টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

ইসলামের অবমাননাই সিটি নির্বাচনে আঃলীগের ভরাডুবির কারণ

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৭ জুন, ২০১৩
  • ১৮৫ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
মোবায়েদুর রহমান  :  ক্ষমতার মদমত্ততা যাদেরকে একবার পেয়ে বসে তারা চোখ থাকতেও অন্ধ হয়। তারা তখন দেয়ালের লিখনও পড়তে পারে না। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের জনপ্রিয়তা যে তলানীতে ঠেকেছে সেটা এদেশের একজন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারলেও সরকারের উচ্চ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত ভিআইপিবৃন্দ সেটি বুঝতে পারেননি। গণচীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের সেনাপতি মাও সে তুংয়ের সেই অমর বাণী থেকেও ক্ষমতাসীনরা কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেননি। মাও সে তুংয়ের সেই অমর বাণীটি হলো, ইতিহাসের শিক্ষা এই যে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করেন না। চট্টগ্রাম মহানগরীর সাবেক মেয়র ডাকসাঁইটে আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দীন চৌধুরী যখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কুপোকাৎ হন তখনই আওয়ামী হাইকমান্ডের বোঝা উচিত ছিল যে, তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের বোধোদয় হয়নি। কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির একজন বহিষ্কৃত নেতাও যখন সেখানকার নির্বাচনে আওয়ামী প্রার্থীকে ধরাশায়ী করেন তখনও তাদের চৈতন্যোদয় হয়নি। ঐ দিকে নারায়ণগঞ্জে সেলিনা হায়াৎ আইভী আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হলেও হাই কমান্ড সমর্থিত প্রার্থীকে তিনি পরাজিত করেন। এই পরাজয়ের অর্থ ছিল, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি নরায়ণগঞ্জবাসীর অনাস্থা। প্রায় কাছাকাছি সময়ে অনুষ্ঠিত হয় নরসিংদী পৌরসভার নির্বাচন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, নরসিংদী পৌরসভার নির্বাচিত মেয়রকে গুলী করে হত্যা করা হয়। হাইকমান্ডের আশীর্বাদপুষ্ট একজন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর ভাই এই হত্যাকা-ের নেপথ্য নায়ক ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মেয়র হত্যার পর মেয়রের ছোট ভাই বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়ী হন। এটিও ছিলো আওয়ামী হাইকমান্ডের প্রতি নরসিংদীবাসীর অনাস্থা। এরপর আসে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোট অংশগ্রহণ করেনি। ফলে সেখানে প্রতিদ্বন্দি¦তা হয়েছে মূলত মহা জোটেরই দুই শরিকের মধ্যে। যদি বিএনপি তথা ১৮ দল ঐ নির্বাচনে অংশ নিতো তাহলে সেখানেও আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হতো।
তবুও সরকারের বোধোদয় হয়নি
এরপর এলো একসাথে চারটি বড় বড় সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। সেগুলো হলো সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশাল। এই চারটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকে ঐ চারটি মহানগরীর অধিবাসীরাই নয়, সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ শুধুমাত্র স্থানীয় নির্বাচন নয়, জাতীয় নির্বাচনের আঙ্গিকে গ্রহণ করে। কারণ, এর মাঝে সারাদেশে এমন কিছু ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে যায় যেগুলো শান্তিপ্রিয় সাধারণ নিরীহ মানুষের নিস্তরঙ্গ জীবনে প্রবল ঢেউ সৃষ্টি করে। একটি বিচারকে কেন্দ্র করে তিন মাস ধরে ‘শাহবাগী’ বলে পরিচিত কিছু নাস্তিক যুবকসহ একটি মঞ্চের কয়েক ব্যক্তিকে সরকার জামাই আদরে পালপোষ করে। তারা তিনমাস ধরে ‘খতম কর’, ‘জবাই কর’ শ্লোগান সম্বলিত উত্তেজক বক্তৃতা করে জনগণকে সহিংসতার পথে উস্কে দেয়। পক্ষান্তরে লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ, অতি দরিদ্র, নিরীহ, সহজ সরল আলেম ওলামাকে একটি মাত্র রাত অর্থাৎ ১২ ঘণ্টার জন্যও শাপলা চত্বরে রাত্রি যাপন করতে দেওয়া হয়নি। রজনীর তৃতীয় প্রহরে বিজলী বাতি নিভিয়ে গভীর ঘন অন্ধকারে ১০ থেকে ২০ হাজারের স্ট্রাইকিং ফোর্স ঐসব আলেম ওলামার বিরুদ্ধে সাঁড়াশী অভিযান পরিচালনা করে। ঐ অভিযানে কতজন আদম সন্তান নিহত হয়েছেন সেটির সঠিক হিসাব কেউ জানেন না। তবে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকারের’ সর্বশেষ রিপোর্ট মোতাবেক ২০২ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন এবং ২৫০০ ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। বিএনপি এবং হেফাজতে ইসলামসহ অনেক সংগঠন নিহতের সংখ্যা আড়াই থেকে তিন হাজার বলে দাবী করেছেন। নিহতের সংখ্যা যাই হোক না কেন, এত বড় একটি ভয়াবহ অভিযান, যার পরিণতিতে সংঘটিত মৃত্যুকে অনেকে গণহত্যা বলছেন, সেটির একটি বিচার বিভাগীয় তদন্তেরও ব্যবস্থা করেনি সরকার।
এর আগে কয়েকজন  রাজনৈতিক নেতার বিচারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে ব্যাপক হত্যাকা-। ১৮ দলীয় জোট নেত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া সেই হত্যাকা-কে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। গত ফেব্রুয়ারী এবং মার্চ মাসে সংঘটিত এই হত্যাকা-ে ২০০ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। এই ২০০ ব্যক্তির মধ্যে ৮ জন পুলিশও রয়েছেন। রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন করার জন্য এমন লোমহর্ষক শক্তি প্রয়োগ অতীতে আর কখনো দেখা যায়নি। একটি বিচারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের লক্ষ্যে ২শত লোককে হত্যা করা এবং শাপলা চত্বরে ১০ থেকে ২০ হাজার পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির রক্ত হিম করা সাঁড়াশী অভিযান বাংলাদেশে ৪২ বছরের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। এই বিপুল রক্তপাতের প্রভাব ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিতে ক্ষমতাসীন সরকার তথা শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যেতে বাধ্য। অতীতে রাজপথে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে ২/৪ ব্যক্তি নিহত হলে তোলপাড় হয়েছে। তারও আগে সরকারেরও পতন হয়েছে। আর শত শত লোক সরকারী বাহিনীর গুলিতে নিহত হওয়ায় চার সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে সরকার দলীয় প্রার্থীর যে ভরাডুবি ঘটবে সেটি তো জানার কথা। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চারজন ছিলেন হেভীওয়েট প্রার্থী। এদের মধ্যে সিলেটের বদরুদ্দিন কামরান, খুলনার তালুকদার খালেক, বরিশালের হিরন, রাজশাহীর লিটন আওয়ামী লীগের সেন্ট্রাল লিডার। তাদের তুলনায় বিএনপির চার প্রার্থী জাতীয় পর্যায়ে বা সেন্ট্রাল লিডার নন। তৎসত্ত্বেও সিলেটে  কামরান হেরেছেন ৩৫১৫৭ ভোটে, রাজশাহীতে লিটন হেরেছেন ৪৮৩৮০ ভোটে, খুলনায় তালুকদার খালেক ৬০৬৭১ ভোটে এবং বরিশালে হিরন হেরেছেন ১৮০১০ ভোটে। সিটি কর্পোরেশন বা কোনো পৌরসভার মেয়র বা সভাপতি নির্বাচনে এতো বিশাল ভোটে এই ৪২ বছরে আর কেউ পরাস্ত হননি। বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা বলেছেন যে, যদি নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হতো এবং নির্বাচন কমিশন আরো নিরপেক্ষ ও কঠোর ভাবে দায়িত্ব পালন করতেন তাহলে আওয়ামী লীগের প্রতিটি প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হতো।
নির্বাচনী ফল সম্পর্কে ইনকিলাবের পূর্বাভাস
এই চারটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে ‘দৈনিক ইনকিলাব’ গত ১২ই জুন প্রধান সংবাদ হিসাবে যে পূর্বাভাস দিয়েছিল সেটি সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। জনমত জরিপের ভিত্তিতে ইনকিলাবের ঐ রিপোর্টে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয় যে, চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে চারটি মেয়র পদেই আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে। এই পূর্বাভাসের সঠিক ভিত্তিও প্রকাশ করেছে ‘দৈনিক ইনকিলাব’। গত ১৩ই জুন প্রকাশিত খবরে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, সরকারের ইসলাম অবমাননা ও আলেম ওলামাদের ওপর নির্যাতন এবং ইসলাম বিদ্বেষীদের মদত দেওয়ার কারণেই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জন সমর্থন হারাচ্ছে আওয়ামী লীগ। ঐ খবরে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, “৩৩.১২% ভোটার মনে করেন যে সরকার সমর্থিত প্রার্থীর পরাজয় এবং বিরোধী দলীয় প্রার্থীর বিজয়ের পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে সরকারের ইসলাম অবমাননা, ইসলাম বিদ্বেষীদের মদদ যোগানো এবং আলেম ওলামদের ওপর নির্যাতন”। এই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে যে, বিরোধী দলীয় প্রার্থীরা প্রচার প্রচারণার ক্ষেত্রে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে বর্তমান সরকারের ইসলাম বিদ্বেষী নানা কর্মকা- এবং আলেম ওলামাদের ওপর নির্যাতন ও অত্যাচারের কথা তুলে ধরছেন। জামায়াত শিবির ধরার নামে দাড়ি টুপির ওপর পাইকারী হারে আক্রমণও সরকারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।
আলেম ওলামাদের উপেক্ষা ও কমিউনিস্টদের মহব্বত
বলা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে ধর্মভীরু। অথচ বিগত সাড়ে ৪ বছর ধরে এদেশের ওলামা মাশায়েখ এবং আলেম ও মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকগণকে নির্মমভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। সরকার এবং দলের মধ্যে কমিউনিস্টদের ব্যাপক অনুপ্রবেশ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পিতার মত সচেতন কি না সেটি এখন একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জামায়াত শিবির দমনের নামে একদিকে অসংখ্য মানুষ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়া এবং অন্যদিকে নিহত হওয়ার পর আসামী ধরতে পল্লী গ্রামে গিয়ে নিরীহ গ্রামবাসীর সাথে পুলিশের সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া সরকারের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। লক্ষ লক্ষ মুসল্লিকে আওয়ামী লীগের ভাষায় ‘১২ মিনিটের মধ্যে বিতাড়িত করায়’ সরকার আত্মপ্রসাদে ভুগছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অস্ত্রের মুখে আলেম ওলামা ও মুসল্লিদের রুখে দাঁড়ানোর কথা নয় এবং তারা সেটা করেও নি। আর সেটাতেই সরকার মনে করেছে যে, তারা সমস্ত বিরোধিতা ক্রাশ করেছে। কিন্তু এই ক্রাশ করতে গিয়ে যারা দমিত হয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন এবং পরাজিত হয়েছেন সেই লাখ লাখ মানুষ মফস্বল শহরে ছড়িয়ে পড়েছেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে তাদের দুঃখ বেদনার কথা শহরে নগরে এবং বন্দরে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তারা আরও বলেছেন, কিভাবে সরকার ধর্মদ্রোহীদের তথা ইসলাম বিরোধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এবং ইসলাম প্রেমীদের ওপর জুলুমের স্টিম রোলার চালিয়েছেন। এসবের প্রভাব পড়েছে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। বোরকা এবং হিজাব পরিহিত পর্দানশীল মেয়েরা সকাল সকাল এসে দলে দলে ভোট দিয়ে গেছেন। আগামী নির্বাচনে, বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনে, ইসলাম পন্থীদের ওপর জুলুম নির্যাতন মুখ্য ভূমিকা রাখবে বলে পর্যবেক্ষক মহলের বিশ্বাস।
নির্দলীয় সরকারের দাবি জোরদার হলো
সরকার বলছে যে, চারটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ার পরেও যখন বিরোধী দল জিতেছে তখন নির্বাচন অবশ্যই সুষ্ঠুভাবে হয়েছে। এর ফলে আগামী জাতীয় নির্বাচনও দলীয় সরকারের অধীনে হলে সেটি সুষ্ঠুভাবেই হবে। তাই জাতীয় নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক ও নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজন নাই। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছেন যে, বিএনপি সরকারের আমলে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ হানিফ এবং মহিউদ্দীন চৌধুরী মেয়র পদে জয়লাভ করেছিলেন। কিন্তু তার পরেও আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছাড়েনি এবং সেই দাবিতে সারাদেশকে অস্থির করে তুলেছিল। আওয়ামী লীগের সেই যুক্তির প্রতিধ্বনি করে বিএনপি এখন বলছে যে, এই চারটি নির্বাচনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়কের দাবি আরো জোরদার হয়েছে এবং বিএনপি আওয়ামী সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনে যাবে না এবং সেই নির্বাচন করতেও দেবে না।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT