এক হাসিনা

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২:০৬ : পূর্বাহ্ণ

রফিক উল্লাহ … চল্লিশোর্ধ, মহিলাদের মধ্যে মাঝারি ধরণের গড়ন। গোলগাল চেহারা, গায়ের রং একটু হালকা কাল। চোখে মুখে বিদ্রোহ ভাব। মাঝে মধ্যে থানায় আসে তার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। মেঘলা পর্যটন এলাকায় তার বাড়ি। নিজের নামে কোন জমি নেই। সরকারি জমির মধ্যে সে ঘর করে দীর্ঘদিন বসবাস করছে। পরণে একজোড়া পুরাতন স্যান্ডেল ও একটি কাল বোরকা, যেটি অনেকদিন যাবত ধৌত করেনি। আইরন করাও নেই। বোরকায় অনেকগুলো ভাজ পড়েছে। কাল বোরকার মধ্যে কিছু কিছু স্থানে ধোলা ও ময়লার কারণে সাদা সাদা মনে হচ্ছিল। মনে হয় তড়িঘড়ি করে দ্রæত দৌড়ে আসায় শরীর হতে সামান্য ঘামের দুর্গন্ধ বের হতেছিল। ইতোপূর্বে তার সাথে আর দেখা হয়নি। তার পরিচয় জানার চেষ্টা করা হল। সে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কান্নার ফাঁকে ফাঁেক নিজের পরিচয় বলে। বলার সময় চোখ হতে একফোটা একফোটা করে পানি পড়ছিল। ওড়না দিয়ে সেটি মোছতেছিল। তার দঃখের বিষয় বলার জন্য অনুরোধ করা হয়। তাকে সহযোগীতা করার প্রতিশ্রæতি দেয়া হয়। সে আশ্বাসে তার দঃখের কথা বলতে শুরু করে, তার দুঃখ অনেক দিনের পুরাতন। তার স্বামী নেই অনেকদিন হয়। এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে তার। মেয়ে বড় হয়েছে। দেখতে খুব একটা খারাপ নয়। তার এলাকার পুরুষরা তাকে যতইনা জমি নিয়ে সমস্যা করে তার চেয়ে বেশি সমস্যা করে তার মেয়েকে নিয়ে। স্বামী হারা মহিলা বর্তমান সমাজে বসবাস করা অত্যন্ত কষ্টকর। সে গরীব হওয়াতে তার মেয়ে ও ছেলে নিয়ে দিনাতিপাত করে একেবারে আরামদায়কভাবে নয়। সে পাহাড় হতে লাকড়ি এনে বাজারে বিক্রি করে এবং মাঝেমধ্যে সুবিধামত তরকারী বিক্রি করে দৈনিক উপার্জন করে। যুবতী মেয়েকে ঘরে রেখে সে বাইরে গেলে তার মেয়েকেও অনেকে বিরক্ত করতে চায় এলাকার কখাটেরা। তবে হাসিনা খুবই সতর্ক। সে নিজে এবং তার মেয়েকে সবসময় ভাল থাকতে ও রাখতে চায়। সেটি তার স্বামীর মৃত্যুর পর হতে সে অক্ষুন্ন রেখেছে। তার কোন চারিত্রিক ত্রæটি এখনো এলাকায় লোকের নিকট ধরা পড়েনি। তারপরও তার মনে অনেক কষ্ট। এদিকে নিজের যন্ত্রনা, অপরদিকে আরও একটি বড় যন্ত্রনা নিয়ে সে আমার নিকট এসেছে। তাকে চেয়ারে বসতে বলা হল। অনেক সংকোচ করার পর সে চেয়ারে বসে আমাকে বলতেছিল। তার হাতে একটি ছোট ওয়ালেট/র্পাস ছিল। তার দুঃখটি বলার ফাঁকে ফাঁকে তার হাতের ওয়ালেটটি খোলার চেষ্টা করছিল। তার বর্তমান অভিযোগ তার পুরাতন ঘরটি ভেঙ্গে ফেলেছে। একই পাড়ায় সে আর একটি ছোট ঘর নির্মাণ করতেছিল। নির্মাণের সময় অনেকে বাধা দিয়েছে কয়েকজন লোকে। এমনকি থানায় অভিযোগও করেছে। সে অভিযোগে থানা পুলিশ তার বিষয়টি তদন্ত করেছে। তার পক্ষে অনেকে আছে কিন্তু বিপক্ষে বেশি লোকে কথা বলে। কারণ ছিল তাকে অনেকে পেতে চায়। তাকে না পাওয়ায়, এলাকার অনেক বখাটে পুরুয়ের মনের ক্ষোভ রয়েছে। তার আরজি ছিল, সে যদি ঐ ঘরটি নির্মাণ না করতে পারে তা হলে সে তার ছেলে মেয়ে নিয়ে কোথায় যাবে। দীর্ঘ ৩০/৪০ বছর পূর্ব হতে এখানে বসবাস করে আসছে। তার অন্য কোথাও যাওয়ার কোন উপায় নেই। বর্তমানে তার ঘরের শুধু টিন লাগানো অবশিষ্ট আছে। তাকে আমি যেন একটু সাহায্য করি। আমি তাকে তার ঘরের কাজের প্রতিশ্রæতি দিলেও সে তাতে সন্তুষ্ট হতে পারছে না। তার হাত ততক্ষনে ওয়ালেটের নিকট। মুষ্ঠি একবার খোলে আবার বাঁধে। সে নির্দিধায় আমাকে বলে ফেলল, স্যার আপনার জন্য চার হাজার টাকা এনেছি, এগুলো আপনি নেন আমাকে ঘরের টিনগুলো লাগানোর সুযোগ করে দিন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি এত টাকা তুমি একসাথে কোথায় পেলে? তোমার নিকট একসাথে এতটাকা থাকার কথা নয়। সে আমাকে বলে, তার মেয়ের কানের দুল দোকানে বন্ধক দিয়ে আমার জন্য টাকা এনেছে। আমি না নিতে চাইলে সে জোর করে দেয়ার চেষ্টা করে। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তুমি গরীব, না আমি গরিব? সে নিজের বিষয়ে বলল সে আমার চেয়ে গরিব। তারপরও সে আমাকে টাকা দিতে চায়। একপর্যায়ে তাকে আমি অন্যায়ভাবে ধমক দিয়ে বললাম, আমাকে আর একবার যদি টাকা দেওয়ার চেষ্টা কর তাহলে তুমি কষ্ট পাবে, তোমার ঘর হবে না। তোমাকে আটক করা হবে। আমি হাসিনাকে বল্লাম টাকাগুলো স্বর্ণের দোকানে ফেরত দিয়ে তোমার মেয়ের কানের দুল নিয়ে আস তাহলে আমি তোমাকে সাহায্য করব। সে আশ্বস্থ হয়ে স্বর্ণের দোকানে গিয়ে তার মেয়ের কানের দুল ফেরত নিয়ে আসে। টাকা ফেরত দিয়ে মেয়ের কানের দুল নিয়ে আমাকে দেখায়। তখন আমি তার অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা ডেকে বলে দিলাম হাসিনা যেন তার ঘরের টিন লাগাতে পারে। সে নির্দেশনা পেয়ে হাসিনা চলে যায়, ঘরের টিন লাগায়। তার প্রতি এতদিন যারা অবিচার করছিল এখন কেহ তা করে না। বর্তমানে হাসিনা তার ছেলে মেয়ে নিয়ে ভাল আছে। (বান্দরবান সদর থানার বিষয়)।


সর্বশেষ সংবাদ