ফরিদুল মোস্তফা খান, কক্সবাজার …কিছুদিন আগে রামুতে সংঘটিত বৌদ্ধ সহিংসতার একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনার দীর্ঘদিনেও কক্সবাজারে কর্মরত জেলা পুলিশসহ প্রশাসনে বদলী আতঙ্ক কাটেনি। সহিংসতায় প্রশাসনের ব্যর্থতার জের ধরে ঘটনার একমাস পর রবিবার কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সেলিম মোঃ জাহাঙ্গীরকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। শুধু তাই নয়, রামু ঘটনার পর কক্সবাজার সদর মডেল থানায় যোগদানের মাত্র ১৬ দিনের মাথায় ওসি জসিম উদ্দিন এবং যোগদানের এক মাস না হতে টেকনাফের ওসি মোঃ ফরহাদকেও বদলী করা হয়। তবে কর্তৃপক্ষ টেকনাফের ওসি ফরহাদকে সদর মডেল থানায় যোগদানের নির্দেশ দিলেও কক্সবাজার সদরের ওসি জসিমের ব্যাপারে গতকাল (সোমবার) রাত পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত দেয়নি। এই অবস্থায়, বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত হঠাৎ এসপি প্রত্যাহার ও দুই ওসির করুন পরিণতি দেখে বিষাদের কালো মেঘ নেমে এসেছে কক্সবাজার জেলা পুলিশে। বিনা অপরাধে বদলী কিংবা শাস্তি আতঙ্কে মুখ খোলতে সাহস না করা কক্সবাজার জেলায় কর্মরত অনেক পুলিশ কর্মকর্তা এ নিয়ে রীতিমত হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, কি হচ্ছে জানিনা। সরকারি চাকুরী করি, কর্তৃপক্ষ যেখানে ইচ্ছা সেখানে দিতে পারেন। কিন্তু কষ্ট লাগে, যোগদানের মাত্র অল্পসময়ে বিনাকারণে সরিয়ে দিলে। এতে করে কর্মজীবি হিসেবে আমাদের স্ত্রী-পুত্র এবং আত্মীয়-স্বজনদেরও ভোগান্তি হয়। কারণ বাসা বদলানো, বাচ্চাদের পড়ালেখাসহ নানা অসুবিধা ছাড়াও নিজেদের মানসিক অস্বস্থি লেগে থাকে।
এদিকে ঘন ঘন ওসি বদলানোসহ খোঁড়া অজুহাতে এসপি সেলিম মোঃ জাহাঙ্গীরকে প্রত্যাহারের বিষয়ে স্থানীয় সুশীল সমাজেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
তারা বলেছেন, রামুর ঘটনায় দীর্ঘদিন পর প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. গওহর রিজভী ও শিল্প মন্ত্রী দিলীপ বড়–য়ার কাছে ক্ষতিগ্রস্থ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষে জনৈক তরুণ বড়–য়া স্বাক্ষরিত এসপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশসহ যে ৭ দফা দাবির কথা বলা হচ্ছে তা নিয়ে আক্রান্ত বৌদ্ধ সম্প্রদায়সহ সুশীল সমাজে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এই দাবিগুলো যাচাই-বাছাই না করে এসপি সেলিম জাহাঙ্গীরকে প্রত্যাহারসহ কক্সবাজার প্রশাসনে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা সংশ্লিষ্টদের বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে করে কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা ভাল হবেনা, নতুন নতুন অফিসারদের আগমণের প্রাক্কালে সন্ত্রাসীরা ফের কোন অঘটন ঘটাতে পারে। কারণ পুরাতন অফিসারগুলো থাকলে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ক্ষতি হয়। সহিংসতার মামলা সঠিক তদন্ত-গ্রেপ্তারসহ সবকিছু পুরাতনরা যেভাবে পারবেন, নবনিযুক্ত কর্মকর্তারা সেভাবে পারবেন না।
উল্লেখ্য, ঘটনার পর রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে দেশের অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, পদস্থ কর্মকর্তা এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেই আক্রান্ত বৌদ্ধ পল্লী ঘুরে ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তাসহ তাদের সাথে মন খুলে কথা বলেছেন। কিন্তু আশ্চর্য্যজনক ব্যাপার হল, ওইসময় ক্ষতিগ্রস্থ কোন বৌদ্ধ নারী-পুরুষ এই ঘটনায় কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সেলিম মোঃ জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে কর্তব্যে গাফিলাতির কোন অভিযোগ তুলেননি। বরং জানা গেছে, রাত জেগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাসহ ঘটনার পর থেকে প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত এসপি সেলিম জাহাঙ্গীর ছিলেন নাশকতা বিরোধী। তিনি সংঘটিত ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ এবং ক্ষতিগ্রস্থদের সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াও জড়িত অনেককে গ্রেপ্তার, লুণ্ঠিত মূর্তি উদ্ধারের পাশাপাশি মামলার পর মামলা দিয়ে দুস্কৃতকারীদের এলাকা ছাড়া করে রেখেছেন।
এই অবস্থায়, রহস্যজনক একটি দাবির মুখে এসপি প্রত্যাহারের সংবাদে দুর্বৃত্ত মহলে স্বস্তি ফিরে আসলেও হতভম্ব হয়ে পড়েছেন কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলার সার্বিক উন্নতি প্রত্যাশী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও অভিজ্ঞ মহল। তারা আরো বলছেন, সেলিম মোঃ জাহাঙ্গীরই ছিলেন কক্সবাজারের একমাত্র এসপি, যিনি যোগদানের পর থেকে কক্সবাজারের আইনশৃংখলা ব্যাপক উন্নতির পাশাপাশি পরিবর্তন আসে জেলা পুলিশে। তার কর্মকালীন সময় জেলার ৮ উপজেলার সকল থানায় দূর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর অফিসাররা ছিলেন তটস্থ। জেলার এমন কোন থানা নেই, যেখানে জেলা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত কেউই নিজের ইচ্ছায় পোস্টিং নিতে পারেনি। এসপি যেহেতু কোন অনিয়ম বরদাস্ত করেননা, তাই জেলা পুলিশে কর্মরত দূর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যরা আগেকার মত সচরাচর কোন হয়রানি করতে পারতেন না সাধারণ মানুষদের সাথে। তবুও প্রান্তিক জনপদে কর্মরত কেউ সাধারণ লোকজনকে হয়রানি করছেন তার প্রমাণ পেলেই সেলিম মোঃ জাহাঙ্গীর দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতেন। চেষ্টা করতেন, জনতার দৌড়গোড়ায় পুলিশী সেবা পৌঁছে দিতে।
Leave a Reply