আল্লামা শফিক আহমদ (রহঃ) এর দ্বীপ্তিময় জীবন ও কর্ম

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর, ২০১৯ ১০:১৫ : পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ ইলিয়াছ ফারুক্বী … উপক্রমনিকা: করুণাময় আল্লাহ তা‘আলা যুগেযুগে এ-সুবিমল ধরাপৃষ্ঠে আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন এমন কতেক মহাপুরুষ আবির্ভূত করেন, যারা মানবতার চরম দুর্দিন, দুঃসময় ও ভীষণ দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে সময়ের কঠিন ঝড়-ঝাপটায় হিম্মতহারা না হয়ে পরিবেশ-পরিস্থিতির শত বাধা-বিঘœতার পর্বতচূড়া ডিঙিয়ে দৃঢ় মনোবল ও অদম্য স্পৃহা নিয়ে ধর্ম, দেশ ও জাতির কল্যাণসাধনে উৎসর্গ করে দেন স্বীয় জীবন। ঝাঁপিয়ে পড়ে বিক্ষিপ্ত সংগ্রামে। এগিয়ে যায় সম্মুখপানে। দুর্বার গতিতে। ছিনিয়ে আনে বিজয়-কেতন। সমাজকে করে পরিশীলিত, মার্জিত ও কলুষমুক্ত। বিপন্ন মানবতাকে করে সু-প্রতিষ্ঠিত। বিপদগ্রস্ত, দুঃখ-দুর্দশা জর্জরিত মানুষের জন্য হয়ে থাকে ত্রাণকর্তা। উদ্ধারকর্মী। ঈমান, ইখলাছ ও আমলের সহায়-সম্বল দিয়ে ফিরিয়ে আনে হারানো শৌর্য-বীর্য। হেলিয়ে দেয় অপশক্তির প্রাচীর। যাদের অক্লান্ত মেহনতে ঘুমিয়ে পড়া চেতনা মুহূর্ত জেগে উঠে পূর্ণদীপ্তিতে। নেতিয়ে পড়া ঈমানী জযবা-স্পৃহা যৌবনোদ্যমে নেচে উঠে তনু-মনে। যাদের সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রয়ে যায় ইতিহাসের পরতে পরতে। এমন মহাপুরুষদের হতে অন্যতম হচ্ছেন, দক্ষিণ চট্টলার বহুমাত্রিক বিরল প্রতিভাসম্পন্ন,কালজয়ী মহাপুরুষ আল্লামা শফিক আহমদ (রহ.)। একাধারে যিনি ছিলেন, ত্যাগী ছাত্র, সুদক্ষ শিক্ষক, সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রথিতযশা আলেমেদ্বীন, অপসংস্কৃতির বিশোধক, আকাবিরে উম্মতের প্রদীপ্ত নমুনা, সুন্নাতে রাসূলের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। যার জীবনের প্রতিটি দিকই ভাবী প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়। অনুশীলনীয় ও অনুকরণীয় আদর্শ।
জন্ম: হযরত আল্লামা শফিক আহমদ (রহ.) ১৯৩৫ সালের ৬ই নভেম্বর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অনিন্দ্য সুন্দর, অপরূপা, মনোহরা, নয়নাভিরাম লীলাভূমি কক্সবাজর জেলার টেকনাফ উপজেলাধীন সাগর-পাহাড় ও দৈর্ঘ্য সৈকত নিয়ে বিস্তৃত বালুময় চর ঘেরা বাহারছড়া ইউনিয়নস্থ নোয়খালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এক সম্ভ্রান্ত দ্বীনি পরিবারে। তার পিতার নাম জনাব আশরফ আলী। দাদার নাম আব্দুল আলী। তাঁর পিতা ও ছিলেন, অত্যন্ত আল্লাহভীরু, দুনিয়াবিমূখ ও ধার্মিক।
শৈশবকাল: শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন একটু ভিন্ন স্বভাবের । অন্য রঙের। তার সমবয়সী ছেলেরা যখন খেলা-ধুলার আনন্দ-উল্লাসে মেতে থাকতো, তখন তিনি থাকতেন একেবারেই নিশ্চুপ। নীরব। হৈ-হল্যা করা ছিলো তার স্বভাববহির্ভূত। একা বসে বসে কি যেন ভাবতো। কোন সময় বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে খেলা-ধুলার উদ্দেশ্যে নিজালয় থেকে বের হলেও তিনি সেখানে গিয়ে হয়ে পড়তেন আনমনা। সবের অগোচরে খেলা-ধুলা ছেড়ে চলে আসতেন বাড়ীতে। নিরিবিলি ও নির্জনে থাকাই ছিলো তার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি যেমন ছিলেন স্বল্পভাষী তেমন ছিলেন সদালাপী। তার সদাচারে সবাই হতো মুগ্ধ। সম্মোহিত। সাথী-সঙ্গীদের সাথে কখনো বাজে তর্ক বা ঝগড়ায় হতেন না লিপ্ত। ফলে সাথীরা করতো শ্রদ্ধা আর বড়রা করতো স্নেহ। ভালবাসত তাঁকে সকলেই। ছোটবেলা থেকে ধর্মীয় বিষয়ের প্রতিও ছিলো তার প্রবল আকর্ষণ। খুব একটা টান।
শিক্ষা-দীক্ষা: যখন এই শিশুপুত্র ধীরে ধীরে পড়া-লেখার উপযোগী বয়সে উপনীত হলো, তখন সে ঝকঝকে, উচ্ছল, প্রাণবন্ত এক বালক। প্রতিভাবান এক কিশোর। যৌবন বসন্তের সবুজ-শ্যামল বাগ-বাগিচায় বিচরণরত টগ্বগে উদীয়মান এক তরুণ। তাকে নিয়ে তার পিতার কতো স্বপ্ন। রকমারী স্বপ্ন। স্বপ্নের চোরাবালিতে লুকোচুরী। গগণচুম্বী স্বপ্নবিলাসে লাফালাফি। শুধু? তাঁকে একজন হক্কানী আলেম হিসেবে গড়ে তুলার জন্য। আবার তা কেবল কল্পনাজগতেই নয় সীমাবদ্ধ। বাস্তবে পরিণত করতেও সে হয়ে পড়ে উদ্যত। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এলাকায় মক্তব-মাদ্রাসা বলতে ছিলো না কোন কিছুর অস্থিত্ব। বিধায় সে খুবই চিন্তিত। বিচলিত। সেই হৃদয়পোষ্য স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়ে নিজকে তৃপ্ত ও সুখপুষ্ট করতে হয়ে উঠেন উৎসুক। আগ্রহী। বটে, কোথায় ও কার কাছে সোপর্দ করবে তার বুদ্ধিদীপ্ত, কোমলমতি সোনামণিকে। অনেক ভেবে-চিন্তে অনন্যোপায় হয়ে লালিত মনোবাসনাকে বাস্তবতার রূপ দিতে তার আদরের ছেলেকে পাঠিয়ে দিতে হল অনেক দূরে। বহু দূরে। সাবরাংস্থ বাহারছড়া এলাকার প্রখ্যাত আলেম মরহুম মাওলানা আব্দুর রশীদ সাহেবের তত্ত্বাবধানে। তার বাড়ীতে। যিনি ছিলেন আল্লামা শফিক আহমদ (রাহ.) এর আপন ভগ্নিপতি। নইলে তো প্রস্ফুটিতব্য একটি গোলাপ অঙ্কুরেই হয়ে যাবে বিনষ্ট। ঝরে পড়বে শৈশবেই। সূচনালগ্নেই। পূরণ হবে না তাঁর সেই দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন। যে স্বপ্নের অজনাস্রোতে গা এলিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিলো এতোদিন। এই যে,Ñ“সে একদিন পড়া-লেখা করে হবে একজন বিদ্বান। বড় আলিম। দেখাবে মানুষকে আলোর পথ।” এভাবেই আরম্ভ হলো এই শিশুপুত্রের জীবনের এক নতুন অধ্যায়। প্রবেশ করলো জীবনের এক নব দিগন্তে। শুরু হলো পড়া-লেখা। সবিশেষ গুরুত্ব ও সযতেœর সাথে পুরোদমে চলছেও রীতিমতো। ইতিমধ্যে তার পিতা বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারলেন যে, তার আদরের দুলাল বাংলা পড়া আরম্ভ করেছে। (স্মর্তব্য যে, তখনকার যুগে বাংলা-ইংরেজী পড়াকে ধার্মিক মুসলমানগণ চোরা পড়া বলে আখ্যায়িত করতো)। এই খবর শোনামাত্রই রেগে অগ্নিশর্মা। রেগে তেলে-বেগুনে আগুন। ক্ষোভে-ফুঁসে চোখ-মুখ হতে যেন স্ফুরিত হচ্ছে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এবার যেন শুরু হলো অন্তর্বেদনা। কালবিলম্ব না করে পরিবারের কাউকে কিছু না বলে মুহুর্তেই ঝটপট, তড়িগড়ি করে জামা-কাপড় গায়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন নিজ বাড়ী থেকে। শুরু করলেন পথচলা। বঙ্গোপসাগরের উপকূল ঘেষে প্রস্তরাকীর্ণ বালুকাময় সুদীর্ঘ প্রসারিত পথ। দূর বহু দূর। যাত্রা শুরু করলেন অভিমুখে। পায়ে হেঁটে। একা। কেউ নেই তার সাথে। প্রায় বারো মাইলের দুরত্বেরও বেশি পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়ে উপস্থিত হন মরহুম মাওলানা আব্দুর রশীদ সাহেবের বাড়ীতে। বাড়ীতে পৌঁছে গৃহদ্বারে করাঘাত করে প্রবেশ করলো ঘরে। ডাক দিলো সোহাগভরা কণ্ঠে তার সোনামণিকে। ডাক শুনামাত্রই মুখে ‘আব্বা’ বলে সাঁ করে এসে উপস্থিত হলো তার সামনে। যেন সে এই ডাক শুনতেই বসে আছে উৎকর্ণ হয়ে আগে থেকে। পিতার সাক্ষাত পেয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত দৌঁড়ে-ঝাপে জড়িয়ে ধরে সে স্নেহময়ী পিতাকে। পিতা-পুত্র উভয়ের মাঝখানে চলতে থাকে আদর-সোহাগ বিনিময়। আজই ঘটলো মুখের সাথে মুখের, চোখের সাথে চোখের এবং হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের মিলনমেলা। আনন্দে-উৎফুলে সে আজ আত্মহারা। অচপল পলকে চেয়ে আছে পিতার দিকে। আর মনে মনে স্মরে, হয়তো আজ নিয়ে যাবেন তার সাথে আপনালয়ে। মমতাময়ী মায়ের সকাশে। এই যেন ছিলো স্ফীত অন্তরের নির্বাক অভিব্যাক্তি। সে পরম উদ্বেলিত। উচ্ছসিত। ব্যাপারটা কিন্তু তা-নয়। ব্যাতিক্রম। কেবলমাত্র বুকের সঞ্চিত ব্যথার কিছু কথা কর্ণকুহুরে পৌঁছে দিতেই আজ তার আগমন। মাথায় স্নেহের স্নিগ্ধ আলতো পরশ বুলিয়ে বলতে লাগলেন- বাঁচাধন আমার! আমি শুনেছি, তুমি না কি ‘বাংলা বাল্য শিক্ষা’ পড়তে আরম্ভ করেছ? আমরা জানি বাংলা শেখলে আল্লাহকে পাওয়া যায়না। বিধায় এত কষ্টের পথ অতিক্রম করে এসেছি তোমাকে বারণ করতে। বাবা! তোমাকে তো আমি পাঠিয়েছি এই উদ্দেশ্যে যে, তুমি পবিত্র কুরআন-হাদীসের শিক্ষা গ্রহণ করে নিজে আলোকিত হয়ে দেশ ও জাতিকে করবে আলোকিত। সুতরাং তুমি এই শিক্ষা বর্জন করে আরবী শিক্ষায় মনোযোগ দাও। এটাই আমার একান্ত কাম্য। এমনই ছিল তার পিতার দ্বীন প্রেম ও আল্লাহভীরুতা।


সর্বশেষ সংবাদ