টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

গল্প থেকে বাস্তবতায়….

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ১০ জুন, ২০১৬
  • ৫৩৭ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

ফারুক আজিজ::: আগে, অনেক আগে; যখন খুব ছোট ছিলাম। রাতে ঘুমানোর পূর্বে বাবা বা বয়স্ক কেউ কিচ্ছা শোনাতেন ঘুম পাড়ানোর জন্যে। হয়তো অনেক সময় কিছু কিছু বাস্তব ঘটনাকে কিচ্ছার রুপ দিয়ে বলতেন যেনো কিচ্ছাও হতো আবার কিছু ইতিহাসও শেখা হতো; যেনো সেই ফাকে কিচ্ছার মগ্নতায় বাচ্চাটি ঘুমিয়ে কিন্তু আর সেই কিচ্ছার যুগ নেই। এখন ঘুম পাড়ানোর জন্যে মোবাইল স্ক্রিন ওপেন করে দিলে কিছুক্ষন পর ঘুমিয়ে পড়ে শিশুটি। তা হলো ডিজিটালাইজডের নামে উপরের দিকে পতন। একটি কথা চিরন্তন সত্য যে, পড়ার মতো করে কিছু বললে শেখা খুব কষ্ট। কিন্তু যদি একই জিনিসকে গল্প বা কিচ্ছার রুপ দিয়ে বলে তখন কিন্তু মনোযোগ বেড়ে যায়। এতোদিন পর বুঝে আসলো যে আমার শ্রুত কিচ্ছার মধ্যে এই রকম একটি কিচ্ছা ছিলো। কী পড়ে।এখন রকম!!?? কি ছিলো সেই কিচ্ছা!!?


একটি দ্বীপ ছিলো। সেখানে মানুষ থাকতো না; থাকতো জ্বীন বা প্রেত। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ আসতে লাগলো। মানুষের পরিমাণ যতো বেশি হতে লাগলো, তত কমে যেতে লাগলো জ্বীন-প্রেতের সংখ্যা। মানুষ দিন-দুপুরে বা রাতে অনেক জ্বীনের দেখা পেতো।
কিন্তু মানুষের আধিক্য জ্বীনের হ্রাস হতে খুব বেশি দেরী হলো না।
দ্বীপের মানুষেরা খুব বেশি শিক্ষিত ছিলো না পুস্তকি বিদ্যায়।কিন্তু সবার মাঝে সমতার শিক্ষা ছিলো আর মমতার শিক্ষা ছিলো। দ্বীপের একজন কষ্ট পেলে মনে করতো সবাই আঘাত পেয়েছে। একজন অসুস্থ হলে নৌকা বা চাম্পান ওয়ালারা নিজের আপন কেউ মনে করে পানি পার করিয়ে দিতো। কারণ দ্বীপের সাথে অন্য এলাকার কোন স্থল যোগা্যোগ ছিলো না।
মানুষ নৌকা বা চাম্পান দিয়ে ঐ পাড়ে যেতো। সকালের জোয়ারে যেতো আবার বিকালের জোয়ারে ফিরে আসতো।


ধীরে ধীরে জামানার পরিবর্তনে একটি রাস্তা হলো, বালির রাস্তা। কয়েকটি গাড়ি ছিলো; যা দিয়ে মানুষ একটু একটু ভদ্র (!) হতে শিখলো। দ্বীপের ছেলে পেলেরা গাড়ি দেখতে যেতো সকাল বিকাল রাস্তায়। মানুষ গাড়িতে ছড়তে শিখলো। আরেকটু পরিবর্তন হতে হতে সেই রাস্তাটি হয়ে গেলো আঞ্চলিক হাইওয়ে সড়ক। সেই দ্বীপটি আর দ্বীপ নেই; হয়ে গেলো দ্বীপহীন সুন্দরের এক খন্ড।আরেক খন্ডের সাথে মিলিত একখন্ড। দ্বীপ সুন্দর তাতে সন্দেহ নেই কিন্তু সেই দ্বীপহীন জায়গাটি আরো সুন্দর হয়ে গেলো। রাস্তার দু’পাশের জায়গাতে এক মৌসুমে ধান হতো আরেক মৌসুমে হতো হরেক রকমের ফল।
তবু নামে দ্বীপ রয়ে গেলো। নাম তার শাহ পরীর দ্বীপ। টেকনাফ থানার সর্ব দক্ষিণের একটি ইউনিয়ন-অংশ।বলতে গেলে বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের যে অংশটি আছে তা হলো শাহ পরীর দ্বীপ। ততোক্ষণে আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম কিচ্ছার মগ্নতায়। এভাবে দৃশ্যের ভিন্নতায় এই এক-ই গল্পটি অনেকবার শুনেছি।


এ রকম গল্প শুনে শুনে আমরা বড় হয়েছি। যতো বড় হচ্ছি, ততো এই গল্পটি আর শোনা হতো না। শিশু কালের ফ্রেম ভেঙে কিশোরের ফ্রেমে ঢুকেছি। তখন মনে হতো এই দ্বীপ নিয়ে যে গল্প শুনতাম হয়তো তা গল্প-ই! বাস্তবতা বলে কিছু-ই নেই। কারণ এতো সুন্দর জায়গাটিতে কিভাবে পানি আসতো! কিভাবে ডুবে যেতো! আমাদের কাছে এগুলি অবিশ্বাস্য মনে হতো!
কিশোর বয়সে এই বিলে কতো খেলা করেছি। তরমুজ ক্ষেতে আমরা কতোবার তরমুজ খেতে এসেছি! মাটির দেওয়াল লেপন করতে কতোবার মাটির জন্য এসেছি। মাটির জন্যে এসে কতোবার আকন্ঠ পানিতে ডুব দিয়েছি! কতো দেখেছি দামাল ছেলেদের উন্মাদনা আর কৈশোরের মত্ততা! কতো গরু মহিষকে দেখেছি সন্ধ্যাকালে লাইন ধরে ফিরতে আবার খুব সকালে ঘাসের সন্ধানে বেরিয়ে যেতে! আর একজন রাখাল গান গেয়ে গেয়ে লুঙি কাঁধে নিয়ে গরুর পেছনে ছুটতো! এই সব দৃশ্যের ভেতরে সুপ্ত ছিলো মমতা আর ভালোবাসা। এই দৃশ্য দেখে দেখে আমাদের কৈশোর জীবন অতিবাহিত হয়েছে। এই দৃশ্য দেখার মাঝে যে আনন্দ আছে তা দালান কোটা বা বিত্তদের রাজপ্রাসাদ দেখার মাঝে নেই। কতো মানুষের আয়ের স্মৃতি ভাস্বর হয়ে আছে এই অপরুপ বিলে!


সময়ের আবর্তে আমরা কৈশোরের ফ্রেম ভেঙে তারুণ্যের ফ্রেমে প্রবেশ করেছি। আমরা তো শাহ পরীর দ্বীপকে দেখেছি পরীর মতো সুন্দর। আমরা শাহ পরীর দ্বীপ নিয়ে যে গল্প শুনেছি, তা স্রেফ গল্প হিসেবে শুনেছি। গল্প যে বাস্তবতার ফ্রেমে দাখিল হয়ে যায় তা জানতাম না। কারণ স্টোরি ইজ স্টোরি!
একদিন ভোর রাতে শোনা গেলো শাহ পরীর দ্বীপের বেড়িবাঁধ একটু করে ভেঙে গেছে। হয়তো ঠিক করে ফেলবে। দিনের শেষে রাত আসে,অত:পর সাপ্তাহ; সাপ্তাহ শেষে মাসের সমষ্টি হয়ে বছর পার হয়ে যায়। এভাবে একবছর নয়; চার বছর অতিবাহিত হয়ে গেলো কিন্তু সেই ভাঙা আর ভালো হলো না। সেই বাঁধ আর মেরামত হলো না। এখন আর ভাঙা নেই; তা হয়ে গেলো সেই রাত জেগে শোনা গল্পের মতো।পানির রাজ্য, দৈত্যের রাজ্য। প্রাণ কেঁড়ে নেওয়া মোহনা। এখানে বোটে যাতায়াত করতে হয়। জোয়ার দেখে আসতে হয় আবার জোয়ার দেখে যেতে হয়। রাস্তা বলতে কিছু-ই নেই। রাস্তা যে ছিলো এতোদিনে তার চিহ্নও মুছে গেছে। পানির উপর বোট চলে, সেই বোটে মানুষ যাতায়াত করে।
সেই বোটের ভাড়া ৩০ টাকা। মনকে বুঝাতে অনেক কষ্ট হয় যে, ৩০ টাকার বোট ভাড়া মানে কতো দূর অঞ্চল পানি গ্রাস করে ফেলেছে! অনেক বড় জায়গা আজ পানিতে প্লাবিত চার বছর ধরে।


এই পানি শুধু মানুষের যাতায়াতের রাস্তা কেঁড়ে নেয় নি; কেঁড়ে নিয়েছে হাজারো স্বপ্নের স্মৃতি আর রুজি রোজগারের ক্ষেত্র। শুধু তাই নয়; এই পানি কেঁড়ে নিয়েছে চার চারটি তাজা প্রাণ।
কতো মায়ের বুক খালি হয়েছে এই পানির থাবায়!? সেই মায়েরা যখন এই ভাঙা পার হয়, তখন তাদের মনের আর্ত-চিৎকার কে শুনে?! বুকের ভেতর সৃষ্টি হওয়া বেদনার কম্প কে শুনে!?
অথচ এই ভাঙাকে নিয়ে হয়েছে অনেক রাজনীতি।বর্তমান পৃথিবীতে সবচে নোংরা খেলা তারা-ই খেলতে পারে, যারা রাজনীতি করে। ইতিহাস যেমন বলে, এই রাজনীতির করাল গ্রাসে পড়ে আপন ভাইকে খুন করেছে আপন ভাই। ক্ষমতার মসনদ ছিনিয়ে নিতে জন্মদাতা পিতাকে খুন করেছে সন্তান। ভূ-রাজনীতিতে অতীত ইতিহাস এমন-ই বলে। ঠিক তেমন না হলেও দ্বীপকে নিয়ে রাজনীতির নল কম ঘুরে নি। ঝোপ বুঝে কোপ মেরেছে অনেক নেতা। অনেকে আবার এই ভাঙাকে পুঁজি করে দল ভাঙার রাজনীতি করেছে। অনেকে আবার মডারেট নেতা হতে চেয়েছে। এগুলি সংঘাতিক কর্ম ছাড়া বৈ কিছু-ই নয়।


কিন্তু কয়জন-ই বা বুঝতে চেয়েছে এতো মানুষের মনের চাহিদা কী? জানেন! তাদের খ


কিন্তু কয়জন-ই বা বুঝতে চেয়েছে এতো মানুষের মনের চাহিদা কী? জানেন! তাদের খুব বড় চাহিদা ছিলো না। তারা শুধু বাঁচতে চায়।তারা শুধু নিরাপদে স্কুল বা মাদরাসায় যেতে চায়। তারা অসুখে-বিসুখে সহজে হাসপাতালে আসতে চায়। তাদের যাতায়াত যেনো একটু সহজ হয় তা তারা চায়। কিন্তু বরাবরাই তাদেরকে বোকা বানানো হলো। এভাবে বোকা বানানোর নতুন নতুন পায়তারা কর্তারা আঁটে। এই ক’দিন আগের ঘটনা, দ্বীপের একজন মানুষ মারা গেলো হাসপাতালে। তাকে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন জোয়ারের পানি ছিলো না। কর্দমাক্ত মাটি ছিড়ে ছিড়ে প্রায় চার ঘন্টা পায়ে হেঁটে কাটিয়াতে করে সেই লাশকে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তা বাবুরা, একটু চিন্তা করেন! আপনারা যদি ঐ লাশের আপন কেউ হোন বা ঐ লাশটি আপনার হতো, কেমন লাগতো!!
বর্তমানে টেকনাফ বন্দর থেকে বছরে সর্বোচ্চ টেক্স সরকার পায় কিন্তু বরাবরই এই টেকনাফের সৌন্দর্যবর্ধন এলাকা পানিতে প্লাবিত কেনো!?
এই টেকনাফের সাবরাংয়ে “ট্যুরিজম জোন” দিয়ে কী হবে, যদি ঠিক তার পাশের এলাকায় হাজার হাজার মানুষ পানি বন্দি থাকে!? এ ট্যুরিজম জোন লজ্জার নয়? যেমন পাশের বাড়িতে আলোকসজ্জা করে বিয়ে অনুষ্ঠান হচ্ছে আর পাশের বাড়ির শিশুরা খাদ্যের অভাবে কান্না করে। এ কি মানবতা!?

লেখক
ফারুক আজিজ।
ফাযিল: আল-জামেয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম।
ছাত্র: চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম।
ফোন: ০১৮১৪-৮২০৮৩৩

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT