টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

স্মৃতিতে অম্লান ছাদেকুর রহমান ওয়ারেছী

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২১ জুলাই, ২০১৭
  • ১০৬৬ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

 

কেএম নাছির উদ্দিন = স্থানীয় পর্যায়ে যে ক’জন মানুষ তাঁদের কৃত-কর্মের দ্বারা সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের মনে রেখাপাত করে আছেন- তাদেরই একজন বৃহত্তর চকরিয়ার কৃতি সন্তান এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটনে ভুমিকা রাখার দায়ে পাকিস্তানী শাসক গোষ্টি কর্তৃক চকরিয়া থানায় ৫৫ ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার অন্যতম আসামী ছাদেকুর রহমান ওয়ারেছী। সদা হস্যোজ্জ্বল সদালাপী এ মানুষটি তাঁর ব্যক্তিত্ব দ্বারা মানুষকে যেকোন বিষয়ে সহজে প্রভাবান্বিত করতে পারতেন।

তাঁর নাম-ডাক, যশ-খ্যাতি ও প্রতিপত্তির কারণে সর্বমহলে ছিল অসাধারণ পরিচিতি। চকরিয়ার যেকোন প্রান্তে কখনো ব্যক্তিগত গাড়ী নিয়ে অথবা স্ব-শরীরে দাঁড়ালে চতুর্দিকে জমায়েত হত মানুষের। চেনা বা অচেনা যাই হোক-কোন লোক তাঁকে সালাম দিলেই হল- এমনভাবে তাঁর সাথে মিশে যেতেন ঐ লোকটি যেন তাঁর আত্মার আত্মীয়ের মত।

তাঁর এ বৈশিষ্টের কারণে মানুষের কাছে তিনি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছিলেন।

লোক সমাজে তিনি এখন শুধুই স্মৃতি। গত ১৯ জুলাই ছিল তাঁর ৫ম মৃত্যু বার্ষিকী।

মারাত্মক কোন রোগ-ব্যাধিতে দীর্ঘদিন বিচানায় মৃত্যু যন্ত্রণায় ভোগতে হয়নি-অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সহজ প্রক্রিয়ায় তাঁর উপর কার্যকর হয়েছে ¯্রষ্টার জারীকৃত মৃত্যু পরোয়ানা। বৃহত্তর চকরিয়ার বিশিষ্ট জমিদার, অ-বিভক্ত চট্টগ্রাম জেলা বোর্ডের সদস্য ও বৃহত্তর চকরিয়ার অ-বিভক্ত বারবাকিয়া ইউনিয়ন পরিষদের দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান মরহুম ছৈয়দুর রহমান ওয়ারেছীর সুযোগ্য এ পুত্র তাঁর ৬৩ বছর হায়াতে জিন্দেগী কাটিয়েছেন- সাধারণ মানুষের কাতারে। বৃহত্তর বারবাকিয়া (বারবাকিয়া, টৈটং ওশীলখালী) ইউনিয়নে তিনি দীর্ঘদিন নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। পিতার ন্যায় তাঁর শাসন এবং স্থানীয় সালিশ-বিচারও ছিল খুব কঠোর।

জনশ্রুত রয়েছে যে- এ কারণে এলাকায় অপরাধ প্রবণতা ছিল তুলনামূলকভাবে কম।

ইউনিয়নের ক্ষুদ্র গন্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর পরিসরে উপজেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব দেয়ার আকাঙ্কা ছিল তাঁর এবং এতে জনগণের সমর্থনও ছিল প্রবল। নিজের আকাঙ্কা আর জনতার সমর্থনকে পুঁজি করে তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। ১৯৮৫ সালের কথা- তখন দেশে চলছিল সেনা শাসন এবং এর নায়ক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের দৌর্দন্ড প্রতাপ। সে মুহুর্তে দেশে চালু করা হল উপজেলা পরিষদ পদ্ধতি।

সে বছর ৭ অক্টোবর দেশে অনুষ্ঠিত হয়- প্রথম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে তিনি প্রতিদ্বন্ধিতা করলেন “হারিকেন” প্রতিক নিয়ে।

