টেকনাফে ইয়াবার চালান কমেছে ৭০ শতাংশ: ওসি প্রদীপ

প্রকাশ: ২৬ জুন, ২০১৯ ৯:০৭ : অপরাহ্ণ

টেকনাফ নিউজ ডেস্ক::

বাংলাদেশে প্রবেশের প্রধান রুট কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে কমে এসেছে ইয়াবার চালান। কিন্তু তাতেও কোনো ঘাটতি নেই মরণ নেশা ইয়াবার। কারণ আলাদা রুট খুঁজে নিয়েছে কারবারিরা। ইতিমধ্যে নতুন নতুন রুট দিয়ে ইয়াবা আসায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা।
টেকনাফের বাসিন্দারা জানান, রাজনৈতিক দলের অনেক নেতা-কর্মী আছেন যাদের নাম তালিকায় আছে। কিন্তু এ অভিযানে তাদের গায়ে হাত পড়েনি। তারা আত্মসমর্পণও করেননি। রাজনৈতিক পরিচিতি থাকার সুবাদে তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এতে যেমন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ আছে, তেমনি বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীও আছেন।

টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার বলেন, ‘আগে ঢালাওভাবে ইয়াবা এলেও এখন টেকনাফে ৭০ শতাংশ ইয়াবার চালান কমে গেছে

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযানের মধ্যেও টেকনাফ দিয়ে প্রচুর ইয়াবা প্রবেশ করত। কিন্তু সম্প্রতি ১০২ গডফাদার পুলিশের সেইফ হোমে যাওয়ার পর থেকে নতুন রুট খুঁজতে শুরু করে ইয়াবা কারবারিরা। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় জেলে ও রোহিঙ্গাদের প্রধান বাহক বানিয়ে ইয়াবার চালান আনছে তারা।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকাভুক্ত ১ হাজার ১৫১ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর মধ্যে যারা গডফাদার ছিলেন তার বেশির ভাগই পলাতক। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যারা আত্মসমর্পণ করেছেন তারা প্রায় সবাই টেকনাফের ব্যবসায়ী। কিন্তু উখিয়া ও কক্সবাজারের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই পুরনো ব্যবসায়ীরাই অর্থ লগ্নি করে ইয়াবা ব্যবসা সচল রেখেছেন। এজন্য রোহিঙ্গা ও জেলেদের বেছে নেওয়া হচ্ছে।

তারাই আয়েশি জীবনের আশায় দেশে ইয়াবা আনছেন। তবে আত্মসমর্পণকারীদের স্বীকারোক্তিতে পাওয়া আরও দেড় শ জন ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার ও ক্রসফায়ারে ইয়াবা রাজা সাইফুল করিমসহ ৫৯ জন কারবারি নিহত হলেও ইয়াবার দৌরাত্ম্য কমেনি। পুরনো ব্যবসায়ীরা নতুন সব রুটে ইয়াবার চালান আনছেন। উল্লেখ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরদার অভিযান ও ‘বন্দুকযুদ্ধে’র কারণে ১০২ ইয়াবা কারবারি ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে অস্ত্র, ইয়াবাসহ আত্মসমর্পণ করেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

তারা এখন কক্সবাজার জেলে আছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণের পর এলাকার মানুষ ধারণা করেছিল, এই অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে যাবে। বন্ধ হবে ইয়াবা আসাও। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি। আত্মসমর্পণের দিন থেকে প্রায় প্রতিদিনই ভয়ঙ্কর মাদক ইয়াবা ধরা পড়ছে। সূত্রমতে, টেকনাফের পর উখিয়া উপজেলার থাইংখালী রহমতের বিল, পালংখালী, বালুখালী ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তমব্রু সীমান্তকে ইয়াবা পাচারের রুট হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রপথে জেলেদের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর, পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে ইয়াবার চালান। আগে শুধু নাফ নদ বেছে নিলেও বর্তমানে লাইক্ষ্যংছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকাসহ ১২ থেকে ১৫টি রুট বেছে নিয়েছেন ইয়াবা কারবারিরা। সূত্র জানান, মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় এখনো অনেক ইয়াবার কারখানা রয়েছে। কারখানার মালিকরা ওখানকার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতায় ইয়াবার চালান পৌঁছে দিচ্ছেন মাছ ধরার নৌকায়। মূলত গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার আড়ালে অদলবদল হয় ইয়াবা। হোয়াইকং থেকে শেমলাপুর পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার জেলে বাস করেন। বর্তমানে এদেরই একটি অংশ বাহক হিসেবে কাজ করছেন। তাদের সঙ্গে ভিড়েছেন আশ্রিত রোহিঙ্গারাও। টেকনাফে দীর্ঘদিন কাজ করছেন এমন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘একসময় যে এলাকার বেশির ভাগ মানুষ নিজেদের পেশা হিসেবে ইয়াবাকে বেছে নিয়েছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা বড় চ্যালেঞ্জ। তার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় টেকনাফে ইয়াবা কমে এসেছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বসে নেই। রুট পাল্টে ইয়াবা আনার চেষ্টা করছেন। যেহেতু নানা সীমাবদ্ধতায় গভীর সমুদ্র ও সীমান্তে শতভাগ নজরদারি করা সম্ভব হয় না, সে সুযোগটা তারা নেওয়ার চেষ্টা করবেই। তবে আমরাও সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। ইয়াবা নির্মূল হবেই। ’টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার বলেন, ‘আগে ঢালাওভাবে ইয়াবা এলেও এখন টেকনাফে ৭০ শতাংশ ইয়াবার চালান কমে গেছে। এখন অন্য রুটগুলোয় নজরদারি বাড়ানো উচিত।

এদিকে সম্প্রতি ইয়াবার বড় যে চালানগুলো ধরা পড়েছে তার বেশির ভাগই গভীর সমুদ্র দিয়ে আনা হয়েছে বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। পরে সুবিধা বুঝে এগুলো বিভিন্ন পন্থায় সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বশেষ অভিযানগুলোর দিকে তাকালেও স্পষ্ট হয় ইয়াবার রুট পরিবর্তনের চিত্র।

প্রাপ্ত তথ্যমতে আত্মসমর্পণের আগের দিন ১৫ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের কুরুশকুলে গভীর সমুদ্রে একটি মাছ ধরার ট্রলারে তল্লাশি করে ১ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে র‌্যাব। এ সময় চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলেন উখিয়ার কুতুপালং গ্রামের ছলিমুল্লাহর ছেলে এনায়েত উল্লাহ (২৫), বালুখালীর ইয়াছিনের ছেলে আবদুল হামিদ (২২), রশিদ সালামের ছেলে করিমুল্লাহ (২৬) ও টেকনাফের থাইংখালী গ্রামের নূর আহম্মদের ছেলে রশিদুল্লাহ (২৪)। তারা সমুদ্রপথে বেশ কয়েকটি চালান আনার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে র‌্যাব। একই দিন ভোরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির পাশের রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের হাজিরপাড়ার একটি খামারবাড়ি থেকে সাড়ে ৪ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। এর পরদিন রাতে কক্সবাজার লিংক রোড এলাকায় হানিফ পরিবহনের ইজতেমাগামী একটি বাসের ভিতরে রাখা গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ৪০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করে র‌্যাব। এর আগে ১৪ ফেব্রুয়ারি উখিয়ার বালুখালী পানবাজারে ১৪ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুই রোহিঙ্গাকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, তালিকার বাইরে আরও হাজারখানেক ইয়াবা কারবারি সক্রিয় আছে। তাদের রসদ জোগাচ্ছেন গডফাদাররা। এ চক্রের কেউ আত্মসমর্পণ করেননি। ফলে ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

টেকনাফের বাসিন্দারা জানান, রাজনৈতিক দলের অনেক নেতা-কর্মী আছেন যাদের নাম তালিকায় আছে। কিন্তু এ অভিযানে তাদের গায়ে হাত পড়েনি। তারা আত্মসমর্পণও করেননি। রাজনৈতিক পরিচিতি থাকার সুবাদে তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এতে যেমন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ আছে, তেমনি বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীও আছেন।


সর্বশেষ সংবাদ