টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

আজ পবিত্র আশুরা

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : রবিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১২
  • ৩৬৬ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

হিজরি ১৩৩৪ বছরের প্রথম মাস পবিত্র মহররম। আজ রবিবার মহররমের ১০ তারিখ পবিত্র আশুরা। আশুরা হলো আরবি শব্দ। আর এ শব্দের অর্থ হচ্ছে দশম। এটি একটি অত্যন্ত মহান ও বরকতময় মাস। মহররমের ৯ তারিখ দিবাগত রাত অর্থাত্ গতকাল শনিবার থেকে আশুরা উদযাপন শুরু হয়েছে।

ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি বিশেষ তাত্পর্যমন্ডিত। কারণ আকাশ ও জমিন সৃষ্টিসহ অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা মহররমের ১০ তারিখেই সংঘটিত হয়েছিলো। হযরত আদম (আ.) আশুরার সৃষ্টি। আশুরার দিনে মহান আল্লাহ তা’আলা আদমকে সৃষ্টি করেন। আবার এদিনেই আদম ও বিবি হাওয়াকে   আল্লাহ বেহেশত থেকে বের করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন। পৃথিবীতেই আশুরার দিনে তাদের মধ্যে সাক্ষাত্ হয়। ইসলামের অনেক আগে থেকেই মহররম মাস আল্লাহ’র নিকট অত্যন্ত সম্মানিত এবং ফজিলতপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আশুরার দিন রোজা রাখার কারণে বান্দার বিগত এক বছরের গোনাহ আল্লাহ মাফ করে দেন। হাদিসে বলা হয়েছে রাসূল (সা.) ইন্তেকালের আগের বছর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, যদি আমি আগামী বছর বেঁচে থাকি তবে মহররমের নয় তারিখেও রোজা রাখবো। তবে তিনি তা পারেননি। তার আগেই দুনিয়া ছেড়ে চলে যান।

পবিত্র আশুরা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়াপার্সন খালেদা জিয়া বাণী দিয়েছেন। আশুরার তাত্পর্য উল্লেখ করে জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। এছাড়াও বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার, স্যাটেলাইট চ্যানেল, এফএম ব্যান্ড রেডিও চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। আজ সরকারি ছুটি। একই সাথে সংবাদপত্র অফিস বন্ধ থাকায় আগামীকাল সোমবার পত্রিকা প্রকাশিত হবে না।

পৃথিবীতে অনেক স্মরণীয় ও যুগান্তকারী ঘটনা আশুরার দিনে ঘটেছে। তবে আজ থেকে এক হাজার ২৭৩ বছর আগে কারবালার প্রান্তরে মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনা ঘটেছিলো। দিনটি ছিলো ৬১ হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখ। কারবালার প্রান্তরের ঘটনার আগে ইসলাম পথভ্রষ্ট হয়ে যায় উমাইয়া শাসনামলে । হিজরি ৬০ সনে হযরত আমিরে মুয়াবিয়া’র (রা.) মৃত্যুর পর তাঁরই ছেলে ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া নিজেকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসাবে ঘোষণা করে। মুয়াবিয়ার ছেলে হলেও সে প্রকৃত পক্ষে মুসলমান ছিলো না, ছিলো মোনাফেক। ইসলামের পথ থেকে এমনভাবে সরে গিয়েছিলো যে মদ পান করা এবং এক সাথে দুই বোনকে বিয়ে করা বৈধ ঘোষণা করেছিলো। শাসক হিসাবে সে ছিল স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী।

আখেরি নবীর নাতী হযরত ইমাম হুসাইন (রা:) ইয়াজিদের আনুগত্য অস্বীকার করে মদীনা ছেড়ে মক্কায় চলে আসেন। মক্কা থেকে তিনি কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সঙ্গীদের নিয়ে মহররমের ১০ তারিখে কারবালার প্রান্তরে উপস্থিত হন। কয়েক ঘণ্টা পর ইয়াজিদের বাহিনী শিমার ইবনে জিলজুশান মুরাদির নেতৃত্বে কারবালায় আসার পর উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। আর এ অসম যুদ্ধে হযরত ইমাম হুসাইন (রা:) তাঁর ৭২ জন সঙ্গীসহ শাহাদত্ বরণ করেন। শিমার ইবনে জিলজুশান মুরাদি নিজে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) এর কণ্ঠদেশে ছুরি চালিয়ে তাঁকে হত্যা করে।

পবিত্র কোরআনের সূরা তাওবা’র ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, নিশ্চয় মাসসমূহের গণনা আল্লাহর কাছে বারো মাস আল্লাহর কিতাবে, (সেদিন থেকে) যেদিন তিনি আকাশ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্য থেকে চারটি সম্মানিত, এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন। সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে নিজেদের উপর কোন জুলুম করো না। হিজরি বছরের বারো মাসের মধ্যে চারটি অতি সম্মানিত। পর পর তিনটি হচ্ছে জিলকদ, জিলহজ্ব্ব ও মহররম। আর চতুর্থটি হলো জমাদিউস সানি ও শাবানের মধ্যবর্তী রজব (বোখারি:২৯৫৮)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মহররম মাসের রোজা।

হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে আশুরার দিন চোখে সুরমা, হাতে মেহেদি লাগানো, মুসাফাহা করা, খিচুড়ি রান্না করা, আনন্দ উত্সবসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন সম্পর্কে শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া’কে (রহ.) প্রশ্ন করা হয়, এর কোনো ভিত্তি আছে কি না? জবাবে তিনি বলেন, এসব অনুষ্ঠান উদযাপন প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহিহ কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি। এমনকি সাহাবাদের নিকট থেকেও না। চার ইমামসহ নির্ভরযোগ্য কোনো আলেমও এসব কাজকে সমর্থন করেননি। কোনো মুহাদ্দিস এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ও সাহাবাদের থেকে কোনো সহিহ কিংবা জয়িফ হাদিসও বর্ণনা করেননি।

এরপরও ইসলামের ইতিহাসে অনেক কারণে ১০ মহররম গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনে হযরত আদম (আ.) কে আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টি করেছিলেন। আল্লাহ তা’আলা পৃথিবীতে পাঠানো তাঁর নবীদের স্ব স্ব শত্রুর হাত থেকে আশ্রয় প্রদান করেছিলেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর শত্রু ফেরাউনকে নীল নদে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। হযরত নূহ (আ:) এর কিস্তি  ঝড়ের কবল হতে রক্ষা পেয়েছিলো এবং তিনি জুডি পর্বতশৃংগে নোঙ্গর ফেলেছিলেন। হযরত দাউদ (আ.) এর তাওবা কবুল হয়েছিলো। নমরূদের অগ্নিকুন্ড থেকে হযরত ইব্রাহিম (আ:) উদ্ধার পেয়েছিলেন। হযরত আইয়ুব (আ.) দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত ও সুস্থতা লাভ করেছিলেন। আল্লাহ তা’আলা আশুরার দিনে হযরত ঈসা (আ.) কে ঊর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। হযরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।

রাষ্ট্রপতির বাণী : রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান পবিত্র আশুরা উপলক্ষে এক বাণীতে কারবালা প্রান্তরে শাহাদত বরণকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শান্তি ও সমপ্রীতির ধর্ম ইসলাম সব সময় সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব প্রদান করে। সত্য ও ন্যায়ের সুমহান আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য হযরত ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচরবৃন্দ এ দিনে কারবালায় শহীদ হন। তাঁর এই আত্মত্যাগ মানব ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছে। পবিত্র আশুরার শাশ্বত বাণী আমাদেরকে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে এবং অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে উদ্বুদ্ধ করবে বলে আমার বিশ্বাস।

প্রধানমন্ত্রীর বাণী : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বাণীতে বলেছেন, পবিত্র আশুরা মানব ইতিহাসে একটি তাত্পর্যপূর্ণ দিন। বিভিন্ন কারণে এ দিনটি বিশ্বের মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর পরিবারবর্গ কারবালা প্রান্তরে শাহাদাতবরণ করেন। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তাঁদের এ আত্মত্যাগ মুসলিম উম্মার জন্য এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তিনি বলেন, সকল অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে আমাদের জাতীয় জীবনে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আশুরার মহান শিক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে আমি সকলের প্রতি আহ্বান জানাই।

খালেদা জিয়ার বাণী: বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন,অন্যায় অবিচার, অন্যায্য, অবৈধ অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়া প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। ইসলাম আমাদেরকে সে শিক্ষাই দেয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামও অন্যায়কে প্রতিহত করতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন। তাঁর উম্মত হিসেবে আমাদের কর্তব্য যে কোন গণবিরোধী ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর কৃত অনাচার আর অবৈধ ক্ষমতার দাপটে মানুষকে দমিয়ে রাখার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

পবিত্র আশুরা উপলক্ষে গতকাল এক বাণীতে বেগম জিয়া বলেন, ১০ মহররম সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর জন্য খুবই তাত্পর্যময় দিন। অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে মহানবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) কে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল। কারবালা প্রান্তরের সেই লোমহর্ষক ও হূদয় বিদারক ঘটনা আজও মানুষকে কাঁদায় এবং বেদনার্ত করে। সমাজ ও রাষ্ট্রে সত্য এবং ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর আত্মত্যাগ বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলমানদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।আমি শহীদ হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ), তাঁর পরিবারের সদস্যদের এবং কারবালার সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই, তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি।

কর্মসূচি : ছুন্নী আন্দোলন বেলা সাড়ে ১১টায় জিপিও মোড় থেকে শোভাযাত্রা বের করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ করবে। সায়েদাবাদ আরজুশাহ্ দরবার শরীফ বড় জামে মসজিদে বাদ আসর মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। তাজিয়া মিছিল- পুরনো ঢাকার হোসেনী দালান ও মোহাম্মদপুর এলাকার শিয়া মসজিদ থেকে তাজিয়া মিছিল বের হবে। এছাড়া এসব মিছিল থেকে কারবালার প্রান্তরে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদতের উল্লেখ করে ‘হায় হুসাইন হায় হুসাইন’ বলার পাশাপাশি ঘটনার ওপর শোকগাঁথা পাঠ করা হবে। সুপ্রিম কোর্ট মসজিদ ও মাযার শরীফ- বাদ মাগরিব বিশেষ ওয়াজ, মিলাদ, জিকির ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। দেওয়ানবাগ শরীফ- আরামবাগে বাবে রহমত দেওয়ানবাগ শরীফে বাদ জোহর পবিত্র কোরআন তেলওয়াত ও মিলাদ মাহফিল। ফরিদপুরের বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে গতকাল শনিবার মাগরিবের নামাজের পর থেকে আশুরার দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা শুরু হয়েছে। দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ওয়াক্তিয়া নামাজের সাথে নফল ইবাদত বন্দেগী, তেলাওয়াতে কালামে পাক, মোরাকাবা মোশাহেদা, জিকির আসকার, মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাত এবং কারবালার বেদনা বিধুর মহাঅধ্যায় আলোকপাত করে ওয়াজ নসিহত।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT