বেসামাল নিত্যপণ্যের বাজার, দাম কমার লক্ষণ নেই

প্রকাশ: ৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১:৩৯ : পূর্বাহ্ণ

নিত্যপণ্যের দাম কমার লক্ষণ নেই। আজ চালের দাম বাড়ছে তো, কাল সবজি, ময়দা, ভোজ্যতেলের দাম। পেঁয়াজের দাম এখনও আকাশচুম্বীই আছে। গত এক মাসে প্রায় সবকটি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। তবে সামান্য কমেছে কয়েকটির দাম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ডিম, আমদানিকৃত রসুন, ব্রয়লার মুরগি। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ওয়েবসাইটে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বুধবার টিসিবির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বাজার দরের তালিকা মতে, গত এক মাসের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারগুলোতে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। সরু চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৫-৬ টাকা। আর মোটা চালের দাম বেড়েছে ২ টাকা। খোলা আটার দাম বেড়েছে কেজিতে ২ টাকা। আর ময়দার দাম বেড়েছে ৩ টাকা। অবশ্য প্যাকেটজাত আটার দাম কমেছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। রান্নার অন্যতম অনুষঙ্গ ভোজ্যতেলের দামও বেড়েছে।

খোলা সয়াবিন তেল, পাম অয়েল দাম লিটারে বেড়েছে ৪-৮ টাকা। মসুর ডালের দামে বেড়েছে কেজিতে ৫ টাকা। আলুর দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ টাকা। পেঁয়াজের দামও গত মাসের চেয়ে বেড়েছে। গত এক বছরে দেশি ও আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৫৯২ ও ৫৬০ শতাংশ। আর এক মাসের ব্যবধানে দেশি পেয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ১০০ টাকা। দেশি রসুন, শুকনা মরিচ, হলুদ, জিরা, দারুচিনি, এলাচ, ধনেপাতা, তেজপাতার দাম বেড়েছে। অন্যদিকে বেড়েছে চিনির দাম। কেজিতে চিনির দাম বেড়েছে ২-৪ টাকা। গুঁড়োদুধ বেড়েছে কেজিতে ১০-২০ টাকা।

টিসিবির তথ্য মতে, দাম কমার তালিয়ায় আছে- ডিম, দেশি-ব্রয়লার মুরগি, রুই মাছ, অ্যাঙ্কর ডাল, তুরস্ক-কানাডার মাঝারি দানার ডাল, আমদানিকৃত রসুন ও আদার দাম।

অবশ্য রাজধানীর কারওয়ান বাজার, রামপুরা কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, টিসিবির দামের চাইতে প্রায় সব পণ্যই বেশিতে বিক্রি হচ্ছে। টিসিবি বলছে, দেশি পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২২০-২৩০ টাকা। অথচ খোলাবাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা কেজি। একই অবস্থা আমদানিকৃত পেঁয়াজের। ১২৫-২১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে আমদানিকৃত পেঁয়াজ। আর দেশি নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ খুচরা বাজারে ১৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। যা দু’দিন আগেও বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকা।

মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২০০-২১০ টাকা। মিসরের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১৫০-১৬০ টাকা। এছাড়া চীন থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১৩০ টাকা কেজিদরে। মিসরের পেঁয়াজ হয়েছে ১২০ টাকা। আর পেঁয়াজ পাতা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০ টাকা দরে। অন্যদিকে টিসিবি বলছে, ব্রয়লার মুরগি ১১০-১২০ টাকা কেজি। কিন্তু বাজারে এই মুরগি ১৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে। চিনির দাম টিসিবি বলছে, ৫৮-৬০ টাকা কেজি। কিন্তু বাজারে চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা কেজি।

নিত্যপণ্যের এই বেসামাল ঊর্ধ্বগতিতে নিু আয়ের মানুষদের ভরসা টিসিবির ট্রাক। খিলগাঁও, রামপুরা বাজারের সামনে টিসিবির ট্রাকের সামনে নিু আয়ের মানুষের লম্বা লাইন দেখা গেছে। অনেকে লাইনে দাঁড়িয়েও পণ্য না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন।

খিলগাঁওয়ে সকালে ট্রাক আসার আগেই লাইনে দাঁড়ান মানুষ। ট্রাক আসতেই শুরু হয় হুড়োহুড়ি। শুধু পেঁয়াজ নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যই নিম্নবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষকে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে চিনি, মসুর ডাল, সয়াবিন তেল কিনতে দেখা গেছে।

চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীদের কুশপুত্তলিকা দাহ : এদিকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কারসাজি করে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে ব্যতিক্রমী কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। মঙ্গলবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে নাগরিক উদ্যোগের ব্যানারে পেঁয়াজের কারসাজির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের কুশপুত্তলিকা তৈরি করে তাতে ঝাড়ু ও জুতা নিক্ষেপ এবং থুথু ছিটানো হয়। কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি ছিলেন নগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা মহিউদ্দিন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী যখন দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, বিশ্বে যখন বাংলাদেশের সুনাম বাড়ছে ঠিক তখনই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, যে কোনো মূল্যে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের চক্রান্ত প্রতিহত করা হবে। তাদের বলছি, দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করবেন না।

সিরাজগঞ্জে রাত জেগে পেঁয়াজের ক্ষেত পাহারা : উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের চরা চিথুলিয়া গ্রামের পেঁয়াজচাষীরা জানিয়েছেন, সাধারণত এ এলাকার জমি থেকে পেঁয়াজ চুরি হয় না। কিন্তু এ বছর পেঁয়াজের দাম বেশি হওয়ায় ও বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় চুরির আশঙ্কায় ও গরু-ছাগলের আক্রমণ থেকে পেঁয়াজ রক্ষায় তারা এ বছর অধিকাংশ পেঁয়াজের জমিতে নেট দিয়ে ঘিরে রেখেছেন।

এছাড়া পালাক্রমে রাতে ও দিনে পেঁয়াজক্ষেত পাহারা দিচ্ছেন। কৃষকরা বলছেন, যাদের জমি বাড়ি থেকে বেশ দূরে তারা দিনেও পাহারা দিচ্ছেন। আগে কৃষকরা পেঁয়াজের পাতা ক্ষেতেই ফেলে দিত। এখন পেঁয়াজের পাতাও ১০০ টাকা কেজিদরে বিক্রি হচ্ছে। তাই পেঁয়াজ চুরি ঠেকাতে সবাই ক্ষেত পাহারা দিচ্ছে।

ঘণ্টায় শেষ এক হাজার কেজি পেঁয়াজ : পঞ্চগড় জেলা শহরের সরকারি অডিটোরিয়াম চত্বরে প্রথমবারের মতো টিসিবির খোলা ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু হয়। পেঁয়াজ বিক্রির উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন। ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে মানুষ। ক্রেতাদের চাপ সামলাতে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে কম দামে পেঁয়াজ কিনতে পেরে খুশি অনেকেই।

আবার অনেকেই দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে পেঁয়াজ না পেয়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরে গেছেন। টিসিবির ডিলার সজিব প্রধান বলেন, এক হাজার কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করা হয়েছে। চাহিদা ব্যাপক থাকায় ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। এক ঘণ্টার মধ্যেই সব পেঁয়াজ বিক্রি হয়ে যায়। আপাতত প্রতি বুধ ও বৃহস্পতিবার পেঁয়াজ বিক্রি করা হবে।


সর্বশেষ সংবাদ