টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

টেকনাফ-উখিয়া-রামু-পটিয়ায় ১৯ বৌদ্ধবিহার ও ৪৫ বাড়িতে আগুন-বৃদ্ধার মৃত্যু

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : সোমবার, ১ অক্টোবর, ২০১২
  • ১০৭ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় গতকাল রোববার রাতে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের পাঁচটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে দুষ্কৃতকারীরা। এতে দগ্ধ হয়ে বুচি শর্মা (৭০) নামের এক বৃদ্ধা মারা গেছেন। উখিয়া উপজেলায় চারটি বৌদ্ধবিহারে ভাঙচুর ও একটি বিহারে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এ সময় পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়লে টেকনাফে অন্তত ১৫ জন ও উখিয়ায় পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়।
এর আগে গত শনিবার রাতে জেলার রামু উপজেলা সদরে দুষ্কৃতকারীদের একাধিক দল বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের শত বছরের পুরোনো ১২টি বৌদ্ধবিহার ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করে। পুড়িয়ে দেয় বৌদ্ধপল্লির ৪০টির মতো বসতবাড়ি। ভাঙচুর করে শতাধিক ঘরবাড়িতে।
বৌদ্ধধর্মাবলম্বী এক তরুণের ফেসবুকে (সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম) পবিত্র কোরআন শরিফের অবমাননাকর ছবি ব্যবহার করা হয়েছে—এমন অভিযোগে শনিবার গভীর রাতে ওই হামলা চালানো হয়। একই অভিযোগে গতকাল দুপুরে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় দুটি বৌদ্ধবিহার ও একটি হিন্দু মন্দিরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়।
অনাকাঙ্ক্ষিত ওই ঘটনার পর গতকাল সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য রামু সদরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। সকাল থেকে সড়কে গাড়ি নিয়ে টহল দেন সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা। মন্দিরগুলোতে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
রামুর ঘটনার পর গতকাল দুপুর থেকে টেকনাফের বিভিন্ন বৌদ্ধমন্দির ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের এলাকায় পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের টহল জোরদার করা হয়। এর মধ্যেই সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের জুয়াড়িখোলা এলাকায় চ্যাকুমনি বৌদ্ধবিহারের দিকে একদল লোক মিছিল নিয়ে এলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়।
হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ ৩০-৪০টি ফাঁকা গুলি ছোড়ে। মিছিলকারীরা বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের পাঁচটি বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এতে দুজন দগ্ধ হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে যতীন শর্মার স্ত্রী বুচি শর্মা (৭০) মারা যান। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শামসুল ইসলামও বুচি শর্মার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রামু থেকে শুরু: পুলিশ সূত্র জানায়, রামুর মেরুংলোয়া বড়ুয়া পাড়ার উত্তম কুমার বড়ুয়ার (২৫) ফেসবুকে কে বা কারা পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননার একটি ছবি যুক্ত (ট্যাগ) করে। ছবিটি আরও কেউ কেউ শেয়ার করে।
সূত্রমতে, শনিবার রাত আটটার দিকে ফেসবুকে ওই ছবিটি ট্যাগ করা হয়। রাত ১০টার দিকে কয়েক হাজার মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে রামুর চৌমুহনী চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ শুরু করে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় রামু থানার পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এরপর কক্সবাজার শহর থেকে অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ পাঠানো হয়। রাত সাড়ে ১১টায় র্যা ব সদস্যরাও মাঠে নামে।
রামু থানার পুলিশ জানায়, একপর্যায়ে উত্তম কুমার বড়ুয়া ও তাঁর মা মাদু বড়ুয়াকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেয় তারা। উত্তম কুমার পুলিশের কাছে দাবি করেন, কেউ একজন তাঁর ফেসবুকে কোরআন শরিফের অবমাননার ওই ছবিটি যুক্ত (ট্যাগ) করেছে। বিক্ষোভ শুরুর পর উত্তম নিজেই তাঁর ফেসবুক আইডি বন্ধ করে দেন।
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজিবুল ইসলাম বলেন, রাত সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার গর্জনিয়া, রশিদনগর, ঝিলংজা, ঈদগাঁও, কচ্ছপিয়া, রাজারকুল ইউনিয়ন থেকে ট্রাকে করে হাজার হাজার মানুষ চৌমুহনীতে আসতে থাকে। রাত ১২টার পর সংঘবদ্ধ লোকজন বৌদ্ধমন্দিরগুলোতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে। এ সময় ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’ স্লোগান শোনা গেছে। তখন স্বল্পসংখ্যক পুলিশের পক্ষে সাত হাজারের বেশি মানুষকে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।
জামায়াত-শিবিরের প্রতি সন্দেহ: রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার বলেন, জামায়াত-শিবির মৌলবাদী চক্র পরিকল্পিত এ ঘটনায় যুক্ত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। কারণ, মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তাদের সখ্য রয়েছে। ৮ জুন আরাকানে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সঙ্গে মুসলমানদের জাতিগত দাঙ্গা শুরুর পর এখানকার জামায়াত-শিবির চক্র মন্দিরে হামলার চক্রান্ত করেছিল। ফেসবুকে কোরআন অবমাননার ঘটনাকে পুঁজি করে ওই মৌলবাদী চক্রটি এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
তবে কক্সবাজার জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জি এম রহিমুল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ফেসবুকে ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর রামুতে যেসব মিছিল-মিটিং হয়েছে, সেখানে নেতৃত্ব দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতারাই। তাঁরাই মন্দিরের হামলার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এখন জামায়াতকে দায়ী করা হচ্ছে।
দুই মন্ত্রীর পরিদর্শন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া গতকাল দুপুরে রামুতে পুড়িয়ে দেওয়া বিহার, মন্দির ও ঘরবাড়ি দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বেলা দেড়টার দিকে তাঁরা রামুর সীমা বিহার পরিদর্শন করেন। ভিক্ষুদের সঙ্গে কথা বলার পর দুই মন্ত্রী ছুটে যান লালচিং ও সাদাচিং মন্দিরে। বেলা দুইটার দিকে উপজেলার চৌমুহনী চত্বরে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে মন্দিরে হামলা করেছে। কারণ, মন্দির পোড়ানোর সময় গান পাউডার ও পেট্রল ব্যবহারের আলামত পাওয়া গেছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে থাকার কথা নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের জঘন্য ঘটনা আর ঘটেনি। নিউইয়র্ক থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফোন করে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং ঘটনার আসল রহস্য উদ্ঘাটনে আমাদের সরেজমিন পরিদর্শনে পাঠিয়েছেন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, খুব শিগগির এর রহস্য উদ্ঘাটন করে হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, মন্দিরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা দমনে পুলিশের ব্যর্থতা এবং দমকল বাহিনীর বিলম্বে ঘটনাস্থলে পৌঁছার কারণ অনুসন্ধান করতে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। ১৫ দিনের মধ্যে ওই কমিটি প্রতিবেদন দেবে।
শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ রকম নারকীয় তাণ্ডব আর কোথাও হয়নি। রামু এত দিন সম্প্রীতির অনন্য স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। আজ মন্দিরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রামু সেই ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছে।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT