মালয়েশিয়ায় মানবপাচারকারী চক্রের ১২১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ: অসংখ্য মর্মস্পর্শী জবানবন্দি ও ৮০০ জনের মৃত্যু

প্রকাশ: ২৮ মার্চ, ২০১৯ ১১:৫৬ : অপরাহ্ণ

টেকনাফ নিউজ ডেস্ক::  ২০১৫ সালের ১৪ মে থাইল্যান্ডের জলসীমায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নৌকা দেখে স্থানীয়রা যখন এগিয়ে আসে তখন সেখানে খাবার ও পানির অভাবে মৃত্যুপথযাত্রী ছিল অনেক শিশু, নারী ও পুরুষ। থাই পর্যটক-নৌকা পরিচালনাকারী চায়্যুক চ্যুসাকুন সেদিনের স্মৃতিচারণা করে বলেছেন, ওই আশ্রয়প্রার্থীরা প্রায় তিন মাস ধরে কোনো ধরনের খাবার ও পানি পায়নি।

এ সময় তারা শুধু নিজেদের মূত্র পান করে বাঁচার চেষ্টা করেছে। পাচারকারীরা তাদের ফেলে পালিয়েছিল।

২০১৩ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডে পাচার হওয়া বাংলাদেশি মোহাম্মদ খান (২৩) জানান, তাঁর এক সহযাত্রী বুক পকেট থেকে দুই সন্তানের ছবি একবার দেখে কাঁদতে কাঁদতে সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। চারদিকে পানি। অথচ পান করার মতো এক ফোঁটা পানিও ছিল না। বৃষ্টি না হলে তাঁদের সবাই হয়তো মারা যেতেন। পাচারকারী চক্র তাঁদের প্রতি পাঁচ দিনে মাত্র একবার খাবার দিলেও পানি দিত না। পানির তৃষ্ণায় অনেকেই সাগরে ঝাঁপ দিয়ে মারা গেছে।

২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে সাগরপথে পাচার হওয়া ব্যক্তিদের এ ধরনের অসংখ্য মর্মস্পর্শী জবানবন্দি ও প্রায় ৮০০ জনের মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছে মালয়েশিয়ার মানবাধিকার কমিশন ও বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা ফরটিফাই রাইটসের যৌথ প্রতিবেদনে।

মিয়ানমার, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া—এই চার দেশের মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা তুলে ধরা হয়েছে ১২১ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে।

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে গতকাল বুধবার বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ‘মাছের মতো বিক্রি’ ও পাচারকারী চক্রের বারবার হাতবদলের তথ্য-উপাত্ত

তুলে ধরা হয়। পাচারের শিকার হওয়া ওই ব্যক্তিরা মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হয়েছে বলেও জোরালো অভিযোগ রয়েছে প্রতিবেদনে।

পাচার হওয়া সেই ব্যক্তিদের কেউ চেয়েছিলেন একটু ভালোভাবে বাঁচার জন্য মালয়েশিয়ায় যেতে। কেউ করছিলেন একটু ভালো কাজের সন্ধান। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডে গণকবরের সন্ধান পাওয়া পর্যন্ত এক লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি ব্যক্তি বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ছেড়ে সাগরপথে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছে। ভালো চাকরি আর আশ্রয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের পাচারকারীচক্র ডাঙা থেকে নৌকায় তুলতেই প্রতিবছর হাতিয়ে নিয়েছে ৪২০ কোটি থেকে ৮৪০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে চার বছরে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর জন্য সাগরে নৌকায় তুলতেই দেড় হাজার কোটি থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আয় করেছে পাচারকারীচক্র। আর নৌকায় ওঠার পর গভীর সাগরে বড় নৌকায় বা জাহাজে ওঠা, সামান্য খাবার পাওয়া—এসবের জন্য আলাদা করে টাকা গুনতে হয়েছে ওই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পাচার হওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশই রোহিঙ্গা। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে পাচারকারীচক্র বাংলাদেশিদেরও টার্গেট করা শুরু করেছিল। ’

প্রতিটি নৌকায় অন্তত ৪০০ জন করে লোক তুলত পাচারকারীচক্র। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতো বলে জানিয়েছে পাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পাচারকারীচক্র অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নৌকায় তোলার পর জিম্মি করত। সে সময় তাদের জন্য তখন তিনটি পথ খোলা ছিল। একটি হলো, প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার টাকা পণ দিয়ে মুক্তি পাওয়া। দ্বিতীয়টি, আরেকটি চক্রের কাছে বিক্রি হওয়া। তৃতীয়টি, বন্দি অবস্থায় মারা যাওয়া। ’

মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গর স্টেটের একজন পাচারকারীকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মাছের মতো মানুষ বিক্রি হয়ে এক হাত থেকে আরেক হাতে গেছে। এ কারণে দাম (মুক্তিপণ) বেড়েছে। ’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ‘পাচারকারীচক্র অসংখ্য নারী, পুরুষ ও শিশুকে নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণসহ নানা ধরনের নিপীড়ন চালিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই তাদের বেচাকেনা করা হয়েছে। ’

ফরটিফাই রাইটস বলেছে, তারা একাধিক কথোপকথনের রেকর্ড পেয়েছে, যেখানে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বন্দি শিবিরে আটকে রেখে তাদের বিক্রির জন্য দর-কষাকষি করা হচ্ছিল। নৌকায় নারী ও শিশুদের সহযাত্রী পুরুষদের কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হতো। পাচারের শিকার একাধিক নারী তাদের নৌকায় সহযাত্রী নারীদের ধর্ষিত হওয়ার কথা জানিয়েছে। এমনকি গণধর্ষণের ভিডিও পেয়েছে ফরটিফাই রাইটস।

প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, মালয়েশিয়ার ওয়াং কেলিয়াংয়ের কাছে থাইল্যান্ডে ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর থাই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করেন। এ থেকে ধারণা পাওয়া যায়, থাই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও এই পাচারকারীচক্রের সঙ্গে জড়িত। ২০১৫ সালের ২৫ মে মালয়েশিয়ার পুলিশও পেরলিস রাজ্যের ওয়াং কেলিয়াংয়ে ১৩৯টি কবর ও মানবপাচারকারীদের ২৮টি শিবিরের সন্ধান পাওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল। ওয়াং কেলিয়াংয়ে পাচার হওয়া ব্যক্তিদের আটকে রাখার জন্য বড় বড় খাঁচা ছিল।

রহিম উল্লাহ নামে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের এক রোহিঙ্গা তাঁর জবানবন্দিতে বলেছেন, মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী শিবিরগুলোতে ভয়ংকর নির্যাতন চালানো হতো। জিম্মি অবস্থায় তাদের কাছে প্রতিদিন টাকা চাওয়া হতো। আর তা দিতে না পারলেই তাদের শরীরে গরম পানি ঢালা হতো। যারা টাকা দিতে পারত না তাদের কোনো খাবার, ওষুধ দেওয়া হতো না। এতে অনেকেই মারা গেছে।

নূর বেগম নামে এক রোহিঙ্গা নারী জানান, প্রতিদিনই লোকজন মারা গেছে। কোনো দিন বেশি আর কোনো দিন কম। থাইল্যান্ডে পাচারকারীদের শিবিরে ছয় মাস জিম্মি জীবন কাটানো নূর বেগম জানান, বর্বর নির্যাতনের কারণে তাঁরা তাঁদের স্বজনদের ফোন করে টাকা পাঠাতে অনুরোধ করতেন।

তিনি জানান, জিম্মিকারীরা লোহার ‘প্লাইয়ার’ দিয়ে জিম্মি নারীদের কান ও স্তন এবং পুরুষদের পুরুষাঙ্গ ধরে টানত এবং বাকিদের তা দেখতে বাধ্য করত। শিশুরা কাঁদলেও তাদের ওপর নিষ্ঠুর নিপীড়ন চালাত।

দক্ষিণ থাইল্যান্ডের মাঝবয়সী এক পাচারকারী ফরটিফাই রাইটসের কাছে স্বীকার করেছে, যে রোহিঙ্গা নারীরা মুক্তিপণ দিতে পারত না তাদের বিক্রি করে দেওয়া হতো। গবাদি পশুর মতো বেচাকেনা হতো।

তিনি জানান, কিছু ব্যক্তি বিয়ের জন্য ওই নারীদের মুক্তিপণ দিয়ে কিনে নিয়েছে। আবার অনেকে কিনেছে গৃহস্থালি বা অন্যান্য কাজ করানোর জন্য। দালালের মাধ্যমে যে কেউ তাদের কিনতে পারত।

কুয়ালালামপুরে গতকাল ওই প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আন্তর্দেশীয় ওই অপরাধীচক্রকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানের ওপরও তাঁরা জোর দিয়েছেন


সর্বশেষ সংবাদ