টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কথা

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬
  • ১৬৭ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট:::

দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় ১১/৯/১৬ তারিখ ”রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা মুসলিম: কফি আনানের সফর” শিরোনামে কলামটি প্রকাশিত হওয়ার পর অনেক পাঠক,সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ফোনে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। আমার সাথে আলাপ করার পরের দিন জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক জনকন্ঠের শেষ পাতায় আমার উদ্ধৃতি দিয়ে সাংবাদিক এইচএম এরশাদ একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখেছেন। কয়েক দিন আগে একজন মোবাইল করে নিজেকে কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের নিবন্ধিত শরণাথী পরিচয় দিয়ে আমার সাথে দেখা করার সময় চান। পরের দিন মোহাং জাফর আলম দিপু,মোঃ শামশু আলম, ছৈয়দ আলম, মোহাম্মদ ও আব্দু শুক্কুর নামের পাঁচজন শরণার্থী আমার সাথে দেখা করে লেখাটা প্রকাশ করার জন্য রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তারা তাদের বর্তমান অবস্থা ও মনের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি স্মারকলিপি দিতে চান। আমার সাথে প্রায় দুই ঘন্টা আলাপ করেছেন। আমি তাদেরকে বলেছি এ দেশে যতদিন থাকেন ততদিন এ দেশের আইন মান্য করতে হবে। শিবিরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে স্মারকলিপিটি দেওয়ার পরামর্শ দিই।

১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গা মুসলমান রিফিউজীরা যখন বাংলাদেশে আসা শুরু করে এবং সরকারীভাবে তা স্বীকারও করা হচ্ছিল না তখন থেকে কক্সবাজার প্রেসক্লাবের উদ্যোগে ’কমিটি ইন এইড অব রোহিঙ্গা মুসলিম রিফিউজী’ নাম দিয়ে তাদের জন্য সরেজমিনে গিয়ে কাজ করেছি।

১৯৯২ সাল থেকে দীর্ঘ দিন ইউএনএইচসিআর কর্তৃক নিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে রিফিউজীদের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে তাদের সাথে অনেক আলাপ আলোচনা হয়েছে। এই বারের আলোচনার পরে রোহিঙ্গা রিফিউজী সম্পর্কে আমার পূর্বের খারাপ ধারণা বদলে যায়।

তারা বলেন, আমরা কোন অবস্থাতেই বাংলাদেশে থাকতে চাই না। দুইটি ক্যাম্পে আমরা নিবন্ধিত প্রায় ত্রিশ হাজার শরণার্থী আছি। কিন্তু অনিবন্ধিত আরো চার/পাঁচ লাখ শরণার্থী শুধু কক্সবাজার, বান্দরবান, চট্টগ্রামে নয় বাংলাদেশের প্রায় সকল জেলায় এই দেশের মানুষের সাথে বসবাস করছে। আমরা জানি তা বাংলাদেশের মানুষের উপর, অর্থনীতির উপর,আইনশৃংখলার উপর অতিরিক্ত চাপ। আমরা ন্যুনতম মানবাধিকারের নিশ্চয়তা পেলে মিয়ানমার নিজের মাতৃভুমিতে ফিরে যেতে প্রস্তুত আছি। তখন নিবন্ধিত অনিবন্ধিত কোন শরণার্থীই প্রতিবেশী কোন দেশে থাকবে না। এখন আমরা বিশ্বাস করি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে না। আলোচনার মাধ্যমেই আমরা আমাদের জন্মভুমি, মাতৃভুমি মিয়ানমারে ফেরৎ যেতে পারব। এই দেশ যেমন ব্রিটিশ শাসনাধীন ছিল আমাদের বার্মাও ব্রিটিশদের শাসনাধীনে ছিল। এ দেশে যেমন সিএস খতিয়ান, আরএস খতিয়ান হয়েছিল, বার্মাতেও সেই ধরনের খতিয়ান প্রকাশিত হয়েছিল।

ব্রিটিশ আমলে তৈরী সেই খতিয়ানগুলি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে আরাকান রাজ্যে (বর্তমানে রাখাইন) শত শত মুসলিম কবরস্থান, মসজিদ, মাদ্রাসা ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ড করা আছে।

১৯৬২ সালে সামরিক শাসন জারী হওয়ার পর থেকে বার্মার আরাকান রাজ্যে কোন মসজিদ, মাদ্রাসা,কবরস্থান নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। শত শত বছর পূর্বে আমাদের মুসলিম পূর্ব পুরুষদের দান করা এবং ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া জমিতেই মসজিদ,মাদ্রাসা,কবরস্থান করা হয়েছিল। আমরা তখনও ছিলাম রোহিঙ্গা মুসলমান,এখনও রোহিঙ্গা মুসলমান। বিভ্রান্ত বৌদ্ধ উগ্রবাদীরা আমাদের ’বাঙ্গালী’ বললেও অং সান সুচির সরকার আমাদেরকে ’আরাকান রাজ্যে বসবাসকারী মুসলিম’ হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেছেন।

বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালে জাতিরজনককে হত্যা করার পর যেমন দীর্ঘদিন এ দেশে ’বঙ্গবন্ধু’ ও ’জয়বাংলা’ শব্দ নিষিদ্ধ হয়েছিল, বার্মাতেও রেঙ্গুনের সামরিক জান্তা আরাকান দখল করে ’ডিভাইড এন্ড রুল’ নীতিতে তাদের শাসন পাকাপোক্ত করার জন্য রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশ থেকে গিয়ে ঐ দেশে অবৈধভাবে বসবাস করছে এবং তারা বৌদ্ধদের ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান শত্রু হিসাবে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মাধ্যমে প্রচার করতে থাকে। ’অহিংসা পরম ধর্ম’ বৌদ্ধ ধর্মের এই নীতির পরিপন্থী প্রচারণার বিরোধিতা করায় আরাকানের অনেক বৌদ্ধভিক্ষুদের তখন হত্যা করে রেঙ্গুন থেকে আগত সেনাবাহিনীর পুতুল ভিক্ষুদের কথা অনুযায়ী প্রচারণা চালাতে বাধ্য করা হয়েছিল। আরাকানে তিন প্রজন্ম ধরে যে মিথ্যা ইতিহাস ও ভুল বৌদ্ধ ধর্ম শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল তা এখন গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে চলে যাবে। অং সান সু চির কফি আনানকে প্রধান করে গঠিত কমিটি ও অন্যান্য উদ্যোগে আমরা আশাবাদী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক উদ্যোগে সে আশাবাদ আরো দৃঢ় হয়েছে। শরণার্থীরা ক্যাম্পে থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা প্রতিদিন বাংলাদেশে কি হচ্ছে, মিয়ানমারা কি হচ্ছে, আর জাতিসংঘে কি হচ্ছে সব জানেন বলে জানান। আমি অবাক হয়ে দেখলাম ও তারা তাদের স্মার্ট ফোনে দেখালো  ‘আরটিভি’ রোহিঙ্গা টিভি থেকে রোহিঙ্গা ভাষায় ( প্রায় আঞ্চলিক চাটগাইয়া ভাষার মত) এক তরুণী সর্বশেষ সংবাদ পাঠ করতে। এ টিভি স্ট্যাশনটা কোথায় জিজ্ঞাসা করলে তারা জানান তা মালয়েশিয়ায় অবস্থিত।

তারা আরো জানান, বাংলাদেশে নিবন্ধিত শরণার্থীদের মধ্যে এক হাজার শরণার্থীকে জাতিসংঘের উদ্যোগে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ আরো কয়েকটি দেশে পুনবার্সিত করা হয়েছে। তারা খুব ভাল আছে এবং আমাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। তারা বলেন,আমারা রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা মুসলমানরা বিশ্বের সবচেয়ে বেশী নির্যাতিত জাতিগোষ্টি হিসেবে বিশ্ব মিডিয়ার,বিশ্বনেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষন করতে সক্ষম হয়েছি। বার্মায় সামরিক সরকারের অবসানের পর এখন গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সমস্যা সমাধানে অং সান সুচির আন্তরিকতাও দেখা যাচ্ছে। শেখ হাসিনার আন্তরিকতা আরো বেশী দেখা যাচ্ছে। তাই আমরা শেখ হাসিনাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে স্মারকলিপি দিতে চাই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মঙ্গলবার জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল চেম্বারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আয়োজিত ‘লিডারশিপ সামিট অন রিফিউজস’ বিষয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা সামাল দেওয়ার জন্য সহযোগিতার নতুন পথ খুঁজতে হবে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের শরণার্থী ইস্যু সমাধানে উপায় বের করতে দেশটির নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশ। আমরা এই ইস্যুর সমাধানে উপায় বের করার কাজে মিয়ানমারের নতুন নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছি। আমি ইতোমধ্যেই অং সান সু চিকে কিছু আভাসও দিয়েছি। তিনি বলেন, গত তিন দশকে মিয়ানমার থেকে আসা বিপুল সংখ্যক শরণার্থী ও উদ্বাস্তুুকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা ওই মানুষদের দায়িত্ব বহন করে চলেছি। আমাদের স্থানীয় জনগণ তাদের আশ্রয় প্রদান ও সহযোগিতার জন্য জায়গার ব্যবস্থা করে দিয়েছে যদিও এতে বিভিন্ন সামাজিক,অর্থনৈতিক,পরিবেশগত ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে। শেখ হাসিনা অন্য আর্ন্তজাতিক অংশীদারদের শরণার্থী ইস্যুতে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন,কাউকে পেছনে ফেলে না রাখার যে অঙ্গীকার তা বাস্তবায়নে অবশ্যই জনগণকে সুশৃংখল, নিরাপত্তা, নিয়মানুবর্তিতা ও দায়িত্বের প্রতি উন্নয়ন সাধনে কাজ করতে হবে।

১৯৬২ সাল থেকে ৫৪ বছর পর এবারই প্রথম জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মিয়ানমারের বেসামরিক সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রেখে ইতিহাস রচনা করলেন অং সান সুচি। রোহিঙ্গা প্রশ্নের প্রতি ইঙ্গিত করে অং সান সুচি বলেন, আমরা সকল পক্ষের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি টেকসই সমাধানের জন্য কাজ করছি। আমাদের সরকার উন্নয়নের লক্ষ্যে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহন করেছে। তিনি জানান,জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানকে প্রধান করে এসব কাজ তদারকির জন্য একটি কমিশন গঠন করা হয়েছে। জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সু চি সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থাকে জঙ্গিবাদের উত্থানের প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেন। জঙ্গিবাদ রুখতে জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে সঠিক দিক-নির্দেশনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষত তরুণদের ভ্রান্ত মত দ্বারা বেশী প্রভাবিত হন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আমরা আশা করি, প্রার্থনা করি দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দুই গণতান্ত্রিক দুই মহান নেত্রীকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ঐতিহাসিক ও মানবিক সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করতে সৃষ্টিকর্তা সহায়তা করবেন।লেখকঃ কলামিষ্ট, সভাপতি, কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT