টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

মামলা বাণিজ্যে-টেকনাফের মানুষ দিশেহারা থানায় সন্ধ্যায় বাড়ে ভিড় কমে রাতে

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : বুধবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১২
  • ১১৯ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

ফরিদুল মোস্তফা খান, কক্সবাজার /  মামলার নামে ভয়াবহ চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে টেকনাফ থানায়। এই থানায় রাজনৈতিক কর্মী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, চিকিৎসক, আইনজীবী এমনকি নিরীহ সাধারণ মানুষের কেউই রেহাই পাচ্ছেন না। মানুষকে বন্দী করে চাঁদাবাজির মতো ন্যাক্কারজনক কাজ শুরু করেছে পুলিশ। নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড, সরকারবিরোধী আন্দোলনে যোগদান, রাষ্ট্রদ্রোহিতা, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডে অর্থ জোগানসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে স¤পৃক্ততার অভিযোগ ধোঁয়া তুলে সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার, মামলা, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনসহ ব্যাপক নিপীড়ন চলছেই। পুলিশের এমন গর্হিত বাণিজ্য থেকে রেহাই পাচ্ছে না তৃণমূল পর্যায়ের সরকারি দলের কর্মীরাও। অভিযোগ উঠেছে, টেকনাফ থানার এক শ্রেণির পুলিশ সদস্য সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষকে সীমাহীন হয়রানির মাধ্যমে বেপরোয়া চাঁদাবাজি করছে। এ জন্য তারা এলাকার জন্য বিতর্কিত গুটি কয়েক জনবিচ্ছিন্ন সরকারি দলের নেতা-পাতিনেতাদের যোগসাজশে উপজেলার ধর্নাঢ্য ব্যক্তিদের তালিকা করে চাঁদা আদায়ে নেমেছে। এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি রাখা হয়েছে সীমান্তের আদম ও ইয়াবা ব্যবসায়ী ধর্নাঢ্য ব্যক্তিদের। জানা গেছে, থানা পুলিশের কয়েকজন চিহ্নিত দূর্নীতিবাজের ভয়ে অনেকে নিজ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ কেউ পুলিশের অব্যাহত হুমকি ও ফোন কলের ভয়ে মোবাইল ফোন বন্ধ করে রেখেছেন। বাড়িঘর ও পরিবার-পরিজন ফেলে নির্বাসিত সময় অতিবাহিত করছেন অনেকেই। বিশেষ করে যেসব পরিবারের কোনো সদস্য সরকারবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সামান্য সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বা দলের প্রতি সমর্থন রয়েছে এমন লোকদের পাইকারি হারে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ভয়ে অনেক অভিভাবক তাদের কলেজপড়–য়া ছেলেদের ভয়ে কলেজে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন। গত এক মাসে সীমান্তের অপরাধ দমন অভিযানের নামে এ ধরনের অগণিত মানুষকে গ্রেফতার করেছে টেকনাফ থানা পুলিশ। গ্রেফতার এড়াতে পারেনি বয়োবৃদ্ধরাও। শুধু বাসা-বাড়ি নয়, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এমনকি মসজিদ-মাদ্রাসা ও রাস্তাঘাট থেকে পর্যন্ত পুলিশ নিরহ লোক ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যারা মোটা অঙ্কের টাকায় রফা করতে পেরেছেন তারাই থানা থেকে ছাড়া পেয়েছেন। বাকিদের ভাগ্যে জুটেছে কারাবরণ ও রিমান্ডে নির্যাতনের মতো ভয়াবহ পরিণতি। এ ধরনের অসংখ্য অভিযোগ আসছে সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে। নাকের ডগায় এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা এসব জেনেও নির্লিপ্ত থাকছেন। যে কারণে থানা পুলিশ হয়রানির মাত্রা দিন দিন বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা হাতেনাতে ধরাও পড়েছে। বর্তমানে সাজানো মামলার তালিকায় পড়া ভুক্তভোগীদের অনেকেই কক্সবাজার কারাগারে আটক থেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অর্থাভাবে অনেকেই জামিনে বের হতে পারছেন না। তারপরও অনেকের পরিবার ধারকর্জ করে প্রিয় মানুষকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্ত করে আনছেন। সম্প্রতি পুলিশের অভিনব গ্রেফতার বাণিজ্য ধরা পড়া ব্যক্তিদের খোঁজ নিতে থানা, আদালত ও কারাগারে সরেজমিন খোঁজ নিতে গেলে পাওয়া যায় এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতে কক্সবাজার কোর্ট হাজত খানায় গিয়ে দেখা গেছে, এই দিন টেকনাফ থানা পুলিশ ৫ জন আসামি পাঠিয়েছে। তৎমধ্যে তিনজনকে আদম পাচারের মামলায় এবং অপর ২ জনকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। হাজতে আটক এই ৫ আসামির কেউই কোন অপরাধে পুলিশ তাদের ধরে জেলে পাঠিয়েছে তা জানেন না বলে চিৎকার করে হাজত অভ্যন্তরে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তারা বলেন, কোন অপরাধ না করে জেল খাটতে হয় কথাটি তারা শুনেছেন, কিন্তু এই প্রথমবারের মত নিজেরাই এর শিকার হন। নাম না জানা এক হাজতি জানান, উপরের নির্দেশে নাকি পুলিশ বিনাকারণে তাকে ধরে একসাথে ২ মামলায় জড়িয়ে জেলে পাঠায় পুলিশ। শুধু ওই ব্যক্তিটি নয়, অনুরূপ বক্তব্য টেকনাফ থেকে আসা ৫ আসামির সবার। তৎমধ্যে হোয়াইক্যং ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক মেম্বার আলী আকবর জানান, বিএনপির হরতাল কর্মসূচি শেষে হ্নীলা থেকে শান্তিপূর্ণভাবে বাড়ি ফেরার পথে টেকনাফ থানার দারোগা আলমগীর হোসেন তাকে আটকিয়ে জানান, থানায় যেতে হবে, ওসি সাহেব ডাকছেন। দারোগার এ কথা শুনে আলী আকবর মেম্বার পুলিশ ভ্যানে উঠলেই মুহুর্তেই দারোগা আলমগীর তাকে হ্যান্ডকাপ পড়িয়ে দেয়। এরপর পুলিশ আলী আকবর মেম্বারকে রাতভর থানায় আটকিয়ে রেখে পরেরদিন মঙ্গলবার আদালতে পাঠায়। আজব বিষয় হচ্ছে, পুলিশ সাবেক এই মেম্বারকে জড়িয়ে দেয় ইতোপূর্বে ০৯ ডিসেম্বরে থানায় রুজুকৃত একটি মানব পাচার মামলায়। অথচ ওই মামলার এজাহারে আলী আকবরের মেম্বারের নাম না থাকলেও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোঃ আলমগীর হোসেন বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো আসামি প্রেরণ পত্র (ফরওয়ার্ডিং)-এ তাকে মানব পাচারে সন্ধিগ্ধ হিসেবে দেখায়। শুধু তাই নয়, মিথ্যা মামলায় নিরপরাধ লোক জড়িয়ে দেওয়া ওই দারোগা আলী আকবর মেম্বারকে মামলা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত জেল হাজতে আটক রাখার আবেদনও জানান ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। শুধু আলী আকবর মেম্বারই নয়, জানা গেছে, উক্ত গুণধর দারোগা এই মামলায় আরো ২ ব্যক্তিকে একই কায়দায় জড়িয়ে দিয়ে জেলে পাঠায়। এই অবস্থায়, স্থানীয় সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, টেকনাফ থানা পুলিশ আসল অপরাধীদের না ধরে এভাবে নিরপরাধ লোকজনকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠালে আইনশৃঙ্খলার আদৌ উন্নতি হবে কি? এদিকে, আলী আকবর মেম্বারের নির্বাচনী এলাকা হোয়াইক্যংয়ের খারাংখালী এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাবেক এই মেম্বার কোন অপকর্মের সাথে জড়িত নয়। ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক হওয়াটাই তার পাপ। একারণে পুলিশ তাকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করছে। নিশ্চয় এতে অদৃশ্য কোন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তের হাত রয়েছে। টেকনাফ থানার ওসি ফরহাদ জানিয়েছেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ভাল করে জানেন, কেন তাকে এই মামলায় ফরওয়ার্ডিং দেওয়া হয়েছে। এদিকে, পুরো টেকনাফ উপজেলা জুড়ে এখন থানা পুলিশের কর্মকান্ড নিয়ে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। রাজনীতি নিরপেক্ষ লোকজন বলছেন, পুলিশ এখন আগের মত নিজেদের অবস্থায় নেই। তারা এখন ক্ষমতাসীনদের পুতুলের মত ব্যবহার হচ্ছে। সূত্র জানায়, এর আগে টেকনাফ সদর ইউপির চেয়ারম্যান প্রবীণ রাজনীতিবিদ আলী আহমদকে পুলিশ বিনাকারণে থানায় বসিয়ে রাখার অজুহাতে স্থানীয় জনতার সাথে থানা পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ওই সংক্রান্ত ব্যাপারে পুলিশের রুজুকৃত মামলাকে পুঁজি করে টেকনাফেপুলিশ গণহারে ধরপাকড় শুরু করে। পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযান থেকে বাদ পড়েনি রাস্তার পাগলও। ভুক্তভোগীরা বলছেন, রাজনৈতিক উত্তাপকে পুঁজি করে পুলিশ যাকে পাচ্ছে তাকেই জামায়াত-শিবিরের ‘ক্যাডার’ হিসেবে চিহ্নিত করে আটক করছে। এরপর ভয়ভীতি দেখিয়ে নাশকতা ও ভাঙচুর মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার কথা বলে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। পুলিশের এই সুযোগকে আবার ব্যবহার করছে প্রতিপক্ষ গ্র“পও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেকনাফ থানায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর সন্দেহজনক ব্যক্তি আটকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। পুলিশের নিয়োগ করা দালালদের মাধ্যমে পরে আটককৃতদের স্বজনদের জানানো হয়। খবর পেয়ে স্বজনেরা থানায় ভিড় জমান। এরপর শুরু হয় ছেড়ে দেয়ার বাণিজ্য। এই কাজ চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। যারা দাবিকৃত টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন তাদের পরের দিন সন্দেহজনক মামলায় নতুবা পুরনো কোনো মামলায় ঢুকিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। যদিও এমন অভিযোগ পুলিশ বরাবর অস্বীকার করে বলছে, তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT