টেকনাফে খাটো জাতের গাছে থোকায় থোকায় ডাব-নারিকেল

প্রকাশ: ১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১০:৩৫ : অপরাহ্ণ

হাফেজ মুহাম্মদ কাশেম, টেকনাফ … টেকনাফের কৃষি অফিস সংলগ্ন কোয়ারেন্টাইন (সংগনিরোদ কীটতত্ববিদ) অফিস প্রাঙ্গণে রোপিত খাটো জাতের নারিকেল গাছে শোভা পাচ্ছে থোকায় থোকায় ডাব-নারিকেল। টেকনাফ উপজেলা কৃষি বিভাগের তৎপরতায় ক্রমে জনপ্রিয়তা লাভ করছে এই খাটো জাতের নারকেল গাছ। অবিশ^াস্য হলেও সত্যি, দ্রæত বর্ধনশীল খাটো জাতের নারিকেল গাছে ১৮ মাসের মধ্যেই ফুল চলে আসে এবং তিন বছরের মাথায় ফল পরিপূর্ণ হতে শুরু করে। মাত্র তিন বছরেই গাছে ধরেছে নারিকেল। তাও একটি-দুটি নয়। একাধিক গাছে।
সরেজমিন পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, টেকনাফে সর্বপ্রথম উপজেলা কৃষি অফিস সংলগ্ন কোয়ারেন্টাইন (সংগনিরোদ কীটতত্ববিদ) অফিস প্রাঙ্গণে উপ-পরিচালক আসাদুজ্জামান বুলবুল বিদেশ থেকে সংগ্রহ করে এনে লাগান খাটো জাতের নারিকেল চারা। শুরুতে পরিক্ষামুলক ২টি লাগানো হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে মোট ১২টি চারা লাগানো হয়েছে। প্রথমে কেউ বিশ^াসই করেনি। কিন্ত বাস্তবে দেখা গেছে চারা লাগানোর পর ২২ মাসের মধ্যেই গাছে ফুল এসেছে। প্রথম লাগানো ২টি গাছে থোকায় থোকায় ডাব-নারিকেলে ভর্তি। সংলগ্ন উপজেলা কৃষক প্রশিক্ষণ সেন্টারে আগত কৃষক-কৃষাণীগন তো দেখছেনই, উপরন্ত বিভিন্ন গ্রাম থেকে উৎসুক নারী-পুরুষ খাটো জাতের এই নারিকেল গাছ দেখতে আসেন। উপ-পরিচালক আসাদুজ্জামান বুলবুল স্বয়ং পরম যতেœ দেখাশোনা এবং মনোরঞ্জন বড়–য়া নামে একজন কর্মচারী পরিচর্যা করেন। টেকনাফ কোয়ারেন্টাইন (সংগনিরোদ কীটতত্ববিদ) অফিসের কর্মচারী মনোরঞ্জন বড়–য়া জানান, অফিসের সামনে এবং পেছনে মোট ১২টি খাটো জাতের নারিকেল চারা রোপন করা হয়েছিল। চারা লাগানোর পর ২২ মাসের মধ্যেই গাছে ফুল এসেছে। ২৯ মাসে থোকায় থোকায় ডাব-নারিকেলে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে অফিসের সামনে ৫টি গাছে ডাব-নারিকেলে ভর্তি।
জানা যায়, ভিয়েতনামের নারিকেল গাছের এই প্রজাতির নাম ‘ডুয়া এক্সিম লু’। এ জাতটি আবার দু’ধরনের। ‘সিয়াম গ্রিন কোকোনাট’ এবং ‘সিয়াম বøু কোকোনাট’। সারা পৃথিবীতে এ পর্যন্ত দ্রæত নারিকেল আসে এমন জাতের যেসব গাছের উদ্ভাবন এবং চাষাবাদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে ভিয়েতনামের এই জাতটি সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই গাছ একটানা ৭০/৮০ বছর পর্যন্ত ফল দিতে পারে। স্বাদে-গন্ধে, আকার ও পুষ্টিমানে এটি অসাধারণ। এর পানি অত্যন্ত মিষ্টি ও সুস্বাদু। এছাড়া ভারতের ‘গঙ্গাবন্ধন’ জাতের নারিকেল গাছেও দ্রæত ফল আসে। ‘ডুয়া এক্সিম লু’ নারিকেলের জাতটির আদি উৎপত্তি স্থান থাইল্যান্ডে। যা ‘সিয়াম’ নামে পরিচিত। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্য থাইল্যান্ডে এই জাতের নারিকেল ব্যাপক পরিচিত ও জনপ্রিয়।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, এই খাটো জাতের হাইব্রিড নারিকেল গাছের চাষে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তাছাড়া বিভিন্ন এনজিও সংস্থা রোহিঙ্গা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হিসাবে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সহায়তার অংশ হিসাবে খাটো জাতের নারিকেল চারা বিতরণ করেছে। সরকারীভাবে প্রশিক্ষণের মাধমে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কৃষক-কৃষাণীদের মাঝে অন্যান্য চারার সাথে উন্নত জাতের এই নারিকেল চারা দেয়া হয়েছে। নিয়ম মতে রোপন ও যথাযথ পরিচর্যা করা হলে এ নারিকেল গাছ সনাতনী গাছের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি ফল দেবে। গাছের উচ্চতা ২ থেকে ৪ ফুট হলেই ফল ধরা শুরু করে। মাটিতে ছুঁই ছুঁই এ নারিকেল মাটিতে বসেই পাড়া যাবে। লবণাক্ততা সহিষ্ণু এই গাছ সব ধরনের মাটিতে চাষের উপযোগী। এ চারা পরিচর্যা করা সহজ। ঝড়ে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে কম ক্ষতি হয়। বছর ব্যাপী ফল উৎপাদনের মধ্য দিয়ে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নত জাতের এ নারিকেলের জাতটি দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি বিভাগ। ভিয়েতনাম এবং ভারত দুই দেশ থেকে খাটো দুই জাতের নারকেলের চারা সংগ্রহ করা হচ্ছে। সিয়াম গ্রিন কোকোনাট ডাব হিসেবে ব্যবহারের জন্য অতি জনপ্রিয়। এ জাতের রং সবুজ, আকার কিছুটা ছোট, প্রতিটির ওজন ১.২-১.৫ কেজি। ডাবে পানির পরিমাণ ২৫০-৩০০ মিলি। গাছ প্রতি বছরে ফল ধরে ১৫০-২০০টি। এছাড়া সিয়াম বøু কোকোনাটও অতি জনপ্রিয় জাত। এটা ২০০৫ সালে উদ্ভাবন করা হয়। এটা কৃষকের খুব পছন্দের জাত। চারা রোপণের আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যেই ফল ধরে। ফলের রং হলুদ। ওজন ১.২-১.৫ কেজি। ডাবের পানির পরিমাণ ২৫০-৩০০ মিলি। ডাবের পানি অতি মিষ্টি এবং শেল্ফ লাইফ বেশি হওয়ার কারণে এ জাতের ডাব বিদেশে রফতানি করা যায়। গাছ প্রতি বছরে ফলে ধরে ১৫০-২০০টি। প্রায় সব ধরনের মাটি নারিকেল চাষের জন্য উপযোগী। তবে অতি শক্ত, কাঁকর শিলাময় মাটি হলে প্রায় দেড় মিটার চওড়া ও দেড় মিটার গভীর করে তৈরি গর্তে জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ উপরিভাগের মাটি ও সার দিয়ে ভরাট করে গাছ লাগালে গাছ সুন্দরভাবে বেড়ে উঠবে এবং শুকনো মৌসুমে সেচের সুবিধা থাকলে অথবা বসতবাড়িতে সারা বছরই রোপণ করা যাবে। চারা রোপণের পর প্রতি তিন মাস পর পর সার প্রয়োগ করতে হয়। ##


সর্বশেষ সংবাদ