‘কয়েন বিড়ম্বনা’

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ১১:৩৫ : অপরাহ্ণ

কয়েন অর্থাৎ মুদ্রা। মুদ্রা হল পণ্য বা সেবা আদান প্রদানের জন্য একটি প্রকাশ্য বিনিময় মাধ্যম। যা অর্থের পরিচয় বহন করে। এটি অর্থের প্রাক পরিচয় হিসেবে গণ্য করা হয়। ওজন ও আকৃতিতে সমান খোদাইকৃত নিরেট ধাতব পদার্থ। মুদ্রাই প্রাচীন ইতিহাস পূণর্গঠনে ইতিহাসের পুরাতাত্তি¡ক সূত্র হিসেবে কার্যকরী একটি মাধ্যম। মুদ্রা রাষ্ট্র ও সরকারের আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের পরিচয় বহন করে। মুদ্রা একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক।
মুদ্রা ব্যবহারের ইতিহাসঃ-মানব জাতী সভ্যতার ছোঁয়া প্রাপ্তির পরপর ব্যবসার ক্ষেত্রে দ্রব্যের বিনিময়ে দ্রব্য আদান প্রদান করতেন। দ্রব্য বিনিময় করতে অসুবিধার সম্মুখিন হওয়ায় কিছু কিছু নিদির্ষ্ট পণ্য ব্যবহার করতেন। সহজে পণ্য ব্যবহারে অসুবিধা হওয়ায় স্বর্ণ রৌপ্যকে পরবর্তীতে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। স্বর্ণ ও রৌপ্য ব্যবহার আরামদায়ক হওয়ায় তা সকলের মাঝে জনপ্রিয় হয় ও ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। সভ্যতার ক্রম বিবর্তনের ফলে মুদ্রা আবিষ্কার হয়। স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রাকে ঢালাই করে মুদ্রার উভয় পিঠে মোহর অংকন করে দেয়া হত। পর্যায়ক্রমে সে মোহর আধুনিক মুদ্রা হিসেবে প্রচারে স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে বিশ্বের সকল দেশে তাদের জাতীয় প্রতিক মুদ্রার উভয় পিঠে ছাপিয়ে ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে মুদ্রার মান এক, দুই, পাঁচ, দশ, পঁচিশ পয়সা বা চার আনা ও পঞ্চাশ পয়সা বা আট আনা ছিল। সেগুলো বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ভাল ব্যবহার ছিল। তৎপরবর্তী সময়ে মুদ্রা স্ফীতি ও দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার পর মুদ্রার প্রাথমিক মান সর্বনি¤œ এক টাকাতে নির্ধারিত হয়। বর্তমানে এক, দুই ও পাঁচ টাকার মুদ্রা দেশে প্রচলন আছে। এসকল মুদ্রা প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারনের নিকট খুবই জনপ্রিয় ছিল।
বর্তমানে এক টাকা, দুই টাকা ও পাঁচ টাকার কয়েন দেশে প্রচলন আছে। এই কয়েন ব্যবহারের জন্য একটি অত্যন্ত সুন্দর ডিভাইস। কোন ময়লা থাকেনা, ছিড়েনা, ভাঙ্গেনা। তবে একদিনে ব্যবহারের পরিমান মত কয়েন একসাথে বহন করা সহজ নয়।
ওয়াফি কয়েন জমাতে পছন্দ করে। অনেক দিন যাবৎ কয়েন জমিয়ে রাখছিল। সে মনে করে কয়েন মানে অনেক টাকা। তার বাবা, মা ও বোনের নিকট হতে যখন যা পায় সবগুলো নিয়ে জমিয়ে রাখে। অনেক দিন জমানোর পর সে মনে করে এগুলোর বিনিময়ে সে অনেক টাকা পাবে। তখন সে তার মাকে বলে কয়েনের পরিবর্তে তাকে টাকা দিতে। মা তাকে বলে মুদি দোকানে বাজার সদাই করতে গেলে তখন সে যেন কয়েনগুলো নিয়ে যায়। মার সাথে দোকানে যাওয়ার সময় সে কয়েনগুলো সঠিকভাবে গুণে নেয়নি। দোকানদার আংকেলকে সে বলে তার অনেকগুলো কয়েন আছে। দোকানদার তাকে প্রথমে অনেক উৎসাহ দেন কয়েন জমানোর জন্য। তখন দোকানদার তাকে জিজ্ঞাসা করে কয়েনগুলো কোথায়? সে তখন বলে কয়েন আপনাকে দেয়ার জন্য সাথে নিয়ে এসেছি। দোকানদার একটু বিচলিত, কিন্তু কি করা অনেকদিন যাবৎ তাদের দোকানে সদাই করা হয়। মনে মনে চিন্তা করে কিভাবে ওয়াফিকে কয়েন বদলিয়ে না দিয়ে ফেরৎ পাঠানো যায়। দোকানদার তার কাছে জানতে চান কয়েনগুলো গুণে এনেছে কি না? সে তখন বলে ‘আংকেল কয়েনগুলোত গুণে আনা হয়নি’। দোকানদার সাহেব হাপ ছেড়ে বাচলেন। তখন তাকে বলে ‘আগে বাসায় গিয়ে গুণে তারপর আনতে হবে। কয়দিন পরে আনবে, আমি বলব’। ওয়াফির মন খারাপ, টাকা পায়নি। মনে কষ্ট নিয়ে বাসা চলে যাবার সময় তার মাকে বলে এখন কয়েন কেহ নেয়না কেন? তার অর্থ হল এই কয়েন দোকানদার নেবেনা। ওয়াফি বাসায় মাকে বিরক্ত করে কয়েন বদলানোর জন্য। তার মা, বাবাকে বলে ওয়াফির কয়েন দোকানদার নিচ্ছেনা। বাবা একদিন সদাই করতে দোকানে গিয়ে সদাই শেষ করে দোকানদারকে বলেন ওয়াফির কয়েনতো বদলাতে হবে। তখনো দোকানদার ওয়াফির বাবাকে বলেন ‘কয়েন এখন কেহ নিতে চাননা। আপনি যদি দেন তা হলে সঠিকভাবে গুণে আনবেন’।
দোকানদারের সে কয়েন গণনা করার সময় নেই। এখনো সে কয়েন দোকানে দেয়া হয়নি। বেশিরভাগ সময় দোকানে সদাই শেষে কয়েন দিলে তা নিতে মন চায়না কোন লোকেই। দোকানদারও তার কাস্টমারের অবস্থা ভেবে কয়েন দিয়ে থাকেন, সবাইকে দেননা। সদাই করে দোকানে কয়েন প্রদান করতে চায়লেও একই বিষয় লক্ষ্য করা হয় সকলের ক্ষেত্রে। বিত্তবান কোন ব্যক্তি কেনা-কাটা করলে কয়েন দেয়ার প্রশ্নই আসেনা।
কর্ম, পরিচয়, সম্পর্ক ও আত্মীয়তার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বাসা-বাড়িতে যাতায়ত করতে হয়। এসকল বাসা, বাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠানে কয়েন বিভিন্ন স্থানে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। কারো রান্না ঘরে সেল্ফের উপরে, অনেকের বাথরূমের জানালার উপরে, অনেকের বিছানার নিচে। অনেকের সাথে আরাপ করলে জানা যায় কয়েন সেচ্ছায় কেহ নিতে চাননা। পরস্পরের সাথে আদান প্রদানে কয়েনের ব্যবহার খুবই কম পরিলক্ষিত হয়। কেনা-কাটা করার পর কয়েন দিলে তা বদলিয়ে দিতে বলা হয়। এই সম্মানজনক মুদ্রা ব্যবহারে সকলের অনিহা। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ তার সঠিক ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করার সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া উচিত। প্রায় সকলেই কয়েনকে অপছন্দ করে থাকেন।

লেখক,
রফিক উল্লাহ্
ওসি।
০১৮১৯৯৫৫৮৪৪।


সর্বশেষ সংবাদ