স্থানীয় ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশিক্ষিন

প্রকাশ: ১৭ জুলাই, ২০১৯ ৬:১৯ : অপরাহ্ণ

টেকনাফ প্রতিনিধি **
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে গভীর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঝড়ের কারণে প্রায় তিন ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছাস হয়েছিল বাংলাদেশের উপকূলীয় কিছু কিছু জায়গায়। ফলে সম্প্রতি সময়ে সাত বছরের একটি ছেলে শিশু ঘরে ফেরার পথে জলোচ্ছাসের পানিতে ভেসে যায় এবং মারা যায়। অন্য এক ঘটনায়, একটি ১০ বছরের ছেলে শিশু তার বাড়ির সামনেই ডুবে মারা যায়।হতভাগ্য এই শিশু দুটি ছিল সহোদর। রোহিঙ্গা শিবিরের লিবা আক্তারের ছেলে ছিল ওরা। গত বর্ষায় এভাবেই দুই ছেলে শিশুকে হারান লিবা । তারই সুত্রে ধরেই সন্তানহারা লিবা এরপর সিদ্ধান্ত নেয় দুর্যোগ মোকাবেলায় তার কিছু একটা করতেই হবে, যাতে আর কোন মা যেন তার সন্তান না হারান।

এ লক্ষ্যেই লিবা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এর দুর্যোগ মোকাবেলার প্রশিক্ষণ কর্মসূচীতে কর্মতৎপর হয়ে উঠে। আইওএম এই ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচী স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও ক্যাম্পবাসী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আয়োজন করছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম- এর ন্যাশনাল কমিউনিকেশন অফিসার তারেক মাহমুদ। তিনি পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

এদিকে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে ককক্সবাজারের প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্পগুলোর কাছাকাছি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা লিবার মতে তাদের সবসময় শংকার মধ্যে জীবনযাপন করতে হয়।
সন্তান হারা লিবা বলেন, “যেকোন সময় কোথাও না কোথাও ঝড়ো বাতাস ও ভারী বৃষ্টিপাত হয় এবং মানুষ মারা যায়। আমরা আবহাওয়া বদলাতে পারব না কিন্তু আমরা তো প্রস্তুত ত থাকতে পারি।“

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আইওএম ২০১৮ সাল থেকেই ঘূর্ণিঝড় এবং মৌসুমী ঝড়ের ব্যাপারে প্রশিক্ষণের কাজ করে আসছে। ১৮-২০ জনের ব্যাচ গঠন করে আইওএম বিশেষজ্ঞরা ঘূর্ণিঝড় এবং মৌসুমী ঝড়ের জন্য ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতামূলক সংকেত এবং পতাকা’র অর্থ ও করণীয় বিষয়গুলোতে প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষণার্থীরাও শিখতে পারছে কিভাবে জরুরীভিত্তিতে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হয় এবং কিভাবে প্রাদুর্ভাব ছড়ানো পানিবাহিত রোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হয়। প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থীরা তাদের প্রশিক্ষন গ্রহণ শেষে তাদের স্থানীয় জনগোষ্ঠী’র মধ্যে ছড়িয়ে পড়েন এবং তারা দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতি বিষয়ে যা যা শিখেছেন তা স্থানীয়দের মধ্যে প্রচার করেন যাতে অন্যরাও এসব জরুরী প্রশিক্ষণগুলো নিতে আগ্রহী হয়। সর্বশেষ গত সপ্তাহেই ২০০ জন এই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছেন। উল্লেখ্য গত সপ্তাহজুড়েই গোটা কক্সবাজার ভারী বৃষ্টিপাতে অনেকটাই অচল হয়ে পড়ে।

গত ২০১৮ সালের মার্চ শুরু করে এখন পর্যন্ত উখিয়া ও টেকনাফের ১৩ হাজার ৪৪৬ জন স্থানীয় মানুষকে দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতি বিষয়ক নানা আলোচনা ও প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছে। এসব বিষয়গুলো ছাড়াও মানব পাচার প্রতিরোধের উপরেও জোর দিয়ে থাকেন।

আইওএম-এর ডিজেস্টার রিস্ক রিডাকশন (ডিআরআর) বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেছেন, “বাস্তবতা হচ্ছে মানব পাচারকারীরা দুর্যোগকালীন সময়টিকে একটি সুযোগ হিসেবে চিন্তা করে। দুর্যোগ নানা ঝুঁকির কারণ এবং মানুষ এই সময়ে খুবই অসহায় হয়ে পড়ে যা পাচারকারীদের সুযোগ করে দেয়। কক্সবাজার জেলায় অনেক আর্থ-সামাজিক সমস্যা আছে যার ফলে এখানকার বাসিন্দারা মানব পাচারের দালালদের খপ্পরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
তিনি আরে বলেন, “তারা স্থানীয় এলাকায় ঢুকে পড়ে এবং ঐসব এলাকার মানুষদের সাথে মিশে যেতে চেষ্টা করে। তখন তারা এলাকাগুলোর সবচেয়ে দুর্বল ও অভাবী লোকদের খুঁজে বের করে এবং তাদের টাকার লোভ দেখায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব দালালরা মানুষদের লোভ দেখায় যে তাদের শুধু যাতায়াত ভাড়া দিয়েই মালয়েশিয়া পৌঁছে দিবে যেখানে চাকরি নিশ্চিত। কোন ভুক্তভোগী যদি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে তখন সে নানা জটিলতায় পড়ে এমনকি তার পাসপোর্টও জব্দ হয় এবং তাকে জেলখানার মত পরিবেশে থাকতে হয়। পুরুষদের নির্মাণাধীন সাইটগুলোতে ঘন্টার পর ঘন্টা কাজ করতে হয় এবং তাদের পারশ্রমিক হুবই সামান্য হয়। নারীদের জোরপূর্বক অপব্যবহার ও যৌন হয়রানির সম্মুখীনও হতে হয়।

প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী ৩০-বছর-বয়সী আনোয়ারা বেগম বলেন, যে মানব পাচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হওয়ায় তার এলাকায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। “এখন আমরা যদি প্রতারক-দালালদের সাথে কথা বলি তাহলে সহজেই তাদের চিহ্নিত করতে পারব। এখন আমরা জানি কোন দেশে কি কি ধরনের পারমিট নিয়ে বৈধভাবে যেতে হবে।“

fil pic


সর্বশেষ সংবাদ