নির্বাচনী প্রচারণার নামে শব্দ দুষনে দূর্বিষহ হয়ে উঠছে টেকনাফের জনজীবন

প্রকাশ: ২০ মার্চ, ২০১৯ ৬:৫১ : অপরাহ্ণ

জেড করিম জিয়া **
টেকনাফ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীরা। পাশাপাশি নির্বাচনে প্রার্থীর পক্ষে মাইকিং প্রচারণায় শব্দ দূষণ,অপরীক্ষিত শব্দমাত্রা, উৎকট বাজনা ও বিকট শব্দের গানে ভোটারদের যতটা না আকৃষ্ট করছে, তার চেয়ে বেশি প্রার্থীর প্রতি ঘৃণার জন্ম দিচ্ছে এলাকা জুড়ে।একই স্থানে একই সাথে চারটি-পাঁচটি করে মাইক বাজানো হচ্ছে। বিভিন্ন গানের সঙ্গে প্রতীক। উল্লেখ করে ভোট চাওয়া এসব মাইকের যন্ত্রণায় পথচারীরা ভালভাবে কথাও বলতে পারছেন না। বিশেষ করে রাস্তায় বের হলে কোনো পথচারী মোবাইল ফোনে কথা বলতেও পারছেন না আবার শুনতেও পারছেন না। আবার রাস্তার ধারে দোকান হওয়ায় খদ্দেরদের কথাও শোনা যাচ্ছে না মাইকের শব্দে।
সচেতন ভেটারদের অভিযোগ ,কেউ যদি এ সব উৎকট বাজনা ও বিকট শব্দের গান বিষয়ে মাইকিং বন্ধ করা নিয়ে অনুরোধ করে, তাকেই তোপের মুখে পড়তে হয় ,তাই উভয় বিপদ থেকে উত্তরণের পথ না পেয়ে উচ্চমাত্রার শব্দ প্রতিদিন আমরা কানে ঢুকাচ্ছি।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত,উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হৃদরোগ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, আলসার, বিরক্তি সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন শিশু এবং বয়স্করা। এমনকি গর্ভে থাকা সন্তানও শব্দদূষণে ক্ষতির শিকার হয়, অর্থাৎ তাদের শ্রবণশক্তি খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।ক্রমাগত শব্দ দূষণের ফলে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়, হৃদযন্ত্রের কম্পন ও রক্তচাপ বেড়ে যায়, হজমক্রিয়া ব্যাহত ও মাংসপেশীতে খিঁচুনি হয়, শিশুদের বেড়ে ওঠায় বাধাগ্রস্ত এবং গর্ভবতী নারীদের মৃত সন্তান জন্ম দেয়ার সম্ভাবনা থাকে। শব্দ দূষণে মেজাজ খিটখিটে হয়, মনোযোগ নষ্ট হয়। অসুস্থরা এই শব্দ দূষণের বড় শিকার।
টেকনাফ সাংবাদিক ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক নুরুল হোছেন বলেন, যেহেতু বর্তমানে নির্বাচনী প্রচারণায় মাইক ব্যবহারের আধিক্যতা, শব্দদূষণের তীব্রতা ও জনগণের স্বাস্থ্য ও মানসিকতায় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, তাই নির্বাচনী প্রচারণায় মাইকিং নিষিদ্ধ করা অবশ্যই জরুরি।
জানা যায়,শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুসারে নির্ধারিত শব্দের মানমাত্রা নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকার জন্য দিবাকালীন যথাক্রমে ৫০, ৫৫, ৬০, ৭০ ও ৭৫ ডেসিবল এবং রাত্রিকালীন যথাক্রমে ৪০, ৪৫, ৫০, ৬০ ও ৭০ ডেসিবল।এই আইন অমান্য করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য ১ মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ৬ মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে ,উপজেলা পরিষদ নির্বাচনী আচরণ বিধিমালার ২১ (১) ধারায় উল্লেখ আছে, ‘কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী একই সঙ্গে পথসভার জন্য একটি এবং নির্বাচনী প্রচারণার জন্য একটির অধিক মাইক্রোফোন বা শব্দের মাত্রা বর্ধনকারী অন্যবিধ যন্ত্র ব্যবহার করিতে পারিবেন না।কিন্তু নানামুখী প্রভাবে শব্দ দুষণ সৃষ্টিকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
বাস স্টেশন এলাকার ব্যবসয়ী সৈয়দ হোছেন বলেন, ‘সড়কের দুই পাশে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু সড়কের ওপর অসংখ্য গাড়ির নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবসা করা দায় হয়ে পড়েছে। অথচ এসব দেখার যেন কেউ নেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘড়ির কাঁটা বেলা দুইটার ঘরে আসার সঙ্গে সঙ্গে টেকনাফ পৌর শহরসহ উপজের বিভিন্ন স্থানে নেমে পড়ে প্রার্থীদের শতাধিক গাড়ি। জিপ (চাঁদের গাড়ি), অটোরিকশা, ইজিবাইক ও রিকশায় মাইক বেঁধে চলে রিরামহীন প্রচারণা। এর মধ্যে জিপ, ইজিবাইক ও অটোরিকশায় বাঁধা হচ্ছে একাধিক মাইক। আবার এসব গাড়িতে প্রচারণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে শিশু-কিশোরদেরও ।গাড়িতে ছোটদের কেউ গানবাজনা করে, কেউ স্লোগান দেয়, কেউবা মাইকিং করে প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চায়।
অনেক সময় মাইক বাঁধা ১০ থেকে ১২টি গাড়ি দিয়ে একই স্থানে একসঙ্গে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বেশি। ফলে মাইকের শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে এলাকাবাসীর।
এলাকার সচেতন মহল মনে করেন,
ডিজিটাল জুগেলএ ধরনের পচারনার কোন মানে হয় না। ভোট কাকে দিবেন, সেটি তো মনের ব্যাপার। এভাবে তীব্র শব্দে মাইক বাজিয়ে শব্দদূষণ করে কী ভোট পাওয়া যাবে। নাকি মানুষ ভোট দিবে। এতে মানুষ তো আরো বিরক্ত হচ্ছে। মানুষের সমস্যা হচ্ছে। আর তাই এসব গানের আওয়াজ অপরীক্ষিত, বাদ্যযন্ত্রের অপরীক্ষিত ব্যবহার, উচ্চ শব্দে বাজানো তাদের ক্ষতির প্রধান কারণ। তিন-চারজন প্রার্থীর জন্য প্রত্যেকটি এলাকায় কমপক্ষে বার থেকে পনেরটি মাইকে একসাথে নির্বাচনের গান চলে।এমতাবস্থায় রাস্তার নিকবর্তী স্কুল-কলেজ,মসজিদ-মন্দির, হাসপাতাল ও বসতবাড়ীর মানুষের কি পরিমাণ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় তা বোধ হয় প্রার্থীরা বুঝে না !


সর্বশেষ সংবাদ