১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা, মানবতার ভারে বাংলাদেশ !

প্রকাশ: ২২ জুন, ২০১৯ ১:১৩ : অপরাহ্ণ

আবদুর রহমান,টেকনাফ **
পাহাড়ের চূড়ায় দাড়িঁয়ে এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরের দেখা মিলে কক্সবাজারের। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এ জেলায় চার দফায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মাথা গুজানো ঠাই মিলে। সীমান্ত ঘেঁষা নাফনদের ওপারের (মিয়ানমারে) সেনাবাহিনীর ববর্রতায় যখন বিপন্ন সেখানকার রোহিঙ্গা জীবন, ঠিক তখনই তাদের আশ্রয়দাতা হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছে অন্য এক মানবিক বাংলাদেশ। রাখাইন থেকে বাংলাদেশে নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থী স্্েরাত আসা শুরু হয় ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে। তাতে সাত লাখ ২০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গাকে মানবিক চিন্তায় আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ। এখন এই ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গার ভার বইতে পারছেনা বাংলাদেশ!

গেল ২০ জুন- বিশ্ব শরণার্থী দিবসে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভার নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর মুখপাত্র জোসেফ ত্রিপুরা বলেছিলেন, অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও শরণার্থী পালিত হয়েছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ৯ লাখ ১০ হাজার।

তবে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, বর্তমানে নতুন ও পুরাতন মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফ দুটি উপজেলায় ১০ লাখের মত রোহিঙ্গা রয়েছে। এদিকে বহিরাগমন বিভাগ ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নতুন ও পুরাতন মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফ দুটি উপজেলায় সর্বশেষ ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৪ রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করা হয়েছে। তবে বর্তমানে সে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কিন্তু আসলে বাংরাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা কত?

সরেজমিনে দেখা গেছে,

টেকনাফ ও উখিয়া মিলে বর্তমানে চার দফায় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়, বন ও জঙ্গল কেটে ৩৪টি শরাণার্থী শিবিরে আশ্রয়স্থল গড়ে তুলেছেন। তবে এখন যেন উখিয়া ও টেকনাফের সর্বত্র শরণার্থী শিবির। এ দুই উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা চার লাখ ৭১ হাজার ৭৬৮। এ নিয়ে সংশয় নেই- ২৪ আগস্ট রাতের পর মিয়ানমারের রাখাইনে শুরু হওয়া সেনা অভিযানের পর আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা স্থানীয়দের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে। এছাড়া দিন যতই গড়াচ্ছে, রোহিঙ্গা শিবিরে বাড়ছে অস্থিরতা। একই সঙ্গে বাড়ছে হত্যা, গুম, অপহরনসহ নানা অপরাধ। এইভাবে চলতে থাকলে এক সময়ে গুটা এশিয়াতে অস্তিরতা বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ যেভাবে

সংশ্নিষ্টদের ভাষ্য মতে, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ শুরু হয় ১৯৭৮ সাল থেকে। সেবার বাংলাদেশে আসা তিন লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে আড়াই লাখ শরণার্থী মিয়ানমার পরে ফিরিয়ে নিয়েছিল। ১৯৯২ সালে আসে দুই লাখ ৫৫ হাজার ৫৫৭ জন শরণার্থী। এর মধ্যে মিয়ানমার ফিরিয়ে নিয়েছে দুই লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে। ফলে প্রতিবারই কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে থেকে গেছে। তবে ১৯৯২ সালের পর আরও বেশ কয়েকবার রোহিঙ্গারা এলেও তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো উদ্যোগ আর দেখা যায়নি। এরপর প্রত্যাবাসন বন্ধ হয়। এরপর ২০১২ সালের ৩ জুন মিয়ানমারে তাবলিগ জামাতের ওপর হামলা চালায় রাখাইনরা। সে সময় সংর্ঘষ শুরু হয়। সংঘর্ষ মংডু থেকে আকিয়াব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। ওই পরিস্থিতিতে প্রাণ বাঁচাতে পালানো শুরু করে রোহিঙ্গারা। তাদের অনেকে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাখাইন রাজ্যের সীমান্তে পুলিশের ছাউনিতে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য হতাহত হয়। তখন মিয়ানমার সরকার দাবি করে, এ হামলার সঙ্গে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা জড়িত। পরদিন রাতে হঠাৎ মিয়ানমারের সেনারা সন্ত্রাসী দমনের নামে রোহিঙ্গাদের গ্রাম ঘিরে ধরপাকড়, হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু করে। ওই সময় ৭৮ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ২৪টি সীমান্ত চৌকিতে একযোগে হামলা হয়। আবারও শুরু সেদেশে হয় অপরাধী দমনের নামে অভিযান। পরের দিন ২৫ আগস্ট থেকে প্রাণে বাঁচতে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। তাতে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয় উখিয়া-টেকনাফে।

প্রত্যাবাসন বন্ধ

সুত্রে জানা গেছে, ১৪ বছর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ থাকার পর গত ২৩শে নভেম্বর ২০১৭ তারিখে একটি নতুন সমঝোতা স্মারকে একমত হয় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। এরপর গত ৩০ অক্টোবর রাজধানী ঢাকায় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম দিনে এই ক্যাম্পের ৩০ পরিবারের ১৫০ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে পাঠানোর কথা ছিল। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গত বছর ১৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁদের নিয়ে যাওয়ার জন্য কয়েকটি গাড়ি টেকনাফের উনচিপ্রাং রোহিঙ্গা শিবিরে পৌঁছানোর পরই সেখানে বিক্ষোভ শুরু হয়। এতে রোহিঙ্গাদের সরব প্রতিবাদের মুখে প্রত্যাবাসন শুরু করতে পারেনি বাংলাদেশ। এখনই মিয়ানমারে ফিরতে চাইছে না দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা ‘তালিকাভুক্ত’ প্রত্যাবাসীরা। এর আগে ২০০৫ সালের জুলাই মাসে এক পরিবারের দুই সদস্য মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার পর থেকে কোন রোহিঙ্গা দেশে ফেরত যায়নি। তখন থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ রয়েছে। তখন কোনো কারণ ছাড়াই এ কর্মসূচি স্থগিত করেছে মিয়ানমার। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। ফলে ১৪ বছর ধরে প্রত্যাবসন বন্ধ রয়েছে।

বিচরন ও তৎপরতা

স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিকদের অভিযোগ, উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই রয়েছে জঙ্গি তৎপরতা। রোহিঙ্গারা এখন কক্সবাজারের বাইরেও অবাধে বিচরণ করছে। মাদক পাচারসহ সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে অংশগ্রহণসহ একাধিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গোপন তৎপরতা চালানোর অভিযোগ রয়েছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির সহায়তায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে তারা বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্টও পাচ্ছে।
পুলিশ জানায়, রোহিঙ্গা শিবির থেকে বের হয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাড়িসহ দেশে-বিদেশ বিভিন্ন প্রান্তে পাড়ি দেওয়ার সময় গত দেড় বছরে প্রায় ৫৬ হাজার রোহিঙ্গাকে আটক করে ক্যাম্পে ফেরত আনা হয়েছে।

৫০ জেলায় রোহিঙ্গা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) রোহিঙ্গা শুমারি থেকে জানতে পারে, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও পটুয়াখালীসহ ৫০ জেলায় রোহিঙ্গাদের অবস্থান রয়েছে। দেশের প্রায় ৫০টি জেলায় রোহিঙ্গারা রয়েছে।

বাড়ছে অপরাধ

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দুই বছরের কঅচঅকাছি সময় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হত্যাসহ ২৩০টির মতো অপরাধমূলক কর্মকান্ড হয়েছে। তার মধ্যে ৩০টি মত খুন হয়েছে। এসব ঘটনায় দই শত রোহিঙ্গাকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে অস্ত্র আইনের ২৫টি মামলায় ৫৫ জন, মাদক আইনের ১০০টি মামলায় ১৫০ জন, পাসপোর্ট আইনের ৬৫টি মামলায় ৫০ জন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের দুটি মামলায় দু’জন, অপহরণের পাঁচটি ঘটনায় ১০ জন আসামি হয়েছে। এ ছাড়া চোরাচালান আইনের ৭টি মামলায় ১৫ জন, চুরির কয়েকটি মামলায় ১০ জন এবং ডাকাতির ৮ মামলায় ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

পরে আছে প্রত্যাবাসন ঘাট

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে চুক্তি অনুযায়ী কক্সবাজারের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ও টেকনাফের কেরণতলী (নয়াপাড়া) প্রত্যাবাসন ঘাট দুটির পরে আছে। ঘুমধুম পয়েন্ট দিয়ে স্থলপথে এবং কেরণতলী পয়েন্ট দিয়ে নাফ নদী হয়ে নৌপথে রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত পাঠানোর কথা ছিল। টেকনাফ প্রত্যাবাসন ঘাটে এক লাইনে ১১টি করে তিন লাইনে ৩৩ আধা সেমি-টিনের থাকার ঘর, চারটি শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে। নাফনদের প্যারাবনের ভেতর থেকে ১৬০ গজ লম্বা কাঠেরজেটি ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদাভাবে চারটি ঘর রয়েছে।

দুই বছরে কত শিশু জন্ম

কক্সবাজার সির্ভিল সার্জেন মতে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে দুই বছরের কাছাকাছি সময়ে প্রায় ৩৭ হাজার নারী গর্ভবতি ছিল। তার মধ্যে ৯ হাজার ৩৪৯ জন নারী স্বাস্থ্যা প্রতিষ্টানে সন্তান প্রশব হয়। বাকিগুলো হোম ডেলিভারী হয়েছে। তবে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার পর গত দুই বছরে শিবিরগুলোতে অনুমানিক ৫০ হাজারের মত শিশু জন্ম হয়েছে। তবে কয়েকেটি আন্তজার্তিক এনজিও সংস্থার মতে এই সংখ্যা ৪০ হাজার হতে পারে। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি এবং আন্তজার্তিক এনজিও সংস্থার কাছ থেকে এর সঠিক পরিসংখ্যা পাওয়া যায়নি।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) মুহিব উল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে থেকে যাবে। এটা কিন্তু আমরা চাই না। বাংলাদেশ আমাদের বাড়ি নয়। আমরা চিরদিন বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে থাকতে চাই না।” আমরা নিজ দেশে ফিরতে চাই; তবে নাগরিক অধিকার, ধন-সম্পদসহ সবকিছু দিতে হবে। এভাবে আর বাস্তুহারা হিসেবে থাকতে চাই না।’

টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র আবব্দুল্লাহ মনির বলেন, মাদক, মানব পাচার, খুন-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হওয়ায় এরা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে উঠেছে। সেসময় মানবিক বিবেচনায় যেসব রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে স্থানীয়রা, তাঁরা এখন হুমকির মুখে রয়েছে।

টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুর আলম বলেন, মিয়ানমারের মিথ্যাচারের কারনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা এখন বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে, এতে দেশ ঝুকির মধ্যে থেকে যাচ্ছে। তবে রোহিঙ্গার তৎপরতা নানা সামাজিক সংকট তৈরি করলেও তাদের নিয়ন্ত্রণে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

উখিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ আবুল খায়ের জানান, ‘রোহিঙ্গা শিবির গুলো পাহাড়ের তীরে হওয়ায়, আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা পুলিশের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। এখানে অপরাধ প্রতিদিনই বাড়ছে। তবু রোহিঙ্গা শিবিরে বিশৃঙ্খলা ঠোকাতে রাত-দিন দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ।


সর্বশেষ সংবাদ