নারিকেল জিঞ্জিরার এই অনাদর কেন

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি, ২০২০ ১০:২৯ : অপরাহ্ণ

সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে   বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ। কক্সবাজার জেলার টেকনাফ হইতে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মিয়ানমারের উপকূল হইতে আট কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত দ্বীপটিতে প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায় বলিয়া স্থানীয়ভাবে ইহাকে নারিকেল জিঞ্জিরাও বলা হইয়া থাকে। দ্বীপটির আয়তন ৩৬ বর্গকিলোমিটার। নয়নাভিরাম এই দ্বীপটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ কেন্দ্র; কিন্তু মূলত সেই পর্যটকদের চাপেই দ্বীপটি পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন অবস্থায় উপনীত হইয়াছে। দ্বীপটির সর্বত্র ছড়াইয়া ছিটাইয়া থাকিতে দেখা যায় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিক দ্রব্য। সম্প্রতি একটি পরিবেশবাদী সংগঠন সেন্টমার্টিন হইতে মাত্র দেড় ঘণ্টায় প্রায় ১২০ কেজি প্লাস্টিকসামগ্রী সংগ্রহ করিয়াছে। সংগ্রহকৃত প্লাস্টিকের মধ্যে রহিয়াছে একবার ব্যবহারযোগ্য কাপ, প্লেট ও চিপসের খালি প্যাকেট। মাত্র দেড় ঘণ্টায় যদি এই পরিমাণ প্লাস্টিক দ্রব্য সংগ্রহ করা যায় তাহা হইলে ভাবিয়া চিন্তিত হইতে হয় যে, প্রকৃতপক্ষে দ্বীপটিতে কী পরিমাণ বর্জ্য জমা পড়িয়াছে। বলা বাহুল্য, ইহাতে দ্বীপটির পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হইতেছে। শৈবাল, প্রবাল, কচ্ছপ, লাল কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুকসহ নানা জলজ ও উভয়চর প্রাণী এবং পাখিসহ নানা জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হইবার পথে। অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, যথেচ্ছভাবে হোটেল-মোটেল নির্মাণ, নির্বিচারে গাছ কাটিয়া বন উজাড়, প্লাস্টিকসামগ্রীর বর্জ্যে সেন্টমার্টিনের পরিবেশ-প্রতিবেশে দারুণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলিয়াছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসাবে (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। পরবর্তী সময়ে এই ঘোষণা কেবল কাগজে কলমেই থাকিয়া গিয়াছে, বাস্তবে কোনো পদক্ষেপে ইহার কোনো প্রতিফলন আমরা দেখিতে পাই নাই, সেন্টমার্টিন রক্ষায় সরকারের কোনো উদ্যোগ কার্যকর রূপ লাভ করে নাই। সেন্টমার্টিনকে রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসাবে সরকারের কয়েকটি সংস্থার মতামতের ভিত্তিতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত লওয়া হইয়াছিল; যেমন—শুধু দিনের বেলায় পর্যটকরা সেন্টমার্টিনে যাইতে পারিবেন, রাতে অবস্থান করিতে পারিবেন না; ছেঁড়াদ্বীপে পর্যটকসহ সকলের যাতায়াত বন্ধ থাকিবে, প্রতিদিন দুইটি জাহাজে ৫০০ জনের বেশি পর্যটক যাইতে পারিবে না। ২০১৯ সালের ১ মার্চ হইতে এই সকল সিদ্ধান্ত কার্যকর হইবার কথা ছিল; কিন্তু এখনো তাহা কার্যকর হয় নাই। কেন কার্যকর করা যায় নাই—সেই দায় সংশ্লিষ্ট মহলের উপরই বর্তাইবে।

সেন্টমার্টিন রক্ষায় একদিকে সরকারকে যেমন কঠোর পদক্ষেপ লইতে হইবে, তেমনি অন্যদিকে সাধারণ পর্যটককে সচেতন করিয়া তুলিতে হইবে। দ্বীপটিকে পুরোপুরি পর্যটকদের জন্য রুদ্ধ করিয়া দেওয়া সম্ভব নহে বা তাহা উচিতও হইবে না। সেই ক্ষেত্রে করণীয় হইল—দ্বীপটিতে অবস্থানকালে পর্যটকেরা যেন সরকার-নির্দেশিত সকল বাধা-নিষেধ মানিয়া চলেন তাহা নিশ্চিত করা। এই জন্য সরকারের নির্ধারিত নির্দেশনাবলি পর্যটকদের নিকট পৌঁছাইতে হইবে। দ্বীপটির উল্লেখযোগ্য স্থানগুলিতে তাহা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করিতে হইবে। সর্বোপরি প্রত্যেকের সচেতনতাই পারে দেশের অন্যতম এই পর্যটনকেন্দ্রের পরিবেশকে রক্ষা করিতে।


সর্বশেষ সংবাদ