপ, বেড়ানো কিছুই হয়না ছেলেটার। শুধু পড়া আর পড়া। এত পড়ালেখায় কী হবে ?

একদিন দেখলাম শহরের নামকরা স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছাত্রী কান্না করতে করতে বেরিয়ে আসছে ক্লাস থেকে । গেটে তার মা দাঁড়ানো। কান্নার কারণ মেয়েটির পিঠে কয়েক কেজি ওজনের বইয়ের ব্যাগ। ভারী ব্যাগটি সে বহন করতে পারছিল না। মেয়ের আঁকুতি দেখে কান্না করে দিলেন মা-ও।

তৃতীয় শ্রেণির সিলেবাসে ১৩টি বই। প্রত্যেক বিষয়ে আবার আলাদা খাতা। ব্যাগে ভেতরে থাকে টিফিন বক্সসহ পানির বোতল। ওজন দাড়ায় পাঁচ-ছয় কেজি। বড় ক্লাসের ( ষষ্ট-সপ্তম-অষ্টম) শিক্ষার্থীদের পিঠে বইয়ের বোঝা আরও বড়। কারো পিঠে তুলে দিচ্ছি ১০ কেজি ওজনের ব্যাগ ।
প্রিয় সন্তানদের শরীরের তুলনায় বইয়ের অতিরিক্ত বোঝা বয়ে স্কুলে আসা-যাওয়ার এমন দৃশ্য সবখানেই চোখে পড়ে।

সহায়ক বইয়ের চাপে শিশুদের এখন ত্রাহি অবস্থা । অতিরিক্ত ওজনে শিশুর ঘাড় এবং পিঠে প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। ফলে ওদের মেরুদণ্ড বাঁকা হওয়ার পাশাপাশি কুঁজো হয়ে যাচ্ছে শরীরটাও। শ্বাসকষ্টে ভুগতে হচ্ছে অনেক শিশুকে, যা শিশুস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

চিকিৎসকরা বলছেন-১৮ বছর পর্যন্ত শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির উৎকৃষ্ট সময়। এ সময় শিশুর হাড় ও মাংসপেশি যথেষ্ট নরম থাকে। সামান্য আঘাতে অথবা চাপে মেরুদণ্ড বেঁকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এ বয়সেই। অথচ এই বয়সেই আমরা শিশুদের পিঠে তুলে দিচ্ছি ভারী ব্যাগের বোঝা। যে বোঝাটি পিঠে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। ছেলে-মেয়েরা লম্বা না হয়ে বেঁটে হওয়ার জন্য অনেকে অতিরিক্ত বইয়ের বোঝাকে দায়ী করে থাকেন।
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত যেন না হয়, সেজন্য সরকারকে এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেই রায় আজ অবধি বাস্তবায়ন হয়নি।
দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী কিন্ডারগার্টেনে পড়াশোনা করলেও সেখানে কী ধরনের বই পড়ানো হচ্ছে, তার তদারকিও নেই।

# সন্ধ্যায় কোচিং, সন্তানের নিরাপত্তা :

এবার আসি কোচিং বাণিজ্যের কথায়। প্রথম আলোর খবরে জানা গেল-কোচিং সেন্টারের বৈধতা দিয়ে শিক্ষা আইনের খসড়া চুড়ান্ত করেছে শিক্ষামন্ত্রণালয়। দিনে নয়, সন্ধ্যার পর কোচিং সেন্টার পরিচালনা করা যাবে। সেখানে শিক্ষকতাও করা যাবে। তবে কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্টানের কোনো শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবেন না।

প্রস্তাবিত আইনে নোট ও গাইড বই নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। কেউ যদি কোনো ধরনের নোট বই বা গাইড বই মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত করেন তাহলে তাঁকে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড ভোগ করতে হবে।

কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্টান বা কোনো শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীদের নোট ও গাইড কিনতে বা পাঠে বাধ্য করেন বা উৎসাহ দেন, তাহলে অসদাচরণের জন্য ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক শাস্তির ব্যবস্থা আছে।

কোচিং, প্রাইভেট এবং সব ধরনের নোট-গাইড, অনুশীলন বা সহায়ক বই শিক্ষা আইনের মাধ্যমে বন্ধ করা এবং জাতীয় শিক্ষানীতি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের জন্য ২০১১ সাল থেকেই শিক্ষা আইন করার কাজ চলছে।কিন্তু কোচিং, প্রাইভেট এবং নোট-গাইড, অনুশীলন বা সহায়ক বইয়ের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একটি পক্ষের নানামূখী তৎপরতায় এই আইন কাযর্কর করা যাচ্ছেনা।
এখন শিক্ষা আইনটি কাযর্কর হলে ছেলেমেয়েদের কোচিং-প্রাইভেটে যেতে হবে সন্ধ্যার পর। সম্ভবত রাত ১০-১১টা পযর্ন্ত বাইরে থাকতে হতে পারে ছেলেমেয়েদের । ছেলে সন্তান হলে সমস্যা একটু কম। কিন্তু মেয়ে সন্তানের ঝুঁকি থাকে অনেক বেশি। অভিভাবকেরা কতক্ষণ পাশে থেকে মেয়ের নিরাপত্তা দিতে পারবেন ? সমাজের আজকাল যে অবস্থা ! সন্ধ্যার পর শহরের অধিকাংশ অলিগলি অন্ধকার-ভুতুড়ে পরিবেশ। সেখানে আড্ডা মাদকসেবী আর বখাটের। এনিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা।

শ্রেণিকক্ষে লেখাপড়া ঠিকমত না হওয়ায় অভিভাবকেরা সন্তানদের কোচিং সেন্টারে পাঠান, নোট-গাইড বা অনুশীলন বই কিনে দেন। শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের কোচিং-প্রাইভেট এবং নোট-গাইড কিনতে-পড়তে বাধ্য করেন-এমন অভিযোগ সবসময় করেন অভিভাবকেরা। আসল ঘটনাও তাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ভাষ্য-নোট-গাইড নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ ইতিবাচক। কিন্তু কোচিং-বাণিজ্য চালু রেখে নোট-গাইড নিষিদ্ধ করে লাভ হবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্টানগুলো পড়াশোনার প্রতিষ্টান হওয়া উচিত। যত দিন কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা থাকবে, তত দিন বিদ্যালয়ে পড়া বিদ্যালয়ে হবে না। তাই নোট-গাইড বন্ধের পাশাপাশি কোচিং সেন্টারও বন্ধ করা উচিত।


সর্বশেষ সংবাদ