স্মৃতির পাতায় কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর, ২০১৯ ১০:২৫ : অপরাহ্ণ

রফিক উল্লাহ, (বর্তমানে ওসি) … ১৪২ বছর। পুরাতনের চেয়ে পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহি ‘কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়’। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সুনিপূণ লীলা ভূমি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত নান্দনিক জেলা শহর কক্সবাজার। যেখানে রয়েছে পাহাড়, সবুজ বনরাজি, সময়ে ছোট ছোট ও অসময়ে বিশাল বিশাল ঢেউয়ের উত্তাল বঙ্গোপসাগর এবং গুল্ম লতা, সিলিকন, কোরাল, শামুক-ঝিনুকের সমন্বয়ে সৃষ্ট বিশ্বের দীর্ঘতম পরিচ্ছন্ন বালুকাময় সমুদ্র সৈকত। যেখানে নেই কোন কোলাহল, নেই কোন প্রকৃতির সৃষ্টি আর্বজনা। মানুষ অবচেতন মনে, অসর্তকতাবশতঃ অবহেলায় অপরিচ্ছন্ন করে রাখার চেষ্টা করে। রয়েছে পছন্দের অনেক স্থান ও উপভোগের সকল প্রাকৃতিক সৌন্দর্র্য। অকল্পনীয় সৌন্দর্যকে অবলোকন করতে দেশ ও দেশের বাইরের ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকগণ পাগলের মত ছুটে আসেন কক্সবাজার। পড়ন্ত বিকেলে ডিমের কুসুমের মত সূর্যাস্ত দেখা বিশ্বের কোথাও পাওয়ার কথা নয়। সেই জেলার ঐতিহ্য বহনকারী এক নান্দনিক ও অসাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। যার বয়স মাত্র একশত বিয়াল্লিশ বছর। এ জেলার সকল প্রাইমারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর সচেতন অভিভাবকগণ চিন্তায় অস্থির থাকেন তাদের সন্তানদের কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ানোর আশায়। উক্ত স্কুলেরই একজন নগন্য শিক্ষার্থী ছিলাম ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত। আজকের লেখা স্মৃতিগাঁথা সেই ৬ বছরের।
প্রিপারেটরি প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে আসা যাওয়া। মনে মনে অনেক চিন্তা ছিল এই স্কুলে পড়ার সুযোগ হবে কিনা। প্রাইমারি স্কুল পড়া শেষে আমার চাচা কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম সংগ্রহ করে পূরণ করে জমা দেন। যথারীতি সে কঠিন যুদ্ধ ভর্তি পরীক্ষা। জানুয়ারিতে ভর্তি পরীক্ষা হল। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অবশেষে ভর্তি হলাম। একটি ছোট স্বপ্ন পূরণ হল।
ভর্তির পর অনেক শর্ত। নতুন স্কুল ড্রেস, সাদা প্যান্ট, হাফ অথবা ফুল, সাদা শার্ট, সাদা পিটি শো, সাদা মোজা। ড্রেস তৈরি করা হল। জুতো, বই খাতা কেনা হল। স্কুল ও স্কুলের শিক্ষক নিয়ে অজানা কল্প-কাহিনী। ইতপূর্বে শুনেছি সৈয়দ স্যার, সিরাজ স্যার ও সালাউদ্দিন স্যারের কথা। স্কুলে পড়া না পারলে মার খেতে হয়। অনেকের পিঠে রক্তে সাদা শার্ট লাল হয়েছিল। এমন কঠিন গল্প শুনেছি পাড়ার বড় ভাইদের নিকট। কিন্তু তারপরও পড়েছে ঐ স্কুলে। মনে অনেক ভয় কিন্তু আনন্দ বেশি। তারপরও স্কুলে পড়তে হবে। নতুন স্কুল, নতুন দিন।
৬ষ্ঠ শ্রেণিতে প্রথম ক্লাস। ক্লাস রুম ছিল প্রশাসনিক ভবনের ২য় তলায় পশ্চিম প্রান্তে, সিঁড়িও আলাদা। সিঁড়ির সম্মুখে কেরানী স্যারের অফিস। আস্তে আস্তে ক্লাসে উঠাতে হবে, না হয় কেরাণী স্যারের মাইর। আমার পূর্বে অনেক ছাত্র ক্লাসে উপস্থিত। কয়েকজন পরিচিত এবং বেশির ভাগই অপরিচিত, ক্লাসে সামান্য হৈচৈ। কে কোথায় বসবে। সেকশান দু’টি, এ-সেকশান ও বি-সেকশানে ভাগ করেছে ৬ষ্ট শ্রেণি। সেকশান বিন্যাসে আমি পেলাম বি-সেকশান। প্রতি সেকশানে একশত বিশ জন করে ছাত্র। কোন ছাত্রী নেই। বড় শ্রেণি কক্ষটি দুটি বাঁশের স্ট্যান্ড পার্টিশান দ্বারা আলাদা করা। পার্টিশানের সামনে ও পিছনে সামান্য পথ আছে, এ-সেকশান হতে বি-সেকশানে যাওয়া যায়। ছাত্ররা ছোটাছুটি করার একসময় ক্লাস টিচার তমিজ স্যার এসে হাজির। কিন্তু ছাত্রদের অনেকের সেদিকে খেয়াল নেই। স্যারের হাতে একটি চিকন বেত, গলি দিয়ে দ্রæত হেঁেট পেছনে যাওয়ার সময় দুএকজনকে বেত দিয়ে হালকা টুস-টাস বারি দিলেন। স্যার আবার দ্রæত সামনে এসে নিজের মুখে আঙ্গুল দিয়ে দেখালেন চুপ। সে সাথে অনেক ছাত্রও নিজের মুখে আঙ্গুল দিল। মনে হল ছাত্ররা অনেক পূর্ব হতেই স্যারকে চেনেন।
তমিজ স্যার হাজিরা নিলেন। বাংলা ক্লাস। প্রথম দিন কি পড়িয়েছিলেন আমার মনে নেই। তমিজ স্যার দুপুরে নামাজ পড়তে খানেকাতে যেতেন। টিফিন ছুটির সময় আমাদেরকে রাস্তায় দেখতে পেলে মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। আমরাও কিছ ুদূর যাওয়ার পর পিছন দিক হতে পালিয়ে যেতাম। তখন স্যার কি কি যেন বলতে বলতে মসজিদে চলে যেতেন। স্কুল ছুটির পর মাঠে ফুটবল খেলা, প্রাইভেট পড়া এসব দেখতে দেখতে ৬ষ্ঠ শ্রেণি শেষ।
কেহ পাশ, কয়েকজন ফেল এভাবে ৭ম শ্রেণিতে ওঠা হল। ৭ম শ্রেনিতে উত্তির্ণ হয়ে প্রায় সকল ছাত্রের সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্ট হওয়া গেল। এক অপরকে চেনে, নাম জানা হল, কোথায় থাকে তাও জানা হল। ৭ম শ্রেণির ক্লাস উত্তর পাশের এক তলা ভবনের পশ্চিম পাশে। দেখতে অনেক লম্বা বদরুল আলম স্যার সমাজ বিজ্ঞান পড়াতেন। মৌলভী হাশেম স্যার ইসলাম ধর্ম পড়াতেন। তাঁর মাথায় চুল কম থাকাতে তাঁকে ‘পিতলা গম্ভি’ বলতেন সবাই। আনোয়ার স্যার, যাকে সকলে “মিড়া মৌলভী” স্যার হিসেবে ডাকতেন। ধর্ম ও আরবি পড়াতেন। ক্লাসে পড়া না পারলে বেত দিয়ে মারতেন ও পরীক্ষায় ফেল করানোর ভয় দেখাতেন। পরীক্ষায় পাশের জন্য বার্ষিক পরীক্ষার তিন মাস পূর্বে হাশেম স্যার ও বদরুল আলম স্যার হতে প্রাইভেট পড়তাম মূল ভবন এবং খেলার মাঠের মাঝখানের ভাঙ্গা টিনের ঘরে স্কুল ছুটির পর। পরীক্ষার পূর্বে স্যার আট-দশটি প্রশ্ন দিতেন। তার উত্তর মুখস্ত করে ভাল নম্বার পাওয়া যেত। এভাবে পার হল ৭ম শ্রেণি, আবারও কয়েকজন ফেল।
৮ম শ্রেণিতে কয়েকজন নতুন বন্ধু পাওয়া গেল। তাঁরা দুই বছরের অভিজ্ঞতা নেয়ার অপেক্ষায় ছিল। একই ভবনের পূর্ব পাশে ৮ম শ্রেণির দুটি সেকশান। এক তলা ভবন, পূর্ব পশ্চিম লম্বা, পশ্বিম দিকে এল এর মত একটি রূম আছে। ৮ম শ্রেনিতে সম্ভবত ক্লাস টিচার ছিলেন সালাহ উদ্দিন স্যার। যার ভয়ে সবাই অস্থির থাকত। অনেক লম্বা, মাথায় চুল কম ছিল, হাতে একটি চিকন বেত নিয়ে ক্লাসে আসতেন। স্কুলের অফিস ভবন এবং ৭-৮ম শ্রেণির ক্লাস ভবনের মাঝখানে একটি মাঠ আছে। স্যার অফিস হতে বের হলে সবাই দেখে। কখন সালাহ উদ্দিন স্যার ক্লাসে আসবেন। সালাহ উদ্দিন স্যার অফিস হতে বের হলেই সব ছাত্র চুপচাপ। কোন হৈচৈ নেই। যাকে বলে পিনড্রপ সাইলেন্ট। কেহ কোন কথা বলতনা। বিজ্ঞান পড়াতেন। পড়া ক্লাসে আদায় করতেন। পড়া না পারলে মার কাকে বলে। তিনি কোন ছাত্রকে প্রাইভেট পড়াতেননা। তাতে ছাত্রদের আরো বেশি ভয় ছিল। প্রায় সকলে অন্য কোন স্যারের পড়া শিখে না আসলেও সালাহ উদ্দিন স্যারের পড়া মুখস্ত করে আসত। একদিন উজ্জল কর নামে এক ছাত্র মামুনকে দুষ্টোমি করে লাল বেল্ট পরাতে ফান করে। মামুন সেটি সালাহ উদ্দিন স্যারকে বলে দিয়েছিল। স্যার উজ্জল করকে এমন মার দিয়েছিলেন তার এখনো মনে আছে। অংকে সিরাজ স্যার ও সৈয়দ স্যার। ক্লাস এইট হতে অংকে প্রাইভেট পড়তে হবে। এক গ্রæপ সিরাজ স্যারের নিকট অন্য গ্রæপ সৈয়দ স্যারের নিকট। আমি সিরাজ স্যারের নিকট প্রাইভেট পড়া শুরু করি। স্যারের চুলের স্টাইল খুব সুন্দর। আরো ব্যতিক্রমি স্টাইল করে ব্যানসন সিগারেট খেতেন, হাত মুষ্টি করে সিগারেটে টান দিতেন। দল বেঁেধ সিরাজ স্যারের বাসায় প্রাইভেট পড়তে যেতাম। এক ব্যাচে ৩০/৩২ জন এক সাথে প্রাইভেট পড়া। স্যারের শাসন খুবই কঠিন ছিল। স্যারের বাসা বার্মিজ মার্কেটের সামনে। দোতলা কাঠের পাটাতন। স্যার না থাকা অবস্থায় দোতলায় ছাত্ররা দৌড়াদৌড়ি করলে নিচে শব্দ হত। স্যারের মার ঘুম ভেঙ্গে গেলে স্যার এসে মার কাকে বলে। একদিন হারুন আর যায়েদ আলম দুষ্টোমি করেছে। স্যার এস জিজ্ঞাসা করেন কে করেছে। কেহ কথা বলেনা। হঠাৎ হারুন আমার নাম বলে দিয়েছে। স্যার আমাকে কঠিন একটি মার দিল। হারুন আর যায়েদ আলম বেচে গেল। সিরাজ দৌল্লাহ ভুইয়া স্যার গ্যালিভার পড়াতেন। মুখে দাড়ি, সবাই ভয় পেত। তিনি একজন দাপটে শিক্ষক ছিলেন। গড়নে মোটা-সোটা। তিনি দ্রæত পঠনে অনেক বেশি পারদর্শী ছিলেন। সুগত বড়–য়া স্যার অনেক পুরাতন শিক্ষক। তার পড়া চমৎকার। বাংলা ও ইংরেজি পড়াতেন। প্রাইভেট পড়ার জন্য মাঝে মাঝে মার দিতেন। মাথার চুল অনেক সুন্দর ছিল। চুল পাকেনি, সরিষার তৈল পানি সাথে মিশিয়ে মাথায় দিতেন। তার নিকট প্রাইভেট পড়তাম। তাঁর মেয়ে করবি বড়–য়া আমার সাথে প্রিপারেটরি প্রাইমারি স্কুলে পড়ত। তখন সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে। স্যার সকালের নাস্তা করার পর মুড়ি খেতেন। মুড়ি খাওয়া শেষের দিকে কতগুলো মুড়ি নিয়ে টিনসেড ঘরের চালে ছিটিয়ে দিত। কাক এসে হৈচৈ, কা-কা করে খেত। এই বছর আবদুল লতিফ স্যার স্কুলে নতুন যোগদান করেন। পেট একটু বড় ছিল। সমাজ বিজ্ঞান পড়াতেন। ছাত্ররা নতুন শিক্ষক হিসেবে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করতনা। কলিম উল্লাহ স্যার অংক ও বিজ্ঞান পড়াতেন। পরীক্ষা পাশের জন্য প্রাইভেট পড়তাম। সেন্ট্রাল প্রাইমারি স্কুলের পাশে ভাঙ্গা টিনের ঘরে থাকতেন। পান খেতেন বেশি। আমাদের প্রাইভেট পড়ানোর সময় মাঝখানে পান মুখে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। নূরুল হক স্যার এবং সিরাজুদৌলা স্যার ইংরেজী পড়াতেন। অত্যন্ত দক্ষ ইংরেজী শিক্ষক ছিলেন। সৈয়দ স্যার আমাকে, ভুট্টো ও বাবুলকে একদিন বেদম পিঠালেন মারামারি করার জন্য।
আমাদের ৬ষ্ঠ শ্রেণি হতে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রসাশনিক দায়িত্বে ছিলেন প্রধান শিক্ষক মোঃ আব্দুল কাদের স্যার। আমরা কাদের স্যার হিসেবে ডাকতাম। তিনি এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। বাড়িও ককসবাজার শহরে। তাঁকে যেমনি ভয় পেত ছাত্ররা, তেমনি ভয় পেতেন সহকারী শিক্ষকগণও। প্রধান শিক্ষক থাকতেন সরকারি বাসভবনে। এভাবে পার হল ৮ম শ্রেণি।
৯ম শ্রেণিতে পদার্পন। নবম শ্রেণির ক্লাশটি ছিল প্রসাশনিক ভবনের পূর্ব পাশে ২য় তলায়, আলাদা সিঁড়ি। বিজ্ঞান শিক্ষক আবার সেই সালাহ উদ্দিন স্যারের মার। নবম শ্রেণির ক্লাস টিচার ছিলেন সালাহ উদ্দিন স্যার। রেজিস্ট্রেশন করানোর সময় স্যার সকলকে বলেন নামের পূর্বে ও পরে কোন বিশেষণ দেয়া যাবেনা। যদি দিতে হয় তা হলে বানান সম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণভাবে লিখতে হবে। কোন সংক্ষেপ বানান লেখা যাবেনা। যেমন মোহাম্মদ। মোহাং লেখা যাবেনা। শুরুতেই গলদ, যায়েদ আলম শুরুতেই মোহাং লিখে বসে। সালাউদ্দিন স্যার দেখেই যায়েদ আলমকে এমন মার, সে ভয়ে আমি নামের পূর্বে মোঃ আর লেখিনি। ওপেন্দ্র স্যার ইংরেজী পড়াতেন, ক্লাসে একদিন উরংবধংবং বানান করতে বলেছিলেন পূর্বের দিনের পড়া আদায় করাকালে। বানান করতে গিয়ে কেহ না পারায় সকলকে বেদম মার দিলেন একজনও বাদ পড়েনি। বিজ্ঞান শাখার প্রাকটিক্যল ক্লাস সিরাজ স্যার ও সালাহ উদ্দিন স্যার নিতেন। নবম শ্রেণিতে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করার সময় সৈয়দ স্যারকে মংছেংক্য জিজ্ঞাসা করেছিল স্যার কস্টিক সোডা কি ? উত্তরে স্যার বলেছিলেন এটি খুব পিচ্ছিল, মংছেংক্য তুমি একটু নাও এবং সাইফুলকে একটু দাও। এভাবে পার হল একটি বছর। নবম শ্রেণিতে আসাদ উল্লাহ কাজলকে একটু বেশি ফান করত। কাজলও তাকে কিছু বলতনা। কাজল ধর্যশীল ছিল।
১০ম শ্রেণি অর্থাৎ এসএসসি পরীক্ষার বছর। ক্লাস, কোচিং এসবের মধ্য দিয়ে ব্যস্ততম দিন অতিবাহিত করতে ছিল সকলে। ১০ম শ্রেণির ক্লাস মূল ভবনের পশ্চিম পাশের ২য় তলায়। মমতাজ স্যার একটু রসিক ছিলেন। ক্লাসে ছাত্রদের সাথে রসিকতা করতেন। একদিন ক্লাসে ভুগোল পড়ানোর সময় সূচিত্রকে নামের পাশে আকার দিতে নিষেধ করেন এবং তাকে একটি প্রশ্ন করেন হ্রদ চেন? সূচিত্র পাল উত্তরে বলেছিল স্যার চিনি। কি বলতো। তখন সে উত্তরে বলে স্যার ছোট ছোট নালা। স্যার প্রতি উত্তরে বলেন তোমাকে নিয়ে আরেক জ্বালা। আমাদের বন্ধুরা অনেকে একসাথে বসলে আড্ডার ছলে এসকল কথাগুলো প্রায়ই আলোচনা হয়।
দশম শ্রেনিতে ছাত্রদের তুমূল আন্দোলন। ইসলাম ধর্মের পরিবর্তে বানিজ্য গনিত পড়তে হবে। বানিজ্য গনিতে ধর্মের চেয়ে বেশি নম্বার পাওয়া যায়। নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রিশনের পর বিষয় বদলানো কঠিন কাজ ছিল। শিক্ষা বোর্ডে হেড স্যারকে যেতে হবে। বোর্ড করতেও পারে নাও করতে পারে। ছাত্ররা প্রায় সকলে বানিজ্য গনিত পড়তে রাজি। ইতিমধ্যে অনেকে পড়া শুরু করে দিয়েছে। প্রধান শিক্ষক স্যার বোর্ডের সাথে প্রাথমিক আলাপকালে বোর্ড না করে দিয়েছে। হেড স্যারও আমাদেরকে না করে দিয়েছেন। ছাত্ররা মানেনা। আন্দোলন মিছিল, মিটিং। স্কুল প্রশাসন বাদ দিয়ে বাইরে নেতা, এমপি ও মন্ত্রিরে সাথে দেখা করা এসব চলছে। ছাত্ররা একবার সার্কিট হাউজেও গিয়েছিল মন্ত্রির মহোদয়ের সাথে দেখা করতে। মন্ত্রি মহোদয়ের নাম আমার মনে নেই। তার পরও কোন সমাধান হচ্ছেনা। একদিন ছাত্ররা ক্লাস হতে বের হয়ে গেল। হেড স্যারের রুমের সামনে মিছিল ও শ্লোগান। হেড স্যার বের হয়ে ছাত্রদের তাড়ানোর সময় হিরু বড়–য়া অবচেতন মনে মাঠ হতে বালি নিয়ে ছুড়ে মারলে হেড স্যারের চোখে পড়ে। স্যারের চোখে বালি ঢুকে। স্যার তখন তাঁর অফিসে চলে যান। ছাত্ররা সবাই ক্লাসে চলে আসে। সবাই ভয়ে তটস্থ। কি হবে, কে কে শাস্তি পাবে। আতংক ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে। স্কুল ছুটি দিয়ে দিয়েছে। পরদিন আলোচনা, সমালোচনা, স্যারদের মধ্যে দু’দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু কোন স্যার প্রকাশ্যে মুখ খুলছেননা। প্রায় সকল স্যারেরা ছাত্রদের পক্ষে। বেশি নাম্বার পেলে ভাল রেজাল্ট হলে স্কুলের সুনাম। পরদিন সকালে সবাই স্কুলে আসে, কি হয় সে অপেক্ষায়। হেড স্যার তার অফিসের বারান্দায় এসে সকল ছাত্রদের ডাকলেন। বলে দিলেন “আজ হতে যারা ইসলাম ধর্মের পরিবর্তে বানিজ্য গনিত পড়তে চাও সকলে পড়তে পারবে”। ছাত্রদের আন্দোলন সফল হল। এসএসসি পরীক্ষায় সকলে বানিজ্য গনিতে সর্বোচ্চ নাম্বার পেল। স্কুলের জীবনে উনিশতম স্ট্যান্ড করল।
আমাদের ব্যাচের প্রায়ই সকল ছাত্র লেখাপড়ার পাশাপাশি স্কাউট, ফুটবল, ক্রিকেট খেলত, আবৃত্তিও করত নিয়মিত। ওসমান ভাল আবৃতি করত, খেলা ঘরের আসর এসব করে সময় কাটাত। এ ব্যাচের ছাত্ররা খুবই মেধাবি ছিল। বর্তমানে সবাই দেশ-বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত। এসএসসি’৮৬ ব্যাচ একটি সংগঠন আছে। প্রতি বছর পূনর্মিলন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শিক্ষকগণ আমাদের খুবই প্রিয় ছিলেন। যেমনি শাসন করতেন তেমনি আদরও করতেন। রাস্তায় দেখা হলে লেখাপড়ার খোঁজখবর নিতেন। খলিল একদিন রাস্তায় হাটার সময় (সম্ভবত ফায়ার সার্ভিসের সামনে) সৈয়দ স্যারকে দেখে ভয়ে সালাম দিতে গিয়ে ড্রেনে পড়ে যায়।
মেধাবি, দক্ষ, জ্ঞানী ও আদর্শবান শিক্ষকদের মধ্য হতে আমরা অনেককে হারিয়েছি। তাঁদের জন্য দোয়া করি, তাঁদেরকে আল্লাহ বেহেস্তবাসী করুন। যারা বেঁচে আছেন তাঁদের দীর্ঘায়ু কামনা করি। কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই মাঠ, সেই ভবন, সেই শহীদ মিনার, সেই জিমনেসিয়াম এখনও দাঁড়িয়ে আছে। ককস্বাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই স্মৃতি মাঝে মাঝে আমাদের হাতছানি দেয়।

লেখক,
রফিক উল্লাহ
বর্তমান ওসি।
০১৮১৯৯৫৫৮৪৪।


সর্বশেষ সংবাদ