ডেঙ্গু রোগ মহামারী আকারে বেড়েছে এটা “অসত্য” : বাংলা ভাষায় ‘অসত্য’ শব্দটি কি মিথ্যার সমার্থক বুঝায় ?

প্রকাশ: ২ আগস্ট, ২০১৯ ৭:৩১ : অপরাহ্ণ

-হারুনুর রশিদ আরজু::  এখন গত কয়েক বছর যাবত আমাদের দেশের নেতাদের মুখে শুনছি “অসত্য ” শব্দটি ব্যবহার করতে। যারা বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন, টকশোতে কথা বলেন। ইদানীং লক্ষ্য করেছি “মিথ্যা” শব্দটার ব্যবহার মিডিয়াতে একেবারে হয় না বললেই চলে। যেমন বলেন- ছেলে ধরা ঘটনা “অসত্য”। পদ্মা সেতুতে বাচ্চাদের কাটা মাথা ব্যবহার হয় এটা “অসত্য”। ডেঙ্গু রোগ মহামারী আকারে বেড়েছে এটা অসত্য”।
যেমন সম্প্রতি প্রিয়া সাহা নামীয় এক ভদ্র মহিলা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্পের সামনে সরাসরি অভিযোগ করে বলেন যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৩কোটি ৭০লক্ষ লোক গুম হয়েছে এবং বর্তমানে ১কোটি ৮০লক্ষ সংখ্যালঘু লোক নিরাপত্তাহীন আছে। তার এই বক্তব্যটি দেশ-বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে গেছে। সবার বক্তব্য একটাই প্রিয়া সাহা যা বলেছেন সত্য বলেননি। মিথ্যা বলেছেন। কিন্তু আমাদের কয়েকজন মন্ত্রী নেতা এবং টকশোজীবি বলেছেন প্রিয়া সাহার বক্তব্য “অসত্য”। এখানেই আমার প্রশ্ন- তাহলে এই “অসত্য” কথার মানে কী?
“অসত্য” শব্দটি দিয়ে তারা কী অর্থ প্রকাশ করেন বা বুঝাতে চান? ঘটনাটা বা কথাটা “সত্য নয়” বুঝাতে চান? কিন্তু তাহলে সরাসরি ঘটনাটা বা বিবৃতিটা মিথ্যা বললেইতো হয়ে যায়। তারাতো এটা “মিথ্যা” কথা তা বলেন না। মিথ্যা হলেতো সরাসরি “মিথ্যা” বলেছেন বলা হতো। অনেকে হয়তো বলবেন “অসত্য” মানে যা সত্য নয়। অর্থাৎ “অসত্য” কথার মানে দাঁড়াচ্ছে -যা সত্যও নয় আবার যা মিথ্যাও নয়। তাহলে সত্য-মিথ্যার মাঝখানে যা থাকে তাকেই কি “অসত্য” বলে? কিন্তু পাবলিকতো আমার মতো অতো গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেনি মন্ত্রী কেনো প্রিয়া সাহার কথা “মিথ্যা” না বলে সেখানে প্রিয়া সাহার বক্তব্য “অসত্য” বলে চালিয়ে দিলেন? পাবলিকের মাথায় অতো গভীর চিন্তা আসে না। আমি অনেক চেষ্টা করেছি “অসত্য” শব্দের অর্থ বা তাৎপর্য খুঁজে বের করতে।
ছোট বেলা থেকে বড়দের কাছে উপদেশ শুনে বড় হয়েছি- “সদা সত্য কথা বলবে, কখনও মিথ্যা কথা বলবে না” । এরপর ইস্কুলে গেলাম । ওখানেও পড়তে হলো – Allows speak the truth. Never tell a lie. ইস্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসা এমন কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে না, যেখানে সত্য /মিথ্যা ‘র বাইরে “অসত্য” নামে কোনো শব্দ পড়ানো হয়েছে । বিভিন্ন ক্লাসে পরীক্ষায় সত্য বা মিথ্যা নির্ণয় করতে বাক্য লিখে দিতো। আমরা লিখতাম এটা সত্য কিংবা এটা মিথ্যা। কিন্তু কোথাও কোনো ক্লাসে পাইনি “অসত্য” বাক্য বের করতে।
ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা ব্যাকরণ পড়ানো হয় । বাংলা ব্যাকরণের কোথাও “অসত্য ” শব্দটি সম্পর্কে কোনো ব্যবহার শিখানো হয়নি। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শব্দের বিপরীত শব্দ শিখানো হতো, যেমন -রাত/দিন, সত্য /মিথ্যা ইত্যাদি। কোথাও অসত্য শব্দের বিপরীত শব্দ লিখতে বলা হতো না। যেহেতু “অসত্য” শব্দটির বিপরীত শব্দ পড়ানো হয়নি। বাংলা ভাষায় অসংখ্য প্রবাদবাক্য প্রচলিত আছে। তারমধ্যে সত্য এবং মিথ্যাকে নিয়েও প্রবাদবাক্য রয়েছে। যেমন-“সত্যবাদী যুধিষ্ঠির” কিংবা “মিথ্যাবাদী রাখাল”। কোথাও অসত্যবাদীর নামে কোনো প্রবাদবাক্য নেই। কেউ পড়েছে বলে দাবীও করতে পারবে না।
