করোনা: কক্সবাজারে আক্রান্তের সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল

প্রকাশ: ২৩ মে, ২০২০ ৯:৪৬ : অপরাহ্ণ

বিশ্ব মহামারি করোনার প্রাদূর্ভাব কক্সবাজারে ক্রমে বাড়ছে। শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ছে করোনার তীব্রতা। ছড়াচ্ছে জেলার আশপাশের উপজেলাতেও। সরকারের তরফ থেকে সচেতনতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও আমজনতার উদাসীনতায় প্রতিদিনই করোনা ‘পজিটিভ’ রোগীর সন্ধান মিলছে বলে অভিমত সচেতন মহলের। ফলে বাড়ছে উদ্বিগ্নতা।

রোগী বাড়ার পাশাপাশি করোনার উপসর্গ নিয়ে ধীরে ধীরে মৃতের সংখ্যাও দীর্ঘ হচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত করোনার উপসর্গ নিয়ে কক্সবাজারের নারীসহ ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি যথাযথ চিকিৎসায় ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫৮জন করোনা রোগী।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে পিসিআর ল্যাব স্থাপনের ৫১তম দিনে পরীক্ষার আওতায় এসেছেন চার হাজার ৭৬৭ সন্দেহজনক রোগী। পরীক্ষা হওয়াদের মাঝে করোনা পজিটিভ এসেছে ৩৪৩ জনের। এদের মাঝে কক্সবাজার জেলার ৩১৪ জন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। শুক্রবার এক দিনেই করোনা পজিটিভ এসেছে ৮ রোহিঙ্গার। এতে সবমিলিয়ে ২১ রোহিঙ্গার করোনা পজিটিভ। কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. অনুপম বড়ুয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তার মতে, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ল্যাবে শুক্রবার (২২ মে) ১৭৪ জনের স্যাম্পল পরীক্ষার রিপোর্টে নতুন ২৮ জন করোনা ‘পজিটিভ’ এসেছে। ফলোআপ পিজিটিভ মিলেছে ৬ জনের। ৩৪জনে একজন কেবল নাইক্যংছড়ি উপজেলার বাসিন্দা আর বাকিরা কক্সবাজারেরই।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) ১৬২ জনের স্যাম্পল টেস্টের রিপোর্টে নতুন ১৭ জনের করোনা ‘পজিটিভ’ এসেছে। পাশাপাশি রামু ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া ৮ জন এবং চকরিয়া ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালের একজন পুরাতন করোনা রোগীর ফলোআপ রিপোর্ট আবারো ‘পজেটিভ’ পাওয়া যায়। বাকী ১৩৬ জনের ‘নেগেটিভ’ রিপোর্ট এসেছে। বৃহস্পতিবার ‘পজেটিভ’ আসা ১৭ রোগীর ১৬ জন কক্সবাজার জেলার বাসিন্দা। বাকী একজনের বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলায়।

আর, বুধবার নতুন শনাক্ত হন ২৯ জন। ১৫৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৩৩ জন পজেটিভ আসাদের মাঝে ৪ জন ফলোআপ রোগী। যারা চিকিৎসা নেয়ার পর আবারো পজেটিভ রিপোর্ট এসেছে। আর নতুন শনাক্তের মাঝে কক্সবাজার জেলার ২৩ জন এবং বাকি ৬জন প্রতিবেশী উপজেলা লোহাগাড়া-সাতকানিয়া ও বান্দরবানের রোগী

এর আগেরদিন (মঙ্গলবার) পজিটিভ মিলেছিল ৪২ জন রোগী। এদিন ১৭৮ নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ আসাদের মাঝে ৪ রোহিঙ্গা ও এলিট ফোর্স র‌্যাবের এক সদস্যসহ ৩৩ জন কক্সবাজারের। ৮ জনের ফলোআপ রিপোর্ট এবং বাকিজন বান্দরবানের।

জেলা প্রশাসনের শুক্রবারের হিসাব মতে, কক্সবাজারে করোনা আক্রান্ত ৩১৪ জনে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৫৮ জন। ২৬৯ জন আইসোলেশনে রয়েছেন আর মারা গেছেন ২ জন। জেলায় ২ হাজার ৪৭৮ হোম কোয়ারেন্টাইন ও ৬৭০ জন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। কোয়ারেন্টাইন ছাড়পত্র পেয়েছেন এক হাজার ৩৩ জন।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, রোগীর পরিসংখ্যান বাড়ার সাথে করোনার উপসর্গ নিয়ে ধীরে ধীরে মৃতের সংখ্যাও দীর্ঘ হচ্ছে। করোনার উপসর্গ নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে মারা যান কক্সবাজার শহরের বড় বাজার জামে মসজিদ এলাকার প্রতিষ্টিত ব্যবসায়ী ‘ডিস্ট্রিবিউটর এসোসিয়েশন অব কক্সবাজার’র সহ-সভাপতি, ‘মেসার্স হাজী কাসেম এন্ড সন্স’র স্বত্বাধিকারী হাজী নুরুল আবছার। ওইদিন রাত ১০টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আইসোলেশন থেকে চট্টগ্রাম রেফার করা হলে এ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় তিনি মৃত্যু বরণ করেন বলে জানিয়েছেন ‘সাতকানিয়া-লোহাগাড়া সমিতি’র সহ-সভাপতি ব্যবসায়ী আবদুর রহমান। মৃত নুরুল আবছার করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

তারই মতো করোনার উপসর্গ নিয়ে বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাত সাড়ে ১০টার দিকে মারা যান শহরের বৈদ্যঘোনার বাসিন্দা মহিউদ্দিন (৪৫)। কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পৌছানোর আগেই তিনি মারা যান বলে দাবি করেন আরএমও ডা. শাহীন আবদুর রহমান। মৃত্যুর পর সংগ্রহ করা নমুনায় শুক্রবার তার করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে বলে জানা যায়।

করোনার উপসর্গ নিয়ে একইদিন (বৃহস্পতিবার) রাতে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চকরিয়ার কৈয়ারবিল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা শহীদ হোছাইন চৌধুরী (৭৫)। অবশ্যই তাকে আরো কয়েকটিদন আগে ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তার মৃত্যুর সনদে করোনার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এর আগে বুধবার (২০ মে) ভোরে নিজ বাড়িতে করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর শিকার হন শহরের তারাবনিয়ারছরার বাসিন্দা খোরশেদ আলম। তিনি টেকনাফের হ্নীলার নয়াবাজার এলাকার মৃত হাজী আলী মিয়া দফাদারের ছেলে ও তারাবনিয়ার ছরার স্থায়ী বাসিন্দা। ১৭ মে তার করোনার স্যাম্পল নেয়া হয় এবং ২০ মে মৃত্যুর পর রিপোর্ট আসে তিনি করোনা পজিটিভ ছিলেন।

আর কক্সবাজারে করোনার উপসর্গ নিয়ে সর্ব প্রথম মৃত্যুবরণ করেন রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের পূর্ব কাউয়ারখোপ গ্রামের মো. আবদুল্লাহর স্ত্রী ছেনু আরা বেগম। গত ৩০ এপ্রিল রাতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তির ৬ ঘন্টার মাথায় তিনি মারা যান। পরে রিপোর্টে তার করোনা পজিটিভ এসেছিল।

এভাবে দিন দিন করোনা পজিটিভ রোগী বাড়া আতংকের উল্লেখ করে কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স ও সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, করোনা যেহেতু ছোঁয়াছে ভাইরাসজনিত রোগ সেহেতু শুরু থেকেই এ বিষয়ে সরকার ও প্রশাসন নানা সচেতনতা মূলক কার্যক্রম চালিয়েছে। প্রশাসনের সাথে সচেতনতা চালিয়েছে বিভিন্ন সংস্থা ও সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংগঠনও। কিন্তু সবকিছুকেই উদাসীনভাবে নিয়েছে আমজনতা। ফলে এখন এর কুফল দৃশ্যমান হচ্ছে। লকডাউনকে তাচ্ছিল্য করায় প্রতিদিন বাড়ছে করোনা পজিটিভ রোগী। ধীরে ধীরে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও, এমনটি অভিমত তার।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের করোনা পরীক্ষার ল্যাবের রিপোর্ট মতে, কক্সবাজারের ৮টি উপজেলা, ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা এবং চট্টগ্রামের লোহাগাড়া-সাতকানিয়া থেকে সন্দেহভাজন রোগীর করোনা নমুনা সংগ্রহ করা হয় প্রতিদিন। এ ল্যাবে গত ৫১তম দিনে পরীক্ষার আওতায় এসেছেন ৪ হাজার ৭৬৭ সন্দেহজনক রোগী। পরীক্ষা হওয়াদের মাঝে করোনা পজিটিভ এসেছে ৩৪৩ জনের। এদের মাঝে কক্সবাজার জেলার ৩০৭ জন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মাঝে চকরিয়া উপজেলায় ১০৫ জন, কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৯০ জন, পেকুয়া উপজেলায় ২৮ জন, মহেশখালী উপজেলায় ১৮ জন, উখিয়া উপজেলায় ৪১ জন, টেকনাফ উপজেলায় ৯জন, রামু উপজেলায় ৭জন, কুতুবদিয়া উপজেলায় ২ জন এবং রোহিঙ্গা শরনার্থী ২১জন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, করোনার ধকল রুখতে পর্যটন নগরী কক্সবাজার ও ১১ লাখ রোহিঙ্গার ৩৪ ক্যাম্প শুরুতেই লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছিল। অসচেতন জনতা চোর-পুলিশ খেললেও কঠোরতার কারণে দীর্ঘ দু’মাস কক্সবাজারে করোনার প্রাদূর্ভাব কমই ছিল। করোনা মুক্ত ছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্পও। কিন্তু সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা করে সম্প্রতি লকডাউন সীমিত ঘোষণার পর অবিবেচকভাবে ঘুরে বেড়ানোর চেষ্টা চালিয়েছে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। ফলে, কক্সবাজারে এখন করোনার ‘পজিটিভ’ সংখ্যা বাড়ছে। এরপরও যথাযথ চিকিৎসা প্রয়োগ হওয়ায় মৃত্যুর হার কমই রয়েছে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন অর্ধশত রোগীও। আমরা এখনো বলছি, সচেতনতা ছাড়া করোনার প্রাদূর্ভাব কমানো অসম্ভব। নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমরা সচেতন হলে করোনার গতি ধরে রাখা সম্ভব।


সর্বশেষ সংবাদ