টেকনাফের শালবাগান ক্যাম্পে ১০১ রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকার সম্পন্ন

প্রকাশ: ২২ আগস্ট, ২০১৯ ১:০৯ : পূর্বাহ্ণ

হাফেজ মুহাম্মদ কাশেম, টেকনাফ … টেকনাফের শালবাগান ২৬ নম্বর ক্যাম্পে বুধবার ২১ আগষ্ট আরও ৮০টি রোহিঙ্গা পরিবার স্বেচ্ছায় স্বদেশে ফিরে যাওয়া বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। ১ম দিন মঙ্গলবার ২০ আগষ্ট মতামত দিয়েছিলেন ২১ পরিবার। টেকনাফের শালবাগান ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সিআইসি কার্যালয়ে ত্রিপাল দিয়ে ঘেরা রুমে ২য় দিনের মতো প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাতকার নেয়া হয়। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং রোহিঙ্গা ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশণারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের সমন্বয়ে ১০টি দল শালবাগানের বিভিন্ন বøকের ঘরে ঘরে প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা রোহিঙ্গাদের সিআইসি কার্যালয়ে আসার জন্য বলা হয়। সকাল থেকে এই ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থার লোকজনের তৎপরতা দেখা গেছে। প্রথম দিনের ন্যায় ২য় দিনও ইউএনএইচসিআর এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা সাক্ষাতকার দিতে রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে গিয়ে উৎসাহিত করেছেন।
সাক্ষাৎকার দেয়া মোট ১০১ পরিবারের প্রধানগণ সকলেই শর্ত পুরণ ছাড়া স্বদেশে ফিরতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। শর্তগুলো হচ্ছে এনভিসি কার্ড নয় সরাসরি নাগরিকত্ব প্রদান, ভিটে-বাড়ি ও জমি-জমা ফেরত, আকিয়াব জেলায় আশ্রয় শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের নিজ বাড়ীতে ফেরত, মিয়ানমারের মাব্রাই দীর্ঘদিন ধরে বন্দি এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাদের মুক্তি, হত্যা, ধর্ষনের বিচার, অবাধ চলাফেরা করার সুযোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে এগিয়ে নিতে জাতিসংঘ উদ্বাস্ত বিষয়ক হাইকমিশণ (ইউএনএইচসিআর) ও সরকারের পক্ষ থেকে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের কাছে লিফলেট বিতরণ করেছে। লিফলেটে স্বদেশ ফিরে গিয়ে কোথায়, কিভাবে রাখা হবে এবং পরবর্তীতে কি কি করণীয় সে সম্পর্কে ধারণা রয়েছে।
জানা যায়, উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমার নাগরিকদের স্বদেশ প্রত্যাবাসন করতে আশ্রয়ন কেন্দ্র এবং জেটিঘাট প্রস্তত করে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ যেকোন মূল্যে কাংখিত এই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সফল করতে প্রস্তত রয়েছে। প্রত্যাবাসনে তালিকাভূক্ত রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প ছেড়ে আতœগোপনে যেতে প্ররোচিত করায় এই প্রত্যাবাসন সফলতা রোহিঙ্গাদের সদিচ্ছার উপরই নির্ভর বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য শালবাগান ক্যাম্প ইনচার্জ অফিসের পাশে এবং কেরুনতলীতে বিশেষ আশ্রায়ন কেন্দ্র তৈরী করা হয়েছে। প্রস্তত করা হয়েছে প্রত্যাবাসন জেটিঘাট। এই প্রত্যাবাসন সফল করতে শরণার্থী ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কমিশনারের লোকজনসহ ইউএনএইচসিআরের লোকজন কাজ করে আসছেন। এই লক্ষ্যে সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তৎপর রয়েছে। তবে প্রত্যাবাসনকারী রোহিঙ্গাদের কেউ এখনো এসব কেন্দ্রে অবস্থান না নেওয়ায় সচেতন মহলে এই প্রত্যাবাসন নিয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। গত বছর ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রথম পদক্ষেপ ব্যর্থ হওয়ার পর আবারো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তৎপরতায় প্রাথমিকভাবে ৩ হাজার ৪৫০ জনের এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এই প্রক্রিয়াটি মুলত রোহিঙ্গাদের সদিচ্ছার উপরই নির্ভর করছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একাধিক নেতাদের সাথে আলাপকালে জানান, রোহিঙ্গাদের উত্থাপিত দাবী পূরণ হলেই রোহিঙ্গারা ওপারে যেতে পারে। অন্যথায় রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণকারী উগ্রপন্থী স্বশস্ত্র গ্রæপের লোকজনের কাছে এসব রোহিঙ্গারা জিম্মি এবং নিরাপত্তাহীন অবস্থায় রয়েছে। তাদের কথার বাইরে গেলে রাতে হামলার আশংকায় মিয়ানমার ফিরতে আগ্রহী অনেকে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছেনা। উপরন্ত কতিপয় এনজিও কর্মকর্তাদের রহস্যজনক কর্মকান্ড রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিরোধী হিসেবে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আবার সাধারন রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ জানান, ক্যাম্পে তারা স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারছেননা। রোহিঙ্গা স্বশস্ত্র গ্রæপ সবসময় তাদের উপর নজরদারী করছে।
টেকনাফের শালবাগান ২৬ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সিআইসি খালেদ হোসেন বলেন, ‘২০ আগষ্ট ২১ পরিবার এবং ২১ আগষ্ট ৮০ পরিবার স্বেচ্ছায় স্বদেশে ফিরে যাওয়া বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। বিকাল ৪টা পর্যন্ত এই মতামত নেওয়া হয়েছে। কেউ প্রত্যাবাসন বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কাংখিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য আমরা প্রস্তত রয়েছি। প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের দ্বিতীয় দিনের মতো সাক্ষাৎকার সম্পন্ন হয়েছে। ২য় দি বুধবার রোহিঙ্গাদের আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচেছ। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে কোনো বাধা ছাড়ায় রোহিঙ্গারা সাক্ষাৎকার দিতে আসছেন। এ পর্যন্ত শতাধিক রোহিঙ্গা পরিবার সাক্ষাৎকার দিতে এসেছে’।

রোহিঙ্গাদের শর্ত :
২ দিনে সাক্ষাৎকার দিতে আসা ৮০টি পরিবারের প্রধানগণও শর্ত পুরণ নিশ্চিত না হলে মিয়ানমারে ফিরতে নারাজ বলে জানা গেছে। শর্তগুলো হচ্ছে এনভিসি কার্ড নয় সরাসরি নাগরিকত্ব প্রদান, ভিটে-বাড়ি ও জমি-জমা ফেরত, আকিয়াব জেলায় আশ্রয় শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের নিজ বাড়ীতে ফেরত, মিয়ানমারের মাব্রাই দীর্ঘদিন ধরে বন্দি এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাদের মুক্তি, হত্যা, ধর্ষনের বিচার, অবাধ চলাফেরা করার সুযোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ। প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকার কর্তৃক অনুমোদিত রোহিঙ্গারা জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশণার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের প্রতিনিধিদের কাছে সাক্ষাৎকারে এমনটি জানিয়েছেন।
সাক্ষাৎকার শেষে হলরুম থেকে বের হওয়া ২৬ নম্বর ক্যাম্পের ‘এ’ বøকের বাসিন্দা মুহাম্মদ রিয়াজ (৩২), রশিদ আমিন (৪৫) ও ‘আই’ বøকের হোসেন আহমদ (৫২) এ তথ্য জানান। তাঁরা বলেন, ‘এপার থেকে যারা যাবেন, তারা ওপারের কোনো ক্যাম্পে নয়, সরাসরি নিজেদের পুরনো বসতভিটায় যেতে পারার মতো ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে কোনো লাভ নেই। দোদুল্যমান অবস্থায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাইনা। মিয়ানমারে আমাদের ওপর চালানো নিপীড়নের বিচার করতে হবে, সম্পত্তি ফেরতের পাশাপাশি নাগরিকত্ব দিতে হবে। এরপরই আমরা ফেরত যাব। সব ধরনের প্রস্ততি থাকা সত্ত্বেও পূর্বের প্রতিশ্রæতি অনুযায়ী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করেনি মিয়ানমার। এবারও হঠাৎ করে তিন হাজার ৪৫০ জনকে ফেরত নিতে রাজি হয়েছে দেশটি। বারবার কথা না রাখার রেকর্ড আছে মিয়ানমারের। এবারও ‘শঙ্কা’ নিয়েই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রস্ততি রোহিঙ্গারা মেনে নিতে পারেনা’। সাক্ষাৎকার দিয়ে আসা ডি-৩ নুরুল ইসলাম, নুর হোসেন, ডি-২ মনির উল্লাহ, এ-৫ বøকের রহমত নুর বাহার ও রোজিয়া বেগম বলেন, ‘জীবনের সুরক্ষার নিশ্চিয়তা ফেলে স্বদেশে ফিরে যাবো। জোর করে কেউ আমাদেরকে মিয়ানমারে নিয়ে যেতে পারবেনা। প্রয়োজনে বাংলাদেশে গুলি করে আমাদের হত্যা করা হোক, তাতে আমরা খুশি। এতে করে আমাদের মৃতদেহ ন্যূনতম জানাজা ও কবরের একটি স্থান পাবে। বুধবার ২১ আগস্ট সকালে ইউএনএইচসিআর ও ক্যা¤প ইনচার্জের প্রতিনিধিরা ঘরে ঘরে এসেছে। তারা বলেছেন তালিকায় তার ও পরিবারের নাম রয়েছে সাক্ষাতকার দিতে ক্যা¤েপ যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমরা মিয়ানমারে ফেরত যাবোনা। যে দেশ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছি, সেখানে কেমনে ফিরে যাব? নির্যাতনের বিচার, নাগরিক অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত হলে স্বদেশে ফিরে যাব’।
সাক্ষাতকার শেষে রোহিঙ্গা মোঃ আয়ুব ও নুর হাশিম বলেন, ‘ প্রতিনিধি দলটি প্রথমেই জিঞ্জাসা করেছেন মিয়ানমার ফেরত যাবো কি-না। আমরা সরাসরি না বলেছি। কারণ আমাদের আগে নাগরিকত্ব ও অধিকার ফিরে ফেলে নিজ দেশ মিয়ানমারে চলে যাব। তবে স¤পদ, ভিটি-বাড়ি ফেরত ও জীবনের সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে’।
সাক্ষাৎকার দিতে আসা রোহিঙ্গা নারী ডি-৩ বøকের সাজিদা ও রাজিয়া বেগম বলেন, ‘বুধবার সকালে ইউএনএইচসিআর ও ক্যা¤প ইনচার্জের প্রতিনিধিরা ঘরে গিয়ে সিআইসি কার্যালয়ে আসতে বলেছেন। এই তালিকায় নাকি আমাদের পরিবারের নাম রয়েছে, নাম যেহেতু রয়েছে, তাই যাব কি যাব না তা সাক্ষাৎকারে গিয়ে বলে যেতে হবে। তাই এসেছি। কিন্তু আমরা কিভাবে মিয়ানমারে ফেরত যাব? যে দেশ থেকে নির্যাতনের স্বীকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসেছি, সেখানে ফিরে যেতে চাই না। মিয়ানমারে নির্যাতনের বিচার, নাগরিক অধিকার ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা ফেলে স্ব-ইচছায় ফিরে যেতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত রয়েছি’। রোহিঙ্গাদের এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন শালবাগানের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) মোহাম্মদ খালেদ হোসেন।
প্রসঙ্গতঃ ইতিপুর্বেও রোহিঙ্গারা সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের দাবি করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সরব হয় মিয়ানমার সরকার। এরই বহিঃপ্রকাশ আগামী ২২ আগস্ট তিন হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি হওয়া। এটি বাস্তবায়নে দুই দেশের মাঝে চলছে তোড়জোড়। এসব কারণে সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে আশাবাদী হন তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গারা। ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে তারা জানান, সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা আছে রোহিঙ্গাদের। তারা মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখলে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে ঘিরে দফায় দফায় বৈঠক, ট্রানজিট ঘাট প্রস্তুত, ক্যা¤প থেকে ঘাট পর্যন্ত নিরাপত্তা নিয়ে রূপরেখা তৈরিতে ব্যস্ত প্রশাসন। তবে যাদের ঘিরে এত আয়োজন সেই সব রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে যেতে মানসিকভাবে কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে এখনও সংশয় রয়েছে। অনেক রোহিঙ্গা নেতা সাফ বলেই দিয়েছেন, তারা তখনই যাবেন যখন নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী উখিয়া-টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। কিন্তু একাধিকবার সময় নির্ধারণ করেও রোহিঙ্গাদের দাবি পূরণ না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি।
এদিকে রাখাইনে সেনাবাহিনী, বিজিপি, উগ্রপন্থী রাখাইন যুবকদের নির্যাতনে বাস্তচ্যুত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নিতে উখিয়ার শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করেন মিয়ানমার সরকার কর্তৃক গঠিত ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমিশন অব ইনকোয়ারি’র (আইসিআই) একটি টিম।
আইসিআই দলটি মঙ্গলবার ২০ আগস্ট বালুখালী ৯নং ক্যাম্পের ৬টি বøক, জি-১৮, জি- ১৯, জি-২০, জি-১, সি-১, সি-২ বøকের বিভিন্ন বাসস্থান ঘুরে দেখেন। একই সাথে জামতলী ক্যাম্পও পরিদর্শন করেন তারা। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দল বালুখালী ক্যাম্পের ইনচার্জ শেখ হাফিজুল ইসলামের কার্যালয়ে আধা ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফিলিপাইনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোজারিও মানালো। সদস্যরা হলেন, মিয়ানমারের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান মিয়াং থেইন, জাতিসংঘে জাপানের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি কেনজো ওশিমা, ইউনিসেফের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড. অন তুন থেট, প্রফেসর ইউশিহিরো নাকানিশি ও লিনা ঘোষ। সোমবার ১৯ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে দলটি কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে রয়েল টিউলিপ হোটেলে বিশ্রাম নিয়ে দুপুর ২টার দিকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালামের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। সেখান থেকে তারা ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করে মঙ্গলবার ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বলেন, ‘এরা ফিরে গেলে ‘এভিডেন্স কালেকশন এবং ভেরিফিকেশন’ নামে আরও একটি প্রতিনিধি দল ক্যাম্পে আসবেন’।

ত্রিমুখী চাপে মিয়ানমার :
২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইনে অভিযান শুরু করে। সেই থেকে এ পর্যন্ত ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এসেছে বাংলাদেশে। তাদের ফিরিয়ে নেয়ার কোনো উদ্যোগ না নিয়ে কার্যত বরং ছলচাতুরিতেই দুই বছর পার করেছে মিয়ানমার। তিন ধরনের বৈরী চাপের মুখে পড়ে পরিত্রাণের আশায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নামে বিশ্বের সঙ্গে মিয়ানমার ফের আইওয়াশ করে ছলনার আশ্রয় নিতে যাচ্ছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
১. আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় নিরাপত্তা পরিষদের মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে দেশটির গণতান্ত্রিক নেত্রী অং সান সু চির। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই তাকে উত্তর দিতে হবে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার সুরক্ষায় এ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নিয়েছেন শান্তিতে নোবেল জয়ী এ নেত্রী।
২. আগামী ২৫ আগস্ট নিজ বাসভূম থেকে রোহিঙ্গা উচ্ছেদের দুই বছর পুরো হতে যাচ্ছে। ফলে ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা ফেরত প্রকল্প স্বল্প মাত্রায় বাস্তবায়ন করতে পারলেও অন্তত মুখ রক্ষার একটা উপায় থাকবে। কিন্ত রোহিঙ্গারা যেসব শর্ত বা দাবি তুলছেন তা পুরন করে নির্ধারিত ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন করা প্রায় অসম্ভব।
৩. রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্তে এ মুহূর্তে বাংলাদেশে অবস্থা করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একটি শক্তিশালী প্রতিনিধি দল। এসব কারণে এতকাল যা-তা বলে কাটিয়ে এলেও এ মুহূর্তে একটি ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছে মিয়ানমার। ফলে বস্তনিষ্ট কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ২২ আগস্ট একটি লোক দেখানো প্রত্যাবাসন আয়োজনে মরিয়া হয়ে উঠেছে মিয়ানমার।
মিয়ানমারের রাখাইন থেকে সেনাবাহিনী লেলিয়ে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা উচ্ছেদ ও তাদের বাংলাদেশ অভিমুখে বিতাড়ন প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। বাংলাদেশের তীব্র প্রতিবাদ এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রবল সমালোচনার মধ্যেও প্রথম থেকেই এ বিষয়ে সেনাভিযানকে পরোক্ষ সমর্থন এবং রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের প্রশ্নে বিস্ময়কর নিষ্ক্রিয়তা দেখিয়ে এসেছেন দেশটির ডি-ফ্যাক্টো নেত্রী অং সান সুচি। এমনকি রোহিঙ্গা সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতি এড়াতে গত দুই বছরে জাতিসংঘের কোনো উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক কোনো আয়োজন কিংবা বৈশ্বিক কোনো সম্মেলনে অংশ নেয়া থেকেও তিনি বিরত থাকেন। এই সময়ে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ অনুসরণে জাতিসংঘ ও ইইউসহ একাধিক বৈশ্বিক সংস্থা মিয়ানমারকে তাগাদা দিলেও কিছুই করেনি তারা। ফলে পরবর্তীতে এসব সংস্থাসহ যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো ক্ষমতাধর দেশগুলোর বহুবিধ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে দেশটির আসল ক্ষমতাধর মিয়ানমারের সেনা নেতৃত্ব। এবার সেই একঘরে দশা কাটিয়ে ওঠার মানসেই প্রায় একতরফাভাবে ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা ফেরতের তারিখ নির্ধারণ করে। তারা যাতে অন্তত কথা বলার মতো একটা সুযোগ পায়। যদিও বিশ্ব সম্প্রদায় ও রোহিঙ্গাদের মৌলিক দাবি, যেমন- নাগরিকত্ব প্রদান ও স্বাধীন চলাফেরার অধিকারসহ অনেকগুলো প্রশ্নের কোনো মীমাংসা এখনো করেনি তারা। ফলে এ উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত বছরের নভেম্বর মাসেও রোহিঙ্গা ফেরতের প্রথম উদ্যোগটি ভেস্তে গেছে মিয়ানমারের মিথ্যাচার ও নির্লজ্জ একগুঁয়েমির কারণে। ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা ফেরতের উদ্যোগটিকে বিশ্বসভায় মিয়ানমারের মুখ রক্ষার মরিয়া প্রয়াস হিসেবে দেখা ছাড়া অন্য কোনো কিছু হিসেবে দেখার ভিত্তি নেই। ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে চুক্তি সই হলেও এখনো শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন। এরমধ্যে ঘটে গেছে নানা ঘটনা। চলেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক বৈঠক। গঠন করা হয় প্রত্যাবাসন কমিশন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মাসে চীন সফরকালে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে আলোচনা করে এ ব্যাপারে চীনের সহযোগিতা চান। আর্ন্তজাতিক চাপে ২২ আগস্ট প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়ার দিন ঠিক হয়েছে। ##


সর্বশেষ সংবাদ