তাঁর নির্বাচনী পোষ্টারের কারুকার্য এবং মুদ্রিত ভাষা এতই চমৎকার ছিল যে- যেকোন বয়সের মানুষ এক নজর তা না-দেখে পারেনি। পোষ্টারের শিরোভাগে উল্লেখিত বাক্য “অন্যায়ের কাছে নত নাহি কর শির-ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ লড়ে যাও বীর”।

এখনো মানুষের কাছে তা স্মরণীয় হয়ে আছে।

এ বাক্যের দ্বারা তিনি জনগণকে বুঝাতে চেয়েছিলেন- দেশে জনতার রায় বিহীন এক শাসকের অন্যায় শাসন চলছে- এ শাসন মুখ বুঝে মেনে নিয়ে কাপুরুষের মত মাথা নত করা যায়না এবং এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে জনতাকে পরিচয় দিতে হবে বীরের”। নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হলেন, কিন্তু শাসক গোষ্টি জনতার রায় মেনে না-নিয়ে সেনা শাসক এরশাদের দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করে। জনগণ এতে বিক্ষোভে ফুঁসে ওঠে।

শাসক গোষ্টির এহেন আচরণের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত হল এক বিশাল গণ মিছিল। চকরিয়া ডিগ্রী কলেজ হতে থানা রাস্তার মাথা পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী মানুষের ঢল নেমেছিল।

শাসক গোষ্টি জনতার এ ঢল দেখে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারী করতে বাধ্য হয়।

সেদিন ছাদেকুর রহমান ওয়ারেছীর বিপুল সংখ্যক ভোট নষ্টের জন্য দায়িত্বপালনকারী অনেক নির্বাচন কর্মকর্তা এখনো আক্ষেপ করে বলেন “সেদিন চাকুরী রক্ষার খাতিরে একটি বিবেক বর্জিত কাজ করেছি”।

জনতার বিপুল ভোটের পরেও তাঁকে নেতৃত্বে বসতে না-দেয়ার ক্ষোভ হিসেবে তিনি কখনো বৃহত্তর এলাকায় কোন নির্বাচনে প্রার্থী হলে তাঁকে মানুষ আরেকবার ভোট দিবেন- এমন প্রত্যাশায় ছিলেন। যার কারণে ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বংলাদেশ আওয়ামীলীগের মনোনয়ন নিয়ে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন- এমন একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু দলের উচ্চ পর্যায়ে চেষ্টা-তদ্বীরে হেরে গিয়ে মনোনয়ন না-পাওয়ায় নির্বাচন করতে পারেননি। এরপর ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারী পেকুয়া উপজেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হন এবং এটি ছিল তাঁর জীবনের শেষ নির্বাচন। এ নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। ফলে নেতৃত্ব দেয়ার মনোবাসনায় অতৃপ্ত আত্মা নিয়েই তাঁকে চিরবিদায় নিতে হয়েছে। তাঁর প্রতি মানুষের অগাধ ভালোবাসার সর্বশেষ প্রমাণ পাওয়া গেছে ২০ জুলাই-২০১২ বিকেল ৩ টায় তাঁর পৈত্রিক বাড়ী, হতে মাত্র ২/৩ মিনিটের পায়ে হাঁঠা দূরত্বে অবস্থিত মসজিদ এবং ইউনিয়ন পরিষদের বিশাল মাঠে অনুষ্ঠিত জানাযায়।

আওয়ামীলীগ, বিএনপি’র স্থানীয় নেতৃবৃন্দতো আছেই সেদিন সর্বস্তরের বিভিন্ন বয়সের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ এতে অংশ গ্রহণ পুর্বক তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জানাযায় বারবাকিয়ার চেয়ারম্যান মৌলানা বদিউল আলমের আবেগ মিশ্রিত বক্তব্য সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ক্রন্দনের সৃষ্টি করে। তিনি দৃঢ়ভাবে উচ্চারখ করেছিলেন- দীর্ঘ ৩০ বছর ছাদেকুর রহমান ওয়ারেচী এ জনপদের মানুষের সেবা করে গেছেন। আল্লহ রাব্বুল আলামীন এ মানুষটির পরকালে সুখ এবং আত্মার শান্তি দান করুন- তাঁর ৫ম মৃত্যু বার্ষিকীর এ মুহুর্তে এটিই আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT