মানবপাচার মামলাগুলোর অগ্রগতি নেই

প্রকাশ: ৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১০:৩৪ : অপরাহ্ণ

টেকনাফ নিউজ ডেস্ক []
বিশেষ আদালতে দায়ের করা বেশির ভাগ মানবপাচার মামলার কোনও ধরনের অগ্রগতি নেই। সাক্ষীর অভাব, ভিকটিমের জবানবন্দি ও বিচারক সংকটসহ নানা আইনি জটিলতায় মামলাগুলো ঝুলে আছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মানবপাচার আইনে মামলা হয়েছে ৪২২টি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে দুই হাজার ৮৯ জনকে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৭৫০ জনকে। পাচারের সময় উদ্ধার করা হয়েছে তিন হাজার ২২৩ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে। থানার রেকর্ড অনুযায়ী, ৩৩টি মামলা ছাড়া সবকটি মালমায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে নবেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের সময় রোহিঙ্গাসহ উদ্ধার করা হয়েছে ৬১৭ জনকে। এসময় পাচারকাজে জড়িত ১৭ জন দালালকে গ্রেফতার করা হয়। একইভাবে জড়িতদের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে ২৮টি। এসব মামলা এখনও তদন্তাধীন রয়েছে।

মানবপাচারের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০১২ সালে কক্সবাজারে গঠিত হয় ট্রাইব্যুনাল (বিশেষ আদালত)। কিন্তু গত ৭ বছরে মানবপাচার আইনের কোনও মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। অথচ, জামিনে গিয়ে পাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা আবারও ফিরে গেছে পাচারের মতো অনৈতিক কাজে। কক্সবাজারসহ দেশের অন্যান্য এলাকার সংঘবদ্ধ পাচারকারীরা রোহিঙ্গা শিবিরের পাচারকারীদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে উপকূলীয় ও সীমান্ত এলাকায় রমরমা পাচার কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।

মামলার অগ্রগতি নিয়ে কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বে থাকা বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নুরুল ইসলাম বলেন, ‘মানবপাচার মামলাগুলোর কোনও অগ্রগতি নেই। এগুলো অনেকটাই থমকে আছে। কারণ, স্পেশাল আদালতের প্রথম বিচারকের পদটি খালি রয়েছে গত এক বছর ধরে। বিশেষ করে মামলার ভিকটিম, বাদী, সাক্ষী ও আসামিরা একেকজন একেক এলাকার বাসিন্দা। এ কারণেও একটি নির্দিষ্ট তারিখে মামলার পক্ষভুক্ত সবাইকে আদালতে উপস্থিত করা সম্ভব হয় না। এসব কারণেই মামলা নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। এছাড়া, মামলার তদন্তে পুলিশের সীমাহীন দুর্বলতাও মামলা নিষ্পত্তি করতে না পারার অন্যতম প্রধান কারণ।’

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘কক্সবাজার জেলা পুলিশ শুধু মানবপাচারই নয়, ইয়াবাসহ মাদকপাচারে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি বর্ষা মৌসুম শেষে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক মানবপাচার শুরুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে অন্যান্য ধরনের মানবপাচার শূন্যের কোটায়। এরপরও সাগরপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচার, ইয়াবাপাচারসহ নানা অপরাধের বিরুদ্ধে পুলিশ তৎপর রয়েছে। এসব বিষয়ে পুলিশ সক্রিয় থাকায় নিষ্ত্রিয় হয়ে পড়েছে পাচারকারীরা।’

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালের দিকে সর্বপ্রথম টেকনাফ পয়েন্ট দিয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের সূচনা হয়। এরপর ২০১২ সালের পর থেকে মানবপাচারের প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। পরবর্তীতে টেকনাফ ছাড়াও জেলার উখিয়া, রামু, চকরিয়া, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার সদর ও মহেশখালীসহ বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারের ঘটনা বেড়ে যায়। কয়েক লাখ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমায়। ২০১৫ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের হিসাব মতে, ১৬ লাখ বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের নাগরিককে (রোহিঙ্গ) সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করেছে পাচারকারী চক্র। পরবর্তীতে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়। তখন সাগরপথে মানবপাচার বন্ধে ব্যাপক তৎপর হয় প্রশাসন। এরপর থেকে এলাকার চিহ্নিত মানবপাচারকারীরা আত্মগোপনে চলে যায়। কিন্তু, সম্প্রতি উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে পাচারকারীরা। এখন শুষ্ক মৌসুমে প্রতিনিয়ত তারা রোহিঙ্গাদের সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।


সর্বশেষ সংবাদ