টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলে ৭০ হাজার একরে লবণ চাষ হবে

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : সোমবার, ১২ নভেম্বর, ২০১২
  • ১১৭ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ১৫ লাখ টন/কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার সমুদ্র উপকূলীয় ৭টি উপজেলার প্রায় ৭০ হাজার একর এলাকার জমিতে এবার লবণ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য অর্ধ লক্ষাধিক চাষি প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। কয়েকটি এলাকার চাষিরা ইতিমধ্যে মাঠ তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

এবার বাজারে লবণের উচ্চ দাম থাকায় চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছে বিসিক। তবে পাউবো’র ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ সংস্কার ও অনুকূল আবহাওয়ার উপর এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নির্ভর করছে।

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার (বিসিক) কক্সবাজারস্থ লবণ প্রকল্প অফিস জানায়, চলতি লবণ উত্পাদন মৌসুমে (নভেম্বর-মে) কক্সবাজার জেলার চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার সদর, টেকনাফ ও চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার উপকূলীয় এলাকার ৭০ হাজার একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব জমিতে উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে পরিশোধিত আকারে ১৫ লক্ষ ২০ হাজার টন লবণ। দেশে   খাবার ও শিল্পে ব্যবহার্য লবণের বাত্সরিক চাহিদা রয়েছে ১৫ লক্ষ ৬ হাজার টন। সাধারণত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ও উত্পাদন মৌসুমে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে চাষিরা দিনরাত খেটে লক্ষ্যমাত্রার অধিক লবণ উত্পাদন করে থাকে। ইতিমধ্যে কুতুবদিয়াসহ কয়েকটি এলাকার লবণচাষিরা মাঠ তৈরির কাজে নেমে পড়েছেন। তবে অধিকাংশ প্রান্তিক লবণচাষি সহায়-সম্বলহীন হওয়ায় মহাজনের টাকায় চাষের উদ্যোগ নিচ্ছেন বরাবরের মত। উত্পাদন মৌসুমে যদি ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে লবণ আমদানির পাঁয়তারা নিয়ে তাদের মনে শংকা কাজ করছে। প্রতি বছর একশ্রেণীর লবণ মিল মালিক সরকারকে ভুল বুঝিয়ে এ কাজটি করে থাকে। ফলে প্রায় প্রতি বছর উত্পাদনের মাঝপথে লবণ উত্পাদনে চাষিদের উত্সাহে ভাটা পড়ে । গত ২০১১-২০১২ উত্পাদন মৌসুমে  অনুরূপভাবে চাষিরা উত্পাদন খরচ না পাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে লবণ উত্পাদন হয়নি। ফলে বিগত মৌসুমে ১৪ লক্ষ ৩৬ হাজার টন লবণ উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রার স্থলে লবণ উত্পাদিত হয়েছিল ১১ লক্ষ ৬৮ হাজার টন। ফলে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করতে হয়। এতে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে ভারত থেকে লবণ আমদানি করতে হয়।

বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে মাঠ পর্যায়ে মাটি মিশ্রিত কালো লবণ বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ২৪০ থেকে ২৭০ টাকায়। মাঠ-ওয়াশ সাদা লবণ বিক্রি হচ্ছে ২৬০ থেকে ৩২০ টাকায়। আর সর্বোকৃষ্ট পলিথিন পদ্ধতিতে উত্পাদিত লবণ ২৮০ থেকে ৩৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চলতি মৌসুমে লবণ উত্পাদনে আরো একটি সমস্যা রয়েছে। টেকনাফের নাফ নদী সংলগ্ন বেড়িবাঁধ ও  মহেশখালীর ধলঘাটা দ্বীপে সমুদ্রতীরের বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক লবণচাষি হতাশ। তারা অপেক্ষা করছেন, কখন পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ সংস্কার করবে। কারণ ১ নভেম্বর শুরু হয়ে গেছে উত্পাদন মৌসুম। একমাস সময় লাগে উপকূলীয় এসব জমিতে ‘গরান’ মেরে সমান করে নিতে। জমি সমান না হলে সমুদ্র থেকে উত্তোলিত লবণাক্ত পানি আইল দিয়ে সমভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। এতে সূর্যতাপ নির্ভর এ লবণ চাষাবাদ ব্যাহত হয়।

টেকনাফ ও ধলঘাটার লবণচাষিরা প্রতিদিনই কক্সবাজারে পানি উন্নয়ন বোর্ডে নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে ধরনা দিচ্ছেন ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ মেরামতের জন্য। এ ব্যাপারে পাউবো’র কক্সবাজারস্থ নির্বাহী প্রকৌশলী মো.মাইনুদ্দিন জানান, আপতত জরুরিভিত্তিতে মাটির অস্থায়ী রিং বাঁধ দিয়ে লবণ চাষাবাদ নির্বিঘ্ন করার ব্যবস্থা হচ্ছে।

১৯৬২ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লবণ চাষের সূচনা ঘটে। তখন এ চাষাবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার জন্য সূর্যতাপ নির্ভর হলেও শিল্প হিসাবে উল্লেখ করা হয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কালক্রমে লবণ চাষে উপকূলীয় বাসিন্দাদের উদ্বুদ্ধ করে। কেউ কেউ প্রতি বছর লবণ চাষাবাদকে পেশা হিসাবেও গ্রহণ করে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য সরকার লবণের দাম নির্ধারণ করে আপতকালীন মজুদ গড়ে তোলে। কিন্তু ৯১ সালের প্রলয়ংকরি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে এখানে উপকূল তছনছ হয়ে যায়। প্রাণ হারায় বহু লবণচাষি। যারা বেঁচে ছিলেন তাদের প্রায় সবাই সর্বস্ব হারান। এসব লবণচাষি আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে তত্কালীন বিএনপি সরকার কৃষি ঋণের ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মওকুফ করেন। কিন্তু লবণচাষিদের মাথাপিছু ৫ হাজার টাকার ঋণ এ মওকুফের আওতায় পড়েনি। চাষিদের বিভিন্ন সংগঠন এ নিয়ে বহু সভা-সমাবেশ-মানববন্ধন করেছে বছরের পর বছর। কিন্তু কোনকিছুই সরকারি প্রশাসন যন্ত্রের টনক নড়াতে পারেনি। ফলে অনেক লবণ চাষি সার্টিফিকেট মামলার শিকার হয়ে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হন। অনেকে সর্বস্ব হারানোয় তা পরিশোধ না করেই পরপারে চলে যান।

বিসিকের তথ্যমতে, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম উপকূলে অর্ধ লক্ষাধিক চাষি লবণের আবাদ করেন। এসব চাষি আরো অর্ধ লক্ষাধিক শ্রমিক লবণ চাষাবাদের নিয়োগ করে থাকেন।  ফলে লক্ষাধিক উপকূলীয় বাসিন্দা এ লবণ চাষের সাথে সরাসরি জড়িত। এছাড়া লবণ পরিবহন, মিলিং ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত ৪ থেকে ৫ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত হয়ে বছরের প্রায় ৬ মাস জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। আর এসব কর্মক্ষম লোকের আয়ের উপর নির্ভরশীল ২০ থেকে ২৫ লক্ষ পোষ্যের প্রত্যাশা, লবণচাষ থেকে তাদের ভরণ পোষণ চলবে।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT