হ্নীলায় একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে ধবংস করতে কুচক্রীমহলের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ ৭:৫৫ : অপরাহ্ণ

News Pic-17-02-14কামরুন্নাহার::::বার্মায় চলে যাওয়ার বেশ ক‘দিন পর পাক সেনারা একটি তালিকা এনে এলাকার লোকজনের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ-গ্রহণকারীদের বাড়ি-ঠিকানা জানতে চায়। পরদিন বিকালে পাক সেনারা প্রথমে লেদার হাজী বদিউজ্জামানের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে জ্বালিয়ে দেয়। পাক সেনাদের উপস্থিতিতে তাদের সহযোগী দালালেরা বদিউজ্জামান হাজীর বাড়ির মালামাল লুটপাট করে। এরপর পর্যায়ক্রমে বৃহৎ হ্নীলার হাজী ছিদ্দিক আহমদ,শামসুদ্দিন, আমীর আলী মাষ্টার, অছিয়র রহমান, আমির হোছন, কালা মিয়া, মাঈনুদ্দিন, লাতু মিয়া ও নুর আহমদ সিকদারের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং ভাংচুর চালায়। এ সময় হাজী বদিউজ্জামান নিয়মিত ছেলেরা বেঁচে আছে নাকি পাক সেনাদের হাতে ধরা পড়েছে সেই খোঁজ-খবর রাখত। এভাবে চলার বেশ কিছুদিন পর দেশ স্বাধীন হওয়ার খবর পেয়ে হাজী বদিউজ্জামান স্বপরিবারে দেশে ফিরে আসে। তখন তিনি বসত-ভিটায় সূর্যের আলো ছাড়া আর  কিছু দেখতে পাইনি। গরু-মহিষ যা ছিল সব লুট হয়ে যায়। আপাতত থাকার একটি কূঁড়ে ঘর তৈরী করে বসবাস শুরু করে। ১৫/২০ দিন পর ছেলে নুরুল ইসলাম মেম্বার এলাকায় ফিরে এসে বসত-বাড়ির অবস্থা দেখে হতবাঁক হয়ে যান। পরিজনের সঙ্গে দেখা করতে গেলে পিতা ছেলেকে জীবিত দেখে আনন্দে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে পরিজনের সঙ্গে স্বাক্ষাৎ হলে কান্নার রোলে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এরপর পিতা ছেলেকে সান্তনা দিয়ে বলে আমার স্বর্ণ-রূপা যা ছিল তা মাটিতে রেখে তোমার কথামত বার্মায় চলে গিয়েছিলাম। তুমি না আসা পর্যন্ত এদিকে নজর দেয়নি। তোমাকে পেয়ে এসব অলংকার নিয়ে আবারো নতুন করে জীবন সাজাবো। আলোচনা স্বাপেক্ষে পিতা-পুত্র মাটিতে লুকিয়ে রাখা স্বর্ণ-রূপা উত্তোলন করে বিক্রি করার পর বসত-বাড়ি তৈরী করে। এরপর গরু-মহিষ ক্রয় করে আবার হাল-চাষ এবং চিংড়ী প্রজেক্ট শুরু করে। এক পর্যায়ে পূর্বের ন্যায় মিয়ানমারের লোকজনের সঙ্গে বাণিজ্য শুরু করে। এভাবে চলতে চলতে তাদের সংসারে আগের মতই স্বচ্ছল পরিবেশ ফিরে আসে। হাজী পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরে আসতে দেখে পাক সেনাদের সহযোগী দালালেরা আবারো সংগঠিত হয়ে একের পর এক নানা অপকর্ম শুরু করে। এক পর্যায়ে এই চক্রের হাত থেকে স্থানীয় বিডিআর ক্যাম্প পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। বিডিআরের অস্ত্র লুটপাট করার ঘটনা সেনাবাহিনী এসে হ্নীলা-হোয়াইক্যংকে কর্ডন করে রেখে তল্লাশী চালায়। আব্দুস সোবহান মেম্বারকে আটক করে লেদা ক্যাম্পে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চালায়। এক পর্যায়ে বাহারছড়া হতে আব্দুস সোবহান মেম্বারের ২য় ছেলে মোঃ ছিদ্দিককে অস্ত্রসহ আটক করে। পরে তাকে টেকনাফ থানায় নেওয়ার পথে সেনাবাহিনী টেকনাফ হেচ্ছারখালে ক্রস ফায়ার দেয়। যা এখনো এলাকার প্রবীণ লোকদের মুখে শুনা যায়।  #######

লেখক ঃ

কামরুন্নাহার

মুক্তিযোদ্ধা মরহুম নুরুল ইসলাম মেম্বারের ভাগিনী।

#####################################################

( পর্ব-৩ )

এ ঘটনার বেশ কিছুদিন পর হাজী বদিউজ্জামান তার ৬ পুত্রকে ডেকে বলেন বাবারা দেখ এখন আমার অনেক বয়স হয়েছে। আমি আর ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাষাবাদ করতে পারবনা। এখন থেকে তোমাদের দায়িত্ব তোমরা নিজেদেরকে নিতে হবে। তখন ছেলেরা বাবার কথার প্রতি সম্মান দেখিয়ে বলেন আমরা আপনার ইচ্ছেমত যা বলেন তাই করব। তখন হাজী বদিউজ্জামান আলহামদুলিল্লাহ বলে জানান তোমাদের সম্মতিতে আমি খুব খুশি হয়েছি। এরপর একেক ছেলেকে একেক দায়িত্ব প্রদান করেন। নুরুল ইসলাম মেম্বার ও হাজী আবুল কাশেমকে যাবতীয়  ব্যবসা-বাণিজ্যের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অবশিষ্ট ৪ ছেলেকে মৎস্য ঘের ও হাল-চাষের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ছেলেদের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করার পর ৬ ছেলেকে একদিন রেজিষ্ট্রি অফিসে নিয়ে গিয়ে প্রত্যেক জনকে প্রায় ৫ একর বা ১২ কানি করে সম্পত্তি নামীয়মূলে প্রদান করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার পর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলের কারনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ঘোষণা হলেই আবারো নুরুল ইসলাম মেম্বার পদপ্রার্থী হয়। প্রতিদ্বন্দি হিসেবে আব্দুস সোবহান মেম্বারের ১ম পুত্র আবু বক্কর ছিদ্দিক প্রতিদ্বন্দিতা করেন। তখন এলাকায় জমজমাট নির্বাচনী প্রচারনা শুরু হয়। নুরুল ইসলাম মেম্বারের পক্ষে জন সমর্থন বেশী থাকায় প্রতিদ্বন্দি প্রার্থী জয়ী হওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করে। এমনকি আবু বক্কর ছিদ্দিককে ভোট না দিলে এলাকা ছাড়া করার হুমকি-ধমকি দেওয়া শুরু হয়। ভোটের দিন বিপূল সংখ্যক লোক কেন্দ্রে ভোট দিতে এলেও মেম্বার প্রার্থী আবু বক্কর ছিদ্দিক গং প্রতিপক্ষ ভোটারদের ভোট দেওয়া হয়েছে বলে তাড়িয়ে দেন। বিকালে ভোট গণনা হলে সেই আবু বক্কর মেম্বার জয় লাভ করে। পরদিন এলাকার লোকজন পরাজিত নুরুল ইসলামের বাড়িতে সমবেদনা জানাতে আসে। হাজী বদিউজ্জামান আগত জনসাধারণকে সান্তনা দিয়ে বলেন আমি জানি তোমরা আমার ছেলেকে ভোট দিয়েছ কিন্তু পেশী শক্তির কারণে আমরা কেন্দ্রে যেতে না পারায় পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। তোমরা নিরাশ হইওনা। বাঘের বল বার বছর। আল্লাহ একদিন এই পেশী শক্তি ধবংস করে দেবে। ইনশল্লাহ সাধারণ মানুষের জয় একদিন হবে। আবু বক্কর ছিদ্দিক মেম্বার নির্বাচিত হওয়ার বেশ কিছুদিন পর একটি বাহিনী তৈরী করে। পরে এই বাহিনীর সদস্যরা সরকার গঠিত গ্রামবাহিনীতে ঢুকে পড়ে। যার নেতৃত্ব ভার দেয় বক্কর মেম্বারের ভাতিজা আবুল হোছনের উপর। এই বাহিনীর চাঁদাবাজি, উৎপাত ও নির্যাতনে জনসাধারণ ফুঁিসয়ে উঠে। এতে করে হাজী পরিবারের সঙ্গে সোবহান মেম্বার পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক আরো খারাপ হয়। নারী লোভী বক্কর মেম্বার একে একে ৯টি বিবাহ করে। এতে ১ম স্ত্রী গুল চাম্পা ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে। এভাবে মান-অভিমানে তার সংসার চলাকালীন দেশে আবারো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে জাতীয় পার্টি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে এবং আব্দুল গফুর চৌধুরী মুসলিম লীগ ছেড়ে জাতীয় পার্টির মানোনয়ন নিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়। আবু বক্কর মেম্বার গং এই গফুর চৌধুরীর সঙ্গে দল পাল্টায়। এরপর প্রত্যেক স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দি না থাকায় আবু বক্কর একাধারে মেম্বার নির্বাচিত হয়। এরই মাঝে দমদমিয়াস্থ জইল্যাদিয়ার আবির্ভাব হলে লীজ নেওয়ার জন্য টেকনাফের বদিউর রহমান, আবু বক্কর মেম্বারসহ হ্নীলা-টেকনাফের অসংখ্য-লোক তদবির চালায়। লটারীর মধ্যে বদিউর রহমান গংসহ অন্যরা দ্বীপটি চাষাবাদের জন্য পায়। বক্কর মেম্বার গং দ্বীপের বরাদ্ধ না পাওয়ায় ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে। শুরু হয় চাল চালা-চালী এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার নানা অপচেষ্টা।  (চলবে)

#########################

লেখক ঃ

কামরুন্নাহার

মুক্তিযোদ্ধা মরহুম নুরুল ইসলাম মেম্বারের ভাগিনী।

#####################################################


সর্বশেষ সংবাদ