টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

কক্সবাজারের বাতাসে ডলার উড়ে মাটিতে.. পর্যটনের অমিত সম্ভাবনা

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৩
  • ৩৩৬ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

ফরিদুল মোস্তফা খান…The-largest-Sea-Beach-of-the-World-Cox’s-Bazar_2অজানাকে জানা এবং অচেনাকে চেনার আগ্রহ মানুষের মজ্জাগত স্বভাব। প্রতিনিয়তই নতুন কিছু দেখতে এবং জানতে মন চায়। এই দুর্বার আগ্রহ বা আকর্ষণই মানুষকে ঘরের বাইরে নিয়ে আসে। মানুষের মন বড়ই বিচিত্র। বিচিত্র মনের খোরাক জোগাতেই মানুষ ছুটে যায় প্রকৃতির কাছে। প্রকৃতিও যেন মানুষকে আপন মমতায় বুকে টেনে নেয়। পর্যটন শারীরিক কষ্ট এবং ব্যয়বহুল হলেও এতে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়, তার মূল্য কম নয়। কথায় বলে, একটি বিষয় দশবার শুনে যতোটা অনুধাবন করা যায়, একবার দেখেই তার চেয়ে সহজে বোঝা যায়। ইসলাম ধর্মে আল্লাহর সৃষ্টিজগৎকে দেখার ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইসলামে পর্যটনের ওপর যতোটা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, অন্য কোনো ধর্মে তা দেয়া হয়নি। উল্লেখ্য, একজন মুসলিম মুসাফির বা পর্যটকের জন্য চার রাকাত ফরজ নামাজ দুই রাকাতে সীমিত করা হয়েছে। এতে সহজেই অনুধাবন করা যেতে পারে, ইসলামে পর্যটনের ওপর কেমন গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে পর্যটন একটি তাৎপর্যপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্মরণাতীতকাল থেকেই মানুষ কোনো না কোনোভাবে পর্যটনে নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু অতীতে এ খাতটি তেমন একটা সংগঠিত ছিল না। আগেকার দিনে মানুষ ভ্রমণ করতো মনের আনন্দে। সেখানে অর্থ আয়ের বিষয়টি ছিল গৌণ। অনেকে শুধু দেশ ভ্রমণ বা পর্যটনের মাধ্যমেই বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাদের মধ্যে চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং, ফাহিয়েন এবং মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা যেতে পারে। তারা শুধু দেশ ভ্রমণ করেই খ্যাতিমান হয়ে আছেন। এখানে যে বিষয় উল্লেখ করতে হয় তা হলো, অতীতে পর্যটকরা দেশ ভ্রমণ করতেন নিজেদের মনের আনন্দে। কিন্তু তাই বলে তাদের এই ভ্রমণ বা পর্যটন নিরর্থক ছিল না। পর্যটকদের অধিকাংশই কোনো না কোনো পর্যায়ে তাদের ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখে গেছেন। আর কে না জানে, এই ভ্রমণবৃত্তান্ত ইতিহাসের অন্যতম একটি উপকরণ হিসেবে বিবেচিত। ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্তে বাংলাদেশের তৎকালীন আর্থসামাজিক অবস্থার সুন্দর বিবরণ পাওয়া যায়। ইবনে বতুতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রশংসা করেছেন। বর্তমান সময়ে পর্যটন একক বৃহত্তম অর্থনৈতিক খাত হিসেবে পরিগণিত। বিশ্বের এমন অনেক দেশ আছে, যারা পর্যটন খাতের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার বেশিরভাগ আয় করে থাকে। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশ নেপালের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। নেপাল একটি দরিদ্র দেশ হলেও পর্যটন খাতের বিচারে বেশ সমৃদ্ধ। এ দেশের জাতীয় আয়ের অন্তত ৪০ শতাংশ উপার্জিত হয় পর্যটন খাত থেকে। সিঙ্গাপুরের মোট জাতীয় আয়ের ৭৫ শতাংশই আসে পর্যটন খাত থেকে। অন্যদিকে তাইওয়ান ৬৫, হংকং ৫৫, ফিলিপাইন ৫০ এবং থাইল্যান্ড ৩০ শতাংশ জাতীয় আয় অর্জন করে পর্যটন খাত থেকে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পর্যটন স¤পর্কে মানুষের ধারণাও পরিবর্তিত হয়েছে। আগে মনে করা হতো, পর্যটক তারাই যারা শুধু মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ান। কিন্তু এখন আর তা মনে করা হচ্ছে না। পর্যটনের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, নিজের স্থায়ী আবাসস্থল থেকে দূরবর্তী কোনো স্থানে গিয়ে ন্যূনতম একদিন এবং অনধিক ৩৬৫ দিন অবস্থান করলে (কর্মসংস্থান ছাড়া যে কোনো উদ্দেশ্যেই হোক না কেন) তিনি পর্যটক হিসেবে আখ্যায়িত হবেন। বর্তমান বিশ্বে পর্যটন একক বৃহত্তম অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি এমন একটি খাত, যেখানে প্রচুর বিনিয়োগ না করেও পর্যাপ্ত অর্থ আয় করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, পর্যটন খাতে কোনো কিছুই নতুন করে সৃষ্টি করতে হয় না। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নসাধন করা গেলেই এই খাত থেকে অর্থ আয় করা সম্ভব। পর্যটন হচ্ছে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী একটি খাত। কয়েক বছর আগের এক হিসাবমতে, বিশ্বে পর্যটন খাতে মোট ৭.৫০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পরোক্ষভাবে এ খাতে কর্মরত রয়েছে আরো ৮০ কোটি মানুষ। প্রতিনিয়তই এ খাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বাড়ছে। প্রতিটি দেশই পর্যটক আকর্ষণের জন্য নানা উদ্যোগ-আয়োজন গ্রহণ করে থাকে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে, ২০০০ সালে মোট ৬২ কোটি মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পর্যটনে গেছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৮৯ কোটি ৮০ লাখ জন। চলতি বছর এই সংখ্যা ১০০ কোটি এবং ২০৩০ সালে এটা ১৬০ কোটিতে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পর্যটকরা খাওয়া-দাওয়া এবং সাইট সিইং বাবদ বছরে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার খরচ করে। উন্নত দেশগুলোতে মানুষ পর্যটনকে তাদের একটি অত্যাবশ্যকীয় কালচারে পরিণত করেছে। তারা পুরো সপ্তাহ অমানষিক পরিশ্রম করে এবং সপ্তাহান্তে পর্যটনে বেরিয়ে পড়ে। এখন প্রশ্ন হলো, একজন পর্যটক কোন দেশকে কেন পর্যটনের জন্য বেছে নেবে? বা কী কী উপকরণ থাকলে মানুষ একটি দেশ ভ্রমণে গমন করে? বিশ্বের পর্যটন এক্সপার্টরা এ বিষয়ে অনেকটাই একমত যে, মানুষ বিনোদনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন কিছু জানার জন্যই পর্যটনে গমন করে। সাধারণত সাতটি বৈশিষ্ট্য একটি অঞ্চলকে পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলে। এগুলো হচ্ছেÑ মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য, পাহাড়, সমুদ্র, বন, মরুভূমি, প্রাচীন ঐতিহ্য এবং ফ্রি সেক্স। এই সপ্ত উপাদান মানুষকে একটি দেশে পর্যটনে যেতে আগ্রহী করে তোলে। অবশ্য এটা ঠিক, কোনো দেশেই এই সাতটি উপকরণ একসঙ্গে পাওয়া নাও যেতে পারে। কিন্তু তাই বলে কি মানুষ ভ্রমণে যাবে না? এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই ইতিবাচক। কোনো একটি উপকরণের অভাব হলেই যদি মানুষ সে অঞ্চল ভ্রমণে যেতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতো তাহলে পর্যটনের ক্ষেত্র অত্যন্ত সঙ্কুচিত হয়ে পড়তো। আর সব উপকরণ যদি একটি দেশ বা অঞ্চলে পাওয়া যেতো তাহলে মানুষ একটি অঞ্চল ভ্রমণ করেই তার পর্যটন নেশা পূরণ করতে পারতো। এই উপকরণগুলোর একটিও যদি কোনো দেশে বিদ্যমান থাকে তাহলেও মানুষ সেই দেশে পর্যটনে যেতে পারে। অবশ্য পর্যটনের জন্য নিরাপত্তার বিষয়টিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অঞ্চল যতোই পর্যটন সম্ভাবনাময় হোক না কেন, সেখানে যদি নিরাপত্তার অভাব থাকে তাহলে কোনো মানুষই সে অঞ্চলে পর্যটনে যাবে না। কারণ জীবনের চেয়ে পর্যটন কোনো দিনই বড় হতে পারে না। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে, বিশেষ করে আকর্ষণীয় পর্যটন ¯পটের আশপাশের মানুষের আচার-আচরণও এ শিল্প বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে এ বিষয়টির অনুপস্থিতি বড়ই পীড়াদায়ক। আমাদের দেশের মানুষ এখনো পর্যটনমনস্ক হয়ে ওঠেনি। স্থানীয় পর্যায়ের মানুষের মধ্যে এমন একটি নেতিবাচক মনোভাব বিরাজ করছে যে, তারা পর্যটন শিল্পকে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কোনো অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গ্রহণ করতে পারছে না। অনেকেই মনে করেন, ভ্রমণ বা পর্যটন হচ্ছে বিলাসিতা এবং এর কোনো অর্থনৈতিক গুরুত্ব নেই। আমাদের দেশে কিছুদিন আগেও পর্যটন শিল্প নিয়ে কেউ তেমন একটা ভাবতো না। সরকারি পর্যায়ে পর্যটন করপোরেশন আছে। তারা পর্যটনের উন্নয়নে চেষ্টা করে চলেছে। কিন্তু এখানেও ধারণাগত বিভ্রান্তি লক্ষণীয়। বিশ্বে সম্ভবত একটি দেশের উদাহরণ দেয়া যাবে না, যারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চেষ্টা চালিয়ে পর্যটন শিল্পের উন্নতি করেছে। সব দেশেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন হয়েছে। সরকার শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটিয়ে থাকে। সরকারি অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি খাতে এ শিল্পের বিকাশ ঘটে। ইদানীং আমাদের দেশেও ব্যক্তি পর্যায়ে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অনেকেই এখন পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে নিচ্ছেন। দেশে অনেক ট্যুর অপারেটর গড়ে উঠেছে, যারা নিয়মিত বিভিন্ন স্থানে পর্যটনের ব্যবস্থা করে থাকে। বর্তমানে অনেকেই এ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এখানেও বেশকিছু সমস্যা রয়েছে। স্থানীয় ট্যুর অপারেটররা যে চার্জ আরোপ করে, তা যে কোনো বিচারেই অত্যন্তবেশি। যে টাকা দিয়ে সুন্দরবন যেতে হয়, তার চেয়েও কম টাকা দিয়ে ভারতের কোনো কোনো শহর ঘুরে আসা যায়। বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র দেশ হলেও এর রয়েছে নানা ঐতিহ্য, যা সহজেই একজন পর্যটককে আকৃষ্ট করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য আগে তেমন একটা চেষ্টা করা হয়নি। বিশ্বে কোনো দেশেরই সরকারি উদ্যোগে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটেনি। বাংলাদেশে সেই অসাধ্য সাধন করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে দুই থেকে আড়াই লাখ পর্যটক আসেন। তাদের কাছ থেকে আমাদের আয় হয় ৪০০ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু আমাদের দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে ভালোভাবে কাজে লাগানো গেলে এ আয় অনেকটাই বাড়ানো যেতে পারে। বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটন বেশি আসে না। এ জন্য বাংলাদেশের ইমেজ সঙ্কটও অনেকটা দায়ী। বাইরের দুনিয়ায় বাংলাদেশ একটি দুর্নীতিগ্রস্ত, ঝড়-ঝঞ্ঝার দেশ বলে পরিচিত। এখানে এসে পর্যটকরা নানা সমস্যায় পতিত হন। এসব নেতিবাচক প্রচারণার জন্য বাংলাদেশে বিদেশিরা আসতে চায় না। বাংলাদেশ আয়তনে অত্যন্ত ছোট এটা সত্যি, কিন্তু আমাদের তো ঐতিহ্যের অভাব নেই। কোনো দেশে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য যেসব উপকরণ দরকার, তার প্রায় সবই আমাদের এখানে বিদ্যমান রয়েছে। বাংলাদেশে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। এখানে আছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, আছে একই স্থানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখার বিরল সুযোগ সৃষ্টিকারী সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা। বাংলাদেশে রয়েছে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধ নিদর্শন। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সুন্দর পাহাড়ি এলাকা। সিলেটের দিগন্ত বিস্মৃত চা বাগান যে কোনো পর্যটকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম। এখন আমাদের শুধু ইমেজ উন্নয়ন করতে হবে। একইসঙ্গে বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া দরকার। পর্যটন শিল্প এখন আর কোনো বিনোদন উপকরণ মাত্র নয়।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT