টেকনাফের হাবিব উল্লাহ সৌদি আরবে ইয়াবা পাচারের সময় চট্টগ্রামে আটক

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ১০:১৩ : অপরাহ্ণ

টেকনাফনিউজ ডেস্ক []
দেশের সীমানা ছাড়িয়ে টেকনাফ থেকে ইয়াবা যাচ্ছে সুদূর সৌদি আরবে। যাত্রী বেশে লাগেজে বিশেষ কায়দায় নেয়া হচ্ছে হাজার হাজার ইয়াবা। টেকনাফের পেশাদার ইয়াবা ব্যবসায়ীরা সৌদি আরবে আরো বেশ কয়েক বছর আগে ইয়াবা ব্যবসা শুরু করেছে। ইয়াবা বহন করতে তাদের নিজস্ব লোক রয়েছে। নগরীর বহদ্দারহাট এলাকার আবু মনসুর মিনার বেশ কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবে ইয়াবা পাচার করলেও কখনো ধরা পড়েনি। তারা ইয়াবার সাংকেতিক নামকরণ করেছে ‘গরু’। ইয়াবা বহনকারীর কাছে মুঠোফোনে জানতে চাওয়া গরু নিয়ে কতটুক এসেছেন। গরু সীমান্ত পার হয়েছে কি না। গতকাল বুধবার সকালে সহযোগীসহ মনসুর নগরীর চান্দগাঁও থানা পুলিশের হাতে ধরা পড়লে থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে। তার মুঠোফোনে সৌদি আরবে ইয়াবা পাচার সংক্রান্ত কথাবার্তার বেশ কিছু অডিও রেকর্ড পেয়েছে পুলিশ। মনসুরের কাছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের একাধিক ব্যাংকের হিসাবের চেক ও জমা বই পাওয়া গেছে। একটি নোট খাতায় ইয়াবা বিক্রির কোটি কোটি টাকার হিসাব পেয়েছে পুলিশ।

টেকনাফের ডেইল পাড়ার হাবিব উল্লাহ ড্রাইভিং ভিসা নিয়ে যাচ্ছিলেন সৌদি আরবে। আজ বৃহস্পতিবার রাত আটটায় সৌদিয়া এয়ারলাইন্সে সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে উড়াল দেয়ার কথা। এরমধ্যে গতকাল বুধবার সকালে নগরীর পূর্ব ষোলশহর মালিবাড়ি এলাকা থেকে হাবিব উল্লাহকে আটক করে চান্দগাঁও থানা পুলিশ। এসময় হাবিবের সাথে চাচাতো ভাই মহিউদ্দিনও ছিল। পরে হাবিবের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর খতিবের হাট সিদ্দিক মার্কেট এলাকার মৃত আবুল বশরের ছেলে আবু মনছুর মিনারকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হাবিব জানান, তিনি টেকনাফের ডেইল পাড়ার মৃত মকবুল আহম্মদের ছেলে। ২০০৭ সাল পরবর্তী বেশ কয়েক বছর তিনি সৌদি আরব ছিলেন। থাকতেন আবহা শহরে। সেখানে ভাতিজা আলি আহমদ টেকনাফের সাবরাং গ্রামের বাসিন্দা নাজির আহমদও থাকেন। দুজনেই সৌদি আরবে ইয়াবা ব্যবসা করেন। টেকনাফের বিভিন্ন ইয়াবা ব্যবসায়ীর সাথে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। ভিসা বাতিল হয়ে যাওয়ায় এক বছর আগে বাংলাদেশে চলে আসেন হাবিব। দেশে আসলেও আলি আহমদ ও নাজিরের সাথে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ ছিল। ইতিমধ্যে ড্রাইভিং ভিসা নিয়ে সৌদি আরবে যাবার সব প্রস্তুুতি সম্পন্ন করেন।

ইয়াবা পাচার প্রসঙ্গে হাবিব জানান, টেকনাফের পেশাদার ইয়াবা ব্যবসায়ী জাফর আলমের সাথে সৌদি আরবে বসবাসরত আলি আহমদ ও নাজিরের যোগাযোগ রয়েছে। সৌদি আরব যাবার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ভাতিজা আলি আহমদের কথামতো গত মঙ্গলবার বিকেলে জাফর তাকে ১২ হাজার ইয়াবা দিয়ে যায়। বিমান বন্দরে স্ক্যানার মেশিন ফাঁকি দিতে কার্বন পেপার মুড়িয়ে লাগেজের তলায় বিশেষ কায়দায় ইয়াবাগুলো নেন।
হাবিব বলেন, টেকনাফ থেকে চট্টগ্রামগামী একটি বাসে উঠেছিলেন তিনি। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা আবু মনছুর মিনারের সাথে তাকে দেখা করতে বলেছিলেন প্রবাসী ইয়াবা ব্যবসায়ী আলি আহমদ। মিনার তাকে বিমান বন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার কথা ছিল। বারো হাজার ইয়াবা সৌদি আরবে পৌঁছাতে পারলে তাকে দুই লাখ টাকা দিতো আলি আহমদ ও নাজির। বিমানের টিকিটের টাকাও তারা দিয়েছেন।
আটক মহিউদ্দিনের দাবি, হাবিব সম্পর্কে তার চাচা হয়। সৌদি আরব চলে যাবেন তাই বিমানে তুলে দিতে সাথে এসেছিলেন।
চান্দগাঁও থানার পরিদর্শক (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম জানান, আমাদের কাছে সংবাদ ছিল হাবিব নামে এক ব্যক্তি টেকনাফ থেকে সৌদি আরবে বেশ কিছু ইয়াবা নিয়ে যাচ্ছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হাবিব ও তার প্রতিবেশী মহিউদ্দিনকে পূর্ব ষোলশহর মালির বাড়ি এলাকার রিদম স্কয়ার কমিউনিটি সেন্টার এলাকা থেকে আটক করি। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে খতিবের হাট এলাকা থেকে আবু মনছুর মিনারকে আটক করি। মিনারের মুঠোফোনে সৌদি আরবে ইয়াবা পাচার সংক্রান্ত বেশ কিছু কথাবার্তার অডিও রেকর্ড পেয়েছি আমরা।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মনসুর জানান, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন তিনি। ২০০৭ সালে তিনিও সৌদি আরব ছিলেন। এর আগে দীর্ঘদিন দুবাই ছিলেন। সৌদি আরবে থাকাকালে টেকনাফের ডেইল পাড়ার বাসিন্দা আলি আহমদ ও সাবরাংয়ের বাসিন্দা নাজিরের সাথে তার সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। এরমধ্যে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ আসা যাওয়া করেছেন মনসুর। সর্বশেষ গত আগস্ট মাসে তিনি দেশে আসেন।

ইয়াবা পাচারের সাথে জড়িত থাকার কথা জানিয়ে মনসুর পুলিশকে জানান, হাবিব উল্লাহ মূলত ইয়াবা বহন করেন। সৌদি আরবে আবহা শহরে বসবাসরত আলি আহমদ ও নাজিরের এ ধরনের আরো বেশ কয়েকজন ইয়াবা বহনকারী রয়েছে। নির্দিষ্ট অংকের টাকার বিনিময়ে তারা ইয়াবা বহনের কাজ করে থাকে। টেকনাফ থেকে ইয়াবা নিয়ে আসা ব্যক্তিদের বিমান বন্দরে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করে থাকে মনসুর। একজন যাত্রী বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে পারলে এক লাখ পেয়ে থাকে মনসুর। হাবিবকে পৌঁছে দিতে পারলেও এক লাখ টাকা পেতেন। কার্বন পেপার মুড়িয়ে ইয়াবা নেয়া প্রসঙ্গে মনসুর বলেন, কার্বন পেপার স্ক্যানার মেশিনে কালো দেখায়। এতে লাগেজের ভেতরে ইয়াবার অবস্থান খুব একট বুঝা যায়না। অনেকে এভাবে দেশের বাইরে ইয়াবা পাচার করছে এমনটি দাবি করেন মনসুর।
চান্দগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুর রহিম জানান, গ্রেপ্তার তিনজনকে আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচদিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।


সর্বশেষ সংবাদ