টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

বিশ্ব ইজতেমা ও দাওয়াতে তাবলিগ

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৩
  • ৩১৩ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

মাওলানা এম এ করিম ইবনে মছব্বির…

বিশ্ব স্রষ্টা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। তিনিই সৃষ্টিকারী, তিনি এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। হায়াত, মউত, ভালো-মন্দ, ধনী, গরিব, রাজা, প্রজা, সাদা, কালো, বাদশাহ, ফকির, ইজ্জত দেনেওয়ালা, বেইজ্জত করনেওয়ালা সব কিছুরই মালিক যিনি, তিনিই হলেন আল্লাহ সুবহানুহু ওয়া তায়ালা। পবিত্র কোরআনে কারিমে আল্লাহপাক ঘোষণা করেন যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি চির জীবিত এবং সব কিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করতে পারে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে সবই তাঁর। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান। (সুরা বাক্বারা : ২৫৫)। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সব সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হলো বনি আদম। সব সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র মানব গোষ্ঠীকেই মহান আল্লাহ দান করেছেন বিবেক, বুদ্ধি আর জ্ঞান-গরিমা। এই বিবেক-বুদ্ধিকে কাজে লাগাবে তাঁরই হুকুম আদায়ের মাধ্যমে, তাঁরই সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য। মহান আল্লাহর গোলামির এই ওয়াদা রুহের জগতে সব মানুষের রুহ একত্র করেছে, যার মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত আবির্ভূত সব মানবগোষ্ঠী রয়েছে। আফসোস, দুনিয়ায় আসার পর আদম সন্তান আল্লাহর সঙ্গে করা ওয়াদাগুলোকে ভুলে গিয়ে বিভিন্নভাবে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে নাফরমানি করতে লাগল। তখনই তাঁদের আবার মহান রবের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক জুড়ে দেওয়ার জন্য যুগে যুগে যেসব আল্লাহর দূত জমিনের বুকে তাশরিফ এনেছেন, তাঁরাই আল্লাহর প্রেরিত মনোনীত বান্দা নবী ও রাসুলগণের জামাত আল্লাহ আহকামুল হাকিমীন, তথা রবকে ভুলে যাওয়া মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন হেদায়াতের নূর দিয়ে। সব নবীর (আ.) একই মেহনত ছিল, আল্লাহভোলা মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। সব নবী (আ.)-ই ছিলেন তাওহিদের দাওয়াত পেশ করনেওয়ালা। এভাবে তাঁদের ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দ্বারা নবুয়তের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীতে আর কোনো নতুন নবী আসবেন না, যারা এতে বিশ্বাস রাখে না, তারা যে-ই হোক না কেন, তারা নিছক বেইমান, কাফির। তাদের কাফির হওয়ার বিষয়ে যারা সন্দেহ করে, তারাও তাদের দলের অন্তর্ভুক্ত। আখেরি নবীর মাধ্যমে দ্বীনে এলাহিকেও পরিপূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) শেষ নবী, এই উম্মতও শেষ উম্মত। হজরত সাহাবায়ে কেরামগণ, আখেরি রাসুল (সা.) নবীয়ে রহমত, সরদারে কাউনাইন, তাজেদারে মদিনা, জিগার গোসায়ে আমেনা, নবীয়ে করিম (সা.)-এর আস্থাভাজন জামাত ছিলেন। স্বয়ং নবী করিম (সা.) মেহনত করে নিজ হাতে ট্রেনিং দিয়ে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-কে গড়ে তুলেছিলেন। আর ইমান হিসেবে নেক আমলের মাইলফলক কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য হজরত সাহাবায়ে কেরামকে রেখে নবী (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। আর হজরত সাহাবায়ে কেরামই দ্বীনের এই আমানতকে পুরো জিম্মাদারীর সঙ্গে আদায় করেছেন এবং হুজুর (সা.)-এর প্রতিটি আদেশ ও নিষেধকে নিজের জিন্দেগিতে বাস্তবায়ন করে দুনিয়া থেকে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির সনদ হাসিল করে গেছেন। নবী করিম (সা.)-এর রক্তমাখা দ্বীনে এলাহির জন্য সাহাবাগণ মূর্তিপূজক, কাফির, ইয়াহুদ, নাসারাদের অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেছেন, নবীয়ে রহমত (সা.)-এর সুন্নাতকে বিশ্বের মানবগোষ্ঠীর কাছে পরিপূর্ণভাবে দ্বীনে এলাহির দাওয়াত পৌঁছে দিতে। তাঁরা জানমাল কোরবানি করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমরা সবাই আখেরি নবী রাসুলে আকরাম (সা.)-এর উম্মত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছি আলহামদু লিল্লাহ। আমাদেরও উচিত সাহাবায়ে কেরামের মতো একইভাবে দ্বীনের জন্য জানমাল ও সময় কোরবানি করা। দ্বীনকে জিন্দা করার জন্য নবী (আ.)-এর বাতানো তরিকায় মেহনত করা। আর পরিপূর্ণ দ্বীন ইসলাম নিজের মধ্যে, পরিবারের মধ্যে, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সমাজ, মহল্লা, গ্রাম, থানা ও পাঠশালা থেকে নিয়ে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, আদালত, রাষ্ট্র তথা সারা বিশ্বে কায়েম হয়ে যায়। প্রতিটি আদম সন্তানের কানে পৌঁছে যায়, এক আল্লাহ সব কিছুর খালিক ও মালিক এবং তাঁরই প্রেরিত রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) আমাদের একমাত্র পথপ্রদর্শক। বর্তমানে দ্বীনে এলাহির এই আমানতের দাওয়াত পৌঁছানোর প্রথম ভাগে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা হলেন হজরত ওলামায়ে কেরাম। দ্বীনকে কায়েমের উদ্দেশ্যে লাখ লাখ নবী (আ.) ও তাঁদের ওয়ারিস ওলামায়ে কেরাম জানমাল ও সময় কোরবানি করেছেন। নবী করিম (সা.)-এর রক্তমাখা দ্বীনকে সহিহভাবে টিকিয়ে রাখার জন্য ইলমে ওহির মারকাজ প্রতিষ্ঠিত করেছেন বহু ত্যাগের বিনিময়ে। খালেদ সাইফুল্লাহর উত্তরসূরি হয়ে নিজের জান আর মালকে কোরবানি দিয়ে তাওহিদের হিলালি ঝাণ্ডাবাহী হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তাবলিগওয়ালারা।
দ্বীনের কাজ মাদ্রাসায় হচ্ছে হক্কানি ওলামা, মাশায়েখ আর বুজর্গানের মাধ্যমে। তবে দ্বীন শুধু মাদ্রাসায় সীমাবদ্ধ থাকার জন্য নয়, সমগ্র আলমের মধ্যে দ্বীন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সারা বিশ্বের জমিনে থাকবে হেদায়াতের মারকাজ, মসজিদ কায়েম ও আবাদ হবে। ইলমে ওহির স্টেশন, Power House কওমি মাদ্রাসাগুলো। এসব কায়েম এবং আবাদের জিম্মাদার বানানো হয়েছে এই উম্মতে মোহাম্মদীকে।
আর এ লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য সামনে রেখে দারুল উলুম দেওবন্দের কৃতী সন্তান, মর্দে মুজাহিদ হজরত আল্লামা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহ.)-এর সুযোগ্য শাগরেদ হজরত আল্লামা ইলিয়াস (রহ.) বর্তমান বিশ্বখ্যাত বিশ্ব ইজতেমা ও নবীওয়ালা মেহনত দাওয়াতে তাবলিগের অগ্রদূত হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) ১৩০৩ হিজরি সালে ভারতের মেওয়াতে জন্মগ্রহণ করেন। হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) বাল্যশিক্ষা গ্রহণ করেন তাঁর বাবা হজরত মাওলানা ইসমাঈল (রহ.)-এর কাছ থেকে। ১৩১৪ হিজরিতে লেখাপড়ার জন্য তিনি চলে যান তাঁর বড় ভাইয়ের সঙ্গে। ১৩২৬ হিজরিতে দাওরায়ে হাদিস (টাইটেল) পাস করেন এবং হাদিসশাস্ত্রে তিনি গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। এলাকাবাসীর অনুরোধে তিনি নিজ গ্রাম মেওয়াতে ইলমে দ্বীনের খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন। তৎকালীন সময়ে মেওয়াত এলাকার বাসিন্দারা শিক্ষা, দীক্ষা ও ইমান আমলে ছিল খুবই নগণ্য। তারা নামমাত্র মুসলমান ছিল। তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা হজরত আল্লামা ইলিয়াস (রহ.)-এর বাবা মাওলানা ইসমাঈল (রহ.)-এর প্রতিষ্ঠিত মক্তব পরিচালনার মাধ্যমে এলাকাবাসীর কাছে হেদায়াতমূলক কাজ শুরু করেন। আর এরই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় মানুষকে ইমান ও আমলের প্রতি আহ্বান। আর সেই আহ্বানকে আজকের বিশ্বের দরবারে তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমা হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে, যা ১৯৪৪ সাল থেকে আমাদের বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর মানবকল্যাণ সাধনে তাঁর নিজ এলাকা মেওয়াত অঞ্চলে ইমান ও আমলের যে বিপ্লব সৃষ্টি করেছিলেন তার বাস্তব নমুনা আমাদের বাংলাদেশের ঢাকার অদূরে টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে। বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম ধর্মীয় মহাসম্মিলন হলো বিশ্ব ইজতেমা। দুই পর্বের বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ করেছেন বিশ্বের প্রায় ৫০ লাখ মুসলমান। হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর মূল কথা ছিল, ‘হে মুসলমানরা! তোমরা মুসলমান হও। মানবকল্যাণই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র বাসনা। তাবলিগ জামাতের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই কাজ নবীওয়ালা কাজ। যে কাজ করে হজরত সাহাবায়ে কেরাম দুনিয়া থেকে আল্লাহকে রাজি ও খুশি করে বেহেশতের সনদ হাসিল করেছিলেন। মনে রাখতে হবে, আমরা মুসলমান, শেষ নবীর উম্মত, আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য গোটা বিশ্বের মানবগোষ্ঠীর কাছে তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাতের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া। আমাদের অবশ্য আল্লাহর হুকুম-আহকাম ও হুজুর (সা.)-এর তরিকা মানতে হবে। উম্মতে মুহাম্মদী (সা.)-কে এক দায়িত্ব ও জিম্মাদারি দেওয়া হয়েছে, তারা সবার কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছায় এবং নিজেও এর ওপর আমল করে। আফসোস, এ কর্তব্যে অবহেলার জন্য আমরা শ্রেষ্ঠ নবীর শ্রেষ্ঠ উম্মত হওয়ার পরও আমরা জানি না ইমান কী? কিসে ইমান চলে যায়, ইমানের সংজ্ঞা কী? জানি না, কথা বলার আদব ও লেহাজ। অনেকে শুদ্ধ করে কোরআন তেলাওয়াত জানি না, শুদ্ধ করে নামাজের সুরা কিরাত জানি না।
দ্বীনি ইলম হাসিল করতে হবে, হারাম-হালাল জানতে হবে, প্রতিটি কাজে আল্লাহর হুকুম ও রাসুলে করিম (সা.)-এর সুন্নাতের পাবন্দ হতে হবে। মুসলমান কোনো শব্দের নাম নয়; মুসলমান হচ্ছে সুস্পষ্টভাবে একমাত্র আল্লাহপাকের কাছে আত্মসমর্পণকারী। আর এই আত্মসমর্পণ হওয়া যায় দ্বীনী মেহনতের মাধ্যমে, তথা তাবলিগওয়ালা কাজ, নবীওয়ালা কাজের মাধ্যমে। আল্লাহওয়ালাদের সোহবতের মাধ্যমে। দ্বীনি মেহনতের দ্বারা দিলের মধ্যে ইমান বৃদ্ধি পায়। ইমানের সম্পর্ক দিলের সঙ্গে। দিলের মধ্যে ইমানকে মজবুত করতে হলে মেহনত শর্ত আল্লাহর রাস্তায়। সেই মেহনতের জন্য ঘরবাড়ি, পরিবার-পরিজন, আরাম-আয়েশ, এয়ারকন্ডিশনের বাতাস, ভোগ-বিলাসকে ছেড়ে আমাদের প্রশিক্ষণ নিতে হবে। ইমানের বাস্তব প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে আল্লাহওয়ালাদের সঙ্গে জামাতবন্দি হয়ে। আল্লাহর ঘরের মেহমান হয়ে।
তাই আসুন, আমরা সবাই উম্মতে মোহাম্মদীর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দাওয়াতে তাবলিগের মেহনতে জুড়ে যাই। আর জানমাল ও সময়ের কোরবানি দিয়ে ইমানকে মজবুত করি। এই নবীওয়ালা মেহনতি কাজ পৃথিবীর কোনায় কোনায় চলছে, কেউ এক চিল্লা, কেউ তিন চিল্লা আবার কেউ বছর চিল্লা, কেউ বা জীবন চিল্লা। ২০১৩ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে অনুষ্ঠিত রাজধানী ঢাকা শহরের অদূরে টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে বিশ্ব মুসলিমের দাওয়াতে তাবলিগের ৪৮তম মহাসম্মিলন বিশ্ব ইজতেমায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে ইহকাল এবং পরকালের কল্যাণ হাসিল করার তাওফিক দান করেন, এই মোনাজাত আমার আপনার সবার।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT