টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

মন্তব্য প্রতিবেদন : জঙ্গিতত্ত্ব ফেরি করে সাম্প্রদায়িকতা আমদানি

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : বুধবার, ৩ অক্টোবর, ২০১২
  • ২০৮ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

মাহমুদুর রহমান…ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ গত প্রায় দেড় দশক ধরে বাংলাদেশকে একটি ইসলামী জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। শেখ হাসিনা গত মেয়াদে যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সে সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি অর্থব্যয়ে এদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান সম্পর্কিত পুস্তিকা ছাপিয়ে সারা বিশ্বে বাংলাদেশ দূতাবাস মারফত বিতরণ করা হয়েছিল। এসব প্রচারণার প্রতিক্রিয়ায় তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ২০০০ সালে বাংলাদেশ সফরে এলে নিরাপত্তাজনিত কারণে রাজধানীর পাশে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পর্যন্ত স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে যেতে পারেননি। ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরও আওয়ামী লীগ সেই প্রচারণা অব্যাহত রেখেছিল।
আমাদের বৃহত্ প্রতিবেশী ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরেই নানারকমভাবে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিদার রাষ্ট্রটি নিয়মিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য সারা বিশ্বে বিশেষ পরিচিতি লাভ করলেও উল্টো তারাই আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশকে একটি ইসলামী জঙ্গিবাদী, সাম্প্রদায়িক ও অকার্যকর দেশ হিসেবে চিত্রিত করার জন্য সর্বপ্রকারে চেষ্টা করে থাকে। এদেশে ভারতীয় শাসকশ্রেণীর ঘনিষ্ঠতম মিত্র আওয়ামী লীগ গণবিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার শেষ উপায় হিসেবে দিল্লির ব্যবহৃত কৌশলই যে পুনর্বার গ্রহণ করেছে, সেটা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভাষণের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।
টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পেছনে কারা প্রকৃত দায়ী, সে বিতর্কে না গিয়ে একথা পরিষ্কারভাবেই বলা যায় যে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামবিদ্বেষ নতুন মাত্রা লাভ করেছে। পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন লাভের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনীতির প্রচারণার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিঃসন্দেহে লাভবান হয়েছে। আমাদের দেশে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বকালীন মাথাচাড়া দিলেও, অপরাধীদের দমনে চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদের প্রথম দিকের সিদ্ধান্তহীনতা দ্বারা আওয়ামী লীগই উপকৃত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ২০০৫ সাল থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা ও তত্পরতা বৃদ্ধি পেলে এদেশে নব্বইয়ের দশকে সৃষ্ট সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া সম্ভব হয়।
আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সংসদে সরকারদলীয় হুইপ মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় শায়খ আবদুর রহমান, বাংলাভাই ও তাদের সহযোগীদের বেগম খালেদা জিয়ার আমলেই গ্রেফতার ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। জেনারেল মইন ও ড. ফখরুদ্দীনের যৌথ নেতৃত্বাধীন ছদ্মবেশী সামরিক জান্তা পূর্ববর্তী সরকারের বিচার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ফাঁসি কার্যকর করে। তবে কিছু ব্যক্তিকে ফাঁসি দেয়া হলেও অনেক প্রশ্নের উত্তর আজ পর্যন্ত অজানা রয়ে গেছে। দেশের প্রতিটি জেলায় প্রায় একই সময়ে এতগুলো বোমা স্থাপন এবং বিস্ফোরণ ঘটানোয় দেশি-বিদেশি মদতদাতা কারা ছিল? বোমার সরঞ্জাম কোন দেশ থেকে সরবরাহ করা হয়েছিল? জঙ্গিগোষ্ঠীর অর্থায়নের পেছনেই বা কারা ছিল? বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সরকার তাদের শাসনের প্রায় চার বছরে সেসব রহস্য উদঘাটনে কোনোরকম উত্সাহ না দেখিয়ে সংকীর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে অব্যাহতভাবে দেশে-বিদেশে জঙ্গিতত্ত্ব ফেরি করে চলেছে।
আগেই উল্লেখ করেছি, ২০০৮ সালের নির্বাচনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের একচেটিয়া সমর্থন লাভে আওয়ামী লীগের এ-জাতীয় প্রচারণা অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে গত পৌনে চার বছরের দুর্নীতি, জুলুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বাকস্বাধীনতা হরণসহ সার্বিক অপশাসনে গণবিচ্ছিন্ন মহাজোটকে তাই আবারও জঙ্গির গল্পেই ফিরে যেতে হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বক্তৃতায় শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে একটি সম্ভাব্য ইসলামী জঙ্গিবাদের দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন। পশ্চিমাদের কাছে নিজের অপরিহার্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন। শেখ হাসিনার বক্তৃতা দেয়ার সময় যে গুটিকয়েক রাষ্ট্রের প্রতিনিধি অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত ছিলেন, তারা বিএনপি-জামায়াতকে ঠিকমত না চিনলেও আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার কল্যাণে জেনে গেলেন যে ষোলো কোটি মানুষের এই দেশটি জঙ্গিবাদের ঘাঁটি।
পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সরকারপ্রধান বিশ্বসভায় যখন নিজ দেশের প্রশংসা করেছেন, সে সময় শেখ হাসিনা দেশকে ডুবিয়ে কেবল নিজ পরিবারের গুণকীর্তনে ব্যস্ত ছিলেন। তার বক্তৃতার মর্মার্থ হচ্ছে, বাংলাদেশে একমাত্র আওয়ামী লীগ এবং ব্যক্তিগতভাবে তার পক্ষেই ইসলামী জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সুতরাং, তার সরকার অব্যাহতভাবে লুটপাট করে দেশের সর্বনাশ সাধন করলেও ইসলামবিদ্বেষী পশ্চিমা শাসকশ্রেণীর স্বার্থরক্ষায় তাকেই সমর্থন করা আবশ্যক। ২০০৮ সালে অন্তরাল থেকে ভারত যেভাবে নানারকম প্রচারণা চালিয়ে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোকে শেখ হাসিনার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল, একমাত্র তার পুনরাবৃত্তি ঘটানো গেলেই গাজীপুরমার্কা নির্বাচনী তামাশার মাধ্যমে মহাজোটকে আরও অন্তত পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় রাখা নিশ্চিত হয়। জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা দেয়ার দু’দিনের মধ্যেই এদেশে আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের প্রাথমিক বাস্তবায়ন দেখা গেল।
গত রোববার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কয়েকটি স্থানে যে চরম নিন্দনীয় সাম্প্রদায়িক অশান্তির সূত্রপাত হলো, তার পেছনে ক্ষমতাসীনদের কারসাজি এবং বিদেশি শক্তির উসকানি সমভাবে দায়ী বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শীর্ষপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের ইসলামবিরোধী বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ড দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে ক্রমেই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। গত পৌনে চার বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে কোরআন শরিফ এবং মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননা করার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। এক ব্যক্তি কোরআন শরিফ পরিবর্তনের আবদার নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করার ধৃষ্টতা পর্যন্ত দেখিয়েছে। এর মধ্যে সংবিধান সংশোধন করে ‘আল্লাহ্র প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস’ সেখান থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিউত্সাহী, আওয়ামী সমর্থক শিক্ষকবৃন্দ ছাত্রীদের বোরকা পরিধানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কথিত জঙ্গি দমনের নামে ভিন্নমতাবলম্বীদের বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা, গুম, রিমান্ডে নির্যাতন, বিনাবিচারে কারাবাসের রেকর্ড সৃষ্টি করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গোলাম মাওলা নামের এক শিক্ষককে সুপ্রিমকোর্ট জামিন দেয়ার পর আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কাশিমপুর কারাগারের ভেতরে ডিবি পুলিশের লোকজন প্রবেশ করে আত্মীয়-স্বজনের চোখের সামনে থেকে তাকে অজ্ঞাতবাসে নিয়ে গেছে। পাঁচদিন গোপন স্থানে রেখে নির্যাতন করায় সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি হলে বানোয়াট মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে আবারও রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। অত্যন্ত মেধাবী এই শিক্ষকের একমাত্র অপরাধ, তিনি নাকি হিযবুত তাহ্রীর নামক একটি সংগঠনের সদস্য। সংগঠনটির কার্যকলাপ প্রধানত মার্কিন ও ভারতবিরোধী লিফলেট বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ হলেও বিদেশি প্রভুদের সন্তুষ্ট করতে বর্তমান সরকারের আমলে তাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম মরহুম হাফেজ্জী হুজুরের বড় ছেলে অসুস্থ বর্ষীয়ান আলেম শাহ্ আহমদউল্লাহ্ আশরাফকেও অত্যন্ত অমানবিকভাবে সরকার গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে। ইসলামী জঙ্গি দমনের কথা বলেই সরকার এভাবে নির্বিচার মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে সক্ষম হয়েছে। অপরদিকে সরকার সমর্থক মাওলানাদের মিছিল করতে কোনো রকম বাধা না দিয়ে রীতিমত পুলিশ প্রহরায় তাদের কর্মসূচি পালন করতে দেয়া হচ্ছে।
সরকারের কৌশল এখানে অতি পরিষ্কার। আলেমদের মধ্যকার একাংশকে সরকারের পক্ষভুক্ত করে ভিন্নমতাবলম্বীদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের নির্যাতন করার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। এভাবেই সারা দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীরা। পটিয়া ও রামুর সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মধ্যেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।
মহানবী (সা.)-কে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চরম অবমাননাকর চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিক্রিয়ায় সারা বিশ্বে যখন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সে অবস্থায় ৯০ শতাংশ মুসলমানের আবাসস্থল, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক তরুণের ফেসবুকে আল্লাহ, কাবা শরিফ এবং কোরআন অবমাননাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। উত্তম কুমার বড়ুয়া নামের ওই তরুণ তার ধৃষ্টতার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে সেটা বুঝতে পারেনি, একথা বিশ্বাস করা কঠিন।
সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হওয়ার পর কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর কর্তৃক প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে ত্বরিত দোষারোপ করায় সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কেই প্রশ্ন উঠেছে। অবশ্য তার উপরিউক্ত মন্তব্য প্রদানের পর ২৪ ঘণ্টা অতিক্রান্ত না হতেই তিনি বায়বীয় মৌলবাদ এবং অসহায় রোহিঙ্গাদের ওপর এই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক হামলার দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন। তাছাড়া সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় এবং বাড়িঘরে প্রায় সারা রাত ধরে আক্রমণ চালানো হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরবতা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকারি দলের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং মত্স্যজীবী লীগের নেতাকর্মীরাই মূলত এই তাণ্ডব চালিয়েছে।
পৌনে চার বছরের মহাজোট সরকারের শাসন পদ্ধতি, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ অভিন্ন রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলেই সচেতন নাগরিকদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে কটূক্তি করার অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অনেক নাগরিকের বিরুদ্ধে রাতারাতি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেয়া হয়েছে। অথচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক তরুণের চরম উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের আগেই দুর্ভাগ্যজনক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্য সরকার বিরোধী দলকে দায়ী করে যেভাবে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে সরকারের ভূমিকাই অধিকতর প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিএনপির কোনো রাজনীতিবিদ যদি এ ঘটনার জন্য প্রকৃতই দায়ী হয়ে থাকেন, তাহলে সরকারের কর্তব্য হচ্ছে যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ জাতিকে জানিয়ে সেই ব্যক্তিকে সময়ক্ষেপণ ব্যতিরেকে আইনের হাতে সোপর্দ করা। কিন্তু তথ্যপ্রমাণবিহীন ঢালাও রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে সহিংসতা রোধে ব্যর্থতায় সরকারের দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও ইতোমধ্যে ঘটনাকে ঘৃণ্য আখ্যায়িত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। বিএনপি ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করার পাশাপাশি সত্য উদ্ঘাটনে দলীয়ভাবে আট সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে। অনেকদিন পর এই একটি ইস্যু নিয়ে অন্তত দেশের প্রধান বিরোধী দল সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে।
এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণ গর্ব করার মতো ঐতিহ্যের অধিকারী। স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৬৪ সালে মোনায়েম খান এবং ১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদের সরকার রাজনৈতিক ঘৃণ্য উদ্দেশ্য সাধনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করলে এদেশের প্রতিটি নাগরিক দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঙ্গাকারীদের প্রতিরোধ করেছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নাগরিকরা সর্বক্ষেত্রে সমঅধিকার ভোগ করে এসেছেন। লেখাপড়া কিংবা সরকারি এবং বেসরকারি চাকরিতে ধর্মের কারণে কোনো নাগরিকের সুযোগ কখনও সংকুচিত করা হয়নি। সরকারের অনেক উচ্চপদে সংখ্যালঘুরা চাকরি করেছেন এবং করছেন। আমাদের প্রতিবেশী প্রায় সব রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুরা নানারকম নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে বরাবর আমরা বাংলাদেশের উল্টো চিত্র দেখে এসেছি। মুসলমানবিরোধী দাঙ্গা সেদেশে সাংবত্সরিক ঘটনা। কয়েক বছর পরপর ভারতে খ্রিস্টানরাও সংখ্যাগুরু হিন্দুদের আক্রমণের শিকার হয়ে থাকেন। প্রধান বিচারপতি আলতামাস কবীরের মতো বিচ্ছিন্ন কয়েকজন সংখ্যালঘু ভারতে উচ্চপদে আসীন হলেও সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের অবস্থা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের চেয়েও নিকৃষ্ট।
পশ্চিমবঙ্গে প্রতি চারজনে একজন মুসলমান হলেও সরকারি চাকরিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব শতকরা তিন ভাগেরও কম। পাকিস্তানে সংখ্যালঘুরা বরাবরই নিগৃহীত। মিয়ানমারে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতনে সামরিক জান্তা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী, শান্তিতে নোবেলপ্রাপ্ত অং সাং সু চির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। রামু ও পটিয়ার চরম নিন্দনীয় ঘটনা আমাদের অতি গর্বের সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে আঘাত করেছে। যে বৌদ্ধ তরুণ ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে এবং যে মুসলমানরা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে সহিংসতাকে বেছে নিয়েছে, তাদের খুঁজে বের করে ভেতরের রহস্য উদঘাটন করতে হবে।
২০০৫ সালে ইসলামের নামে হঠকারী সংগঠন জেএমবি দেশব্যাপী যে বোমা হামলা সংঘটিত করেছিল, তার পেছনে দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংযোগ ছিল বলে জনগণ দৃঢ়ভাবে সন্দেহ পোষণ করে। একইভাবে এবারের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির উসকানিতেও একই গোষ্ঠীর হাত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বৌদ্ধধর্মীয় নেতা শুদ্ধানন্দ মহাথেরো এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘মুসলমানদের সঙ্গে আমাদের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় একসঙ্গে যুদ্ধ করেছি। হাজার বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেনি। এটি অঘটন নয়, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।’ ১৯৯১ সাল থেকে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে ধারা অব্যাহত আছে, সেটি পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করার মাধ্যমে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার অধীনেই পরবর্তী নির্বাচন সম্পন্ন করার অন্যায় ও অযৌক্তিক জিদ ধরে বসে আছেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশন বজায় রেখে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তার রূপটি কেমন হতে পারে, সেটি গাজীপুর-৪ আসনের সাম্প্রতিক নির্বাচনেই দেশবাসী বুঝে ফেলেছে। চাচা-ভাতিজির নিতান্তই পারিবারিক নির্বাচনটাও বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকেনি।
