টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

উখিয়ার উপকূলীয় এলাকা আদম পাচারের নিরাপদ রুট

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১২
  • ১৩১ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া…
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নাগালের বাইরে হওয়ার সুবাদে সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র উখিয়ার উপকুলীয় এলাকাকে আদম পাচারের নিরাপদ রুট হিসাবে বেচে নিয়েছে। বিশেষ করে সাগর লাগোয়া মেরিন ড্রাইভ সড়কটি ইদানিং বেশী ব্যবহৃত হচ্ছে মানব পাচারে জন্য  মালেয়শিয়া পাচারের নামে উক্ত চক্রটি শত শত পরিবারকে সর্বশান্ত করে দিয়েছে। সীমান্তে বিজিবি সদস্যদের সর্তক অবস্থান থাকা স্বত্বেও  সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন বিচ্ছিন্ন ভাবে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা মালেশিয়া যাওয়ার জন্য অনুপ্রবেশ করছে। সম্প্রতি উখিয়া থানা পুলিশের হাতে মালেয়শিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় উপকূলীয় এলাকা থেকে আটক হয়েছে ৬ জন রোহিঙ্গা নাগরিক এবং কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের যাত্রীবাহী গাড়ি তল্লাশি চালিয়ে আরো ১১ জন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাকে পুলিশ আটক করে বিদেশীয় নাগরিক আইনে মামলা রুজু করে জেল হাজতে প্রেরণ করেছে। আটককৃত রোহিঙ্গারা তাদের স্বীকারোক্তিতে পুলিশ কে জানান, তারা স্থানীয় দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে সম্প্রতি অনুপ্রবেশ করেছে। এদিকে মালয়েশিয়ায় মানব পাচার ঠেকাতে উখিয়া পুলিশ প্রতিদিন উপকূলীয় এলাকায সভা সমাবেশ করে এলাকার জনগণের সহযোগীতা কামনা করছে। পাশপাশি উপকূলীয় এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে বলে উখিয়া থানার ওসি অপ্পেলা রাজু নাহা সাংবাদিকদের জানান।
টেকনাফ ৪২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্ণেল জাহিদ হাসান সাংবাদিকদের জানান, বিজিবি, কোষ্টগার্ড ও পুলিশ লাগাতার অভিযান চালিয়ে মালয়েশিয়া গামী লোকজন কে দালাল সহ আটক করার পর থেকে দালাল চক্রের সদস্যারা এবার তাদের রুট পরিবর্তন করে উখিয়া ২৮ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকাকে মানব পাচারের অন্যতম নিরাপদ রুট হিসেবে বেচে নিয়েছে। তিনি বলেন, সীমান্তের বিজিবি  ও নৌপথে কোষ্টগার্ডের সদস্যরা সর্তক থাকার কারণে সম্প্রতি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ হ্রাস পেয়েছে। তাই মালয়েশিয়া পাচারের ঘটনাও উল্লেখ্য যোগ্য ভাবে কমেছে বলে তিনি মতামত ব্যক্ত করেন।
পাচারকারীদের অন্যতম টার্গেট স্থানীয় গরীব জনসাধারনের পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে এদেশে অনুপ্রবেশ করে আসা রোহিঙ্গা নাগরিকেরা । এসব রোহিঙ্গারা বিদেশে অর্থ উপার্জন করে সাবলম্বি হওয়ার উদ্দেশ্যে অনুপ্রবেশ করলেও পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে গভীর সমুদ্রে অনেকের সলিল সমাধি হচ্ছে। দীর্ঘদিন থেকে সমুদ্র পথে মানব পাচার ও গভীর সমুদ্রে এদের সলিল সমাধি হওয়ার কথা শুনা গেলেও মালয়েশিয়ায় মানব পাচার থেমে নেই। পাচারকারী সিন্ডিকেট সমুদ্র পথের মালেশিয়া পৌছে দেওয়ার কথা বলে জনপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আদায় করছে। কম টাকায় মালেশিয়া যাওয়ার সুযোগ পেয়ে মিয়ানমার থেকে চোরাই পথে আসা রোহিঙ্গারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মালেশিয়া যাওয়ার জন্য। আর এ জন্য বর্তমানে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারের নাগরিকদের অনুপ্রবেশের ঘটনা আগের তুলনায় বেড়েছে বলে সীমান্তরক্ষী বিজিবি সদস্যরা জানান।
প্রায় প্রতিদিনই বিজিবি কতৃক অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা আটক ও  পুশব্যাকের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা নাগরিক আসা রোধ করা যাচ্ছেনা। বিজিবি সীমান্তের এক পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের পুশব্যাক করলে অন্য পয়েন্ট দিয়ে ঠিকই তারা আবার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। কারন মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের বেশীর ভাগেরই উদ্দেশ্যে থাকে, তারা যে কোন ভাবে মালয়েশিয়া চলে যাবে। পাচারকারীরা মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক লোকজনকে উখিয়া উপকুলের মনখালী, ছেপটখালী,ইনানী,নিদানিয়া,সোনারপাড়া অথবা টেকনাফ উপজেলা বাহারছড়া, শামলাপুর উপকুলের ঝাউ বাগান অথবা দালালদের বাসা বাড়িতে জড়ো করে রাখে। পরে  সুযোগ বুঝে মালেশিয়াগামীদের ডিঙ্গি নৌকার মাধ্যমে সমুদ্রের এক কিলোমিটার অদূরে অপেক্ষামান কার্গোবোটে তোলে দেয়। উক্ত যাত্রীবাহী কার্গোবোট মিয়ানমার, থাইল্যান্ড অথবা দেশের অভ্যান্তরে কোন চরাঞ্চলের অচেনা জায়গায় তুলে দেয়, অথবা পাচারকারী চক্র অবস্থা ভেদে মালেশিয়াগামী যাত্রীদের গভীর সাগরে ফেলে দিয়ে নিরাপদে সরে পড়ে। এভাবে ইতিপূর্বে শত শত মালেশিয়াগামী যাত্রীর  মৃতে্যুর ঘটনাও ঘটেছে। তবুও থেমে নেই মালয়েশিয়ায় আদম পাচার। মাঝেমধ্যে মালেয়শিয়া যাওয়ার প্রক্কালে রোহিঙ্গাদের আটকের ঘটনা ঘটলে ও দালালেরা থেকে যায় ধরাছোয়ার বাইরে।
সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া পাচারের জন্য উখিয়া উপকূলে এক দালালের বাড়ীতে জড়ো করে রাখা ৬ রোহিঙ্গা যুবককে গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টায় আটক করেছে উখিয়া থানা পুলিশ। আটককৃতরা হচ্ছে মিয়ানমারের বুচিদং ওলাপে গ্রামের ছৈয়দ আমিন (২৮) পিতা-ফারুক আহামদ, রশিদ আহাম্মদ (২২) পিতা- কামাল হোছন, হামিদ হোছন (২৫) পিতা-হাসু মিয়া, মোঃ কালু (২০) পিতা ওমর মিয়া, আরিফ উল্লাহ (২৭) পিতা জাফর আহামদ ও ছৈয়দ কাশেম (২১) পিতা শফি উল্লাহ।  অভিযান পরিচালনাকারী উখিয়া থানার এস,আই মহিদ জানান,গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোনারপাড়া এলাকার জনৈক জালালের বাড়ী ঘেরাও করে তল্লাশী চালিয়ে উপরোক্ত ৬ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। আটককৃত রোহিঙ্গারা জানায়, সোনারপাড়া এলাকার দালাল জয়নাল ও শফির মাধ্যমে তারা  সমুদ্র  পথে মালেয়শিয়া যাওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা করে অগ্রিম প্রদান করে। চুক্তির বাকী টাকা মালেয়শিয়া যাওয়ার পর পরিশোধ করার কথা হয় দালালদের সাথে। আটক ৬ রোহিঙ্গাকে দালাল শফি সম্প্রতি সোনারপাড়া এলাকায় তার আত্বীয় জালালের বাড়ীতে নিয়ে আসে। এখান থেকে তাদের সমুদ্রপথে মালেশশিয়া নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এ ব্যাপারে বিদেশীয় নাগরিক আইনে একটি মামলা দায়ের করে আটক রোহিঙ্গাদের জেল হাজতে প্রেরণ করেছে। এর আগে গত ২৪ নবেম্বর দুপুর ১২টায় যাত্রীবাহি গাড়ীতে তল্ল¬াশি চালিয়ে মালেশিয়াগামী ১১ রোহিঙ্গা যুবককে আটক করে জেল হাজতে প্রেরন করেছে উখিয়া থানা পুলিশ। আটককৃতরা হচ্ছে মিয়ানমারের নাগপুরা, রইঙ্গাদং গ্রামের মোঃ জুবাইর (১২) রশিদ উল¬াহ (২০) মোঃ রফিক (১৫) মোঃ হালিম (১৮) নাজিম উদ্দিন (১৬) আনোয়ার (১৮) সেবাল করিম (১৮) আব্দুল¬াহ (১৯) গফুর মিয়া (২০) জসিম (১৪) ও নুরুল ইসলাম (২২) ।
আটককৃত রোহিঙ্গারা পুলিশকে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে জানান, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের বেশীর ভাগেরই টার্গেট স্বপ্নের দেশ মালেয়শিয়া। তাদের অনেক আত্বীয় স্বজন দালালদের মাধ্যমে মালেয়শিয়া গেছে। আরো অনেকে মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশ করে মালেয়শিয়া যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এক্ষেত্রে সীমান্তে নিয়োজিত বাংলাদেশী একাধিক দালাল রয়েছে। দালালরা অনুপ্রবেশকারী এসব রোহিঙ্গাদের কম টাকায় বিদেশ যাওয়া সহ বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে মালেয়শিয়া যেতে উদ্ধুদ্ধ করছে।
উখিয়া থানার আফিসার ইনচার্জ অপ্পেলা রাজু নাহা জানান, স্থানীয় বা রোহিঙ্গা যে কোন নাগরিক যেন অবৈধ ভাবে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়ায় পাচার হয়ে যেতে না পারে সেজন্য সমুদ্র  উপকুলীয় এলাকাগুলোতে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে পাচার বিরোধী সভা সমাবেশ করে স্থানীয় গ্রামবাসীদের মালয়েশিয়া পাচার প্রতিরোধ করার জন্য সচেতন করা হচ্ছে।

কায়সার হামিদ মানিক
উখিয়া, কক্সবাজার
০১৮১৩-০১৯৮৩২

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT