আমাদের টেকনাফ ও ইয়াবা

প্রকাশ: ১৩ জুলাই, ২০১৯ ২:২০ : পূর্বাহ্ণ

লেখক : লে. কর্নেল মোঃ সাইফুল ইসলাম:

সেনা কর্মকর্তা, সেনাসদর, কিউএমজি’র শাখা (এসটি পরিদফতর)::

ইয়াবা’ (Yaba) একটি থাই শব্দ। যার অর্থ হচ্ছে Crayy Medicine. এটা মিথামফ্যাটামিন (Methamphatamine) একটি শক্তিশালী Stimulate. অর্থাৎ এটা একটি শক্তিশালী উদ্দীপক। এটা শুরুর দিকে শুধু মানবদেহেরই উদ্দীপক ছিল বটে। কিন্তু ইয়াবা এখন সমাজ, রাষ্ট্র ছাড়িয়ে উপমহাদেশের একটি খারাপ উদ্দীপক হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে এর প্রভাব ভাববার বিষয়। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি মহাপ্রলয়ের চাইতে কোন অংশেই কম নয়। মহাপ্রলয় আসে ধ্বংসযজ্ঞ করে চলে যায়। মানুষ পরে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে জনপদকে আবার মুখরিত করে তোলে। কিন্তু ইয়াবার মহাপ্রলয় যেন থামবার নয়। এটা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়তই ধ্বংস করে যাচ্ছে। এতে প্রাণহানি ঘটে, মানুষ আহত হয় আর ইয়াবার মহাপ্রলয়ে ব্যক্তি নিঃশেষ হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। সমাজে নানাবিধ অপরাধের সৃষ্টি হয় ও আইনশৃৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। রাষ্ট্র এক বিশাল নেশায় বুদ হওয়া জনগোষ্ঠী নিয়ে নানা বিপাকে পড়ে ও এক অনিশ্চয়তার দিকে এগোতে থাকে।

সম্প্রতি মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। ইয়াবাসহ মাদকের এক বিশাল অংশ যা মূলত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার থেকে পাচার হয়ে আমাদের দেশে আসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইয়াবার বিরুদ্ধে আগের তুলনায় অনেক অনেক সোচ্চারও বটে। তারপরও ইয়াবা নিয়ে আমার লেখার এত আগ্রহ হলো কেন? আমার আগ্রহটা হলো পত্রিকার একটি সংবাদ পড়ে। সেটা ছিল এ রকম যে- ‘বন্দুকযুদ্ধেও থামছে না ইয়াবা পাচার’। অদ্ভুদ ও কিছুটা হতাশার বার্তা বহন করে এটি। অর্থাৎ মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও আমাদের সমাজের কিছু লোক এ ব্যবসা থেকে পিছপা হচ্ছে না। সত্যি অবাক করা কান্ড আর সুস্থ মস্তিষ্কের বাবা-মার কাছে একটি আতঙ্কের বার্তা। তাহলে আমাদের ছেলেমেয়েরা, যুবকরা কতটা নিরাপদ এই ইয়াবা থেকে? বাঙালীর বহু সাফল্য রয়েছে। আমরা জাতি হিসেবে অনেক সাহসী, আমাদের সংস্কৃতি অনেক সমৃদ্ধ। আমাদের মূল্যবোধ, আমাদের স্বকীয়তা, আমাদের বীরত্ব বিশ্বজুড়ে। তবে কেন আমরা পারব না এই ইয়াবার গ্রাস থেকে আমাদের সমাজকে এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রকে বাঁচাতে। রিপোর্টটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইয়াবা ব্যবসায়ীর বাড়িও নাকি জব্দ করার প্রয়াস চালাচ্ছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আমরা তাদের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরও বহু পদক্ষেপেরও আশা করি। শুনেছি ইয়াবা নৌকায় করে নদী পার হয়ে, খাল পার হয়ে আমাদের দেশে ঢোকে। আমরা সীমান্তের নৌকার বিকল্প দেখতে চাই, প্রয়োজনে নৌকার ওপর নির্ভরশীল স্বল্পসংখ্যক পরিবারের জীবন-জীবিকার পরিবর্তনও ঘটাতে চাই। দেশ বঁাঁচাতে স্বল্পসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকার পরিবর্তন ঘটানোটা সময়ের দাবি বটে। এতে অবাক হবার কিছু নেই, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ইলিশ ধরা বন্ধ করতে সরকার যদি জেলেদের চাল দিতে পারে, অর্থ দিতে পারে, দেশের মানুষের জন্য সুস্বাদু মাছ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে; তবে অবশ্যই সরকার সীমান্তে এসব নৌকার ওপর নির্ভরশীল গুটিকয়েক মানুষের জীবিকার বিকল্প ভেবে দেখতে পারে। সীমান্তে জনগণের চলাচলের জন্য বিশেষ নৌকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে ও অন্যান্য নৌকা চলাচল বন্ধ করা যেতে পারে এবং নদী ও খাল দিয়ে চলাচলের একটা নির্দিষ্ট সময়সীমাও দেয়া যেতে পারে। নৌকা চলাচলের এ পদক্ষেপ স্বল্প বা দীর্ঘ সময়ের জন্য হতে পারে। ইয়াবা চোরাচালানের কম বা বেশির ওপর নির্ভর করে এ অঞ্চলের নৌকা চলাচলে এ নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘ বা স্বল্প মেয়াদের হবে তা নির্ধারণ করা যেতে পারে। ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গ কি.মি. কে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য কয়েক শত বর্গ কি.মি. এর কিছু মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য চলে এবং এতে ঐ এলাকার জনগণ স্বাচ্ছন্দ্যই বোধ করবে বলে আমার মনে হয়। লোকমুখে শুনেছিলাম, টেকনাফের ১৫ বছর আগের স্যাটেলাইটের ছবিতে গ্রামগুলোর যে দালানকোঠা ছিল তা নাকি এখন ১০ গুণ বা তার চেয়েও বেশি দেখাচ্ছে। তা হলে প্রশ্ন হলো, টেকনাফবাসী এমনকি আলাদিনের চেরাগ পেল যে- গত ১৫ বছরে গ্রামগুলোতে বড় বড় ইমারত বানিয়ে ফেলল। তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের টেকনাফের ইমারত, আলীশান বাড়িরও খবর নেয়া দরকার। প্রয়োজনবোধে টেকনাফের বাইরের অন্যান্য শহরেও যদি তাদের (ইয়াবা ব্যবসায়ীদের) সম্পদ থেকে থাকে তারও একটা হিসাব নেয়া জরুরী। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নিজ পরিবারের সদস্যদের বেনামে পরিচালিত সকল প্রকার ব্যাংক হিসাব অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন এবং অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা সকল প্রকার ব্যাংক হিসাব জব্দ করাও এখন সময়ের দাবি। ইয়াবার টাকায় তৈরি বাড়ি জব্দ ও বাড়ির সামনে বড় বড় সাইনবোর্ডে ইয়াবা বাড়ি, ইয়াবার টাকায় তৈরি বাড়ি জব্দ বা এ রকম বিশেষণ যোগ করা যেতে পারে। অনেকেই হয়ত ভাববেন একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না ? আমার দৃষ্টিতে যারা দেশের যুব সমাজকে ধ্বংস করে আলীশান বাড়ি বানায়, সে বাড়ির সামনে শুধু সামান্য সাইনবোর্ড নয়- বাংলাদেশের জনগণ এ রকম বাড়ি ধুলার সঙ্গে মিশে গেলেও কিছু মনে করবে না। অনুমতি না নিয়ে বাড়ি বানানো যদি আইন অমান্য করার অপরাধে ভাঙ্গা যায় তবে মরণ নেশার ইয়াবা, সমাজ ধ্বংসের ইয়াবা, পরিবার ধ্বংসের ইয়াবা ও ইয়াবা বিক্রির বাড়ি পথের ধুলায় মেশাবারই কথা নয় কি?

আমরা আর একটিও টগবগে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় যুবককে হারাতে চাই না। আমরা একটি সুখী পরিবারকে ইয়াবার কারণে দুঃখী ও নিঃস্ব পরিবার হতে দেখতে চাই না। আমরা ইয়াবার কারণে আমাদের সমাজ ধ্বংস হয়ে যাক তা চাই না। আমরা আমাদের রাষ্ট্রের পাশে থাকতে চাই, মাদকের বিরুদ্ধে প্রচলিত সকল অভিযানের পাশে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল বাড়াতে চাই। টেকনাফ মাদকের জনপদ নয়, সুখ-শান্তির একটি জনপদ হিসেবে দেখতে চাই।

সবশেষে বলতে চাই, আমরা মিথামফ্যাটামিন ও ক্যাফিনের মিক্সারে আবদ্ধ থাকতে চাই না। শুনেছি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে খুবই নগণ্যসংখ্যক হলেও কেউ কেউ ইয়াবা সেবন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তাই টেকনাফে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রতি ৩ মাসে একবার করে মাদকাসক্ত কিনা তা নিরূপণ করা জরুরী। এ ছাড়া এ বাহিনীর যে সকল সদস্য বেচাকেনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকবে তাদেরকে অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এ ধরনের সংবাদ প্রচার মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ছাপানোর দাবি করছি। ইয়াবার ক্ষতিকর দিকগুলো অবশ্যই ঞঠ চ্যানেলগুলোতে গুরুত্বসহকারে প্রচার করা প্রয়োজন। ইয়াবায় নেশাগ্রস্তদের সাক্ষাতকার নিয়েও তা প্রচার করা যেতে পারে। এতে দেশের সকল বয়সের নারী-পুরুষ ইয়াবার ক্ষতিকর দিকগুলো ভালভাবে বুঝতে পারবেন ও ইয়াবা হতে সজাগ থাকবেন।

ইয়াবা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে এর কোন বিকল্প নেই। পরিবারের সকল সদস্যের মধ্যে একটা ভাল বোঝাপড়া থাকা, সঙ্গতি থাকা খুবই জরুরী, এটা মাদককে দূরে রাখতে সাহায্য করে। সন্তান কার সঙ্গে মিশে, সারাদিন কোথায় সময় কাটায়, একবার ভেবে দেখুন ও খোঁজ নিন। সারাদিনে অন্তত একবার পরিবারের সকলের সঙ্গে খাবার খেতে বসুন, খাবার খান। একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশুন, সন্তানসহ পরিবারের সকলের কথা শুনুন। পরিবারের সদস্যদের সময় দিন, না হলে হয়তবা মাদক/ইয়াবা আপনার পরিবারের সদস্যদেরকে সময় দেবে- যেটা মোটেই সুখকর নয়। সন্তানদের জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করুন আর অসুস্থ বিনোদন থেকে সন্তানদের দূরে রাখুন। পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসন নিজে মেনে চলুন ও অন্যদেরকে তা অনুসরণ করতে উৎসাহিত করুন। ধর্মীয় অনুশাসন আমাদেরকে মাদক থেকে বিরত রাখতে এক বিরাট ভূমিকা রাখে। এখনও সমাজের অধিকাংশ মানুষ ভাল ও সুস্থ বিনোদনের আশা করে। বাঙালী সংস্কৃতিকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যায়ে পালন, লালন ও ধারণ করুন। আমাদের এ ঐতিহ্য মাদককে ‘না’ বলতে শিখায়।

ইয়াবা সমাজ থেকে নির্মূল করতে হলে জনসচেতনতার কোন বিকল্প নেই। ইয়াবা আস্তানাগুলোও সমাজের বসবাসকারী মানুষের বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অজানা নয়। তাই ইয়াবাকে রুখতে, মাদককে রুখতে জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পৃক্ত করা খুবই জরুরী। কিভাবে এই সম্পৃক্ততা করা যায়, কত দৃঢ়ভাবে, কতটা কার্যকরভাবে করা যায় তা নীতি নির্ধারকরাই ঠিক করবেন। সংবাদ মাধ্যমগুলোর উচিত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সকল সফলতাকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত, যে সকল সাহসী সংবাদকর্মী-সাংবাদিক এই ইয়াবার তথ্য-উপাত্ত অনুসন্ধান করে জনগণকে সচেতন করেন, ইয়াবার বিস্তাররোধে দেশ ও জাতিকে সাহায্য করে তাদের নিরাপত্তা দেয়া। আসুন, মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর প্রচলিত জিরো টলারেন্সে আমরা সবাই সম্পৃক্ত হই।

লেখক : সেনা কর্মকর্তা, সেনাসদর, কিউএমজি’র শাখা (এসটি পরিদফতর)

প্রকাশিত : ১৩ জুলাই ২০১৯


সর্বশেষ সংবাদ