এই অভিজ্ঞতার পর বিএনপির অন্তর্বর্তীকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি জনগণের কাছে আরও ন্যায্যতা পেয়েছে। এই বাস্তবতায় শেখ হাসিনার একতরফা নির্বাচন একমাত্র ভারত ছাড়া বিশ্বের আর কোনো রাষ্ট্রেরই মেনে নেয়ার কথা নয়। তাই বিশ্ব জনমত বিভ্রান্ত করতেই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার উদ্যোগ নেয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। এটা যদি দেশি বা বিদেশি কোনো ফাঁদ হয়ে থাকে, তাহলে আমরা যাতে সেই ফাঁদে পা না দিই, সে ব্যাপারে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আবেদন জানাই। এ ধরনের উসকানিমূলক ঘটনা আবারও ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া হলে, তার প্রতিবাদ হতে পারে। তবে সেটি অবশ্যই শান্তিপূর্ণভাবে হতে হবে। সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়ে যারা ভাংচুর চালিয়েছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত সাজা দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।
তবে সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু মিডিয়ার উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর অপচেষ্টা লক্ষ্য করে শঙ্কিত হচ্ছি। মৌলবাদের নামে আলেমদের কিংবা স্বদেশে সংখ্যাগুরু শাসকদের হাতে নির্যাতনের শিকার সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের বলির পাঁঠা বানানোর অপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা সব সচেতন অসাম্প্রদায়িক নাগরিকের কর্তব্য বলেই আমি মনে করি। যেসব মিডিয়া কোনোরকম প্রমাণ ছাড়াই রামুর ঘটনায় রোহিঙ্গাদের দোষারোপ করছেন, তারা মিয়ানমারে যখন অসহায় মুসলমান সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছিল, তখন নীরবই ছিলেন। বিশ্বে মুসলমান জনগোষ্ঠী নিগৃহীত হলে যে শ্রেণী চুপ করে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে অথবা দুঃখবোধ করে না, তারাও অবশ্যই ঘোরতর সাম্প্রদায়িক। এদের মন্দ উদ্দেশ্য সম্পর্কেও আমাদের সচেতন থাকতে হবে। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা প্রসঙ্গে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমরের (রা.) একটি কাহিনী বর্ণনা করে আজকের মন্তব্য প্রতিবেদন সমাপ্ত করব।
মুসলমান বাহিনীর জেরুজালেম বিজয়ের পর খলিফা ওমর (রা.) সুদূর মদিনা থেকে সেখানে ভ্রমণ করেছিলেন। ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমান—তিন ধর্মাবলম্বীদের কাছেই জেরুজালেম অত্যন্ত পবিত্র নগরী। তিনি সেখানে পৌঁছানোর পর হজরত ঈসা (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত একটি গির্জা ঘুরে দেখছিলেন। এমন সময় নামাজের ওয়াক্ত হয়ে গেলে হজরত ওমর (রা.) গির্জার বাইরে এসে নামাজ পড়তে চাইলেন। গির্জার পাদ্রীরা খলিফাকে গির্জার ভেতরেই নামাজ পড়ার অনুরোধ করলে তিনি বলেছিলেন, আমি খলিফা হয়ে আজ এখানে নামাজ পড়লে সব মুসলমানই এটাকে নামাজের স্থান বানিয়ে ফেলবে। তাতে দেখা যাবে আপনাদের গির্জা মুসলমানের মসজিদে পরিণত হয়েছে। একজন মুমিন মুসলমানের অন্য ধর্মের উপাসনালয়কে কতটা শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা কর্তব্য, সেদিন হজরত ওমর (রা.) আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়েছিলেন।
শুধু তা-ই নয়, খ্রিস্টান শাসকদের দীর্ঘদিনের অবহেলায় ইহুদিদের উপাসনার স্থানে যে আবর্জনার স্তূপ জমে উঠেছিল, খলিফা ওমর (রা.) সেই আবর্জনা স্বহস্তে পরিষ্কার করেছিলেন। ভিন্ন ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের এর চেয়ে মহত্ নজির বিশ্ব ইতিহাসে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আজ ধর্মরক্ষার নামে যারা বৌদ্ধ মন্দিরে আগুন দিয়েছে, ভাংচুর করেছে, তাদের আর যা-ই হোক, ইসলাম ধর্মের প্রকৃত অনুসারী বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদীরা বিভিন্ন পন্থায় ও কৌশলে আগ্রাসন চালাচ্ছে। দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধভাবে সেই আগ্রাসনের মোকাবিলা করতে হবে। সাম্প্রদায়িকতা উসকে দেয়া হলে বাংলাদেশে কাছের ও দূরের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন পরিচালনার নতুন ছল-ছুতা সৃষ্টি হবে। ইরাক, আফগানিস্তান এবং লিবিয়ার ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের এদেশীয় দালাল শ্রেণীকে প্রতিরোধ করে দেশপ্রেম ও প্রকৃত ঈমানের পরিচয় দেয়ার আহ্বান জানাই।
[email protected]

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT