বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সরকার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১১:১৮ : অপরাহ্ণ

এইচএম এরশাদ :: রোহিঙ্গাদের এদেশে অবস্থান, মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন, আশ্রয় ক্যাম্প থেকে যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়া, বাংলাদেশী এনআইডি ও পাসপোর্ট জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়াসহ বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের আগে আসা পুরনো রোহিঙ্গার অনেকে উখিয়া-টেকনাফের আশ্রয় ক্যাম্পে ঢুকতে শুরু করেছে। এদের অনেকের কাছে বাংলাদেশের জাতীয়তার সনদ, এনআইডিও রয়েছে। এদেরকে নিবন্ধিত করা হচ্ছে ইউএনএইচসিআর’র পক্ষ থেকে। ইতোপূর্বে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ রোহিঙ্গাকে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সরকার নিবন্ধিত করার পর তা বন্ধ করে দেয়া হয়। ইউএনএইচসিআর, আইএমওসহ বিভিন্ন বিদেশী এনজিও পুরনো রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য আশ্রয় শিবির নির্মাণ করে দিচ্ছে।

২০১৭ সালের আগস্ট মাসে রাখাইন রাজ্য থেকে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার পর সরকার পক্ষে উখিয়া-টেকনাফে তাদের আশ্রয়স্থল নির্মাণের জন্য ৬ হাজার ২শ’ একর ভূমি না দেয়ার সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছিল। ৩২টি আশ্রয় শিবির নির্মিত হওয়ার পর এখন বিভিন্ন বিদেশী এনজিও সংস্থা আরও ভূমি ব্যবহার করছে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর নির্মাণের জন্য, যা সরকারের সিদ্ধান্তবিরোধী।

এদিকে, রোািহঙ্গাদের ভোটার হতে সহায়তা বা সম্পৃক্তদের আইনের আওতায় আনার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন বলেন, যত আগেই আসুক না কেন- মিয়ানমার থেকে এসে কোন রোহিঙ্গা এদেশের ভোটার হয়ে থাকলে সেটা বাতিল হবে। এই বিষয়ে কোন ছাড় নেই। রোহিঙ্গা ভোটার বিষয়ে সামনে আরও নির্দেশনা আসতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এদিকে, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার নানা উদ্যোগ ও কঠোর মনোভাবের ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পুরনো রোহিঙ্গারা উখিয়া-টেকনাফের আশ্রয় শিবিরে ফিরে আসছে। এক সপ্তাহের মধ্যে শতাধিক রোহিঙ্গা পরিবার চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে ক্যাম্পে ঢুকেছে। তবে যারা ইতোমধ্যে নানাস্থানে স্থায়ীভাবে বসতি গেঁড়েছে এদের কেউ এখনও ফেরেনি। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা নেতাদের পরিচালনাধীন কক্সবাজারে একাধিক মাদ্রাসা-এতিমখানার সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সরকারী দল সমর্থিত স্থানীয় নেতাদের। সূত্র মতে, ক্যাম্প পলাতক রোহিঙ্গাদের দেখভাল করার জন্য নগদ টাকাও প্রদান করা হয়ে থাকে সরকারী দল সমর্থক কিছু নেতাকে।

চট্টগ্রামের পটিয়া জমিদারখিল শিবাতলী স্কুল এলাকা থেকে উখিয়ার কুতুপালং ট্রানজিট ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমারের বুচিদং খানসামা এলাকার আমির হামজার পুত্র জাহেদ আলম জানান, প্রায় ১৬ বছর পূর্বে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে সপরিবারে পটিয়ায় ভাড়া বাসায় কাটিয়েছি। স্ত্রী ২ ছেলেমেয়েসহ পটিয়া থেকে ট্রানজিট ক্যাম্পে চলে এসেছি। আমাদের সঙ্গে পটিয়া থেকে আরও ২০ পরিবার ট্রানজিট ক্যাম্পে এসেছে। ট্রানজিট ক্যাম্পে দায়িত্বরত ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধিরা সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি না হওয়ায় তাদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে ট্রানজিট ক্যাম্পে দায়িত্বে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আমি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছি জানতে পারলে আমার চাকরিটা যাবে। এখানে আশ্রয় নিয়ে এখন পর্যন্ত তালিকাভুক্ত হয়েছে ৮০ পরিবার। বাকিরা এখনও তালিকাভুক্ত হয়নি। এসব রোহিঙ্গাকে উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। কুুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ জানান, আগে ট্রানজিট ক্যাম্প দেখাশোনার দায়িত্ব আমাদের ছিল। কিন্তু এখন ইউএনএইচিসআর এবং আরআরআরসি কার্যালয় দেখাশোনা করে থাকে। তাই রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়ার ব্যাপারে আমাদের কাছে কোন তথ্য নেই। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নিকারুজ্জামান জানান, সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে ফেরাতে কাজ করছে। আমরা নিজেরাও এ নিয়ে কঠোরভাবে কাজ করে আসছি। তাই রোহিঙ্গাদের অনেকে নিজ উদ্যোগে ক্যাম্পে ফিরছে।

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পুরনো রোিহঙ্গাদের যারা এদেশের ভোটার তালিকায় স্থান করে নিয়েছে তাদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। এদেরকে চিহ্নিত করে দ্রুততম সময়ে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত রয়েছে। একই সঙ্গে আগে আসা বা অন্যকোনভাবে রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার তথ্য পেলে সেটা নির্বাচন অফিসে জমা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ মোখলেছুর রহমান।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার পৌর এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা ভোটার আছে ৫ ওয়ার্ডে। এর মধ্যে তুলনামূলক ৭ নম্বর ওয়ার্ডে রোহিঙ্গা ভোটার বেশি। প্রাপ্ত তথ্য মতে, যাদের নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে এমন অনেকের মধ্যে তারাবনিয়ার ছড়ায় মৌলবি আয়াছ, এবিসি ঘোনায় আবদুর রশিদ, মোঃ খলিল, মোঃ আলী মাঝি, হাফেজ আহাম্মদ, ডাঃ আইয়ুব, আবদুস সালাম, মৌলবী আবু শামা, সরওয়ার, মোঃ তালেব, শুক্কুর, রফিক, মৌলবী আমজাদ, রশিদ ড্রাইভার, মোহাম্মদ হোসনসহ সবাই আগে আসা রোহিঙ্গা যারা ইতোমধ্যে ভোটার আইডি কার্ড পেয়েছে। এছাড়া টেকনাফ পাহাড় এলাকায় থাকা সৈয়দ হোসেন, আবদুল হামিদ, মোঃ সোলতান, আবদুল্লাহ, আবদুল লতিফ, আশরাফ আরী। ফাতের ঘোনার মোঃ রফিক, সোনা মিয়া, মৌলবী নজিবুল হক, সোনা মাঝি, জিয়া নগর এলাকার রুহুল আমীন, আব্দু শুক্কুর, পূর্ব পাহাড়তলী এলাকার লালু মাঝি, আরিফ উল্লাহ, ইসলামপুর এলাকার হামিদ, মৌলবী নুর মোহাম্মদ, দিল মোহাম্মদ, ইয়াকুব, বাবুল, আবদুল্লাহ, ইসলাম খাতুন, মৌলবী আবদুল মালেক, মৌলবী নুর হোসাইন, কাশেম মাঝি, মাস্টার হাবিব উল্লাহ, হালিমা পাড়া সত্তর ঘোনা এলাকার মরিয়ম, মুজিবুর রহমান, সুলতান মোহাম্মদ ছিদ্দিক, বশর প্রকাশ ডাকাত বশর শফিক, করিম উল্লাহর নাম জানা গেছে। এছাড়াও রয়েছে রহমানিয়া মাদ্রাসা এলাকায় জহির হাজী, মোহাম্মদ, আবু ছালেহ, ইসমাঈল, আমীর, মৌলবী এমদাদ ও মৌলবি আবু ছালেহ। বাদশা ঘোনা এলাকায় নুরুল আমিন নামের এক স্বীকৃত রোহিঙ্গা বর্তমানে সায়মন আমিন নামে পরিচিত। সে ৯ নং ওয়ার্ডে বসবাস করলেও এলাকায় ভোটার হতে না পেরে ৪ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ভোটার হয়েছে। কক্সবাজারে বর্তমানে এসব বার্মাইয়াকে নিয়ে একটি সমাজ গড়ে উঠেছে। কেউ কেউ থানা পুলিশের দালালিতেও লিপ্ত। এছাড়া ছৈয়দুল আমিন, সিরাজ মিস্ত্রি, নুরুল ইসলাম মিস্ত্রি যাদের নামে এর আগেও রোহিঙ্গা ভোটার হওয়া নিয়ে মামলা আছে। হাবিবুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন স্বীকৃত রোহিঙ্গা আছে যারা ১৫-২০ বছর আগে এসে বর্তমানে ভোটার হয়েছে কক্সবাজারে। জাতীয় সনদও হাতিয়ে নিয়েছে এসব রোহিঙ্গা। পাশাপাশি বাঁচা মিয়ার ঘোনা এলাকার ডাঃ আইয়ুবের পুরো পরিবার, মৌলবী আমজাদের পুত্র ইলিয়াছ, মোস্তফা, মৌলবী নজির, আবদুর রহমান ড্রাইভার (আশুরঘোনা) আমির হোসেন প্রকাশ ভুলু, দক্ষিণ ডিককুল এলাকার জামাল হোসেন, মৌলবি আবু নফর, জাফর আলম, সাবমেরিন ক্যাবল অফিস এলাকা সংলগ্ন নুরুল ইসলাম, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বড়ুয়াপাড়ার শওকত, আব্দু শুক্কুর, আবদুল সালামসহ অনেক রোহিঙ্গা যারা নানাভাবে পরিচয়ে ভোটার হয়ে গেছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম নির্বাচন অফিসের ভয়াবহ এনআইডি জালিয়াতির ঘটনায় রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে কক্সবাজারে বহু মামলা হয়েছে। এ ঘটনার পর আগে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বিষয়ে অনেকটা সচেতন হয়েছে সাধারণ মানুষ। এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন কক্সবাজারের সভাপতি প্রফেসর এম এ বারী বলেন, যারা ২০ থেকে ২৫ বছর আগে এসে এ অঞ্চলে বৈবাহিক সূত্রে, জমি কিনে, আত্মীয়তার সুবাদে ভোটার আইডি কার্ড পেয়ে গেছে, সেসব রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র বাতিলের উদ্যোগ নিতে হবে। এটা কোন বড় ব্যাপার না। কারণ, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত অসম রাজ্যে ৬৫ বছর আগে বসতি গড়াদের যদি নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারে, তাহলে আমাদের সরকার রোহিঙ্গাদের নিয়ে কেন পারবে না।

এপিপি তাপস রক্ষিত জানান, সরকারী তদন্তে বহু রোহিঙ্গা এনআইডিভুক্ত হওয়ার প্রমাণ মিলেছে। হাজার হাজার রোহিঙ্গা এদেশে ভোটার হয়ে গেছে। এদের অনেকে রাজনীতি থেকে শুরু করে সর্বত্র প্রভাব বিস্তার করতেও সক্ষম হয়েছে। আবার অনেকে সরকারী বিভিন্ন দফতরে চাকরিও করছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তাই আগে এসে যেসব রোহিঙ্গা নাগরিকত্ব পেয়েছে, তাদের তালিকা তৈরি করে নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ নিতে হবে। কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নব নিযুক্ত পিপি মোঃ ফরিদুল আলম বলেন, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভোটার তালিকা থেকে রোহিঙ্গা বাদ দেয়া খুবই জরুরী। একইসঙ্গে যারা এসব কাজে সহায়তা করেছে, তাদেরও বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।

এ ব্যাপারে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এসএম শাহাদাৎ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা ভোটার হয়েছে মর্মে কেউ তথ্য দিলে আমরা সেটা বাতিলের উদ্যোগ নেব। আর গণহারে রোহিঙ্গা শনাক্ত করার কর্মসূচীর বিষয়টি নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে সিদ্ধান্ত আসতে হবে। তবে কোথাও কোন রোহিঙ্গার খবর পেলে আামদের জানানোর জন্য অনুরোধ করছি।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সিম যাচাই ॥ বিটিআরসির উদ্যোগে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সিম যাচাই কার্যক্রম উদ্যোগ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ওসব ক্যাম্প এলাকায় নতুন সিম বিক্রি বন্ধ করা হয়েছে, আরও বন্ধ করা হয়েছে থ্রি জি ও ফোরজি সেবা।


সর্বশেষ সংবাদ