টেকনাফে আইনশৃংখলা, চোরাচালান প্রতিরোধ টাস্কফোর্স কমিটি ও সাধারণ সভা

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর, ২০১৯ ১১:২৫ : অপরাহ্ণ

হাফেজ মুহাম্মদ কাশেম, টেকনাফ … টেকনাফ উপজেলা আইন শৃংখলা কমিটির সভা ২০ নভেম্বর অনুষ্টিত হয়েছে। সকাল ১১টায় টেকনাফ উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্টিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সাইফ।
এতে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ নুরুল আলম। বক্তব্য রাখেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও কক্সবাজার জেলা পরিষদ সদস্য আলহাজ¦ মোঃ শফিক মিয়া, সহকারী কমিশণার (ভুমি) মোঃ আবুল মনসুর, টেকনাফ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডাঃ সুমন, ভাইস চেয়ারম্যান মাওঃ ফেরদাউস আহমদ জমিরী, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মিস তাহেরা আক্তার মিলি, প্রাণীসম্পদ অফিসার ডাঃ মোঃ শওকত আলী, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আনন্দময় ভৌমিক, টেকনাফ রেঞ্জ অফিসার মোঃ সাজ্জাদ হোসেন, হোয়াইক্যং মডেল ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আলহাজ¦ মাওঃ নুর আহমদ আনোয়ারী, সাবরাং ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ নুর হোসেন, সেন্টমার্টিনদ্বীপ ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ¦ নুর আহমদ, বাহারছড়া ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল কাসেম মেম্বার, সদর ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান রানু আক্তার মেম্বার, টেকনাফ মডেল থানার ওসি অপারেশন রাকিব আহমদ, বিজিবির প্রতিনিধি বজলুর রহমান, কমিটির সদস্য আলহাজ¦ জহির হোসেন এমএ, আলহাজ¦ সোনা আলী, আবুল কালাম, বাহারছড়া ইউপির মোঃ ইলিয়াছ মেম্বার প্রমুখ।
সভায় টেকনাফের সার্বিক আইন শৃংখলা পরিস্থিতি, বিভিন্ন সংস্থার অপরাধ চিত্র তুলনামুলক পর্যালোচনা, নিয়মিত গ্রাম আদালত পরিচালনা ও আইনশৃংখলা কমিটির সভা নিয়মিতকরণ, মাদক, রোহিঙ্গা সমস্যা, মানব পাচার চক্রের সক্রিয়তা, সেন্টমার্টিনদ্বীপের হাসপাতালে ডাক্তার না থাকা, পর্যটকবাহী জাহাজে নজরদারী বৃদ্ধি, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে গতিশীলতা আনয়ন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
কমিটির সদস্য আলহাজ¦ জহির হোসেন এমএ বলেন, ‘সম্প্রতি ইয়াবা চোরাচালান ও মানব পাচার বৃদ্ধি পেয়েছে। ইয়াবার বড় বড় চালান ধরা পড়ছে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দিনের বেলা পণ্যবাহী ট্রাক টেকনাফ পৌর এলাকায় অবাধে প্রবেশ করায় যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে’।
কমিটির সদস্য আলহাজ¦ সোনা আলী বলেন, ‘রাঘব-বোয়াল বাদ দিয়ে চুনোপুটি ধরলে কোন দিন মাদক চোরাচালান বন্দ হবেনা। মাদক বন্দ করতে হলে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মুল উৎপাটন করতে হবে’।
হোয়াইক্যং মডেল ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আলহাজ¦ মাওঃ নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, ‘নাফনদী বাংলাদেশী স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বন্দ হলেও রোহিঙ্গাদের জন্য উম্মুক্ত। তারা অবাধে নাফনদী অতিক্রম করে মিয়ানমারে যাতায়ত করে ইয়াবা চোরাচালানে নিয়োজিত রয়েছে। মিয়ানমারের বাহিনী তাদেরকে সহায়তা করছে। গত কিছুদিন আগে নাফনদীর এপারে বাংলাদেশ ভু-খন্ডে বেড়ীবাঁধের উপর বসা অবস্থায় মিয়ানমার বাহিনীর গুলিতে ১জন বাংলাদেশী জেলে নিহত এবং অপর ১জন জেলে আহত হন। টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কে বহু চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। কিন্ত মাত্র ১জন গাড়ি চেক করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অনেক সময় অফিসগামী কর্মকর্তা-কর্মচারী, অসুস্থ ব্যক্তি, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, আদালতগামী মানুষের চরম ভোগান্তি হচ্ছে। সেচ সুবিধার জন্য রইক্ষ্যং এলাকায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বাঁধ দেয়া হয়েছিল। কিন্ত স্থানীয় বাসিন্দাগণ সেচ সুবিধা মোটেও পাচ্ছেনা। সব পানি রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাগণ পানি ও সেচ সুবিধার পরিবর্তে পাচ্ছে রোহিঙ্গাদের মল-মুত্র ও ময়লা-আবর্জনা। তাছাড়া বিভিন্ন এলাকায় খুচরা মাদক সেবীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে’।
সেন্টমার্টিনদ্বীপ ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ¦ নুর আহমদ বলেন, ‘রোহিঙ্গারা স্থানীয় বাসিন্দাদের ছদ্মবেশে পর্যটকবাহী জাহাজে করে ইয়াবা নিয়ে যাতায়ত করছে। দ্বীপের সৈকতে ক্যামেরা ম্যানরা পর্যটকদের ইয়াবা বিক্রি করছে। দ্বীপের ১০ শয্যা হাসপাতালে কোন ডাক্তার নেই। গত কিছুদিন আগে এক প্রসূতি চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন’।
সাবরাং ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ নুর হোসেন বলেন, ‘সাবরাং ইউনিয়নের আবদুল মাজেদ, মোঃ আলী, আবুল কালামসহ কয়েকজন লোক মামলায় হাজিরা দিতে কক্সবাজার গিয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানার পুলিশ তাদেরকে আটক করে বিভিন্ন হুমকি দিয়ে মোটা অংকের টাকা নেয়ার পরও ইয়াবা দিয়ে চালান দিয়েছে। সাবরাং পুলিশের পরিচয়ে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। জনতার ধাওয়া খেয়ে ডাকাতরা তাদের ব্যবহৃত ২টি মোটর সাইকেল ফেলে পালিয়ে গেছে। পুলিশ মোটর সাইকেল ২টি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে গেছে’।
বাহারছড়া ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল কাসেম মেম্বার বলেন, ‘বাহারছড়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড এলাকায় মানব পাচার বৃদ্ধি পেয়েছে। টেকনাফ-শামলাপুর এলজিইডি সড়ক বিধ্বস্থ এবং কয়েকটি ব্রীজ ভেঙ্গে যাওয়ায় সর্বসাধারণের ভোগান্তি চরমে উঠেছে’।
কমিটির সদস্য আলহাজ¦ আবুল কালাম বলেন, ‘পুলিশের পরিচয়ে ডাকাতির ঘটনা উদ্বেগজনক। রাতের বেলা চৌকিদার-দফাদারের উপস্থিতি ছাড়া দরজা খোলা যাবেনা। পিইসি পরিক্ষায় কেন্দ্র স্কুলের প্রধান শিক্ষক কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ একই স্কুলের পরিক্ষার্থীরা সেখানে পরিক্ষা দিচ্ছে। এতে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। নিজ স্কুলে না রেখে ভিন্ন স্কুলে দায়িত্ব দিলে পরিক্ষার সচ্ছতা আরও বাড়বে’।
ভাইস চেয়ারম্যান মাওঃ ফেরদাউস আহমদ জমিরী বলেন, ‘বর্তমানে চলমান শুদ্ধি অভিযানের জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। পাশাপাশি পেয়াঁজ কেলেংকারীতে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের কঠিন শাস্তি দাবি করছি’।
সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও কক্সবাজার জেলা পরিষদ সদস্য আলহাজ¦ মোঃ শফিক মিয়া বলেন, ‘অপরাধের তুলনামুলক খতিয়ান প্রকৃতপক্ষে আরও বেশী। মানুষ ঝামেলা মনে করে থানায় আশ্রয় নেননা। ফলে রেকর্ডও হচ্ছেনা। জেটির টোল জেলা পরিষদ কতৃক নির্ধারিত জনপ্রতি আসা বাবৎ ৮ টাকা এবং যাওয়া বাবৎ ৮ টাকা। সেক্ষেত্রে মাথাপিছু নেয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। লবণের কোন সংকট নেই। টেকনাফে গত মৌসুমে উৎপাদিত পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ এখনও মজুদ রয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি মাত্র ৪ টাকা ও ৪.৫০ টাকা দরে বেচাকেনা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের অবাধ বিচরণ প্রতিরোধে কাঁটা তারের ঘেরা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে’।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ নুরুল আলম বলেন, ‘তালিকা টাঙ্গানো না থাকায় পর্যটক ও দ্বীপের বাসিন্দাদের নিকট থেকে জনপ্রতি ৫০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে। যা সম্পুর্ণ বেআইনী। সেন্টমার্টিনদ্বীপ, শামলাপুর, হোয়াইক্যং ও সাবরাং স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোন ডাক্তার না থাকায় পর্যটক এবং সর্বসাধারণ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পুলিশ সাদা পোষাকে অভিযানে গেলেও সাথে চৌকিদার-দফাদারের উপস্থিত থাকা দরকার। প্রতিটি ইউনিয়নে মাদক বিরোধী সভা করা হবে। ইসলামাবাদে পুকুর ভরাট করে জবরদখল করা স্থানের পূর্ব পাশে একটি ভবনে নিয়মিত মাদক, জুয়া ও নারীদের আড্ডা বসে। একবার উক্ত ভবন থেকে বেশ কয়েকজন নারী উদ্ধার করা হয়েছিল। খাল জবরদখলকারীসহ এসবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে’।
সভাপতির বক্তব্যে নবাগত উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সাইফ বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজসহ সকল মহলের আন্তরিক সমন্বিত প্রচেষ্টায় সীমান্ত শহর টেকনাফকে দুর্নাম ঘুছিয়ে পরিচ্ছন্ন ‘মডেল উপজেলা’ হিসাবে পরিণত করা হবে। তাছাড়া যানজট নিরসনে অতি শীঘ্রই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে’।
এরপর উপজেলা চোরাচালান প্রতিরোধ টাস্কফোর্স কমিটির সভা অনুষ্টিত হয়। সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সাইফ। এরপর অনুষ্টিত হয় মাসিক সাধারণ সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ নুরুল আলম। কমিটির সদস্যবৃন্দ সভাগুলোতে উপস্থিত ছিলেন। সভায় বিভিন্ন দপ্তরওয়ারী গুরুত্বপুর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ##


সর্বশেষ সংবাদ