টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!
শিরোনাম :

সুন্দরবনের বন প্রশাসনে অনিয়ম-দুর্নীতি

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫
  • ১৬৪ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
টেকনাফ নিউজ…

সুন্দরবনের বন প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে অনিয়ম, অসততা আর দুর্নীতি নামের ঘুণপোকা। বহুমাত্রিক উপযোগিতার আধার প্রকৃতির অনবদ্য সৃষ্টি এ সুন্দরবনের সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে বিপন্ন করে তুলেছে ঘুণে ধরা বন প্রশাসন। এ বনে খোদ বন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ প্রতিপালিত তো হয়ই না বরং এ ধরনের আদেশ-নির্দেশকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে আসছে বন অধিদপ্তর। এখানে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেও চলছে বিভিন্ন অনিয়ম। উপরন্তু  জনবল সংকট সুন্দরবনের সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে রেখেছে। বন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জীবনবাজি রেখে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বনদস্যু, হিংস  জীব-জন্তু মোকাবেলা করে চাকরি করেন কোনো ঝুঁকি ভাতা ছাড়াই। সুন্দরবন রক্ষায় বন অধিদপ্তর অগত্যা সিভিল প্রশাসন, নৌবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড, আনসার-ভিডিপির কাছেও সাহায্য চেয়েছে। গত ১৮ আগস্ট খুলনায় বিভাগীয় কমিশনারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সব বিভাগের সুন্দরবন বিষয়ক এক যৌথ সভায় বন বিভাগীয় নানা প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আগামী এক বছর এ সংরক্ষিত বনে সকল বনজ ও মত্স্য সম্পদ আহরণ বন্ধসহ জেলে, বাওয়ালী, মৌয়ালদের প্রবেশ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ঐ সভায় অংশগ্রহণকারীদের উপর দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়।

 

লঙ্ঘিত হয় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ

 

সুন্দরবনের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে বন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন মহলের একক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে গিয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ লঙ্ঘন করে সেখানে পছন্দসই কর্মকর্তা-কর্মচারী পদায়ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পাঁচ বছর আগে জারি করা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের এক পত্রে বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে নিজ জেলায় বদলি ও পদায়ন পরিহারের নির্দেশনা রয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখে ৩৬/২০০৯/৭৬২ নং স্মারকে বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষককে  মন্ত্রণালয়ের দেয়া এ পত্রে বলা হয়, এখন হতে বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা/কর্মচারীদেরকে নিজ জেলায় পদায়ন/বদলী (বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত) নিরুত্সাহিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। সংশোধিত নীতিমালায় বিষয়টি সংযোজন হবে বলে মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র সহকারী সচিব স্বাক্ষরিত ঐ পত্রে  উল্লেখ করা হয়। যে নির্দেশনার অনুলিপি বন অধিদপ্তরের বিভিন্ন মহলে একই বছরের  ৬ অক্টোবর পাঠানো হয়। অথচ এ নির্দেশ লঙ্ঘন করে সুন্দরবনের একটি রেঞ্জ সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থলে এই অঞ্চলেরই বাসিন্দা সহকারী বন সংরক্ষক, ফরেস্ট রেঞ্জার, বন প্রহরী, নৌকা চালক পদে বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। যার ফলে নিজ জেলায় চাকরির সুযোগ, উপর মহলের মদদ, জ্ঞাত বহির্ভূত আয় ইত্যাদিতে পুষ্ট কিছু কর্মকর্তা দোর্দণ্ড প্রতাপশালী হয়ে প্রতিনিয়ত প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ ও প্রভাব সৃষ্টির মাধ্যমে আদায় করে নিচ্ছেন নানা সুবিধা। পূর্ব সুন্দরবনের সদর দপ্তর বাগেরহাট ও এ বিভাগের দু’টি রেঞ্জে রয়েছে এই সুবিধাভোগীদের একটি সিন্ডিকেট। যারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, পদায়ন থেকে কাঠ, হরিণ, বাঘ, কুমির ইত্যাদি পাচার, মাছ ধরার পাস দেয়া, দুবলা জেলে পল্লীর রাজস্ব, করমজল বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের খাদ্য সরবরাহসহ পর্যটন খাতের রাজস্ব আদায় ও বিভিন্ন  টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কাছে নির্বিঘ্নে এরা বনের খাল-নদী ইজারা দিয়ে আসছেন। পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জেও স্ব স্ব জেলার বাসিন্দা কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদায়ন করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ভঙ্গ করে। এ ব্যাপারে  সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক এসএম শোয়েব খান ইত্তেফাককে বলেন, নিজ জেলায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন বা বদলির বিষয়টি নিরুত্সাহিত বা পরিহার করা মানে বারণ নয়। অন্যদিকে এ বিষয়ে খুলনা সার্কেলের বন সংরক্ষক ড.সুনীল কুন্ডু বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অমান্য করে এ ধরনের সিদ্ধান্তের দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের, সামষ্টিক নয়।

 

দুবলা জেলে পল্লী রাজস্ব স্টেশন ঃ সোনার ডিমপাড়া হাঁস

 

দুবলা জেলে পল্লী স্টেশন সুন্দরবনের সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়ের অফিস। গত তিন বছরের গড় হিসাবে সুন্দরবন থেকে যে রাজস্ব অর্জিত হয়েছে  তার এক চতুর্থাংশ এসেছে এ স্টেশন থেকে। এ সময় বছরে দুবলা থেকে গড়ে আয় ছিল এক কোটি ৭৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অতীতে রাজস্ব আয় কোন কোন বছর বেশিও ছিল। এ রাজস্বের বেশিরভাগ শীতকালে শুঁটকি মাছ থেকে আসলেও বর্ষাকালে ইলিশ আহরণ থেকেও যথেষ্ট আয় হয়ে থাকে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এ স্টেশনে কর্মকর্তা-কর্মচারী পদায়ন-বদলি নিয়ে অধিদপ্তর, সার্কেল ও বিভাগ পর্যায়ে মোটা অংকের টাকার লেনদেন হয়। দুবলায় তিন বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পদ নিয়ে ঘটে চলছে নানা প্রশাসনিক অনিয়ম। বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ এ পদে যিনি রয়েছেন তাকে তিন মাস আগে  বদলি করা হলেও রিলিজ করা যাচ্ছে না অধিদপ্তরের বড়কর্তার অনাগ্রহের কারণে। এখানে বড়কর্তার পছন্দ এমন একজন  ফরেস্ট  রেঞ্জার, যিনি দুবলা স্টেশনের জেলা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা,  প্রবীণ ও স্বাস্থ্যগতভাবে অসুস্থ এবং সাত মাস পর অবসরে যাচ্ছেন। চাকরির শেষ প্রান্তে অবস্থানকারী  অপেক্ষাকৃত অক্ষম  এ রকম কর্মকর্তাদের এ পদে বহাল  রেখে উপর মহল বিশেষ ফায়দা লুটেন কিন্তু এতে জাতীয় স্বার্থ হয় বিঘ্নিত। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে দুবলা জেলে পল্লীর তত্কালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দিয়ে অর্থ আত্মসাত্ করাতে গিয়ে থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে, উদঘাটিত হয় রাজস্ব কারচুপির এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। অবসরে যাওয়ার প্রাক্কালে সুবিধাভোগী চক্রের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ঐ রেঞ্জার তখন ফেঁসে যান এবং এ ঘটনায় সাসপেন্ড হন।

 

জনবল সংকট ঃ বন প্রহরী হন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা

 

এডিবির সুন্দরবন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পের (এসবিসিপি) পরামর্শে ২০০০ সালে সুন্দরবনের একটি বিভাগ ভেঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিম দু’টি প্রশাসনিক বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। তবে রেঞ্জ রয়েছে আগের মতই চারটি। পূর্ব বিভাগের সদর দপ্তর বাগেরহাটে। এ বিভাগের অধীন রেঞ্জ হচ্ছে শরণখোলা ও চাঁদপাই। পশ্চিম বিভাগের সদর দপ্তর খুলনায়ই আছে এবং নলিয়ান (খুলনা) ও বুড়িগোয়ালিনী (সাতক্ষীরা) এ বিভাগের দু’টি রেঞ্জ। পূর্ব বিভাগের সর্বমোট কর্মকর্তা-কর্মচারীর মঞ্জুরীকৃত পদ ৫১৬টি। যার মধ্যে ১০৯টি পদ শূন্য। খুলনার বন সংরক্ষক ড. সুনীল কুন্ডু বলেন, শূন্য পদ পূরণে কর্মী রিক্রুটমেন্ট করা হচ্ছে। বন কর্মীদের দায়িত্ব পালনে অর্থ বরাদ্দ নেই, আসামি আদালত ও কারাগারে প্রেরণ, মামলা করা- সব জায়গাতেই টাকা লাগে। বনে প্রয়োজনীয় টহল যান নেই , বেশ কিছু অফিস ও ফাঁড়ি বসবাসযোগ্য নয়।

 

ঝুঁকির কাজে নেই ঝুঁকি ভাতা

 

বন বিভাগের কর্মীরা সুন্দরবনসহ বনাঞ্চলে জীবন বাজি রেখে কর্তব্য পালন করেন। পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ সাইদুল ইসলাম বলেন,  পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা একই ধরনের কাজের জন্য ঝুঁকি ভাতা পেলেও বন বিভাগ এ থেকে বঞ্চিত। তাদের ঝুঁকি ভাতা প্রদানের বন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব বার বার অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। ঝুঁকি ভাতা পেলে বন কর্মীরা কাজে আরও দায়িত্ববান হবেন। কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে তাদের সাহস, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতা বাড়বে।

 

দাবি পৃথক অধিদপ্তর গঠনের
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও সুন্দরবন একাডেমীর নির্বাহী পরিচালক ড. আনোয়ারুল কাদির  ইত্তেফাককে বলেন, সুন্দরবনের বন ব্যবস্থাপনা সাবেকী ধরনের। এ বনের কাঠ, মাছ, প্রাণী সম্পদ, সমুদ্রগামী  জাহাজ , অভ্যন্তরীণ ও ভারতের সাথে নৌ চলাচল রুট, বন দস্যুতা রোধ ইত্যাদির ব্যবস্থাপনায় তথা সুন্দরবনের সুরক্ষায় বর্তমান বন প্রশাসন সক্ষম নয়। পশ্চিম বাংলার সুন্দরবন রক্ষায় রাজ্য সরকারের পৃথক মন্ত্রণালয় রয়েছে। আমাদের সুন্দরবন অনেক বেশি সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এ বন নিয়ে সরকারের ভাবনা কম।  সরকারের উচিত বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সুন্দরবন বিষয়ক একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর গঠন করা।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT