টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

টেকনাফের ৮ কোটিপতি

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ৩০ মে, ২০১৩
  • ২৩২ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে


দৈনন্দিন  :টেকনাফের মৌলভীপাড়া ও নাজিরhhhhhপাড়া গ্রাম দুটি বর্তমানে ইয়াবা গ্রাম হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। ইয়াবা ব্যবসার ব্যাপকতায় গ্রাম দুটির আসল নাম অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে। এ গ্রাম দুটির ঠিকানা জানতে চাইলে স্থানীয়রা ইয়াবা শব্দটি জুড়ে দিয়ে গ্রাম দুটির নতুন পরিচিতি তুলে ধরতে চান। সরেজমিন ঘুরে এর প্রমাণও মিলেছে। বছর কয়েক আগেও যে গ্রামের অধিকাংশ লোকের নুন আনতে পান্তা ফুরাত সেখানে এখন সারি সারি রাজকীয় বাড়ি। চারদিকে জৌলুস আর চাকচিক্যময়তার ছাপ। কোথাও যেন দারিদ্র্যের লেশ মাত্র নেই। সেই গ্রামের প্রায় সবার হাতে রয়েছে ইয়াবা নামক এক সোনার চাবি। ইয়াবার অবাধ ব্যবসার বদৌলতে মৌলভীপাড়া ও নাজিরপাড়া গ্রামের কয়েকশ’ পরিবার এখন উচ্চবিত্তে পরিণত হয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে টেকনাফের মৌলভীপাড়া ও নাজিরপাড়া গ্রাম ঘুরে পাওয়া ৮ জন কোটিপতি ইয়াবা ব্যবসায়ী’র হালচাল তুলে ধরা হলো প্রতিবেদনে :-
আবদুর রহমান :-
মৌলভীপাড়ার বাসিন্দা হাজী ফজল আহমদের পুত্র আবদুর রহমানের বয়স এখনও ২৬ পার হয়নি। বছর দুয়েক আগেও তিনি কর্মহীন বেকার হয়ে এলাকায় ভবঘুরে ছিলেন। এখন তিনি চড়েন নিউ মডেলের ঝকঝকে একটা নোয়া মাইক্রোবাসে। তাদের থাকার জায়গায় রাতারাতি গড়ে তোলা হচ্ছে দোতলা বিলাসবহুল বাড়ি। এলাকার বাসিন্দারা জানায়, আবদুর রহমান এর মধ্যে এলাকায় প্রচুর আবাদী জমিও কিনেছেন। টেকনাফের নাফ কুইন মার্কেটে ২০ লাখ টাকা দিয়ে কিনেছেন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। অভিযোগ, ইয়াবা ব্যবসার কাঁড়ি কাঁড়ি কাঁচা টাকাই আবদুর রহমানকে রাতারাতি বিত্তবৈভবের মালিক করেছে। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও অর্থ বিনিয়োগ করছেন। এছাড়া সম্প্রতি আবদুর রহমান তার এক বোনের বিয়ের অনুষ্ঠান করেছেন। এলাকাবাসী জানিয়েছে, জাঁকজমকপূর্ণ ওই বিয়েতে অন্তত ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বিয়েতে বোনের জামাইকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন ২৫ লাখ টাকা দামের গাড়ি। টেকনাফের মৌলভীপাড়ায় আবদুর রহমানের আরেক ভাই একরামও প্রাসাদোপ্যম বাড়ি নির্মাণ করছেন। অথচ তাদের পিতা ফজল আহমদ একসময় ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষিকাজে জড়িত ছিলেন। আবদুর রহমান ও একরাম দুজনের বিরুদ্ধেই ইয়াবা চোরাচালানের মামলা রয়েছে। প্রকাশ্যে সবসময় ঘোরাফেরা করলেও পুলিশের খাতায় তারা পলাতক আসামি। যোগাযোগ করা হলে আবদুর রহমান বলেন, তিনি ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। এতবেশি ধনসম্পদও তার নেই। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তার বিরুদ্ধে কয়েকটা মামলা দেয়া হয়েছে।
লেইট্যা আমির : মৌলভীপাড়ার আরেক কোটিপতি আমির আহমদ ওরফে লেইট্যা আমির। এলাকাবাসী জানায়, ৫/৬ বছর আগেও তার পরিবার রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু হঠাৎ করে তারা যেন হাতে আলাদীনের চেরাগ পেয়েছেন। হাবিব উল্লাহর পুত্র আমির আহমদ বিপুল পরিমাণ জমিজমার মালিক। চলাফেরা করেন দামি গাড়িতে। টেকনাফ বাজারে বড় বড় কয়েকটি পাইকারি দোকানের মালিকও তিনি। আমির আহমদের বিরুদ্ধেও একাধিক ইয়াবা পাচারের মামলা রয়েছে। কিন্তু সেও অধরা। আমির আহমদ বলেন, তার লবণ চাষের ব্যবসা আছে। তিনি কোটিপতি নন। তার বিরুদ্ধে কোন মামলাও নেই।
আবদুল গনি : ইয়াবা পাচার মামলার অন্যতম পলাতক আসামি আবদুল গনি। বছর দুয়েক আগেও তারা বাঁশ ও বেতের ব্যবসা করতেন। কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্ল­ট কিনেছেন তিনি। চড়েন দামি গাড়িতে। এলাকায় প্রচুর জমিও হয়েছে। বিজিবি’র উদ্ধার করা ইয়াবা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হলেও তিনি প্রকাশ্যেই ঘোরাফেরা করছেন। আর পুলিশের খাতায় তিনি পলাতক। অভিযোগ, থানা পুলিশ মাসিক মাসোহারা নিয়ে তাকে গ্রেফতার করে না। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্যের জন্য নূরুল হকের পুত্র গনির মোবাইল ফোনে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
মোহাম্মদ আলী : এ গ্রামের আরেক কোটিপতির নাম মোহাম্মদ আলী। তার পিতা হাজী কালা মিয়া। তার বিত্তবৈভব নিয়ে এলাকায় নানা কথা প্রচলিত আছে। কেউ বলেন, মোহাম্মদ আলী টাকার বালিশে ঘুমায়। কেউ বলে মোহাম্মদ আলীর বাড়িতে টাকার বস্তা আছে। তবে মোহাম্মদ আলী বলেন, তিনি মোটেও কোটিপতি নন। কৃষিকাজ করে তার সংসার চলে। বৃহস্পতিবারও নাফ নদী থেকে সাড়ে ৫ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করেছে বিজিবি। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এ ইয়াবা চালানের মালিক মোহাম্মদ আলী। পরে মোহাম্মদ আলীকে আসামি করে মামলা করা হয়। মোহাম্মদ আলী বলেন, উদ্দেশ্যমূলকভাবে তার বিরুদ্ধে এ মামলা করা হয়েছে।
ফরিদুল আলমের কারবার : সম্প্রতি মৌলভীপাড়ায় কোটি টাকা দামের জমি কেনা নিয়ে আলোচনা চলছে। যিনি জমি কিনেছেন তার নাম ফরিদুল আলম। তার পিতার নাম মৃত আমীর হোসেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, একসময় ফরিদুলের পরিবার লবণ চাষ করে সংসার চালাত। কিন্তু রহস্যজনক আয়ের বদৌলতে ফরিদুল বর্তমানে কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনেছেন। ফরিদুলের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় একাধিক ইয়াবা পাচার মামলা রয়েছে। ফরিদুলের ছোট ভাই আবদুল আমিন ওরফে আবুল সদর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি। সম্প্রতি বিজিবি ও পুলিশের দায়ের করা ইয়াবা পাচার মামলায় আবুলকে আসামি করা হয়েছে। অবশ্য আবুল ও স্থানীয় বিএনপির তরফে বলা হচ্ছে, শাসক দলের ইশারায় হয়রানির উদ্দেশ্যে এসব মামলায় তাকে জড়ানো হয়েছে।
এ গ্রামের আরও যারা অল্প সময়ের মধ্যে অবিশ্বাস্যভাবে বিত্তশালী হয়ে উঠেছেন তাদের মধ্যে উল্লে­খযোগ্য হলেন লাল মিয়ার ছেলে আবুল কালাম ওরফে কালা। তিনি একসময় পিতার লবণ ব্যবসা দেখাশুনা করতেন। তিনি অল্প সময়ে গাড়ি, বাড়ি ও প্রচুর পরিমাণ জমিজমার মালিক হয়েছেন। মৌলভীপাড়ার পাশের গ্রাম নাজিরপাড়া। সরজমিনে ঘুরে এ গ্রামেও বেশ কয়েকজন কোটিপতির নাম জানা গেছে। অথচ এরা অল্প কিছুদিন আগেও ছিলেন সহায়-সম্বলহীন। নাজিরপাড়ার কোটিপতি হিসেবে যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন :
জিয়াউর রহমান : ৭ বছর আগেও বেকার যুবক ছিলেন জিয়াউর রহমান। তার পিতার নাম মোঃ ইসলাম। কিন্তু এখন তার দুর্দিন নেই। তিনি চলাফেরার জন্য এখন একাধিক নোয়া মাইক্রোবাস ব্যবহার করেন। গ্রামেই আলিশান বাড়ি বানিয়েছেন। তার মালিকানায় রয়েছে কয়েক ডজন সিএনজি অটোরিকশা। তার বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অনেক পুরনো। পুলিশের খাতায় তিনি ইয়াবা পাচার মামলার আসামি। তার নিজস্ব সিএনজি অটোরিকশা ও নোয়া মাইক্রোবাসগুলো ইয়াবা পরিবহনের কাজে ব্যবহার হয় এমন তথ্য দিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র। জানা গেছে, নোয়া মাইক্রোবাসগুলোতে একাধিক নাম্বারপ্লে­ট ব্যবহƒত হয়। সুবিধামতো নম্বরপ্লে­ট বদল করে ইয়াবা পরিবহন করা হয়।
ছাগল হাসু : এক সময় ছাগলের ব্যবসা করতেন হাসু। এজন্য এলাকায় তিনি ছাগল হাসু নামে পরিচিত। তবে ছাগল হাসু এখন এলাকার অন্যতম কোটিপতি। থানা সূত্র জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ইয়াবা চোরাচালানের একাধিক মামলা রয়েছে। তবে শুধু ইয়াবা ব্যবসা নয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি নাজিরপাড়া ও মৌলভীপাড়ার কয়েকটি চোরাচালান ঘাটও নিয়ন্ত্রণ করেন। মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালানের পাশাপাশি তিনি অবৈধ মদ-বিয়ার বাংলাদেশে আনেন। আবার বাংলাদেশ থেকে ফেনসিডিল-গাঁজা ও সুখিবড়ি (সরকারি জš§বিরতিকরণ পিল) মিয়ানমারে পাচার করেন। ছাগল হাসু বলেন, তিনি মোটেও ইয়াবা ব্যবসায়ী নন। তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
চাঁন মিয়া ওরফে পোয়া চাঁন মিয়া : নাজিরপাড়া এলাকায় আগে চাঁন মিয়া নামের একজন বয়স্ক চোরাকারবারী থাকত। চেনার সুবিধার জন্য এলাকাবাসী তার নাম দেয় পোয়া চাঁন মিয়া। স্থানীয় ভাষায় ‘পোয়া’ অর্থ ছোট। এই পোয়া চাঁন মিয়ার কত টাকা আছে তা নিয়ে এলাকাবাসীর কৌতূহলের শেষ নেই। টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপ সড়কের পাশে তার বিলাসবহুল বাড়ির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। অথচ পোয়া চাঁন মিয়ার বৈধ কোন আয়ের উৎস নেই। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নাজিরপাড়া সীমান্ত দিয়ে ‘সুখী বড়ি’সহ বিভিন্ন ধরনের দেশীয় মূল্যবান ওষুধ পাচার করেন তিনি। তার বিরুদ্ধে ইয়াবা চোরাচালানের অভিযোগে একাধিক মামলা থাকলেও তাকে পুলিশ স্পর্শ করে না।
এদিকে টেকনাফ উপজেলার কয়েকজন সমাজকর্মী আক্ষেপ করে জানিয়েছেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশের আইনশৃংখলা বাহিনী বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালালেও এ দুটি গ্রাম যেন সব অভিযান থেকে মুক্ত! এ দুটি ইয়াবা গ্রামসহ যেসব পয়েন্ট দিয়ে দেশে প্রতিদিন হু হু করে মরণ নেশা প্রবেশ করছে এবং সেগুলো দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে এগুলো প্রতিরোধ করার কোন ব্যবস্থা নেই।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT