হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

ধর্ম ও দর্শনপ্রচ্ছদ

প্রসঙ্গ : মসজিদের ইমামগণের বেতন

আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোন শরিক নেই। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর প্রেরিত রসুল। আল কুরআন সমগ্র মানব জাতীর জীবন বিধান। মুসলমান জাতীর ধর্ম ইসলাম। ইসলাম ধর্মের অনুসারিগণ মহাগ্রন্থ আল-কোরআন এবং পবিত্র হাদিসকে অনুসরণ করেন।
ইদানিং কিছু সংখ্যক শিক্ষিত মুসলিম ব্যক্তি কথায়, বক্তব্যে, আলোচনা সভা ও কথাবার্তায় ইসলাম ধর্মকে মুসলিম ধর্ম বলেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনাদর্শ মুসলিম জাতি অনুকরণ, অনুসরণ ও তাঁর নির্দেশাবলী পালন করেন। ধর্মের নিয়মকানুন পালন করার যে, বিধানগুলো মহাগ্রন্থ আল-কোরআন এবং পবিত্র হাদিসে আছে তার বর্ণনা মতে এবং সে নিয়মের মধ্যে দিয়ে যথাযথভাবে পালন করতে হয়। যেমন-কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাত। এগুলো বাধ্যতামুলক পালন করতে হবে।
প্রথম ফরজ হল ‘কালেমা’। মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণের সাথে সাথে তাকে মহান আল্লাহ ও রাসুল (সঃ) এর বাণী আযানের মাধ্যমে পৌঁছানো হয়। শিশুটি পৃথিবী সম্পর্কে জানার সাথে সাথে তাকে প্রথম ফরজটি পড়ানো হয় এবং তা শিখানো হয়। সে ফরজটি পালন করা খুবই সহজ।
২য় ফরজ হল নামাজ। নামাজ দৈনিক ৫ বার সময়মত আদায় করা বাধ্যতামূলক। নামাজ আবার গোপনে পড়ার জন্য নয়, নামাজ প্রকাশ্য ফরজ ইবাদত। নামাজ আদায় করতে হলে দৈনিক পাঁচবার মসজিদে গিয়ে আদায় করতে হয়। কোন কারণে মসজিদে যেতে না পারলে যে কোন পবিত্র স্থানে আদায় করা যায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নামাজ মসজিদে আদায় করতে হবে। মসজিদ মুসলিমদের সর্বোচ্চ পবিত্র স্থান। যেখানে মুসলিমদের সকল সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকে। মুসলিমদের মধ্যে যাঁরা নিয়মিত মসজিদে নামাজ আদায় করেন তাঁদের মাধ্যমে মসজিদের জন্য একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। তাঁদের মাধ্যমে মসজিদের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। পৃথিবী ব্যাপি মুসলিম দেশগুলোতে মসজিদের সংখ্যা অনেক। মুসলিম জাতী তাদের নিজেদের ঘর যেমন হোক না কেন তার দিকে খেয়াল নেই। পক্ষান্তরে তাদের আয়ের একটি বিশেষ অংশ মসজিদে দান করেন সওয়াব প্রাপ্তির আশায়। যে দান দিয়ে মসজিদটি সুন্দর করে নির্মাণ করা হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়। তবে কোন কোন স্থানে সরকারিভাবে মসজিদের নির্মাণ কাজও হয়ে থাকে। মসজিদে যথাযথভাবে যারা নামাজ আদায় করেন তাদের মুসল্লি বলা হয়। নামাজ আদায় করার সময় কোন মুসল্লি কোন রকম শব্দ বা অন্য কোন কার্যক্রম করতে পারে না। নামাজ এক মনে আদায় করতে হয়। মসজিদে জামায়াতে নামাজ আদায় করতে শুধু ইমাম সাহেবকে অনুসরণ করতে হয়। ইমাম সাহেব যা করেন তাকে অনুসরণ করলে মুসল্লিদের নামাজ আদায় হয়। মুসলিম সমাজে সবচেয়ে বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব করেন ইমামগণ। ইমামগণ মুসলিম সমাজে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। সমাজের সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা ও যথাযথ সম্মান করেন। মুসলিম পরিবারে একটি শিশু জন্মগ্রহণ করার সময় হতে মৃত্যুবরণ করার পর কবরে শায়িত হওয়া পর্যন্ত ইমামগণ বিভিন্নভাবে ধর্মীয় কাজ করেন ও প্রতিনিয়ত তাঁদের প্রয়োজন হয়। ইসলামী আইনে বিচার, ধর্মীয়ভাবে সামাজিক সমাধানসহ আরো অনেক কাজ ইমামগণ করেন। প্রায় সবসময়ই তাদের সরনাপন্ন হতে হয় সকলকেই।
এত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিকে মুসলিম জাতী এবং সামাজ তাঁকে কিভাবে দেখেন। মুসলিমের আদি হতে মসজিদ ছিল এবং অন্ত পর্যন্ত মসজিদ থাকবে। ইমাম বিহীন মসজিদ হয়না বা থাকতে পারেনা। ইমাম সাহেবকে একটি মসজিদে নিয়োগ দেয়া ও তাঁর বেতনের উৎস সুনির্দিষ্ট নেই। প্রতিনিয়ত গ্রামবাসী ও মুসল্লিদের নিকট হাত পাততে হয়। যেটি খুবই অনাকাঙ্খিত ও লজ্জাজনক। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে মসজিদও বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রচুর। যেসব সমাজে জায়গা আছে সে জায়গা দান করে হোক কিংবা কিনে হোক মসজিদ নির্মাণ করতে হবে।
ইদানিং দেখা যায় অনেকের বাড়ির ছাদে, গ্যারেজে কোন এক ফ্লোরকে মসজিদ হিসেবেও ব্যবহার করছে। ছাদে অনেক মাইক লাগানো আছে। নামাজ শেষে অনেকগুলো মাইকে বড় বড় শব্দ করে জিকির করছে। অন্যের কোন সুবিধা হচ্ছে কিনা তার খবর নেই। এখন আমরা জানার চেষ্টা করি মুসলিম সমাজের সে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ইমাম সাহেবের অবস্থান সম্পর্কে। মসজিদের গুরুত্ব ও শ্রেণিভেদে ইমাম নিয়োগ দেয়া হয়। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াতে হয় ইমাম সাহেবকে। সময় অনুযায়ী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াতে দৈনিক ইমাম সাহেবের প্রয়োজন হয় মাত্র আড়াই ঘন্টা। প্রতি ওয়াক্তে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট করে। অনেক মসজিদে দেখা যায় প্রতি ওয়াক্তে ইমাম সাহেবের নামাজ পড়াতে প্রয়োজন হয় মাত্র পাঁচ থেকে দশ মিনিট, যা কাম্য নয়। দৈনিক সর্বোচ্চ এ আড়াই ঘন্টা চাকরি করার জন্য ইমামগণের নিয়োগ প্রক্রিয়াটি কিভাবে হয়ে থাকে তা পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
দেশে সরকারী, বেসরকারী, আধা সরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত সকল প্রতিষ্ঠানে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা আছে। সর্বনি¤œ বেতন ও সর্বোচ্চ বেতন। তৎমধ্যে প্রতি বছর তাদের বেতন স্কেল অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে ইনক্রিমেন্ট অর্থাৎ ভাতা বৃদ্ধি পায়। দেশের মানুষের জীবন যাত্রার মানের উপর নির্ভর করে কয়েক বছর পরপর বেতন স্কেল বৃদ্ধি করা হয়। যদি কোন কারণে স্কেল বৃদ্ধি করতে দেরি হয় তা হলে সরকারী গেজেটে অতিরিক্ত টাকা প্রদান করা হয়, যেন ইমাজের্ন্সি মোকবেলা করতে পারে জনসাধারণ। নতুন স্কেলের মাধ্যমে বেতন সমতা হলে সে অতিরিক্ত টাকা মিরিয়ে নেয়া হয়। যেটি পেনশনের সময় তার সর্বোচ্চ বেতন হিসেবে গণ্য করে পেনশন প্রদান করা হয়। বাংলাদেশের মসজিদগুলোতে ইমাম নিয়োগের কোন সুর্নিদিষ্ট নিয়ম-কানুন নেই। তাদের জন্য কোন বেতন স্কেলও নির্ধারন করা নেই। কোনটি সর্বোচ্চ বা কোনটি সর্ব নি¤œ। বাৎসরিক বর্ধিত বেতন নেই। অনেক ইমাম সাহেব ওয়াজ মাহফিল করেন। তাবিজ ও দোয়া পড়া দিয়ে থাকেন, মিলাদ পড়েন। বেশিরভাগ ইমামের অন্য কোন আয়ের উৎসও নেই। সামান্য ক’জন নিকটবর্তী মাদ্রাসায় চাকুরী করেন। ইসলামী ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম পরিচালনা করেন কয়েকজন। অনেকের বেলায় সেসব বর্ধিত আয় করা সম্ভব হয়না।
দেশের প্রত্যেক জেলা শহরে প্রধান মসজিদটিকে কেন্দ্রীয় মসজিদ বলা হয়। বিভিন্নভাবে জেলা শহরের কেন্দ্রিয় মসজিদের ইমাম সাহেবের বেতনের বিষয়ে একটি জরিপ চালানো হয়েছে। সেসব জেলার কেন্দ্রিয় মসজিদের প্রধান ইমামের বেতন মাত্র ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা প্রতি মাসে। অনেক মসজিদে আয়ের উৎস বেশি। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কর্তত্বের জন্য অনেক মসজিদে কমিটিও নেই। আয়ের উৎস সঠিকভাবে আয় বা ব্যয় করার জন্য ােকন ব্যাংক একাউন্টও নেই। ইচ্ছমত আয় ইচ্ছামত ব্যয় করার অভিযোগও আছে। আয় ব্যয়ের হিসাব চায়লেই হয় বিপত্তি। সেটি বাংলাদেশের বেতন স্কেলের মধ্যে কোনটিতেও পড়েনা। অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও কিছু আছে, কিন্তু তা খুবই অপ্রতুল।
২য়তঃ বড় মসজিদও অনেক এলাকায় আছে। সেসকল মসজিদের ইমাম সাহেবের বেতন ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা প্রতি মাসে। তাঁর অন্য কোন সুযোগ সুবিধাও নেই। মজার ব্যাপার হল তার কোন অনুযোগ কিংবা অভিযোগও নেই কারও প্রতি। বেতনের বাইরে তাঁর অন্য আয় দাওয়াত পড়া। সেটিও নিয়মিত হয়না। প্রধান ইমামের পর একজন ২য় ইমাম আছে। মুয়াজ্জিন আছে এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আরো কয়েকজন লোক আছে। তাদের কারও বেতন কোন সুনির্দিষ্ট স্কেলে হয়না। নেই তাদের বাৎসরিক বেতন বৃদ্ধি। তাদের পেনশনের কোন বিধানও নেই। বর্তমান বাজারে ৮-১০ হাজার টাকা বেতন দিয়ে কি তাদের সংসার চলে ? চলেনা। তাহলে করণীয় কি ?
ইমাম সাহেবদের সাথে আলাপে জানা যায়, বেতন নিয়ে তাঁদের অনেক দুঃখ আছে। কিন্তু কে তাদের সে সমাধান দেবে ? কমিটিকে ইমাম সাহেবেরে বেতন বৃদ্ধির কথা বললে অযুহাতের শেষ নেই। ইমাম সাহেবের বেতন বৃদ্ধি করা মানে সবচেয়ে বড় বিপদের কাজ বলে মনে হয়।
মুসলিম সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ইমাম সাহেব। তাঁদের জাতীয় বেতন স্কেলের মত একটি বেতন কাঠামো থাকা প্রয়োজন বা মসজিদের শ্রেণি বিবেচনা করে জাতীয় বেতনের যে কোন একটি ধাপে রাখা যেতে পারে বলে ইমাম সাহেবগণ দাবি করেন। তাঁদের সুখ-দুঃখ সকলের বিবেচনা করা প্রয়োজন। অনেক মসজিদে দেখা যায়, টাকার অভাবে প্রতি বেলা নামাজে মুসল্লিদের ধরে রেখে টাকা আদায় করেন। যারা সে মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি তাদের কষ্ট না হলেও প্রতি ওয়াক্ত নামাজে টাকা আদায় করা সে মসজিদে নতুন আগন্তুকদের মনে অনেক কষ্ট হয়, যা দেখতে খুবই দৃষ্টিকটু।
খুৎবা পড়া ও শুনা নামাজের অংশ এবং ওয়াজিব। খুতবা প্রদানের সময় কথা বলা বা টাকা আদায় করা নিষেধ। অনেক মসজিদে দেখা যায় টাকার প্রয়োজনে খুৎবা পড়ার সময় টাকা ওঠানো হয়। সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক। নামাজ আদায় হবেনা। টাকার প্রয়োজনে ইমাম সাহেব মসজিদের দান বাক্স, নামাজের সময় টাকা আদায়ের থলে এসবের হিসেব না দিয়ে অনেক ইমাম সাহেব নিয়ে যান। প্রভাব খাটিয়ে মসজিদের সরদার খাদেম হিসেবেও মসজিদের আয়ের টাকা খরচ করে থাকেন অনেক মসজিদে। যেগুলো মসজিদ এবং ইসলামের নিয়মের মধ্যে পড়েনা। সওয়াব ও পূণ্যের আশায় আদায় করা সব নামাজ আদায় হবে কিনা সন্দেহ আছে।

ইমাম সাহেবদের কল্যাণের জন্য যা প্রয়োজন :
দেশের ছোট বড় সকল মসজিদগুলোর তালিকা প্রস্তুত করে শ্রেণিভেদে সকল ইমামগণের বেতন কাঠামো প্রস্তুত করা অপরিহার্য। প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য বিভাগের ন্যায় ইমাম সাহেবরে নির্ধারিত বেতন স্কেল থাকা অপরিহার্য বলে সকল ইমামগণ এক যুগে দাবি করেন। তা করা হলে ইমাম সাহেবদের সম্মান বৃদ্ধি পাবে, তাঁরা চিন্তামূক্ত হবে। তাঁরা যে কোন অন্যায় কাজ করা হতে বিরত থাকবেন। ইমাম সাহেবগণ সম্মানিত হবেন। তাঁদের সংসারে শান্তি আসবে। মুসলিম সমাজ আধুনিক ও উন্নত হবে।

লেখক,
রফিক উল্লাহ
ওসি।
০১৮১৯৯৫৫৮৪৪।

2 Comments

  1. ধন্যবাদ স্যার! ইমাম প্রসংগে আপনি যে প্রবন্ধটি লিখেছেন, সত্যিই অসাধারণ,যূক্তিসংগত, যূগোপযোগী।

  2. আপনি ভাল বলেছেন। তবে একটা বিষয় বাদ পড়েছে, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকগনের বেতন সম্পর্কে বললে মনে হয় ভাল হত।

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.