ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট যুদ্ধ

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১২ ২:০৫ : পূর্বাহ্ণ

সংবাদ সম্মেলন কক্ষে ঢুকতে ঢুকতে মহেন্দ্র সিং ধোনি তার পরিচিত এক সাংবাদিককে বললেন, তোমরা তো এখন চাপ নিয়ে প্রশ্ন করবে। বাস্তবতাও তাই। ভারত-পাকিস্তান আরেকটি ক্রিকেটযুদ্ধের আগে দুই অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলন জুড়েই বার বার চাপের প্রসঙ্গ এলো। দু’জনই নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে, তারা চাপ নিচ্ছে না। তারপরও দু’অধিনায়কের কথায় ফুটে বেরোলো এই ম্যাচের ভিন্ন তাত্পর্য। আজ প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে দুই চিরশত্রু দেশ—ভারত ও পাকিস্তান। তার আগে পড়ে নিন দুই দলের অধিনায়কের পূর্ণাঙ্গ সংবাদ সম্মেলন—
‘নিজেদের যোগ্যতায় বিশ্বাস আছে’
মহেন্দ্র সিং ধোনি
++প্রশ্ন: পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ মানে তো একটা বাড়তি চাপ। এই চাপ কিভাবে সামলাবেন?
ধোনি: দেখুন, শুধু পাকিস্তানের বিপক্ষেই চাপ থাকে, ব্যাপারটা তা নয়। আসলে টপ লেভেল যে কোনো দলের বিপক্ষেই ম্যাচের আগে সব সময় চাপ থাকে। হ্যাঁ, পাকিস্তানের বিপক্ষে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকে। খেলায়ও তার কিছুটা প্রভাব ফেলে। কিন্তু আমরা এটাকে খুব বড় করে দেখতে চাচ্ছি না। আমরা খেলা উপভোগ করতে চাই এবং ফলাফল কি হবে তা নিয়ে খুব বেশি ভাবতে চাই না।
++প্রশ্ন: আপনাদের জন্য তো ম্যাচটা একটু বেশি কঠিন হয়ে গেছে। এই ম্যাচে জিততেই হবে…
ধোনি: আমি মনে করি দলের এখান থেকে কামব্যাক করার সামর্থ্য আছে। মাঠের পারফরমেন্সে সেই সামর্থ্যটা এখন প্রতিফলিত হতে হবে। দেখা যাক কি হয়। রেজাল্ট কি হবে তা নিয়ে ভাবছি না। কারণ, এই ফরম্যাটে ভালো খেলা আর ফলাফল পক্ষে আসা, এক ব্যাপার নয়। অনেক পরিকল্পনা করেও টি-টোয়েন্টিতে অনেক সময় কোন লাভ হয় না। আমরা স্রেফ মাঠে গিয়ে নিজের খেলাটা খেলতে চাই, উপভোগ করতে চাই।

++প্রশ্ন: ফিল্ডিং নিয়ে কি একটু বাড়তি দুশ্চিন্তায় আছেন?

ধোনি: না। এখানে ফিল্ডিং সব দলেরই খারাপ হচ্ছে। ফিল্ডিং নিয়ে তাই খুব একটা চিন্তিত না। এই স্টেডিয়ামটায় বাম্পি একটা ব্যাপার আছে; বাউন্স বোঝা কঠিন। এটা হয়তো বর্ষা মৌসুমের জন্য হতে পারে।

++প্রশ্ন: পাকিস্তানের বিপক্ষে বোলিং নিয়ে পরিকল্পনাটা কী? স্পিনেই ভরসা করবেন?

ধোনি: প্রথম যে ম্যাচটা আমরা খেললাম, সেখানে উইকেট স্লো এবং লো ছিলো। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার স্পিনাররাও ভালোভাবে গ্রিপ করতে পারছিলো না। ব্যাটে বল আসছিলো না। বড় শট খেলা সহজ ছিলো না। কিন্তু উইকেট কম-বেশি সেস্নাই থাকবে। আশা করি আমাদের স্লোয়ার বোলাররা বেটার পারফর্ম করবে। আর স্পিনার, নাকি পেসার; কাদের ওপর ভরসা করবো, এটা ম্যাচের আগে উইকেট দেখে ঠিক করবো।

++প্রশ্ন: প্রথম ম্যাচের কথায় ফেরা যাক। তিনজন স্পেশালিস্ট স্পিনার, দু’জন স্পিনিং অলরাউন্ডার নিয়েও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের ওপর চাপ তৈরি করতে পারলেন না!

ধোনি: আমি মানছি যে, আমাদের বোলাররা ভালো করতে পারেনি। কিন্তু আমাদের একটা বড় সমস্যায় ফেলে দিয়েছিল বৃষ্টি। আমরা বোলিং শুরু করতেই হঠাত্ বৃষ্টি হল। এরপর স্পিনারদের জন্য বল করা খুব কঠিন ছিলো। বল গ্রিপ করা যাচ্ছিলো না। ফুলটস হয়ে যাচ্ছিলো।

++প্রশ্ন: ইরফান পাঠানকে নতুন বল দিলে কি অন্যরকম হতে পারত না?

ধোনি: আমাদের তা মনে হয়নি। জ্যাক (জহির খান) খুব ভালো করছে কিছুদিন ধরে। আর আমরা দুই প্রান্তেই পেস অ্যাটাক দিয়ে শুরু করতে চাইনি। আমরা আসলে উইকেটের জন্য বল করছিলাম। ১৪০ রান ডিফেন্ড করতে হলে এর কোনো বিকল্প ছিল না।

++প্রশ্ন: কদিন আগেও ভারত যা চেয়েছে, তাই হয়েছে। এখন যা চাচ্ছে, কিছুই হচ্ছে না। এটাই কী ক্রিকেট?

ধোনি: এভাবে ভাবতে পারলে তো সহজ হয়ে যায়। এরকম দার্শনিকভাবে ‘এটাই ক্রিকেট বললে’ সমাধান হয়ে যায়। আসলে আমি এভাবে ভাবতে চাই না। পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে ভাবতে হবে। তাতে বলতে পারি, আমরা ভালো খেলিনি, বলে যা চাই, তা হয়নি। ব্যাটিংটা ভালো হয়নি, বোলিংও ভালো হয়নি। তারপরও সব শেষ হয়ে গেছে; তা নয়। এখনও দুটো ম্যাচ বাকি আছে, আশা করি তাতে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবো।

‘আমরা এখন দারুণ আত্মবিশ্বাসী’

মোহাম্মদ হাফিজ

++প্রশ্ন: ভারতের বিপক্ষে খেলায় তো মাঠের বাইরে-ভেতরে দারুণ চাপ থাকার কথা। কিভাবে নিচ্ছেন এটাকে?

হাফিজ: আমরা কোন চাপ নিচ্ছি না। এই টুর্নামেন্টে ইতিমধ্যে আমরা নানারকম চাপের ভেতর থেকে ম্যাচ করে আনার দক্ষতা দেখিয়েছি। ফলে বাইরের কোনো বিষয় নিয়ে বাড়তি চাপ নেয়ার প্রয়োজন নেই। এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টে প্রতিটা ম্যাচ আমরা ইতিবাচক ভঙ্গিতে খেলেছি। আমি খুব খুশি কারণ, দলের খেলোয়াড়রা চাপের মধ্যে ভালো করছে। ফলে আলাদা কোনো চাপ ভারতের বিপক্ষে নেই। অধিনায়ক হিসেবে আমি বলতে পারি সবাই খেলার জন্য মুখিয়ে আছে। বিশেষ করে প্রস্তুতি ম্যাচে ওদের বিপক্ষে জয় পাওয়ায় সবাই খুব আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।

++প্রশ্ন: এই ম্যাচটাকে ‘ফাইনালের আগে ফাইনাল’ বলা হচ্ছে। আপনারাও সেভাবে দেখছেন?

হাফিজ: না। আমরা এসব কথায় বিশ্বাস করি না। বলেছি যে, ভারতের বিপক্ষে একটা চাপ থাকেই। লোকেদের চাপ থাকে। কিন্তু ইদানিং আমরা ভারতের সঙ্গে নিয়মিত খেলায় চাপ কমে এসেছে। ফলে এভাবে দেখার কিছু নেই।

++প্রশ্ন: ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ স্পিনার খেলার জন্য বিখ্যাত। আবার আপনাদের বোলিং মূলত স্পিননির্ভর। ভারতের বিপক্ষেও স্পিনের ওপর ভরসা করবেন?

হাফিজ: আমি মনে করি প্রেমাদাসার কন্ডিশন স্পিনারদের জন্য উপযোগী। কিন্তু একাদশে স্পিনার ক’জন থাকবে, স্পিনই মূল ভরসা হবে কি না; এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারবো না। উইকেট দেখার পর বলতে পারবো কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। আমরা জানি ভারতে ব্যাটিং লাইনআপ খুব ভালো। তাদের জন্য যেমন দরকার, সেভাবেই প্রস্তুতি নেব আমরা। এমনও হতে পারে এই ম্যাচে আমরা তিনজন সিমার এবং তিনজন স্পিনার নিয়ে খেলতে পারি।

++প্রশ্ন: শুরু থেকেই ফিল্ডিং আপনাদের জন্য একটা চিন্তার বিষয় হয়ে আছে। ফিল্ডিং নিয়ে বিশেষ কিছু ভাবছেন?

হাফিজ: হ্যাঁ, ফিল্ডিং নিয়ে একটু চিন্তা আছে। এই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও কিছু ক্যাচ ফেলেছি আমরা। তবে ক্যাচ ফেলাটাকে শেষ পর্যন্ত আমি খেলারই অংশ মনে করি। এখানে যে গরম এবং ভিন্ন কন্ডিশনে খেলা; তাতে যে ফিল্ডিং হচ্ছে, তাতে আমি খুশি। সবচেয়ে বড় কথা, সবাই চেষ্টা করছে, আরও ভালো ফিল্ডিং করার জন্য। প্র্যাকটিস সেশনে অতিরিক্ত পরিশ্রম করছি।

++প্রশ্ন: প্রথম ম্যাচ আপনারা জিতেছেন। ভারত তার প্রথম ম্যাচে হেরে গেছে। এটা কী আপনাদের একটু এগিয়ে রাখবে?

হাফিজ: এগিয়ে রাখবে, বলা ঠিক না। তবে সুপার এইটে প্রথম ম্যাচ জেতার পর আমাদের একটু বাড়তি আত্মবিশ্বাস থাকবে। এমনকি ওয়ার্মআপ ম্যাচে ভারতকে আমরা হারিয়েছি, এটাও আমাদের উজ্জীবিত করবে। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে ছেলেদের সবাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলবে। পুরো টুর্নামেন্টে আমরা ভালো ক্রিকেট খেলছি। আমি মনে করি এই ম্যাচেও সবাই অনেক ইতিবাচক থাকবে।

++প্রশ্ন: শোয়েব মালিককে বল করতে না দিয়ে তার ব্যবহার ঠিকমতো করা হচ্ছে না। আবার শহীদ আফ্রিদি ম্যাচের পর ম্যাচ ব্যর্থ হয়েও সুযোগ পাচ্ছেন। এটা কেন?

হাফিজ: দেখুন, আমাদের দলের জন্য শোয়েব মালিক এবং শহীদ আফ্রিদি দু’জনই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়; তারা ম্যাচ উইনার। তারা অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। এক ম্যাচে কারো ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায় না। শহীদ আফ্রিদি সব সময়ই পাকিস্তানের জন্য ভালো পারফর্ম করেন। শোয়েব মালিক ভালো বল করতে পারে। কিন্তু কন্ডিশন অনুযায়ী যার দরকার হবে, তাকে বল করানো হয়। তার মানে এমন নয় তাকে অবহেলা করা হয়েছে। আপনাকে একটা ব্যাপার বুঝতে হবে, আফ্রিদি ও মালিক মাঠে কী পারফরম্যান্স করলেন; সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। ওনারা মাঠে আছেন, এটাই আমাদের জন্য অনেক বড় ব্যাপার। তাদের উপস্থিতি দলকে উজ্জীবিত করে।


সর্বশেষ সংবাদ