হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

টেকনাফপ্রচ্ছদবিশেষ সংবাদ

শাহপরীরদ্বীপের ভুমিহিন,সর্বহারাদের সরকারি উদ্যোগে খাসজমিতে পুনর্বাসনের জোর দাবি

আজিজ মিয়া::

আমার জন্মভূমি-মাতৃভূমি শাহপরীর দ্বীপ । এক পাশে নাফ নদী দুই পাশে বঙ্গোপসাগর।
বাংলাদেশ মানচিত্রের স্থলভূমির একেবারে সর্বশেষ দক্ষিণ প্রান্তের টেকনাফ উপজেলার ঐতিহাসিক পর্যটন নগরী শাহপরীর দ্বীপ ।

একসময়ের শস্য শ্যামলা মাছে চাষে ভরপুর প্রকৃতির সবুজ বনে ঘেরা এই শাহপরীর দ্বীপ ।

আমি ইতিহাস লিখব না। এখনো সেই অভিজ্ঞতা আমার নাই। কিন্তু ইতিহাস মানুষ কে বর্তমান করণীয় নির্দেশ করে। আমার এই লেখাটি বিংশ শতাব্দীর শুরুর এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হয়তো একদিন ইতিহাস হয়েও যেতে পারে ।

আমি আমার বেড়ে ওঠা জীবনে যা দেখেছি তার যতটুকু সম্ভব লিখার চেষ্টা করছি মাত্র ।

ইতিমধ্যে, স্নেহের ফারুক আজিজসহ অনেক নামের ডাকের লেখকও এ দ্বীপ নিয়ে লিখেছেন ।

শুরু করছি; ১৯৯২-৯৩ থেকে যখন আমার বয়স চার-পাঁচ বছর চলের । তখনকাল জোয়ার আসলে ভাঙা বাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে আমাদের চিকন রাস্তায় হাটু সমান পানি হত । জোয়ারের পানিতে আমাদের রাস্তাতে অনেকে মাছ ধরত । এমনকি বসত ভিটাতেও মাছ ঢুকে পড়ত । উল্লেখযোগ্য ফুয়া মাছ আর ছিরিম মাছ পাওয়া যেত ।

৯৪ ‘র তুফানের কথাও আমার যতটুকু মনে আছে প্রচুর ক্ষতিসাধন হয় এই দ্বীপের । অনেকের বাড়ি ঘর মাটিতে মিশে গিয়েছিল । গাছ পালা ত সব মাটিতে শুয়ে পড়েছিল । অবশিষ্ট দু চারটা যা ছিল তাও গাছের ভিড়ে মাটিতে লোটার জায়গা না পেয়ে আপনা অবস্থায় রয়েগেছিল ।
গাছের ভিড়ে কিছু সংখ্যক গাছ ক্ষয়ক্ষতির কবল থেকে বেছে গেছিল । ঘরের ভিটায় মাস যাবত প্রায় মাটির উপর দিয়ে হাটা সম্ভব ছিলনা । গাছের উপর দিয়ে হাটতে হয়েছিল ।

৯৫ য়েও হাল্কা তুফান ও জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল । এবং গুলার চরের কিছু চাষের জায়গা লবণাক্ত হয়ে ক্ষতিসাধন করেছে এবং গুলাপাড়ার কিছু ক্ষেত জমি ও ঘরবাড়ি নদী-সাগর বিলিয়ে দেই ।

ছিম্বি খোঁটা আর গুলারটোরার ভা-সুশ ও তেঁতুলগাছ দৃশ্যমান ছিল । তেঁতুলগাছ সংলগ্ন বেড়িবাঁধ প্রায় বিলিন হয়ে জোয়ারে পানি ঢুকত আর বাড়ায় বের হত । এবং
তেঁতুলগাছের বাঁধের ভিতরে থাকা পরিত্যক্ত খোলা জমি গুলিতে গরু মহিষ চড়ানো হত ।

৯৫’র দিকে মনে হয় ব্যারাক দিয়ে শাহপরীর দ্বীপ জীপ স্টেশন পর্যন্ত ইটের রাস্তা হয় । তারও আগে জালিয়াপাড়ার সাইটের উপর দিয়ে নয়াপাড়া বাই/বোটে করে নাফনদী বেয়ে টেকনাফ যেত শাহপরীর দ্বীপ বাসী ।।

৯৮’র শুরুর দিকে মনে হয় বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে বর্তমানে যে বেড়িবাঁধটি আছে এর কাজ শুরু হয় । সম্ভবতঃ মৌসুমী দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রায় প্রতি বছর এলাকাবাসী নিজস্ব বা সরকারি অর্থ ব্যয়ে রক্ষা বাঁধ করত । কিন্তু ৯৮’ বেড়িবাঁধের মত অত মজবুত সেগুলো ছিল না । ৯৮’র বেড়িবাঁধ যাবৎকালের সেরা বেড়িবাঁধ যা বিশ্বব্যাংক আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নির্মাণ করে দিয়েছিলেন ।।

##এখন একটু এই বেড়িবাঁধটির অবস্থান নিয়ে আলোচনা করে মূল সমস্যায় ফিরবঃ
আমার দেখা মতে এ বেড়িবাঁধটি ক্যাম্পপাড়ার বড় মসজিদ থেকে শুরু হয়ে জালিয়াপাড়া প্রাঃস্কুল–ডাঃশফিকের গোদার সুশ–জেটি–বিজিবি ক্যাম্প–হাবী মেম্বারের মাছের বরফকল সংলগ্ন সুশ– দক্ষিণপাড়ার সুশ–মনিরের গোদার সুশ– পশ্চিমপাড়ার মসজিদ– এবং ভাংগা ।। এর পরে আজ্জাহালীর আগে ব্যারাকের মাথায় শাহপরীর দ্বীপ বেড়িবাঁধে আরো একটি সুশ মনে হয় আছে । এবং এর মধ্যেই শাহপরীর দ্বীপের বর্তমান আয়তন ।

এবার মূল আলোচনায় আসিঃ- এ বেড়িবাঁধ টি নির্মাণের সময়ে ক্যাম্পপাড়ার বেড়িবাঁধের পিছনে পেরাবন ছিল । বেড়িবাঁধের বাহিরে জালিয়াপাড়ার ছিল ভিরাট ডেইল ও চর । ডাঃ শফিকের গোদার সুশের পিছন থেকে বর্তমান জেটি–বিজিবিক্যাম্প হয়ে বরপেরা গুলার টোরার মাথা পর্যন্ত ছোট বড় প্রাকৃতিক গাছে ভরপুর বন ছিল ।
যার আয়তন ছিল বর্তমান শাহপরীর দ্বীপের আয়তনের চেয়ে দ্বিগুণ প্রায় । এরপর ছিম্বি খোঁটা ভা-সুশ আর তেঁতুল গাছ হয়ে পশ্চিমের চর যা বর্তমান শাহপরীর দ্বীপের আয়তনের চেয়ে তিনগুণ মত হবে প্রায় ।
এসব আমার কল্পনা বা শত বছরের ইতিহাস না । আমার ক্ষুদ্র এ বয়সে দেখা ৯৫, ৯৬, ৯৭, ৯৮, ৯৯, ২০০০ সালের বাস্তব চিত্র ।

আমার দেখা শাহপরীর দ্বীপের বর্তমান আয়তনের তিনগুণ সমান পরিমাণ জায়গা সাগর ও নদী কে ছেড়ে দিয়ে ৯৮’র বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছিলেন সেই সময়ের বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ কর্তৃপক্ষ ।

মাত্র কয়েক বছরে বেড়িবাঁধের বাহিরে থাকা পেরাবন, বরপেরা, ছিম্বি খোঁটার ভিতরের গুলার চর, তেঁতুল গাছের বাঁধের ভিতরের বিল, জাল্লাপাড়ার ডেইল চর, পশ্চিমের বড় বড় ডেইল ও চর এবং ব্যারাকের পিছনের পেরা সহ শুধু বেড়িবাঁধটি ছাড়া সব নদী সাগরে বিলিয়ে যায় ।

তের চৌদ্দ বছরের ব্যবধানে ২০১২ সালে নদী সাগর আবারও ৯৮’র বেড়িবাঁধ টপকে শাহপরীর দ্বীপের মূল ভূখণ্ডে হানা দিয়ে ঢুকে পড়ে দখলে নেয় পশ্চিমপাড়া, দক্ষিণপাড়ার কিছু অংশ ও ব্যারাক ।

নেই ক্যাম্পপাড়ার পেরাবন জোয়ার এখন ক্যাম্পপাড়ার বেড়িবাধে । নেই জালিয়াপাড়ার ডেইল ও চর । জোয়ার জালিয়াপাড়ার মসজিদও ধসিয়ে দিয়েছে । নেই পেরাবন বরপেরা ।

নেই ছিম্বি খোঁটা তেঁতুলগাছ, জোয়ার এখন বারোবারো নুর আহমেদর বটগাছ তলায় । নেই পশ্চিমের চর মনিরের গোদার সুশ, জোয়ার এখন টোরা আব্দসসালামের ভিটায় । মনিরের গোদার সংলগ্ন সুশ এখন মনে হয় তিন গরিয়া পানিতে ডোবা থাকে ।

মাত্র বার চৌদ্দ বছরে সেই তিনগুণ সমান জায়গা নদী ও সাগর খেয়ে আবারও ২০১২ সালে শাহপরীর দ্বীপ বাসীদের বসতভিটায় নদী ও সাগর যৌথভাবে আঘাত হানে এই দ্বীপের বাসিন্দাদের একদম স্বর্বহারায় পরিণত করে দেই ।
এবং মাঝপথে যে পথটি টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপে যাতায়াতের ছিল সর্বপ্রথম তাতে আঘাত হানে ভেঙে দেই । অসহায় শাহপরীর দ্বীপ বাসীর পালানোর পথটিও বন্ধ হয়ে যায় ।

বাংলাদেশের কিছু মানুষ প্রতি বছর দারিদ্র সীমার নিচে নেমে যাচ্ছে । কেউ কেউ দারিদ্রতার কারনে আত্নহত্যা পর্যন্ত করছে। এক সময়ের হাসি খুশি সচ্ছল মানুষ গুলো যখন মানবেতর জীবন যাপন করেন তখন তা আমাদের ব্যথিত করে, মর্মাহত করে, আমাদের তাদের কে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে । এক সময়ের সচ্ছল কৃষক, ব্যবসায়ী জাদের এক সময় চাষের জমি ছিল,পালে গরু ছিল, পুকুর ভরা মাছ ছিল, লাঙ্গল জোয়াল ছিল । সময়ের পরির্তনের সাথে সাথে আজ তারা নিঃস্ব, ভুমিহিন, সর্বহারা, ফেরারি, রাস্তার ভিখারির চেয়েও মানবেতর জীবন যাপন করছে ।

পালানোর পথ বন্ধ করে নির্যাতনের ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল । পৃথিবীর ইতিহাসে মগ বার্মার নির্যাতন সবচেয়ে নির্দয় অমানবিক ছিল । তারা পর্যন্ত পালানোর পথ খোলা রেখে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করেছে ।

কিন্তু এই নদী সাগর পালানোর পথ বন্ধ করে শাহপরীর দ্বীপ বাসীদের নির্মম নির্যাতন চালিয়ে গিনেস বুকের রেকর্ড ফাইলে নাম লেখিয়ে নতুন রেকর্ড করেন ।

নদী সাগরের এই নির্দয় নির্মম নির্যাতন থেকে বাচাতে প্রজাবান্ধব বাদশাহ সিকান্দার হয়তো বেঁচে থাকলে সিসা ঢালাই দিয়ে অসহায় শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দাদের বাচাতেন ।

অথবা আমীরুল মুমিনিন হযরত ওমর রাঃ মত আল্লাহওয়ালা বাদশাহ থাকলে নদী-সাগরের কাছে চিঠি লিখে নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে নিঃস্ব শাহপরীর দ্বীপ বাসীদের হয়তোবা রক্ষার চেষ্টা করতেন ।

2012 সাল পরবর্তী অনেক হা হুতাশ করে বছর দুয়েক আগে ১০৬ কোটি টাকার একটা বাজেট শাহপরীর দ্বীপ বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য অনুমোদন দেই সরকার ।

সংস্কার কাজ শুরু হলে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে শাহপরীর দ্বীপের কৃতি সন্তান মদিনা ইউনিভার্সিটির মেধাবী ছাত্র Nasrullah Omari ‘র নেতৃত্বে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে মানব বন্ধন করেন শাহপরীর দ্বীপের একঝাঁক তরুণ ছাত্র ।
সেই সুত্রে আজকে সবাই এ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন ।

কিন্তু আমার একটাই দাবি———–
নিঃস্ব শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দাদের বিশেষ করে যারা ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বহারা হয়েছেন । তাদেরকে সরকারি উদ্যোগে খাছ জমিতে পুনর্বাসন করার জোর দাবি জানাচ্ছি ।

##মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা চাইলে সিকান্দার বাদশাহর ভূমিকা নিয়ে অসহায় নিঃস্ব শাহপরীর দ্বীপ বাসির পাশে দাঁড়িয়ে সিসা ঢালাই দিয়ে বেড়িবাঁধ সংস্কার করে/সরকারি অর্থে খাছ জমিতে ঘর দিয়ে নিঃস্ব শাহপরীর দ্বীপ বাসীদের পুনর্বাসন করে প্রজাবান্ধব প্রধানমন্ত্রীর উপাধিতে ভূষিত হতে পারবেন ইনশাল্লাহ ।

যেমনটি রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে মাদার অফ হিউম্যানিটির উপাধি পেয়েছেন । এ ব্যাপারে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা কামনা করছি ।

হে আল্লাহ আমরা দুর্বল অসহায় নিঃস্ব; আমাদের সাহায্য করার মত আপনি ছাড়া কেউ নেই- আমাদের রক্ষা করুন সাহায্য করুন ।

সবাইকে আল্লাহর দরবারে নদী সাগরের নির্যাতনের বিরুদ্ধে ফরিয়াদ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে ১ম পর্ব এখানে শেষ করিলাম ।।

স্মৃতিচারণেঃ
Maulana Aziz Mia
সাউদী প্রবাসি
তাফসীর ও ইসলামী ইতিহাস গবেষণায়
পিএইচডি অধ্যায়নরত

পেশ ইমাম, জামে আলে তালহা
আন-নিমাছ, সাউদী আরব ।
Imo+WhatsApp
+966 0578302981
azizmia24@gmail.com

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.