টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

জন্মাষ্টমী উৎসব

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : বুধবার, ৮ আগস্ট, ২০১২
  • ৬২৬ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

শ্রী বাবুল শর্মা হিরণ্য কৈশিপু, শিশু পাল ও কংসদের মত অত্যাচারী রাজার তান্ডব যেন সমগ্র পৃথিবীকে পাপভরে ভারাক্রান্ত করিয়া তুলিল। মৃতের কোন সৎকারের ব্যবস্থা ছিল না। অন্ধকার কূপে অথবা নদীর জলে নিক্ষেপ করিত। বিদেহী আত্মার ক্রন্দনে প্রেতপূরী ভয়াবহ রূপ ধারণ ইত্যাদিতে প্রতিটি জন্মই দানব ও রাক্ষস চরিত্রগত হইয়া পৃথিবী আরও অন্ধকার পুরীতে পরিণত হইল। নারী জাতিকে দাসী বৃত্তিতে বাধ্য করা হইত। মুষ্টিমেয় সৎ মানব মানবীরা অসহায় পরিণতির জন্য কোন প্রকার উপাসনা বা প্রার্থনা জানাইতে পারিত না। নীরব ক্রন্দন ছাড়া কোন উপায় ছিল না। এই নীরব ক্রন্দন যেন বিপদ বারণ মধু সূদনের কর্ণভেদ করিল। শ্রী ভগবান পৃথিবীকে পাপভার মুক্ত করিবার জন পৃথিবীতে সাধু সজ্জনদের প্রতি দৈববাণী প্রেরণ করিলেন ঃ -যদা যদাহি ধর্ম্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারতঃ। অভ্যহামধর্ম্মস্য তদাতœানং সৃজামহ্যম ॥ পরিত্রানায় সাধূনাং বিনাশায়-চ দুষ্কৃতাম। ধর্ম্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভাবামি যুগে যুগে ॥ — গীতা (যার বাংলা অর্থ হচ্ছে-যখনই ধর্মের উপর কোন গ্লানি আসে, অধর্মের অভ্যুত্থান ঘটে তখনই আমি সৎ ব্যক্তির পরিত্রাণের জন্য দুষ্কর্ম্ম নাশের জন্য যুগে যুগে অবতীর্ণ হই) বসুদেবের মত সাধকের প্রার্থনা ছিল সমগ্র পৃথিবীকে পাপভারমুক্ত করা। এইরূপ সাধকের কাছে ভগবান প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইলেন। তিনি দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্ম গ্রহণ করিবেন।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি। অনেককাল পূর্বে দ্বাপর যুগে মথুরায় কংসের কারাগারে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণ পক্ষের অষ্টমী তিথিতে বসুদেব দেবকীর সন্তানরূপে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হইয়াছিলেন। সেই আবির্ভাব তিথি জন্মাষ্টমী নামে হিন্দুধর্ম্মে একটি ধর্ম্মীয় অনুষ্ঠান বা উৎসব হিসাবে প্রতিপালিত হইতেছে। জন্মাষ্টমী উৎসবের তাৎপর্য সম্পর্কে ধর্মগ্রন্থ হইতে জানা যায়, প্রায় পাঁচ হাজার বৎসরেরও অধিককাল আগে মথুরার উৎপীড়ক রাজা কংসের কারাগারে ভয়ংকর আতংকজনক এক পরিস্থিতিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটিয়াছিল। জন্ম রহিত হইলেও ভগবানের জন্ম হয়।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রোহিনী নক্ষত্রে কংসের কারাগারে দৈবকীর কোলে আর্বির্ভূত হইয়াছিলেন। দৈবকীর অষ্টম গর্ভে জন্ম হইয়াছিল তাই এই জন্মতিথির নাম জন্মাষ্টমী তিথি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পিতা-মাতা বসুদেব ও দৈবকী। যদু বংশীয় সুর সেনের পুত্র সুবদেব। বসুদেবের সঙ্গে বিবাহ হইয়াছিল দৈবকীর। বিদর্ভরাজ আহুকে দুই পুত্র ছিল দেবক ও উগ্রসেন। দৈবকী ছিল দেবকের সাতকন্যার মধ্যে একজন। আর উগ্র সেনের পুত্র ছিল কংস। কংস ও দৈবকী সম্পর্কে ভাই বোন। বোন দৈবকীর বিয়েতে কংস বড়ই আনন্দিত ছিল। এমন কি নিজে রথের সারথী হইয়া বিয়ের রথ চালাইয়া যাইতেছেন এমন সময় দৈববাণী শুনিতে পাইল কংস। যে, হে কংস তুমি যে বোনের বিয়েতে এত আনন্দিত হইয়াছ সেই বোনের অষ্টম গর্ভের সন্তান তোমাকে হত্যা করিবে।

এই দৈব বাণী শুনামাত্র কংস রথ থামাইয়া তরবারি নিকোষিত করিয়া সদ্য বিবাহিত বোন দৈবকীকে হত্যা করিতে উদ্যত হয়। নব বর বসুদেব দৈবকীকে রক্ষা করার জন্য বহু আকুতি মিনতি করিলেন। কোনভাবে কংসকে শান্ত করা যাইতেছে না দেখিয়া বসুদেব এক ভীষণ প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, সন্তান জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি সন্তান আপনার হাতে তুলিয়া দেওয়া হইবে এবং প্রতিটি সন্তান আপনি স্বহস্তে হত্যা করিতে পারিবেন। ইহাতে অংশ অনেকটা স্বস্তি বোধ করিলেন যে জন্মের সাথে সাথে যদি হত্যা করা যায় তাহলে শিশু হন্তার জন্য আর ভয় থাকিতে পারে না।

তাছাড়া কংস জানত বসুদেব সত্যবাদী ও প্রতিজ্ঞা রক্ষায় অটল। এপর বসুদেব ও দৈবকীকে কারারুদ্ধ করিলেন। একে একে ছয় সন্তান হত্যা করিল কংস। সপ্তম গর্ভের সন্তান রোহিনার গর্ভে গোকুলে স্থানান্তরত করা হল। রোহিনী ছিলেন নন্দরাজ গৃহে আশ্রিতা নারী অর্থাৎ দ্বিতীয় পতিœ। এই সপ্ত গর্ভের পুত্রের নাম রাখা হইল বলরাম। এই দিকে কংসের অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বাড়িতে লাগিল। কংসের অত্যাচারে যদ বংশের বহু নারী পুরুষ অন্য জায়গায় আশ্রয় নিতে লাগিল। এইভাবে ভগবান অষ্টম গর্ভে জন্ম নেবে। কংশ এখন খুব সতর্ক। চারিদিকে প্রহরা বহুগুণ বৃদ্ধি করিতে শুরু করিল। এই দিকে বসুদেব মুক্তি কামনায় ভগবৎ ধ্যানে মগ্ন। বসুদেব মন হইতে ভগবৎ সত্ত্বাকে সঞ্চারিত করিলেন দৈবকীর হৃদয়ে। তবুও দৈবকীর হৃদয় বিষাদে পরিপূর্ণ ছিল। তবুও অন্তরে ছিল আশা ও আশ্বাসে ভরপুর। রাত যতই বাড়িতে থাকে কংস সদা উৎকর্ণ ছিল তখন জানি সদ্যজাত শিশু কান্না শুনি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কংসের কারাগারে যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন কংসের অত্যাচারে সমগ্র এলাকা ভয়ংকর আতংকগ্রস্ত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মলগ্নে কোন উৎসব উদ্দীপনা হয় নাই। শঙ্খধ্বনি উলু ধ্বনি তো দূরের কথা, কোন মাঙ্গলিক কর্মকা-ও হয় নাই। সনাতনী সম্প্রদায়ের কাছে এটা অতি দুঃখের ব্যাপার ও গ্লানির স্মৃতি। তবুও শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাবে ধরনী হইল পাপমুক্ত। সাধু, সজ্জন ও ভক্তবৃন্দের মনে সঞ্চার হইল বুক ভরা আনন্দ।

ভাদ্র মাসের কৃষ্ণাষ্টমীর মধ্যরাত। সন্ধ্যা হইতে প্রকৃতি আস্তে আস্তে দুর্যোগময় হইয়া উঠিতে লাগিল। বাহিরে ভয়ংকর মেঘ গর্জন, জলস্ফীতি ও প্রবল বৃষ্টিতে চারিদিক প্লাবিত হইয়া গেল। এই মহাদুর্যোগপূর্ণ মুহুর্ত্তে দৈবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানরূপে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভূমিষ্ট হইলেন। অপর দিকে নন্দরাজের গৃহে নন্দপতিœ যশোদার গর্ভে জন্ম নিলেন মহামায়া। নবজাতক ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জ্যোতির্ষ্ময় মুর্ত্তি দেখিয়া বসুদেব ও দৈবকীর মন আনন্দে ভরপুর হইতে লাগিল। তখন হঠাৎ দৈববাণী শোনা গেল “বসুদেব তোমার নবজাত শিশুপত্রকে নন্দালয়ে যশোদাকে দিয়া তার নবজাত কন্যাকে তুমি নিয়ে এসো” বসুদেব ঐ দৈববাণী শুনিয়া নবজাত পুত্রকে কোলে তুলিয়া লইতেই কারাগারের দরজা খুলিয়া গেল। প্রবল ঝড় ঝঞ্ঝার মধ্যে বসুদেব পুত্রকে মাথায় করিয়া গোকুলে নন্দালয়ে যাইবার জন্য যমুনা তীরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ভগবানের অশেষ কৃপাতে তখন সবাই গভীর নিন্দ্রামগ্ন। কংসও গভীর নিদ্রামগ্ন তখন। অনন্ত নাগ ফণা বিস্তার করিয়া শিশু কৃষ্ণকে বৃষ্টি হইতে আচ্ছাদন দিলেন।

উত্তাল তরঙ্গায়িত যমুনা, কীভাবে পার হইবেন বসুদেব ভাবিতেছেন। এমন সময় দেখা গেল এক শৃগালী অনায়াসে যমুনা পার হইতেছে। বসুদেবও অনুরূপভাবে যমুনা পার হইয়া নন্দালয়ে উপস্থিত হইলেন। যশোদার কক্ষের সামনে যাওয়া মাত্র যশোদার কক্ষের দরজা খুলিয়া গেল। দেখিলেন যশোদা নিদ্রামগ্ন। অতি সন্তর্পণে আপন পুত্রকে যশোদার পাশে রাখিয়া নবজাত কন্যাকে মথুরায় অংশের কারাগারে লইয়া উপস্থিত হইলেন। তখন রাত প্রায় শেষ। ধীরে ধীরে শিশু কন্যাটিকে দৈবকীর কোলে দিতেই নবজাতকের কান্না শুরু হইল। নবজাতকের কান্নায় প্রহরী ও কংসের ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। তৎক্ষণাৎ কংস হুংকার দিয়া শিশু কন্যাকে দৈবকীর কোল হইতে লইয়া মাথায় তুলিয়া আচার দিতেই শিশু কন্যা শুণ্যে অদৃশ্য হইয়া গেল।

এই সময়ে কংস দৈববাণী শুনিতে পাইল, তোমাকে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে। এই বহু বৎসর গত হইতেছে কিন্তু কংশ মৃত্যু ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত দিনাতিপাত করিতেছে। তার মন্ত্রী ও পার্ষদদের পরামর্শে সমগ্র মথুরা ও গোকুলে শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করিবার জন্য বিভিন্ন রাক্ষস ও অসুর প্রেরিত হইল। কিন্তু প্রেরিত সকল অসুর ও রাক্ষস শ্রীকৃষ্ণের হাতে নিহত হইল। শেষ পর্যায়ে ধনুর্যজ্ঞের আয়োজন করিয়া শ্রীকৃষ্ণ ও বলরামকে আমন্ত্রণ জানালে কংসরাজ। উদ্দেশ্য পাগলা হাতির দ্বারা শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করা হইবে। আর সেই ধনুযজ্ঞে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কংসকে হত্যা করিল। এই ভাবে দুরাচার কংসের নিধন করিয়া ধরনীকে পাপভারমুক্ত করিলেন। যিনি আকর্ষণ করেন তাই তিনি কৃষ্ণ। ভক্তজনকে আকর্ষণ করিয়া আপন করিয়া লন তাই তিনি কৃষ্ণ। এই আকর্ষণকে শুদ্ধ মনের দ্বারা সাজাইতে পারিলে ভগবৎ শক্তি আবির্ভাব ঘটে।

একজন কংস, একজন জরাসন্ধ ও একজন শিশু পালকে ধ্বংসের জন্য শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে নাই। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব একটি শিক্ষণীয় ঘটনা। সৎ ব্যক্তিদের পরিত্রাণ, দুস্কৃতিকারীর বিনাশ ও মঙ্গলময় জীবনের সংগঠন-ই শ্রীকৃষ্ণ তাৎপর্য। ঋষিদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তঃ “কৃষ্ণস্তু ভবগান স্বয়ম। কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান। পরিশেষে, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে শান্তি সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব বোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসাবে স্থাপন করে সুখী সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনে এ উৎসব বিশেষ ভূমিকা রাখুক – এই কামনা করি। জেলাবাসীর মঙ্গলার্থে এই শুভ জন্মাষ্টমী তিথির মংগল বাণী হউক জীবনের পাথেয় স্বরূপ।

জেলাবাসীকে শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমীয় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন (লেখক ঃ সাধারণ সম্পাদক, জেলা পূজা উদ্্যাপন পরিষদ, কক্্সবাজার, (সূত্র ঃ মহাপ্রস্থান, হিন্দু ধর্মীয় অনন্য আদি গ্রন্থ। রচয়িতা ঃ প্রয়াত শ্রী অজিত কুমার পালিত)।

ঋ:॥ঔববিষ॥অষষ খধহফ॥ঝূঝরৎ॥০৮-০৮-২০১২.ফড়প

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT