রোহিঙ্গা সহায়তা: ফেঁসে যাচ্ছেন ছয় জেলার ১৫ জনপ্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১০:২৯ : পূর্বাহ্ণ

টেকনাফ নিউজ ডেস্ক::   রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দিতে সহায়তা করার অভিযোগে ফেঁসে যাচ্ছেন ছয় জেলার অন্তত ১৫ জনপ্রতিনিধি। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রাঙামাটি জেলার এসব জনপ্রতিনিধির কেউ জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়েছেন রোহিঙ্গাদের, কেউ দিয়েছেন জাতীয়তা সনদ, আবার কেউ তাদের সরবরাহকৃত নথি সত্যায়িত করেছেন। চট্টগ্রাম জেলার এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর একাই ১১ রোহিঙ্গাকে ভোটার হতে কিংবা পাসপোর্ট পেতে স্বাক্ষর করেছেন। তবে ভোটার হতে রোহিঙ্গাদের পছন্দের জায়গা ছিল চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলা। জনপ্রতিনিধিদের ব্যবহার করে শুধু এ উপজেলা থেকেই ৬৭ রোহিঙ্গা অন্য জেলা ও উপজেলার ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে ভোটার হয়েছেন। এদিকে, একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রোহিঙ্গারা ১৫০টি পাসপোর্টও তৈরি করেছেন বলে ধারণা করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। সন্দেহভাজন এসব পাসপোর্টের মধ্যে ৩৭টিতে জালিয়াতি হওয়ার ব্যাপারে এরই মধ্যে নিশ্চিত হয়েছে কমিশন। তাই রোহিঙ্গাদের নানাভাবে সহায়তা করা জনপ্রতিনিধিরা ফেঁসে যাচ্ছেন এবার।

জানতে চাইলে দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২-এর উপ-পরিচালক মুহ. মাহবুবুল আলম বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও পাসপোর্ট পাইয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধির সম্পৃক্ততা পেয়েছি আমরা। জনপ্রতিনিধিরা কে কীভাবে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, বিনিময়ে তারা কে কী সুবিধা পেয়েছেন, এসবই আসবে আমাদের তদন্তে। আমরা যাদের সম্পৃক্ততা পেয়েছি, তাদেরও এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করব। এ মুহূর্তে সন্দেহভাজন জনপ্রতিনিধিদের নাম প্রকাশ করছি না। তবে রাষ্ট্রের ক্ষতি করে কেউ পার পাবে না।’ বাঁশখালী উপজেলা থেকে সর্বোচ্চ ৬৭ রোহিঙ্গার ভোটার হওয়া প্রসঙ্গে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘জনপ্রতিনিধিদের ব্যবহার করে কে কোথায় কীভাবে ভোটার হয়েছে, সেটির বিস্তারিত তুলে ধরে আমরা দুদক ঢাকা কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। আমরা অন্য জেলা ও উপজেলার এমন ৬৭ নাগরিক পেয়েছি, যারা ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে বাঁশখালী থেকে পেয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর। সন্দেহভাজন এমন জনপ্রতিনিধির সংখ্যা অন্তত ১৫ জন।’

ভোটার ও পাসপোর্ট পেতে রোহিঙ্গারা ছয়টি জেলাকে বেছে নিয়েছেন। কক্সবাজারে যাচাই-বাছাই বেশি হওয়ায় চট্টগ্রাম, বান্দরবান, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রাঙামাটি জেলার স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করে ভোটার কিংবা পাসপোর্ট পেয়েছেন অন্তত ১৫০ জন। সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত রোহিঙ্গা ডাকাত নুর আলমকে ২০১৭ সালে স্মার্ট কার্ড প্রদান করা হয়। তার ভোটার নং ১৫১৭২২০০১৭১৪। আর ফরম নং ৪০৩৬৫৬০৫। রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায় নুর আলম রোহিঙ্গা হলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৭নং পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডের বার্মা কলোনির ভোটার। যাবতীয় নথিতে সেখানকার কাউন্সিলরের স্বাক্ষরও নিয়েছে সে। দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তারা তৎকালীন কাউন্সিলরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন। কিন্তু তিনি বলেছেন, তার স্বাক্ষর জাল করে এ কাজ করেছে নুরুল আলম। একই কথা বলছেন তদন্তে নাম আসা অন্য জনপ্রতিনিধিরাও। তবে তাদের এ বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে পারেনি কমিশন। তাই কমিশন কার্যালয়ে তখনকার সময়ে সংরক্ষিত নথিপত্রও দেখবে কমিশন।

অন্য এলাকার স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করে বাঁশখালীতে যে ৬৭ রোহিঙ্গা ভোটার হয়েছেন, তাদের কেউ চন্দনাইশের, কেউ পটিয়ার স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। আবার চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে সর্বাধিক ১১ রোহিঙ্গা ভোটার ও পাসপোর্ট পেয়েছেন ৮নং শুলকবহর ওয়ার্ড থেকে। এ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর হিসেবে আছেন মোরশেদ আলম। তিনি বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে সাত লাখ বাসিন্দা আছে। ভোটারও আছে এক লাখ ১৪ হাজার। বিপুল পরিমাণের এ মানুষকে প্রতিদিন সেবা দিতে হয়। জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়ার আগে স্বজনদের যেসব নথি নেওয়ার নির্দেশ সরকার দিয়েছে, আমি তার সবই পালন করছি। এখন কেউ যদি জাল পরিচয়পত্র নিয়ে এসে আমার থেকে জাতীয়তা সনদ চায়, তাহলে আমার কী করার আছে? আমি তো নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে গিয়ে পরিবারের স্বজনদের তথ্য যাচাই করতে পারছি না। আবার কেউ যদি আমার প্যাড ও স্বাক্ষর স্ক্যানিং করে ভুয়া কাগজপত্র বানায়, সেখানেও আমার কিছু করার নেই। আমার ধারণা এসব সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়েছে কেউ। তবে সজ্ঞানে আমি কোনো রোহিঙ্গাকে ভোটার হতে কিংবা পাসপোর্ট পেতে সহায়তা করিনি।’

রোহিঙ্গাদের সহায়তা করার অভিযোগে আরও যেসব এলাকার জনপ্রতিনিধির নাম আসছে তার বেশিরভাগ হচ্ছে কক্সবাজার সদর ও টেকনাফের। চট্টগ্রামের পটিয়া, চন্দনাইশ, হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া এলাকার ঠিকানাও ব্যবহার করেছেন রোহিঙ্গারা। এসব এলাকার অন্তত ১৫ জনপ্রতিনিধির স্বাক্ষর আছে রোহিঙ্গাদের নথিতে। তাই দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশের তদন্তে মুখোমুখি হতে হবে এসব জনপ্রতিনিধিদেরও


সর্বশেষ সংবাদ