প্রবাল দ্বীপে একদিন

প্রকাশ: ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১১:১৭ : অপরাহ্ণ

হেলাল উদ্দিন সাগর = গোধূলি লগনে। আমি ক্লান্ত শরীরে বসিয়া আছি। অকাস্মাৎ আমার মোবাইলে রিং বাজিতেছে। আমি চমকিয়া মোবাইল হাতে নিয়া দেখিতেছি আকতার স্যারের কল। আমাকে বলিতেছে “বাংলাদেশ অনলাইন এসোসিয়েশন (বনপা) হইতে আমরা ভ্রমণে যাইতেছি ‘প্রবাল দ্বীপে একদিন’ তোমাকে যায়তে হইবে “। আমি সায় দিলাম।

সন্ধ্যা অতীত হইয়া রাত সমাপ্ত প্রায়ই। আমার চক্ষে কিছুতেই ঘুম আসিতে চাহেনা। কৌতূহল হইয়া ঘড়ির কাঁটা গুনেতেছি – কবে সূর্য উদয় হইবে? নিস্তব্ধ পৃথিবী। একা বারান্দায় বসিয়া আছি। পূর্ব দিগন্তে সুবহে -সাদিককে পিছনে ঠেলিয়া যবে সূর্য উদয় হইল তখন আমার সমস্ত শরীরে শিহরণ জাগিল। কারণ সবাই একসাথে প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন যাইব বলিয়া…..

প্রভাত বেলা। কিছু না খাইয়া সাজগোজ করিয়া বাহির হইলাম। মনে অধিক উৎসাহ নিয়া দ্রুপদে হাঁটিতে লাগিলাম। আমি যখন গাড়ি ষ্টেশনে পৌঁছাইয়াছি, পূর্ব দিগন্তের সূর্যের কিরণ পশ্চিমের উঁচু উঁচু দালানগুলোর আয়নাতে পড়িয়া আয়নাগুলো ঝিকিমিকি করিতেছে। হঠাৎ আমার হৃদয় উঁচু দালানগুলোর আয়নার কিনারে গিয়া ভ্রমণ করিয়া আসিল!

সবাই উপস্থিত। গাড়ি ছাড়িবার সময় হইয়াছে। আমি গাড়ির মধ্যখানে বসিয়াছি। গাড়ি আমাদের লইয়া বাংলাদেশের প্রকৃতির কন্যা কক্সবাজার ত্যাগ করিতেছে। টেকনাফের অভিমুখে যখন গাড়ি যায়তে লাগিল তখন রাস্তার দু’পাশে সারিবিদ্ধ বৃক্ষরাজি পিছনে ছুটিতে লাগিল। সবাই ঠাঁ ঠাঁ করিয়া হাসিতেছে। অতঃপর উচ্চস্বরে সবাই গান গাহিতেছে………………..

চল যাই, আমরা সবাই, ঐ দূর সীমানায়
যেখানে আছে মায়া (প্রকৃতির) আর রঙবেরঙ্গের পাখি
মায়ার বন্ধন এই অন্তরে কিভাবে রাখি?
তাই তাই আমরা সবাই
সাগর পাড়ে জড়ো হব
সাগর জলে স্নান করব
সাগর বালি গায়ে মেশাবো
স্বপ্ন ছোঁয়া গান গাহিব
আনন্দে ভেসে যাব
ভালোবাসার জিঞ্জিরায়।
আমাদের উচ্চ ধ্বনি আকাশ হইতে প্রতিধ্বনি হইয়া আসিতেছে! আমি স্তব্ধ। ও ভাই, আমি স্তব্ধ! ভালোবাসার এলাকা নিয়া ভালোবাসার গান গাহিলে!

টেকনাফে আগমন হইল। গাড়ি হইতে নামিয়া আমরা সারিবদ্ধ হইয়া জাহাজে উঠিতে লাগিলাম। জাহাজ ছাড়িবার সময় হইয়াছে। সবাই নিজ আসনে বসিয়াছি। জানালার ফাক দিয়া বাহিরে দেখিতেছি – বর্তমান দৃশ্য অতীত হইয়া যাইতেছে। আমি চিৎকার করিয়া বলিতেছি, জাহাজ চলিতেছে। সবাই অবাক হইয়া আমার দিকে তাকায়াছে। তাহারা আমায় বোকা ভাবিতেছে! এখন জাহাজ নাফ নদী পার হইয়া সাগরে প্রবেশ করিয়াছে। একটার পর একটা ঢেউ আমাদের কাছে আসিতেছে। তাহারা বলিতেছে, “তোমরা আমাদের মেহমান। আমার নিকটে আইস”। দূরে গিয়া আবার বলিতেছে, “তোমাদের সহিত উত্তরের সমুদ্র সৈকতে দেখা হইবে “। এই কথা বলিবার মাত্র আবার নিকটে আসিতেছে। আমি জানালার ফাক দিয়া ঢেউ-সমূহের নৃত্য দেখিতেছি। তাহারা আতশবাজির ন্যায় আওয়াজ করিয়া আমাদের জাহাজের সহিত মিশিতেছে। মানুষ স্বভাবত আবেগময়ী। আনন্দে আমার চক্ষু ভিজিয়া গাল বেয়ে অশ্রু পড়িতে লাগিল।

সেন্টমার্টিনে আগমন হইল। জাহাজ হইতে নামিয়া দু’হাত প্রসারিত করিয়া আকাশপানে তাকাইয়াছি। আপনমনে বলিতেছি -দরিয়া সুন্দর, আকাশ সুন্দর, সুন্দর এই ভুবন। জানিনা সৃষ্টির স্রষ্টা কতইনা সুন্দর! চক্ষু উপর দিকে দৃষ্টি রাখিয়া বলিতেছি,
তুমি মোদের যা করিলে দান
রক্ষা করিবে যদি হয় বান।

আবাসিক হোটেল অভিমুখে গমন করিতেছি। খানিকক্ষণ হাঁটিয়া হোটেলে আসিয়া পৌছেয়াছি। অতঃপর দুপুর খাবার সম্পন্ন। বিশ্রাম কে নিবে? এই দুঃসাহস কাহার? আমরা সবাই ছুটাছুটি করিয়া সমুদ্রপাড়ে যাইতেছি। কে রুখিবে আমাদের? কে রুখিবে তারুণ্যকে?

ফুটবল খেলা আরম্ভ হইল। খাইর ভাই বল নিয়া গোলপোষ্টের দিকে যায়তেছে। প্রত্যেকে পিছনে পিছনে ছুটিতেছে। একটু থমকিয়া সবাইকে ঝলক দেখাইয়া গোলপোস্ট লক্ষ্য করিয়া বল ছুটিয়া মারিল। লক্ষ্যভ্রষ্ট হইল। ঐদিক হইতে অপর পক্ষের গোলপোষ্টের দিকে বল মারিতেছে। কে কোন দিকের কোন হিসেব-নিকেশ নেই। সবাই বলের পিছনে ছুটিতেছে। অবশেষে সমতা নিয়া খেলা সমাপ্ত হইল।

বিকেল অতীত হইল। পশ্চিম আকাশের লাল আভা সমুদ্রের জলে পড়িয়া সমুদ্রের জল লোহিত বর্ণ ধারণ করিল। সবাই বলাবলি করিতেছে, “তোমার পাড়ে এত সুন্দর কেন? আমাদের হিংসে হইতেছে। ঐ যে দ্যাখো, সমুদ্রপাড়ে পাথরের স্তুপ -কে যেন আপন হস্তে বেঁড়িবাধ দিয়াছে। পশ্চিমা আকাশ হইতে রক্তের ঝর্ণা পড়িতেছে! বাহ, তোমাদের এই পাড়ে বসবাস! আমরা যদি তোমরাই হইতাম এই দ্বীপকে আরো বেশি ভালোবাসিতাম”। ও পাষাণের দল! ইহা কী বলিলে! আমরা পর্যটকদের আনন্দ দিবার জন্য রক্ত দিয়া এই দ্বীপকে ভালোবাসার পাত্র করিয়াছি। না-হলে পশ্চিমা-পাড়ে এত লাল হইবে কেন?

বাজার পাড়ায় গমন। ‘সেন্টমার্টিনে নানান সমস্যা ও করণীয়’ সভা হইতেছে। আমাদের মত সাংবাদিকদের পাইয়া তাহারা মহানান্দিত হইল। ছাত্রসমাজ চিৎকার করিয়া বলিতেছে, “আমরা পরাধীন কেন? আমরা স্বাধীনতা চাই। বিদ্যুৎ চাই, হাসপাতালে ডাক্তার চাই, বিজিবি কর্তৃক অন্যায় কাজ কাজ হইতে মুক্তি চাই। চেয়ারম্যান তুমি নীরব কেন? আমাদের পাশে আসোনা কেন? তোমাকে পাঁচ বৎসর অন্তর অন্তর একবার ভালো মানুষ হিসেবে দেখি কেন? আমরা তোমাকে প্রতিনিধি বানায়াছি ঘরের দরজার ফাকে লুকিয়ে টাকা গুনিবার জন্য নই। অবেলায় তুমি নীরব কেন? তোমার মূখ হইতে প্রতিবাদ শব্দটি বের হয়না কেন? দেশ স্বাধীন পঁয়তাল্লিশ বৎসর গত হল – আমরা কেন পরাধীন? আমাদের বলার অধিকার আছে। কারণ আমরা বাঙ্গালি। আমরা বাংলাদেশের মানচিত্রে বাস করি”।
অবাক হওয়ার মতো ভালো কিছু দেখিলে ধন্যবাদসূচক হা করে তাকিয়ে তাকা আর অন্যায় কিছু দেখিলে সাথে সাথে তাহার প্রতিবাদ করা, ইহা সাংবাদিকের ধর্ম।
ছাত্রদের প্রতিবাদী কথন শুনিয়া লজ্জায় পৃথিবী নীরব হইল। তাহাদের প্রতিবাদী কথন মূখ দিয়া নয় যেন বুক ছেঁড়িয়া বাহির হইতেছে! খানিকপর উত্তর পাশ হইতে দমকা হাওয়া আসিয়া সভাস্থলের প্রতিবাদীদের সান্তনা দিতেছে। বলিতেছে, “আপনাদের দুঃখ দেখিয়া আমরা লজ্জা পাইতেছি। আমরা সভ্য। আপনাদের এই সংবাদ বিশ্বের আনাচেকানাচে প্রেরণ করিব। তদুপরি অনেক সন্তুষ্ট হইয়াছি আপনাদের প্রতিবাদী মানসিকতা দেখিয়া……….
ভালো থাকিয়ো বলে দমকা হাওয়া পশ্চিমপ্রান্তে অদৃশ্য হইয়া গেল। সভা সমাপ্ত হইল।

রাতের খাবার শেষ। আবাসিকের আঙ্গিনায় শিল্পীগোষ্ঠী উপস্থিত। গানের আসর হইবে। শিল্পী গান ধরিল, সবাই তাহার সাথে সাথে গান গাহিতেছে। “বকুল ফুল বকুল ফুল
সোনা দিয়া হাত কেন বান্দাইলি “। সবাই শিল্পীদের উৎসাহ দিতেছে আরো সুন্দর গান উপহার দেওয়ার জন্য। আমার সজল নয়ন আকাশপানে তাকায়াছে। আর বলিতেছে,
আজি যারা গান গাহিতেছে তাদের বলি
স্তব্ধ পৃথিবী কি যেন বলিবার চায়
স্বার্থবাদীরা সুদূরে গিয়েছে চলি
সুখি আমি, রজনীর নিমন্ত্রে এই ধরায়।

নিশিরাত অতীত হইয়া প্রভাতবেলা। আমরা ছেঁড়া দ্বীপ যাইব বলিয়া প্রস্তুত হইয়াছি। খানিক হাঁটিয়া নৌকায় উঠেয়াছি। নৌকা চলিতে লাগিল। মুদিত নয়ন দৃষ্টিপাত করিতেই ছেঁড়াদ্বীপ আমাদের সম্মুখে উপস্থিত। এই মুহূর্তে ছেঁড়াদ্বীপে অবতরণ করিয়াছি। এ-কী, ছেঁড়াদ্বীপে বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা দেখা যাইতেছে। প্রত্যেকে পতাকার নিকটে গিয়া ছবি তুলিয়াছি। বাংলাদেশের শেষ ভূ-খন্ডে গিয়া দু’ হাত প্রসারিত করিয়া কারে যেন বলিতেছি..
কী ঘর বানায়ছে দ্যাখো সাহেব কোম্পানী
এক অঙ্গে লক্ষ মূখ শতক বাখানি
আহা! কী ঘর বানায়ছে দ্যাখো…………

ফুর্তি সমাপ্ত করিয়া পাষানের ন্যায় ছেঁড়াদ্বীপকে পিছনে রাখিয়া পুনঃ সেন্টমার্টিনে উপস্থিত।
দুপুরবেলা। দুপুর খাবার সমাপ্ত হইয়াছে। মনে খুবই পেরেশানি লাগিতেছে আজি চলিয়া যাইতে হইবে ভাবিয়া। প্রস্তুতি সম্পন্ন, আবাসিককে বিদায়। অতঃপর জাহাজঘাটে গমন। ঘাটে কয়েকটি ছবি না তুলিলে হয়না। ছবি তোলা সম্পন্ন। আমরা জাহাজে প্রবেশ করিয়াছি। আচমকা দৈত্য-শব্দ শুনিয়া চমকাইয়া উঠিলাম। বুঝিবার বাকি ছিলনা জাহাজ ছাড়িবার শেষ মুহূর্তের সংকেত যে ছিল এইটি। অতঃপর জাহাজ সেন্টমার্টিন ঘাট ছাড়িয়া সমুদ্রের দিকে অগ্রসর হইতেছে। সাথে সাথে প্রবালদ্বীপ দূরে চলিয়া যায়তেছে। উত্তরের হিমেল হাওয়া বহিয়াছে। সমুদ্র তরঙ্গ পুরো জাহাজকে দুলায়তেছে। খানিকপর আমাদের চক্ষু হইতে প্রবালদ্বীপ নামের সেই সাগর কন্যা সেন্টমার্টিন অদৃশ্য হইয়া গেল। আসিয়াছিলাম -আনন্দ করিবার জন্য। কী যেন স্বরণ করিয়া হৃদয়ে বিষাদ অনুভব করিতেছি। কী আর হইবে? প্রবালদ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ছাত্রসমাজের প্রতিবাদী আচরণ আমাদের যেভাবে মজিয়েছে তাহা ভূলিবার নহে।
বন্ধু, সময় হইলে পুণরায় দেখা হইবে। যে সুন্দর বর্তমান তাহা অতীত হইয়া আরেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আসিয়া বর্তমান হইতেছে। আমরা নীরবে উপলব্ধি করিতেছি। রবী ঠাকুরের ভাষায়………..
“মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভূবনে”।


সর্বশেষ সংবাদ