নিজে বেশ কয়েক বছর শিক্ষকতাও করেছি, “অসত্য” নামে কোনও শব্দ পড়াইনি। সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক জগতে বিচরণ গত প্রায় ত্রিশ বছর কোথাও “অসত্য” শব্দ পাইনি। নজরুল- রবীন্দ্রনাথের গল্প ,উপন্যাস, কবিতা ও গানের রাজ্যে আমি সাঁতার কেটেছি, “অসত্য ” শব্দটি পাইনি। বাংলা সাহিত্যের দুই বাংলার সব বড় এবং বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের জনপ্রিয় বই-লেখা পড়েছি, কোথাও “ অসত্য” শব্দটি পাইনি । একটা বাংলা ভাষার বিখ্যাত কবিতা মনে পড়ে গেলো যা কেবল সত্য-মিথ্যাকে নিয়ে। কবিতাটির নাম -“সত্য মথ্যিা” কবির নাম – “মধুকবি”
“সত্য মিথ্যার সংঘাত হলো
সব কিছু তাই এলোমেলো,
মিথ্যেরা আজ সমাজপতি
সত্যের নেই কোন গতি ।
মিথ্যার কাছে সত্য আজ
করেছে আত্মসর্মপন ,
মিথ্যার আজ জয়জয়কার
সত্যের হলো বিসর্জন ।
সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি মানুষ
আজ বড়ই বেসামাল ,
সত্যের পূজারী মানুষেরা
আজ হচ্ছে নাজেহাল ।
সত্য আজ শো কেসে বন্দী
এসেছে মিথ্যার জোয়ার ,
ক্ষমতার দন্দ্বে মিথ্যেই আজ
হয়েছে বড় হাতিয়ার।
এই অসাধারণ কবিতাটির কোথাও অসত্য শব্দটি পাওয়া যায়নি। রবীন্দ্রনাথ বহুল প্রচলিত একটি লাইন-“সত্য যে কঠিন,/ কঠিনরে ভালবাসিলাম/সে কখনও করে না বঞ্চনা” এখানেও অসত্য শব্দ নেই। লালন বলেছেন- সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন। সালমান শাহ অভিনীত একটা জনপ্রিয় বাংলা সিনেমা নাম রাখা হয় “সত্যের মৃত্যু নাই”।
আমাদের দেশে আদালতে কোনো মামলা তোলা হলে সেখানে স্বাক্ষীকে কাঠগোড়ায় দাঁড় করিয়ে শপথবাক্য পাঠ করানো হয়। স্বাক্ষীকে ধর্মগ্রন্থের উপর হাত রেখে বলতে বলা হয়-“আমি শপথ করিতেছি যে- যাহা বলিবো সত্য বলিবো, সত্য বই মিথ্যা বলিবো না”। এখানেও দেখা যায় সত্য এবং মিথ্যার বাইরে অন্য কোনো কথা বলার সুযোগ নেই। “অসত্য” কোনো কথা আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়।
আমাদের অনেক মনিষী তাদের বাণীতেও সত্য মিথ্যার কথা বলে গেছেন। কোথাও “অসত্য” শব্দটি বলেননি। যেমন- সাহিত্যক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন- মিথ্যারও মহত্ত্ব আছে। হাজার হাজার মানুষকে পাগল করিয়া দিতে পারে মিথ্যার মোহ। চিরকালের জন্যে সত্য হইয়াও থাকিতে পারে মিথ্যা।” জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন-“সত্য কথাগুলো সব সময় বক্তৃতার মতো শোনায়, মিথ্যাগুলো শোনায় কবিতার মত ”।
“অসত্য” শব্দটা নেতারা যে না জেনে না বুঝে বলেন তা কী করে হয়? তারা যখন বলেন কথাটা “অসত্য”, আর তখন আমরা বুঝি বা ধরে নিই তিনি কথাটাকে “মিথ্যা” বলেছেন। আসলে তিনি যে কৌশলে উত্তর দিয়েছেন তা কেউ ধরতে পারেননি। যারা কোনো বিষয়ে “অসত্য” শব্দ ব্যবহার করেন নিশ্চয়ই তাদের মনের মধ্যে অন্য কোনো অর্থ নিয়েই বলেন, যা সবার পক্ষে রহস্য ভেদ করা সম্ভব নয়। অবশ্যই “অসত্য” শব্দটি একটা রহস্যময় শব্দ। যা কেবল ভাষাবিদরাই অনুমান করতে পারেন। যেমন রহস্যময় আমাদের নেতাদের চরিত্র। সকালে যাকে বলেন “পায়খানা’ বিকালে সেটাকেই বলেন ‘হালুয়া’। “অসত্য” শব্দটিকে যারা মিথ্যার সমার্থক শব্দ মনে করেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। “অসত্য” শব্দটি মিথ্যার সমার্থক শব্দ নয় যা আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সব বিষয় থেকে খোঁজার চেষ্টা করেছি। শুধু প্রিয়া সাহার বক্তব্যের ক্ষেত্রেই নয় দেশের অনেক ঘটনা এবং বক্তব্য যা পুরোপুরি “মিথ্যা” বলে জনগণ জানে মানে বিশ্বাস করে। কিন্তু খেয়াল করবেন আমাদের নেতারা মিডিয়ায় যখন বিবৃতি তখন বলেন- কথাটা বা ঘটনাটা “অসত্য”। নেতারা কিছুতেই বলেন না কথাটা- “মিথ্যা”। তাই পাঠক, প্রিয়া সাহা যে বক্তব্য ট্রাম্পের কাছে রেখেছেন তাকে কী বলা হবে- “সত্য”, “মিথ্যা” নাকি “অসত্য”? আপনারাই চিন্তা করুন।
লেখক ঃ কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক।
arzufeni86@gmail.com


সর্বশেষ সংবাদ