টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

বকলমের দু’কলম

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৩
  • ৭০০ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

ডা.সৈয়দ আবদুর রহমান…গত ২৫ এপ্রিল (২০১৩) কক্সবাজার  উপকূলের বঙ্গোপসাগরের কিনারা দিয়ে হেটে যাচ্ছিলাম। এক বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মোবাইল রেকর্ডে হালকা ভলিয়মে  বাজতে শুনতে পেলাম -‘আইল রে ভাই খাল তোপান/ভাসাই নিল বাড়ি ঘর- আঁরার ভাসাই নিল বাড়ি ঘর/ কেন সুন্দর দেশ্শান গইল্লরে ধু-ধুরে বালু চর/ ঘর নিল-বাড়িরে নিল/ বিয়াঙ্গিন ঝারি-ঝুরি/ হাজার হাজার মাইনষর পরান লইগেলগই হারি/ গরু ছাগল হাস মুরগী গেল্/ এগিন ওভাই হনে হর,হাইরে এগিন ওভাই হনে হর-ঐ/  কিয়া হারাইল মা-বাপ-ভাই-বোন/ কিয়াই স্বামী ধন/ কিয়া হারাইল বউ পোয়ারে
আত্মীয়স্বজন/ মায়ে হাঁেদর পুত-পুত গরি/ পুআয়ে নপার মা’র হবর-হাইরে পুআয়ে নপার মা’র হবর.. । (আসল যে ভাই খালের তোপান, ভাসাই নিল বাড়ি ঘর/ কেমন সুন্দর দেশ-খান করল-যে ধু-ধু রে বালু চর/ ঘর নিল বাড়ি যে নিল, সব ঝেড়ে-জুড়ে/ হাজার হাজার মানুষের প্রাণ নিয়ে নিল যে কেড়ে/ গরু-ছাগল-হাস-মুরগী গেল,এসব ওভাই কে বলে/ কেউ হারাল মা-বাপ-ভাই-বোন, কেউ স্বামী-ধন/ কেউ হারাল বউ-সন্তান আর আত্মীয়স্বজন, মা’য়ে কাঁদছে পুত্র পুত্র করে, পুত্র পাচ্ছে না মায়ের খবর..) । একজন স্থানীয় শিল্পীর কন্ঠে গাওয়া  এই গান শুনে আমার মনের পর্দায় ভেসে উঠল ১৯৯১ সালে ২৯ এপ্রিল দিবাগত রাতের কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডব-লিলা ও পরদিন সকালের ধ্বংশ যজ্ঞের করুন দৃশ্যাবলী। ঐ শিল্পী একানব্বই সালের এই ধ্বংশ লিলার চিত্র দেখে কতগুলো গান লিখেছিলেন। যা শুনলে সেই জলোচ্ছ্বাসের মর্মান্তিক চিত্রগুলো ভুক্তভোগী সব মানুষের হৃদয়কে এখনো নাড়া দেয়, দৃষ্টি ঝাঁপসা করে , অশ্রুসিক্ত হয়, ভিকটিম মানুষের চোখ ভিজে যায়। ১৯৯১ সালের এই মহাদুর্যোগের সময় হারিয়ে যাওয়া আপনজন, সহায়-সম্বল,হাঁস-মুরগী,গরু-ছাগলসহ সব স্মৃতিকে কথা ও সুরের ছন্দমালায় বেঁধে রাখার জন্য ঐ শিল্পী ধন্যবাদ ও সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।  প্রতি বছর এপ্রিল মাস আসলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের স্বজন হারানো মানুষের মাঝে শোকের মাতম শুরু হয়। বিষেশ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মানুষের চোখে জল আসে। কক্সবাজারের মহেশ খালি, কুতুব দিয়া, টেকনাফ, ঈদগাঁও, পোকখালী, গোমাতলী, চকরিয়া, পেকুয়া, খুরস্কুল, সেনাদিয়া, মাতার বাড়ি এবং চট্টগ্রাম,বাশঁখালি, ভোলা, হাতিয়া, পিরোজপুর,পটুয়াখালিসহ বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের কিনারায় যারা বসবাস করেন তারা কোন দিন ইচ্ছে করলেও ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলে স্বজন হারানোর ব্যাথা ভুলতে পারবে না।  ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল দিবাগত রাতে হঠাৎ কালবৈশাখী ঘূর্নিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে চট্টগ্রাম কক্সবাজার তথাা বাংলাদেশের দক্ষিন ও দক্ষিন পূর্বদিকের বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী উপকূলীয় অঞ্চলসমূহে এমন আঘাত হানে , যে আঘাতে মুহুর্তের মধ্যেই অনেকের সুখের সংসার ভেঙ্গে  ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়। ছারকার হয়ে যায় জীবনের সকল কোলাহল। হাজার হাজার নর-নারী, মাসুম বাচ্চা, শিশু-কিশোর,বালক-বালিকা, হাস-মুরগী, গরু-ছাগল, ঘর-বাড়িসহ অসংখ্য প্রাণী ও সুন্দরভাবে সাজানো পারিবারের সহায়-সম্পদ সাগরের লোনা পানির ¯্রােতে ভেসে বিলীন হয়ে যায়। মুহুর্তের মধ্যে চিরদিনের জন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় অনেক আপনজন। জীবনের সকল সুখ-স্বপ্ন মুহুর্তের মধ্যেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ঘূৃির্নঝঁড়ের কালো থাবায়। নিজের জীবনটিও রক্ষা করতে পারেরনি অনেকে। হাজার হাজার  বনি-আদম, ঘর-বাড়ি হাস-মুরগী,গরু-ছাগল কামানো-জমানো সহায়-সম্বল বিলীন হয়ে পথের ফকির হয়ে যায় লাখো মানুষ। সেই ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকারের মধ্যে এমন পরিবারও আছে – যাদের একজনও বেঁেচ নেই । এমনও আছে, দৈবকারণে  কোন বৃদ্ধা মা অথবা ছয়মাস নয়-মাস বয়সের শিশু বেঁেচ গেছে । সেই সময় দেখা গিয়েছে সব সহায়-সম্বল পানিতে ভেসে গিয়েছে কিন্তু অক্ষত অবস্থায় বেঁচে গিয়েছে তিন মাস বয়সের মাসুম বাচ্চা। তাই তো বলা হয় -রাখে আল্লাহ মারে কে! প্রবল ¯্রােতের টানে মায়ের বুকে শিশু, ভাইয়ের সাথে ভাই, বোনের সাথে বোনসহ আপনজনদের জড়িয়ে এভাবে কতজন যে  লাশ  হয়ে সাগরের পানির সাথে তলিয়ে গিয়েছে, তার কোন পরিসংখ্যান নেই। কেউ বলে একলাখ ত্রিশ হাজার, কেউ বলে একলাখ চল্লিশ হাজার মানুষ ওই কালবৈশাখীর সময় মৃত্যুবরণ করে। তবে আমাদের জানামতে অনেক মানুষ সে সময় নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে। ত্রিশ এপ্রিল যখন সুবেহ সাদিক হয় তখন দেখতে পাওয়া যায় গাছের ঢালে আটকে পড়া ছুরি মাছ, ফাইস্যা মাছ আর লইট্যা মাছ। আর পুকুর গিয়েছে ভরে এবং ভিটা হয়ে গিয়েছে পুকুর। আমার এক সাংবাদিক বন্ধর বর্ননা শুনলে কেউ অশ্রুসিক্ত না হয়ে পারবে না। ২৯ এপিলের ঘূর্নিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কথা বলতে  গিয়ে তিনি বলেছেন- তিনি নিজ চোখেই দেখেছেন চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় কারেন্টের খাম্বার এগারো হাজার ভোল্টেজের তারের ওপর আটকে পড়েছিলো অনেক বনি আদমের লাশ। অনেকে সেই জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়া মানুষ প্রাণ বাঁচার লড়াইয়ে পারিবারের সদস্যরা নিশ্চিত ভাবে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়ার প্রক্কালে অশ্রুপাত করে একে অপরের কাছ থেকে ক্ষমা, বিদায় দেয়া-নেওয়া করতেও দেখা গিয়েছে নাকি।  চোখের সামনেই দেখা গিয়েছে এক মা তার  তিন সন্তানকে সর্বশক্তি দিয়ে দুইহাতে বুকে আগলে ধরে আছে পচন্ড বাতাস ও পানির প্রবল ¯্রােত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে। বাতাস আর পানির বেগ বেড়েই চলছে। প্রচন্ড বাতাসের গতি আর বিষাক্ত পানির ¯্রােতে একসঙ্গে আর তিনজনকে ধরে রাখা আর ঐ মায়ের পক্ষে সম্ভব হলো না। গালে দু’টো চুমু দিয়ে একজনকে ছেড়ে দিয়ে বাকী দুইজনকে  হলেও  বাঁচানো যায় কিনা সেই চেষ্টা করছে। ঝড় আর বাতাস আরও বৃদ্ধি পেলে মা আরো একজনকে ছেড়ে দিতে চাচ্ছে। দ্বিতীয় ঐ সন্তানকেও ছেড়ে দেয়ার সময় শেষবারের মত তার দু’গালেও দু’টো চুমু খেয়ে ‘আল্লাহ তোমার ওপরই আমার একমাত্র ভরসা, তুমি বাঁচানেওয়ালা ,তুমিই মারেনেওয়ালা, সব তোমার ইচ্ছার ওপর, তোমার কাছেই ছেড়ে দিলাম  ’ বলে নিজের নাঁড়ি ছেঁড়া ধনকে ধরা হাতের বন্ধন বা  মুষ্ঠি খুলে দিয়ে চির দিনের জন্য বিদায় দিয়েছে। মায়ের হাতের মুষ্ঠি ছুড়ন্ত ঐ অবুঝ সন্তান মাকে তখন নাকি করুণ কন্ঠে বলেছিল – ‘আম্মু বর ভাইঅরেও এরি দিঅ, ভায়ই গিঅই,আঁরেও ছারি দিঅ ভায় যাবইল্লাই !! কিন্তু গুরা পুতইন্নারে এক্কনা দর গরি ধরি থাইক্ক, ছুড়ি নজাপান..’ । ( আম্মু বড় ভাইকেও ছেড়ে দেয়ার পর ভেসে গিয়েছে, আমাকেও ছেড়ে দিয়েছ ভেসে যেতে!! কিন্তু আমার ছোট্ট খোকাকে শক্ত করে ধরে থেকো, যেন সেও ছুড়ে না যায়..)।  এভাবে করুন বিদায় নিয়ে একে একে ভেসে গিয়েছে । তবে সন্তানের কথা মত ছোট্ট বাচ্চাকে ছেড়ে দেয়নি তার মা। সকালে দেখা গেল মা মরে লাশ হয়ে পড়ে আছে নদীর চড়ে কিন্তু দুই বছরের ছোট্ট বাচ্চা মায়ের লাশ হওয়া হাত ধরে আম্মু আম্মু বলে কাঁদছে। এই জন্য শিল্পী গেয়েছেন সেই গান-‘ এড়েকা মা পরি রইও -চল ঘরত যাই/ পোআয় নজানে দরদি মা’র ধরত পরান নাই/ লাশ হইয়ে মা থাইক্কে পরি-ওইদ্দা বিড়াত/ গুরা পোআয়ে হাঁদি হাঁদি হর/ ধরি মরা মা’য়ের হাত/ মা’রেই আঁরে দনা ভাত/ পত্যদিন মা, ফজর অইলে দিতা মুরি-হলা/ আজিয়া ফজর অইতে কিছু ন-দিলা মারেই, অ-মা কিছু ন-দিলা/আইজ-কা তুঁই অইন লয়, ন-জালর চুলাত/ গুরা পোআয়ে হাঁিদ হাঁদি হর/ ধরি মরা মা’য়ের হাত/ মারেই আঁরে দ-অনা ভাত…’। মা’য়ের নিথর দেহের পাশে জীবিত এমন অনেক বা”্চাকে এভাবে কান্না করতে দেখা গিয়েছে সে সময়। এভাবে স্বামী স্ত্রীকে, ভাই বোনকে, এক অপরকে চোখের সামনেই এমনভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য চিরবিদায় জানিয়েছিলেন তারা । পরদিন সকাল হলে বুকে বাচ্চাসহ জড়িয়ে ধরা লাশ দেখে বেঁচে যাওয়া আপনজনদের আহজারিতে ভারি হতে থাকে আক্রান্ত এলাকার আকাশ-বাতাশ। পরদিন সুবেহ সাদিক হওয়ার সাথে সাথেই দেখা যায় এক রাত্রির ব্যবধানে চারদিকে পরিনত হয়ে গিয়েছে ধু-ধু মরভূমি । উত্তর পাড়া-দক্ষিন পাড়া, পূর্বপাড়া পশ্চিম পাড়া বলতে কিছু নেই। বলতে শুনা যাচ্ছে-‘উত্তরের ঘরে ১১ জন নিখোঁজ , দক্ষিনের ঘরের ৮জনকে পাওয়া যাচ্ছে না, মধ্য বাড়ির কোন মানুষই দেখা যাচ্ছে না- ধরনের খবর। চারিদিকে বিলাপ আর আহাজারি।  অনেকের আপজনদের দেখাতো নাই, বাড়ি-ঘরসহ সবই বিলীন হয়ে গিয়েছে। আপনজনদেরতো নয়ই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না নিজের মাথাগুজার ঠাঁই একমাত্র ভিটেটিও।  তাইতো  শিল্পী গানে গানে বলেছেন সে কথা -‘ পাষান-ওদরিয়ার পানি/ নিদয়া বাতাসরে ,নিদয়া বাতাস/ দেশ-গেরাম ভাসাইয়া-রে নিল/ গইল্ল সর্ব নাশ রে, গইল্ল সর্বনাশ/ভাসাই নিল ঘর-বাড়ি, যা আছে সম্বল/ হাজার হাজার মানুষ নিল/ গরু আর ছাগল/ ছিন্ন-ভিন্ন গরি দিল, মাইনষের সুখের বসবাস/ দেশ-গেরাম ভাসাইয়ারে নিল/ গইল্ল সর্বনাশ-রে ,গইল্ল সর্বনাশ…’। ঐ জলোচ্ছ্বাসের সময় আক্রান্ত এসব এলাকায় এমন  কতগুলো মর্মান্তিক ও অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল, যা  এলাকার মানুষের কাছে আজ একুশ-বাইশ বছর পরও মনে পড়লে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। সম্মানীত পাঠকদের কাছে আজ আমি এমন  রোমাঞ্চকর ও মর্মান্তিক কয়েকটি ঘটনার কথা এখানে বর্ননা করতে করতে চাই। কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চলের ঘটনা।  ছেলে বিয়ে করার জন্য বউ দেখতে গিয়েছে এক ইউনিয়ন  থেকে অন্য ইউনিয়নে। ছেলের নাম মাকতুল হোসেন বাদশা । মেয়ের নাম আলিমুন্নেছা পারুল ।  সেদিন ছিলো সোমবার । কালবৈশাখীর ঝড়-তোপানের তান্ডবও হয়েছিল সোমাবার দিবাগত রাতে। ছেলে বউ দেখে আংটি পরিয়ে দিয়ে রাত আট-নয়টার আগে স্বাভাবিকভাবেই নিজের বাড়িতে চলে আসে। রাতেই ঘূর্ণিঝঁড়, জলোচ্ছ্বাস আর কালবৈশাখীর বাতাস শুরু হয়। অন্য অনেকের মত তাদের দুই বাড়ির সব সদস্যও বিষাক্ত পানির কাল ছোবলের ¯্রােতে ভেসে যায়। এখানে বিষ্ময়কর ব্যাপার হলো, পারুলের বাড়ির সবাই যে যার মত করে পানি আর প্রচন্ড বাতাসের সাথে যুদ্ধ করেও বাঁচতে পারেনি। ভেসে গিয়েছে সবাই। বাড়ির সবাই পানির স্রোতের টানে ভেসে যাওয়ার সময় পারুলও নিখোঁজ হয়ে যায়। ওই দিক দিয়ে বাদশার বাড়িরও সবাই উত্তাল তরঙ্গমালা ও বাতাসের টানে যে যার মত করে ভেসে যায়। বাঁচতে পারেনি কেউই। পরিবার থেকে ছিন্নভিন্ন হয়ে বাদশাও ওই ¯্রােতের টানে ভেসে আসে। কিন্তু আল্লাহর কি লিলা-খেলাা ।  পারুল পানির ¯্রােতের টানে  ভেসে যাওয়ার সময় এক বড় গাছের ঢালে আটকে পড়ে । এরপর গাছের ঢালকে শক্ত করে ধরে গায়ের ওড়না পেছিঁয়ে কোন রকম প্রাণে বেঁেচ যায়।  অনুরূপভাবে ভিন্ন ইউনিয়নে বাড়ি হয়া সত্ত্বেও নিজ বাড়ি থেকে বাদশাও ভেসে যাওয়ার সময় ¯্রােতের টানে কাকতালীয়ভাবে পারুলের আটকে পড়া ওই একই গাছের ঢালেই আটকে পড়ে। বিষয়টি সকলের বড়ই কাকতালীয়।  সারা রাত পানি আর বাতাসের সাথে যুদ্ধ করে দৈবক্রমে বেঁচে যায় ঐ হবু বর-বধু বাদশা আর পারুল দুইজনই। মজার বিষয় হচ্ছে, তারা দুইজনই যে একই গাছের ভিন্ন ভিন্ন ঢালে আটকে পড়ে আছে, সে খবর তারা দুজনের কেউই জানে না। পরদিন যখন সকাল হয় তখন একটি গাছের ঢালে একজন ১৬/১৭ বছরের মেয়ে ওড়না পেছিঁয়ে বাঁধা আরেকজন ২৪/২৫ বছরের যুবককে গলার মাফলার মোড়িয়ে গাছের ঢালে আটকে পড়ে থাকতে দেখতে পায় এলাকাবাসি।  গাছের ঢালে ওই যুবক আর মেয়ের নিথর দেহদ্বয় বেধেঁ থাকতে দেখে এলাকাবাসি তাদের নামিয়ে হাতের পাল্স দেখলে তাতে নাড়ির নাড়া-চাড়ার আলামত পাওয়া যায়। এরপর প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে চাইলে তারা চেতনা ফিরে পায়। অত:পর তারা তাদের পরিচয় পেশ করে। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, তারা প্রলয়ঙ্করি সেই রাত্রিতে হবু বর হবু বধুকে বউ বানাবার আলামত হিসেবে আংটি পরিয়েছে। এরপর হবু বর রাতে তার বাড়িতে গেলেও জলোচ্ছ্বাস আর বাতাসের কারণে ভিন্ন ভিন্নভাবে পানির ¯্রােতে ভেসে একই গাছের ভিন্ন-ভিন্ন ঢালে আটকে গিয়ে দৈবক্রমে দুইজনই বেঁেচ যায়। ছেলের বাড়ি ও মেয়ের বাড়ির সবাই ভেসে গেলেও আল্লাহর হুকুমে হবু বর ও হবু বধু দু’জনই বেঁচে যায়। পরে তারা সুস্থ হলে এলাকাবাসী সহযোগীতা করে হবু স্বামী বাদশা ও হবু বধু পারুলকে আক্দা পরিয়ে যৌতুক ছাড়া সেদিনই বিয়ের ব্যবস্থা করে মেয়েকে তার বর বাদশার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া  হয়। সেই দিন থেকে তারা ঘর-সংসার করে আসছে। তারা এখন দুই মেয়ে আর দুই ছেলের জনক-জননী। এলাকায় এখন একটি সুন্দর ও সুখি  পরিবার হিসেবে পরিচিত তারা।
আরেকটি ঘটনা হলো, এলাকার সবচেয়ে গরীব পরিবার  বলতে যা বোঝায়-এমন একটি পরিবার। দশজন সন্তানসহ সর্বমোট চৌদ্দ সদস্য বিশিষ্ট পরিবার। পরিবারের কর্তার নাম আবুল কালাম আর গৃহিনীর নাম মরিয়ম বেগম। আবুল কালামের বুড়ো বাবা-মা, নয়জন কন্যা, এক ছেলে ও কর্তা আর গৃহিনীর মধ্যে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আবুল কালামই। সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান একমাত্র ছেলে । নাম লোকমান । বয়স আট কি নয় বছরের মতই হবে। মেয়েদের মধ্যে দুই-তিনজন বিবাহ উপযুক্ত হলেও বিয়ে দিতে পারেনি টাকার অভাবে। আবুল কালামের পেশা মহেশ খালি নদীর কূল-কিনারায় গিয়ে ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ চেয়ে (মেরে) যা পায় তা নিকটস্থ বাজারে এসে বিক্রি করে চাল-ডাল নিয়ে কোন মতে জীবিকা নির্বাহ করা । এমন হলেও সংসাার অসুখী ছিলনা । কারণ, নয়জন মেয়ে হলেও দশ নম্বরে গিয়ে একটি মাত্র ছেলে লোকমানকে পেয়ে তারা সবাই আনন্দিত। সবার ছোট ভাই লোকমানকে ঘিরে সববোনদের সুখ আর স্বপ্নের শেষ নেই। ঐ লোকমানকে নিয়ে পরিবারের সুখের যত স্বপ্ন আর যত আশা । সুখের এই স্বপ্ন  দেখে দেখেই সংসার চলছিল তাদের। ২৯ এপ্রিল সেই ভয়ঙ্কর কাল রাত আসল। অন্যান্য রাতের মত সেই রাতেও বাড়ির পাশের নদীতে আবুল কালাম মাছ মারতে যায় ঝাঁকি জাল নিয়ে। একটু ডাক দিলেই শুনতে পাওয়া যাবে এমন দুরত্বে বাড়ি আর নদী। বলতে গেলে নদীর ধারেই বাড়ি। রাতে যখন প্রচন্ড বাতাস শুরু হয় তখন বাবাকে আলো দেখিয়ে বাড়িতে পৌঁছিয়ে আনতে টস লাইট নিয়ে আট-নয় বছরের ঐ লোকমান বের হয়। বাতাস আর পানি গতি বাড়তে থাকে। বাড়িতে যারা ছিলো তারা আগে আবুল কালামের জন্য টেনশন করলেও এখন লোকমানও ফিরে না আসায় তার টেনশনেই আরও অস্থির হয়ে যায় সবাই।  কিছুক্ষন পর দেখা গেল বাতাস আর পানির গতি এমনভাবে বেড়ে গেল সবাই ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’র মন্ত্র পড়ে নিজের জীবন বাঁচানোর জন্যই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একসময়  দেখা গেল  বাতাস আর পানির ছোবলে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে একে একে সবাই। কারো খবর কেউ জানে না। সেই চলে যাওয়াতে কারও মুখ আর কেউ দেখেনি । সেই থেকে আজও পযর্ন্ত কাউকে আর  খোঁজেও পাওয়া যায়নি।  বাবা আবুল কালামও বাড়ি ফিরে আসেনি। লোকমানেরও খোঁজ মেলেনি। বাড়ির সবাই একে একে পানির ¯্রােতের সাথে ভেসে গেলেও একটি ছেড়া টাইয়ার পেয়ে ভাসতে থাকে মরিয়ম বিবি।  ঐ ছেড়া টাইয়ার ধরে ভাসতে ভাসতে কোন মতে প্রাণে বেঁচে যায় বাড়ির গৃহকর্তী মরিয়ম বেগম। একটি বাড়ির ১৪ জন সদস্যের মধ্যে ১৩ জনই নিখোঁজ হয়ে যায়। যেই মহিলাটি (মরিয়ম বিবি) প্রাণে বেঁচে যায়, যার কোন আত্মীয়-পরিজন আর এই ধরণীতে বেঁচে নেই। কেবল এই মরিয়ম বেগমই বেঁেচ আছে। ঘর-বাড়ি পরম আত্মীয়সহ সব হারিয়ে অধিক শোকে পাথর হয়েই যেন বেঁচে আছে। সহায়-সম্বল আত্মীয়স্বজন সবাইকে হারিয়ে রোগে-শোকে অসহ্য যন্ত্রনার মধ্যেই কোন মতে প্রাণে বেঁচে আছে মরিয়ম বিবি। মরিয়ম বেগম ভিক্ষা করে করেই খেয়ে না খেয়ে যেনতেনভাবে  চলছে। ঐ কালবৈশাখির তোপানে  যাদের হারিছে, কখনো যাদেরকে খোঁজে পাওয়া যায়নি, মরিয়ম বিবি  মনে করেন তারা কেউ না কেউ হয়ত নদীর কূল-কিনারায় যে ঝোপ-ঝাড় আছে সেখানে কোথাও না কোথাও লুকিয়ে আছে, হয়ত বা  প্রাণে বেঁচে আছে, হয়ত বা বেঁচে নেই। তবে কোথাও না কোথাও আছেই। এখনও এমনই বদ্ধমূল ধারণা মরিয়ম বেগমের। এই মহিলার ভিক্ষা করার জায়গা হল নদীর কূল-কিনারা ও চরাঞ্চল। এই মরিয়ম বিবিকে একদিন যখন এই প্রশ্ন করা হয় – খালা নদীর চরে চরে কী খোঁজেন ? এখানেতো মানুষজন তেমন নেই- আপনাকে ভিক্ষা দিবে কে ?  তখন  মরিয়ম বিবি দুই চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলেন-‘ এড়ে আঁই পইত্তদিন হরাত খুঁজিত আইয়ীদে নয় অবাজি , গত তোআনত আঁজি গিঅইদে আঁর পুত-ঝিঅলরে তুআইত আইয়ীদে ।  এগইছ-বাইশ বছর আগে আঁর বুকত্তুন ছুরি গিঅইদে আঁর পুঁত-ঝিঅল এহনও আত্তুন মনে অদ্দে, ইত্রা নঅ-মরে । এড়ে হনিক্কা লুয়াই থাইক্কে পাঁন লাগে আঁত্তন। এতল্লাই দইজ্জার হাচাত আঁই ইতারারে তোআই চাইবল্লাই আইয়ীদে.্ আত্তুন আঁর পুআইনদে .আঁরে অ’মা -ম’ও গরি ডাকে পা’আন লাগে, দইজ্জার হলহলানি আত্তঁন অ’মা-’মও গরি ডাকের পা’আন লাগে.., এতল্লাই দইজ্জার ঢাকে ঢাকে ঘূরি ঘূরি থাকিদে আঁই..অবাজি.।’ (এখানে আমি প্রতিদিন খয়রাত খোঁজতে আসি না  বাবা , গত তোপানে হারিয়ে যাওয়া আমার ছেলে-মেয়ে -আত্মীয়দের খোঁজার জন্যই আসি। ২১/২২ বছর  আগে আমার বুক ছেড়ে চলে যাওয়া আমার ছেলে -মেয়ে এখনও আমার মনে হচ্ছে তারা মারা যায়নি। এই জন্য দরিয়ার কিনারায় আমি তাদেরকে খোঁজে পায় কিনা দেখতে আসি, এখানে আমার ছেলে-মেয়েরা এখনও ওমা-মাগো বলে ডাকছে ডাকছে মনে হয়, দরিয়ার কলকল শব্দ আমাকে আম্মা আম্মা করে ডাকছে বলে মনে হয়। এই জন্য দরিয়ার কিনারে কিনারে ঘোরে ঘোরেই থাকছি যে বাবাজি আমি )।
দরিয়ার চরে খেয়াল করলে দেখা যায় যে, বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া কঙ্কালসার শরীর নিয়ে মরিয়ম বেগমের মত এমন কিছু কিছু বৃদ্ধা- মহিলা এদিক- সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন । কোথাও উচু মাটি দেখলে, ঝাঁপ-ঝোঁপ দেখলে হাতে থাকা লাঠি দিয়ে একটু  নাড়া দিয়ে দেখেন – ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল কালবৈশাখীর ঝড় ও তোপানে ২১বছর আগে  হারিয়ে যাওয়া তার আপনজনদের লাশ কোথাও পড়ে আছে কি-না । সাগরের গর্জন নাকি ঐসব মায়েদের কাছে ‘আ্ম্মা ’ ডাকের মতোই ঠেকাই । মরিয়ম বেগমের মত এই অসহায় মায়েদের  কাছে গেলে চোখের লোনাজল   ফেলতে ফেলতে  গুন-গুনিয়ে গায়তে শুনা যায় ‘ ওরে রাক্ষুসীরে দরিয়া /সোনার সংসার গল্লিরে ছার-হার নিলিরে ভাসাইয়া / সুখের স্বপ্ন ভাঙ্গি দিলি/আশার বুকে দিলি ছালি/ এত কেনে অইত পাল্লি তুই নিমাইয়া /সোনার সংসার গল্লিরে ছার-হার /নিলিরে ভাসাইয়া.. ’ ।  কালবৈশাখীর ঐ ধ্বংস লিলায় আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা জানা যায়। আমজাদ ও আম্বিয়া। দু’জনের পারিবারিক মতামত, সহযোগীতা ও সামাজিক দায়-দায়িত্ব, ধর্মীয় কায়দা-কানুন মেনে অত্যন্ত  আনন্দসহকারে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয় ১৯৯১ সালের ১৫ বৈশাখ সোমবারে । বিয়ের নানা আয়োজন শেষ করে বাসরের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল এই নব দম্পতি । এমন সময় বাতাস আর জলোচ্ছ্বাস শুরু হলে যে যার মত করে বাঁচার লড়াই করতে থাকে। এমতাবস্থায় নব বধু আর নব স্বামী একজন আরেকজনকে ভালোভাবে দেখেওনি। যখন প্রচন্ড বাতাস বইতে শুরু করলো পরিবারের সদস্যরা তখন বোঝতে পারল যে এই মহুর্তে নির্ঘাত মৃত্যু  ছাড়া উপায় নেই কারো। ঠিক সেই মুহুর্তে নববধু আম্বিয়া ননদ ফারহানাকে খবর দেয় যে -‘আমি তো তোমার ভাই অথ্যার্ৎ আমার নব স্বামী আমজাদকে ইতি পূর্বে কোন সময় ভালোভাবে দেখিনি। দয়া করে একটু আমার সামনে আসতে বলো। যে বাতাস আর পানি আসা শুরু হয়েছে কে কখন ভেসে মরে যায় জানি না।  মরার আগে তাকে যেন একটু  দেখে নেই। কেয়ামতের মাঠে যেন দেখলে চিনতে পারি ঐ যে আমার স্বামী আমজাদ। কিছুক্ষনের মধ্যে কে কখন কোথায় হারিয়ে যাই- তার কোন নিশ্চয়তা নেই…’।  বাসর রাতে ননদ ফারহানার মাধ্যমে নববধু আম্বিয়া তার নব স্বামী আমজাদের চেহারাটা এক নজর দেখার জন্য  এই খবর পৌছাঁর আগেই আমজাদ বাতাসের প্রচন্ড এক ধাক্কায় বাড়ির অনেক দুরে গিয়ে ছিটকে পড়ে । আমজাদ এই ছিটকে পড়া থেকে আর ফিরে আসেনি। বাড়ির একেবারে সংরক্ষিত ও মজবুত স্থ্ানে রাখা হয়েছিল নববধু আম্বিয়াকে। প্রচন্ড বাতাস আর পানির কালো ¯্রােতে বাড়ির একে একে সবাই ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। বিধাতার অপার মহিমায় কোন মতে বেঁচে যায় নববধু আম্বিয়া।  পরদিন সকাল হলে ঐ  বাড়ির নববধু একমাত্র আম্বিয়া ছাড়া আর কেউ বেঁচে তো নেই , কারও খোঁজও নেই। এদিকে আম্বিয়ার বাপের বাড়িরও কারো খোঁজ-খবর নেই। আম্বিয়ার নব স্বামীতো সবার আগেই ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। সেই বাসর রাতে নব বধুকে কাক্সিক্ষত চেহারা খানি দেখানোর আগেই পানির ছোবলে হারিয়ে গিয়েছিল আমজাদ।  নব স্বামী আমজাদের মৃত চেহারাটাও দেখার সৌভাগ্য হয়নি আম্বিয়ার। আমজাদের লাশেরও সন্ধান পাওয়া যায়নি। বাসর রাতে চেহারাটাও না দেখে  নবস্বামী আমজাদকে হারানোর এই শোকে আম্বিয়া পাগলের মত ভবঘুরে ঘোরাঘুরি করে এখন। তার মুখে সেই থেকে এখনও একটি সুর সবসময় শুনতে পায় এলাকাবাসী। আম্বিয়ার সেই প্রলাপ হলো-‘ চিন্তায় চিন্তায় জীবন গেল/চিন্তায় চিন্তায় জীবন গেল সোনার যৌবন হরাইলাম দরদি /বাসর রাইতেই তোরে হারাইলাম-ও বন্ধুরে/ একনজর না দেখলাম তোরে আঁই(আমি)-সাইগর জলে গেইলি লোকাই গো/ কোথায় গেলে পাইব তোরে-কোথায় গেইলে- পাইব তোরে  কত চর  ঘোরী আইলাম-দরদি/ বাসর রাইতেই তোরে হারাইলাম….’।
এরকম অংখ্য মহিলা ঐ তোপানের সময় সব আপনজনকে হারিয়ে নিস্ব হয়ে বেঁেচে আছে এখনও। তাদের কেউ খোঁজ খবর নেই না। নদীর চরে চরে ঘুরে ঘুরেই  বাকী জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে।  তাইতো চোখের জলে আব্দুল আলীমের  গাওয়া এই গানটিও এই ভবঘুরে মানুষের অন্তরে একধরণের অনুরাগের সুর তোলে ৯১-এর ২৯ এপ্রিলের দু:সহ স্মৃতিকে স্মরণ করিয়ে দেয় -‘ মেঘনার কূলে/ ঘর বাঁিধলাম/ বড়ই আশা করে/ সে ঘর আমার ভাইঙ্গা গেল/ সর্বনাশা ঝড়েরে মেঘনা।….আমি এখনো খুঁইজা বেড়াই/ নদীর চরে-চরে-রে- মেঘনা/ নদীর চরে-চরে…..’।
লেখক
-ডা.সৈয়দ আবদুর রহমান ।
প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী, কক্সবাজার ।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ঘূর্ণিঝড়ে ভেসে যাওয়া কয়েকটি লাশ ।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ঘূর্ণিঝড়ে ভেসে যাওয়া একটি লাশ ।
(ছবি: স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত এ্যালবাম থেকে সংগৃহীত)

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT