দেশজুড়ে ‘লকডাউন’: ঘর থেকে বের না হওয়ার আহ্বান

প্রকাশ: ২৫ মার্চ, ২০২০ ২:২০ : পূর্বাহ্ণ

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বাড়তে থাকায় মানুষের যাতায়াত সীমিত করতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দেশব্যাপী গতকাল মঙ্গলবার থেকে ট্রেন, লঞ্চ, বিমান চলাচল বন্ধের পাশাপাশি আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে বন্ধ হচ্ছে গণপরিবহন, অফিস-আদালত ও শেয়ারবাজার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি বাড়ানো হয়েছে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। আজ বুধবার বন্ধ হচ্ছে মার্কেট। এর মধ্য দিয়ে কার্যত লকডাউনের দিকেই যাচ্ছে দেশ। এ সময়ে শুধু ওষুধ, কাঁচামাল ও মুদি দোকান খোলা এবং পণ্য পরিবহন ও হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি সেবা চালু থাকবে। জনগণকে অতীব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। দিনে আনা দিনে খাওয়া মানুষের জন্য বিশেষ সহায়তার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে সবচেয়ে জরুরি ও একমাত্র কার্যকর উপায় হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব তথা ভিড় এড়িয়ে চলা। হাঁচি, কাশি ও স্পর্শের মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়ায় বলে বিশ্বব্যাপী মানুষজনকে ঘরেই থাকতে বলা হচ্ছে। অথচ দেশে ঘটছে উল্টো ঘটনা। দেশে সংক্রমণ শুরু হলে গত ১৬ মার্চ প্রথমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর পর থেকেই গ্রামমুখী মানুষের ভিড় দেখা যায়। অনেকে পর্যটনকেন্দ্রও ঘুরতে চলে যান। এর পর গত সোমবার সরকারি-বেসরকারি অফিস ১০ দিনের জন্য ছুটি ঘোষণা করা হলে স্টেশন, টার্মিনালে উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। লঞ্চগুলোয় গাদাগাদি করে শহর ছেড়ে গ্রামে রওনা দেন মানুষ। গতকাল চলাচল সীমিত করার সিদ্ধান্ত আসে। গতকাল বিকালে সংবাদ সম্মেলনে এসে আবারও জনগণকে ঘরে থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস। তিনি বলেন, এই ছুটি উৎসব করার জন্য নয়, করোনা প্রতিরোধের জন্য। তিনি সবাইকে সরকারের নিদের্শনা মেনে ঘরে অবস্থানের আহ্বান জানান। সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপও তুলে ধরেন তিনি।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সকালে ভিডিওবার্তায় জানান, ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল সারাদেশে সব গণপরিবহন ‘লকডাউন করার’ সিদ্ধান্ত হয়েছে। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, ওষুধ, জরুরি সেবা, জ্বালানি, পচনশীল পণ্য পরিবহনÑ এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। পণ্যবাহী বাহনে যাত্রী নেওয়া যাবে না

দুপুরে রেলভবনে সংবাদ সম্মেলন করে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ থাকবে। চলবে শুধু মালবাহী ও ওয়াগনবাহী ট্রেন। রেলমন্ত্রীর এ বক্তব্যের আগে সকালেই লোকাল ও মেইল ট্রেন বন্ধ করা হয়েছিল।
নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, যাত্রীবাহী সব নৌযান পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। গতকাল সকাল থেকেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্স, পণ্যবাহী যান ও সরকারি প্রয়োজনে যানবাহন পারাপারের স্বার্থে ফেরি চলবে।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মহিবুল হক জানান, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রুটে উড়োজাহাজ চলা বন্ধ থাকবে। তবে আন্তর্জাতিক চারটি রুটে ফ্লাইট বন্ধের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) মহাসচিব মফিজুর রহমান বলেন, বুধবার (আজ) থেকে যাদের অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইট ছিল, সেসব যাত্রীর টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে।

অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের কারণে গতকাল সকালে একটি লঞ্চ দুর্ঘটনায় কবলিত হয় মেঘনার মুন্সীগঞ্জ এলাকায়। একই দিনে রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে দেখা যায় প্ল্যাটফরমে মানুষ আর মানুষ। কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হামিদুল ইসলাম খান বলেন, সামাজিক দূরত্ব মানুষ মানছে না। গিজগিজ করছে, গা ঘেঁষে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। মানুষ যদি সচেতন না হয়, আমরা আর কী করতে পারি। সরকার বলেছে, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের না হতে। অথচ মানুষ ছুটি পেয়েই বাড়ির দিকে ছুটছে। এতে করোনা ভাইরাস তো সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কর্মস্থলে থাকতে হবে সরকারি কর্মজীবীদের গতকাল মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে পাঁচ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়। এতে বলা হয়, ১০ দিনের ছুটিতে কর্মস্থলে থাকতে হবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে ওষুধ, খাদ্য প্রস্তুত, ক্রয়-বিক্রয়সহ অন্যান্য শিল্পকারখানা, প্রতিষ্ঠান, বাজার, দোকান নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলবে। গণপরিবহন ব্যতীত অন্যান্য জরুরি পরিবহনÑ অ্যাম্বুলেন্স, ট্রাক, কার্গো ও সংবাদপত্রবাহী গাড়ি যথারীতি চলবে। নিদের্শনায় সংক্রমণ এড়াতে সবাইকে ঘরে থাকার আহ্বান জানানো হয়।

আদালতে ২ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি

সুপ্রিমকোর্টসহ দেশের সব আদালতে ২৯ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল আলী আকবর স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এ কথা জানানো হয়।

সুপ্রিমকোর্টের মুখপাত্র ও হাইকোর্ট বিভাগের বিশেষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বলেন, প্রধান বিচারপতির নির্দেশে এই ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় প্রধান বিচারপতির অভিভাষণ অনুষ্ঠানও স্থগিত করা হয়েছে।

শেয়ারবাজার বন্ধ ১০ দিন

২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ দিন শেয়ারবাজার বন্ধ থাকবে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তরফ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কোচিং বন্ধের মেয়াদ ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রাক-প্রাথমিক থেকে সব রকমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কোচিং ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির সভাপতিত্বে মিটিংয়ে এ সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে ১৬ মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়


সর্বশেষ সংবাদ