সৌদিতে সব রোহিঙ্গাই ‘বাংলাদেশি: বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা সৌদি আরবে

প্রকাশ: ১ মার্চ, ২০২০ ১১:০৩ : অপরাহ্ণ

রাজীব আহাম্মদ, সৌদি আরব থেকে ফিরে::
কুক্কুরু কু’ করে ডাকা মোরগ থেকে শুরু করে কাচকি মাছ, শুঁটকি, কচুরলতি, ধনেপাতা থেকে ধানিমরিচ- বাঙালি রসনার হেন বস্তু নেই যা নাক্কাছা বাজারে পাওয়া যায় না। প্রথম দর্শনে মনে হবে চট্টগ্রামের কোনো কাঁচাবাজার। তবে আসলে এ বাজারটির অবস্থান সৌদি আরবের মক্কায়। এখানকার দোকানিদের কথায় চাটগাঁইয়া ভাষার টান থাকলেও আদতে তা রোহিঙ্গা ভাষা। নাক্কাছা বাজারের প্রায় সব দোকানি ও আশপাশের বাসিন্দারা জাতিতে রোহিঙ্গা হলেও কাগজে-কলমে তারা বাংলাদেশি। সবার হাতেই বাংলাদেশি পাসপোর্ট।

সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরিহিত বৃদ্ধ ফয়েজ আলী ধনেপাতার আঁটি বাঁধছিলেন। দামদর করে তার দেশের বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করলে অকপটেই জানালেন, তিনি একজন ‘বরমাইয়া’। তার বাড়ি ছিল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুতে। ২০১১ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন শুরুর পর পালিয়ে বাংলাদেশ আসেন। তারপর ২০১৪ সালে আসেন সৌদি আরবে।

রোহিঙ্গা হয়েও বাংলাদেশ থেকে এলেন কী করে! এ বিস্ময়ের জবাব ফয়েজ আলী নিজেই দিলেন। জানালেন, ৬৫ হাজার টাকা খরচ করে দালাল ধরে বাংলাদেশি পাসপোর্ট করেছেন। তারপর চার লাখ টাকা খরচ করে সৌদি চলে এসেছেন। তার যেসব আত্মীয় আগে থেকে সৌদি আরবে ছিলেন, তাদের সহায়তায় এসেছেন।

শুধু একজন ফয়েজ নয়, নাক্কাছা বাজারে কয়েকশ’ দোকানি, আর অন্তত কয়েক লাখ রোহিঙ্গা সৌদি আরবে রয়েছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে। অবৈধভাবে এসব পাসপোর্ট করেছে তারা।

সৌদিতে নিযুক্ত বাংলাদেশি কূটনীতিকদের সূত্রে জানা গেল, নব্বইয়ের দশকে তিন লাখ রোহিঙ্গা সৌদি আরব এসেছে শরণার্থী হিসেবে। তারা শরণার্থীর মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। এরপর দেশটিতে যত রোহিঙ্গা এসেছে, তারা বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী। তাদের পরবর্তী প্রজন্মও পাসপোর্ট পাচ্ছে।

সৌদি সরকার বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী ৪২ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে তাগিদ দিচ্ছে। তারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে দেশটিতে এসেছিল। এরপর ওয়ার্ক পারমিটের (আকামা) মেয়াদ শেষে অবৈধ হয়ে পড়েছে। গত মাসে দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে বিষয়টি ওঠে বলে জানিয়েছেন সৌদিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ।

অবৈধ হয়েপড়া এই ৪২ হাজার ছাড়াও সৌদি সরকারের হিসাবের বাইরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী বলে জানালেন বঙ্গবন্ধু পরিষদের মদিনা শাখার সভাপতি মুছা আ. জলিল ছৈয়াল। তিনি দাবি করেন, সংখ্যাটি পাঁচ লাখের কাছাকাছি হতে পারে। অধিকাংশই বাংলাদেশ থেকে পাসপোর্ট নিয়ে এসেছে। তাদের পরবর্তী প্রজন্ম সৌদিতে বসে পাসপোর্ট পাচ্ছে। দূতাবাস যাচাই-বাছাই করলে সৌদি আরবে থাকা দালালরা পাসপোর্ট করে দিচ্ছে ছয় থেকে ১০ হাজার রিয়ালে।

জেদ্দা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি শেখ আনোয়ার জানালেন, সৌদি যারা নিজেদের আওয়ামী লীগ নেতা বলে পরিচয় দেন, তারা এখন এই দালালি করছেন। আগে বিএনপি নেতা পরিচয় দেওয়া দালালরা একই কাজ করতেন। বর্তমান দালাল চক্রের হোতা হিসেবে কাজ করা কয়েকজনের নামও জানালেন। কিন্তু নিরপেক্ষভাবে এই অভিযোগ যাচাই করা যায়নি।

জেদ্দা ও মদিনা আওয়ামী লীগের কথিত প্রস্তাবিত কমিটির নেতাদের নাম শোনা যায় রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট বানিয়ে দেওয়া এবং সৌদিতে আনার হোতা হিসেবে। এতে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে দূতাবাসের কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও। স্বেচ্ছাসেবক লীগের মদিনা শাখার সভাপতি আলী আজগরও একই কথা বললেন। তবে সমকালের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

সৌদি আরবের মক্কার মিছফালাহ এলাকার বাসিন্দা ‘মোহাম্মদ’। যদিও তার প্রকৃত নাম আহমদ। মোহাম্মদ তার পাসপোর্টের নাম। তার দাবি, তাদের আদি বাড়ি চট্টগ্রামের লালখান বাজারে। তাদের দশ ভাইবোনের জন্ম মক্কাতেই। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা জানলেও বাংলা পড়তে ও লিখতে জানেন না। আরবি হরফে লেখা রোহিঙ্গা ভাষা গড়গড় করে পড়তে পারেন। আহমদ বিয়ে করেছেন ‘বরমাইয়া’ মানে রোহিঙ্গা মেয়েকে। তার স্ত্রীরও বাংলাদেশি পাসপোর্ট রয়েছে। সৌদিতে থাকা আর সব বাংলাদেশির মতো তিনি ও তার স্ত্রী প্রতি বছর বাংলাদেশ সরকারকে ১২৫ রিয়াল ‘ফি’ দিয়ে তাদের বিদেশে থাকার তথ্য হালনাগাদ করেন। নির্দিষ্ট সময় অন্তর পাসপোর্ট হালনাগাদ করেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তার স্ত্রী মদিনায় বাংলাদেশ মিশনের খোলা সেবাকেন্দ্রে সব কাগজ হালনাগাদ করেন।

আহমদের সুবাদে মক্কায় বাস করা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়। মক্কার পাহাড়ি এলাকাগুলোতে মূলত রোহিঙ্গাদের বাস। হাতেগোনা কিছু শরণার্থী ছাড়া বাকি সবার রয়েছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট। তাদের মধ্যে দু’জন হাবিবুল্লাহ ও মুহিবুল্লাহ নামে দুই ভাই। দু’জনই গাড়ির চাকা মেরামতের কাজ করেন। এ কাজ তারা শিখেছেন সৌদি আরবে এসে। তারা অকপটেই জানালেন, বাংলাদেশি পাসপোর্ট ‘কিনে’ বিদেশ এসেছেন। পাসপোর্টে তাদের ঠিকানা কক্সবাজারের চকরিয়ায়।

নাক্কাছা বাজারে যে অল্প ক’জন বাংলাদেশি রয়েছেন, তাদের একজন কুমিল্লার আবদুল খালেক। তার বাড়ি কুমিল্লায়। তিনি মাছ বিক্রেতা। তিনি জানালেন, এই বাজারের ৯০ ভাগ বিক্রেতা রোহিঙ্গা। আশপাশে যত বাসিন্দা আছেন, তারাও রোহিঙ্গা। কিন্তু কাগজে সবাই বাংলাদেশি।

সৌদি আরবের আইনানুযায়ী, বিদেশি কর্মীকে একজন নাগরিকের অধীনে থাকতে হয়। যিনি বিদেশি নাগরিকের নিয়োগকারী (কফিল)। তার অধীনেই বিদেশি কর্মীকে কাজের অনুমতি (আকামা) দেয় সৌদি সরকার। প্রবাসী বাংলাদেশিরা জানান, রোহিঙ্গারা সৌদিতে এসে কফিলের অধীনে থাকে না। যে এলাকায় থাকার কথা, সেখানে না থেকে রোহিঙ্গা বস্তিতে চলে যায়। আকামা অনুযায়ী যে কাজ করার কথা তা না করে, বাকি রোহিঙ্গার সঙ্গে মিলে কাজ করে। আকামা নবায়নও করে না। এসব নিয়ম ভাঙার শাস্তি হলো- পুলিশের হাতে ধরা পড়া মাত্র দেশে ফেরত যেতে হবে। বাংলাদেশিদের অনেকে এসব নিয়ম ভাঙে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রায় সবাই নিয়ম ভাঙে। তারা ধরা পড়লে ফেরত পাঠানো যায়। এ কারণে সত্যিকারের বাংলাদেশিরা পড়েছে বিপদে। বাংলাদেশিদের বিষয়ে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে সৌদি আরবে।

রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ সমকালকে বলেন, যখন কেউ বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সৌদিতে আসে, তখন তাকে বাংলাদেশি বলেই মেনে নিতে হয় দূতাবাসকে। প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকরা যে সহায়তা পায়, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গাদেরও তা দিতে হয়। বাংলাদেশি পরিচয়ে রোহিঙ্গাদের সৌদি আসা ঠেকাতে হলে তারা যেন অবৈধভাবে পাসপোর্ট না পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।


সর্বশেষ সংবাদ