আওয়ামী লীগ কানায় কানায় ভরপুর, এবারে ভোটে তা প্রমাণিত

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি, ২০১৯ ৭:৫০ : পূর্বাহ্ণ

-হারুনুর রশিদ আরজু:: বহুল কাঙ্খিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত ৩০শে ডিসেম্বর। নির্ধারিত সময়ে সংবিধান মেনে যথানিয়মে এই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনটি জনগণের মনে বিশেষ চমক সৃষ্টি করে। প্রশ্ন হচ্ছে-সময়মত সংবিধানমত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এতে বিশেষ চমকের কী আছে? চমকতো আছে, সেটা শুনলেই বুঝবেন। প্রধানতম চমক আওয়ামী লীগ এর অভাবনীয় সাফল্য যা কেউ ধারণা করা তো দূরে থাক স্বপ্নেও ভাবেনি। এবারের নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় আওয়ামী লীগ এর নেতৃত্বাধীন মহাজোট ৩০০ আসনের মধ্যে একাই ২৮৮ আসনে জয়ী হয়। হাস্যকর বিস্ময়কর বিষয় হলো জাতীয় ঐক্যজোট মাত্র ৭ আসনে জয়ী হয় যার মধ্যে বিএনপি পায় ৫ আসন। অন্যান্য চমকের কিছু নমুনা তুলে ধরছি। তবে বলে রাখছি এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এই অভাবনীয় একচেটিয়া বিজয়কে চমক না বলে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চার্যের একটি বলা সমীচিন হবে।
এতো বিশাল জয় কিন্তু দেশের মানুষ কোথাও কোনো আনন্দ মিছিল দেখেনি। কোথাও মিষ্টি বিতরণ বা খাওয়া হয়নি। মিষ্টি দোকানগুলিতে প্রচুর মিষ্টি বিক্রি হবে ভেবে তৈরী মিষ্টি সব নষ্ট করতে হয়েছে। কোথাও ফুল কেনা হয়নি। কোথাও ব্যান্ড বাজানো হয়নি। একে অপরকে নিয়ে বিজয়ে কোলাকুলি করতে দেখা যায়নি। তারমানে কেবল শোক আর শোকের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। এমনকি কেউ একটু হাসি মুখে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে দেখা যায়নি। চারদিকে কেবল গুমোট কান্নার ছবি ভাসছিলো। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা বলেছেন,‘৮০% ভোটার ভোট দিয়েছে” । এমন ভোট গ্রহণ অতীতের সব রেকর্ড ফেল করেছে। বিভিন্ন জরিপ সব ফেল করেছে। কিভাবে এতো বড় ব্যবধান তৈরী হলো তা বুঝার কোনো উপায় নেই। বিএনপি কিভাবে মাত্র ৫ আসন পায় তা কোনো হিসাবে মিলানো যায় না। আবার বিকল্প ধারা, জাসদ, গণফোরাম এসব দল কিভাবে আসন পায় তাও কেউ বিশ্বাস করতে পারে না। এই নির্বাচনকে সরকারী দলের অনেকেই ৭০সালের নির্বাচনের সাথে তুলনা করেন যা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আবার অনেকে মিল খুঁজেন ৭৩সালের নির্বাচনের সাথে। অবশ্য ৭৩সালের নির্বাচনের সাথে বর্তমান ফলাফলের মিল পাওয়া যায়। কারণ তখনও বিরোধী দল মাত্র ৭টি আসনে জয়ী হয়।
অনেক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত বিএনপি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়। তবে বিএনপি ড. কামাল হোসেন-এর নেতৃত্বে জোটবদ্ধ হয়ে জাতীয় ঐক্যফন্ট্র গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেয়। যদিও বিএনপি কিছুতেই দলীয় সরকারের অধীনে তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবে না বলে শক্ত অবস্থানে থাকে। তবে সেটা তারা তা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে সক্ষম হয়নি। যে নির্বাচনকে নিয়ে এতো কথা কেমন ছিলো এই নির্বাচন? কিভাবে সম্ভব এমন ফলাফল? দেশের মানুষ রীতিমতো বোবা হয়ে যান। কেউই এটা মানতে পারেন না যে বিএনপি মাত্র ৫টি আসনে জয়ী হওয়ার দল। একটা প্রাইমারী ছাত্রও জানে এবং বিশ্বাস করে বিএনপি একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। ৫টি আসন তো খালেদা জিয়া একাই জয়ী হয়ে আসছেন। অথচ সেই বিএনপি গোটা বাংলাদেশে মাত্র ৫টি আসন পেয়েছে এটা বিশ্বাসযোগ্য হয় কিভাবে? এমনকি বিএনপির ঘাটি ফেনী ও বগুড়া থেকেও কেউ জিতেনি। তাই এমন আজগুবী ফলাফল আজ আওয়ামী লীগের দলের মানুষও এই বিশ্বাস করে না। সবাই বিশ্বাস করে- নির্বাচনটা সুষ্ঠু হলেও ভোট সুষ্ঠু হয়নি এটাই সত্যি।
৩০০ আসনে নির্বাচনের কথা থাকলেও গাইবান্ধা-৩ আসনের একজন প্রার্থী মৃত্যুবরণ করায় একাদশ জাতীয় সংসদের ২৯৯ আসনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের ৩টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত হওয়ায় ২৯৮টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ২৯৮ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২৫৭টি আসন, জাতীয় পার্টি ২২টি, বিএনপি ৫টি আসন, গণফোরাম ২টি আসন পেয়েছেন, বিকল্পধারা বাংলাদেশ ২টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ৩টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ২টি পেয়েছে, জাতীয় পার্টি-জেপি ১টি ও বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ১টি আসন পেয়েছে। আর স্বতন্ত্র থেকে ৩ জন প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। পরবর্তীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে নির্বাচন হলে সেখানে ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী জয়ী হয়। সেই হিসেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সর্ব মোট প্রাপ্ত আসন ৮টি। এই হলো এবারের নির্বাচনের ফলাফল।
যে নির্বাচনে ভোটের কারিশমা দেখে দেশের মানুষের মধ্যে এতো কৌতুহল, অবাক করা সেই ভোটের ফলাফলের কিছু নমুনা জেনে নিই। প্রথমে জেনে নিই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গোপালগঞ্জ-৩ আসন এর ফলাফল। এই আসনে তিনি ভোট পেয়েছেন ৯৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৪৬ হাজার ৮১৮ জন। এদের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২ লাখ ৩০ হাজার ১৪১ জন ভোটার। এ আসনে তিনি ৪ জন প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী এসএম জিলানী ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১২৩ ভোট। কী করুন বিএনপির পজিশন!
এবার জেনে নিই ফেনীর আসনের কথা। ফেনী জেলায় মোট তিনটি আসন। ফেনী-১ আসনটিতে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বড় ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। অথচ এবার বিএনপির প্রার্থী অন্যান্য বারের চেয়ে মাত্র দশ ভাগের এক ভাগ ভোট পেয়েছেন। এবারের নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী পেয়েছেন ২৪,৯৭২ ভোট। এবারের নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি। অন্যদিকে এ আসনে নৌকা মার্কা নিয়ে লড়েছেন জাসদের শিরিনা আকতার। ২০০৮ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া ১,১৪,৪৮২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ প্রার্থী পেয়েছিলেন ৫৮,৫৫১ ভোট।
আরেকটা মজার ঘটনা বলছি। চট্টগ্রাম-১০ আসন। এখানে গণসংহতি ফোরামের প্রার্থী হাসান মারুফ রুমী তার নিজের ভোটটিও পাননি। কতটা বিস্ময়কর! একজন প্রার্থীর একটি ভোটও না পাওয়া কতটা বিশ্বাসযোগ্য? তাই প্রশ্ন উঠেছে, তিনি নিজের ভোটটিও বা কেন পেলেন না? কিংবা তিনি তার নিজের ভোটটি কাকে দিলেন? অন্তত তিনি নিজের ভোটটিতো নিজের মার্কায় দিয়েছেন? সেটা গেল কোথায়? তার পরিবারের ভোটও কি তিনি পাননি? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। এভাবে ভোট নিয়ে শত শত চমক রয়েছে যা বর্ননা করলে শেষ হবে না। এমন একটি একদলীয় ভোট পদ্ধতিতেও এই নির্বাচনকে নিয়ে ঘটে যায় কিছু নিষ্ঠুর ঘটনা। বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় ১৫জন নিহত হন। একজন নারী গণধর্ষিতা হয়েছেন যা এতোটাই বর্বর নিষ্ঠুর ঘটনা যে, না বললেই নয়। নোয়াখালীর সুবর্ণচরে নৌকায় ভোট না দেয়ায় ৪ সন্তানের জননী গৃহবধূকে গণধর্ষণ করা হয়। তার স্বামী একজন সিএনজি চালক।
এতো কেবল নির্বাচনের দিনের চেহারা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে কত যে কাহিনী হয়ে গেছে তা বলে শেষ করা যাবে না। বিএনপি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীদের নোমিনেশন বাতিলের হিড়িক বয়ে যায়। প্রত্যেকের কিছু না কিছু দোষ খুঁজে বের করে এবং যাতে নোমিনেশন পেপার বাতিল হয় বা করা যায়। কাগজপত্র বাচাইয়ে যেসব ভুলত্রুটিকে অপরাধের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা রীতিমত অবাক করার বিষয়। অথচ একই দোষ সরকারী দলের বা তাদের শরীকদের বেলায় চোখে পড়েনি। প্রার্থীদের শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে, গ্রেফতার করা হয়েছে। কোথাও পোস্টার লাগাতে দেয়নি, মাইকিং করতে দেয়নি। এতো কিছু করেও বিএনপিকে নির্বাচন থেকে সরানো যায়নি। সরকারী দলের নেতারা হলফনামায় তাদের এমন সব আজগুবী তথ্য দিলেন যা শুনে দেশের মানুষ কেবল হাসলো। নির্বাচনের এমন রং ঢংয়ের ফলাফল দেখে সারা দেশের মানুষ প্রার্থী ভোটার সবার ভালো একটা হাসির খোরাক হয়েছে। কিন্তু তারা বিএনপির মতো এমন অজনপ্রিয়(?)দলের সাথে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে যা কারিশমা করলো সেটাকে মশা মারতে কামান দাগানোই বলা যায়।
আমাদের সরকারী দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনের ফলাফলে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে এটা অনেকে বিশ্বাস না করলেও আমি করি। কারণ কিছু কিছু বিষয় ব্যতিক্রম হয় তাই বিশ্বাসও করতে হয় । সবসময় যে আমরা যা স্বাভাবিক বা নিয়ম মনে করি তাই ঘটবে, এমন কোনো যুক্তিকতা নেই। মাঝে মাঝে এমন কিছু অবিশ্বাস্য ঘটনা আমাদের চোখের সামনে ঘটে যা মেনে নিতে কষ্ট হয়। এটাকে ‘ব্যতিক্রম’ বলা হয়। এমন কয়েকটা নগদ উদাহরণ দিই-নির্বাচনের ফলাফলের মতো ২০১৮সালে প্রকাশিত প্রাথমিক সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষায় ৬০০ নম্বরের মধ্যে ৬০০ নম্বর পেয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেন নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার কলোনি পাড়ার বাসিন্দা সারা জেরিন। এটা কি অস্বীকার করা যাবে? ২০১৮ সালের মে মাসে প্যারিসে প্রথমবারের মতো নগ্ন নারী-পুরুষ পরিদর্শকদের জন্য চালু হয়েছে একটি জাদুঘর। এর নাম প্যালেইস ডি টোকিও। এই জাদুঘর পরিদর্শন করতে হলে পরিদর্শককে অবশ্যই একেবারে নগ্ন হয়ে গেট দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। প্যারিস প্লাস ১৬তম জেলায় এই জাদুঘরটি অবস্থিত। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত বছর ঢাকা মেডিকেল থেকে মৃত ঘোষনা করা এক নবজাতক কে আজিমপুর কবরস্থান এর গোসল ঘরে গায়ে পানি দেয়ার সময় নড়ে-চড়ে চিৎকার দিয়ে উঠে।যা শুনে সারা দেশে মানুষ অবাক হয়ে যান। আমরা বিশ্বাস করি বা জানি মরা মানুষ জীবিত হয় না, তারমানে মাঝে মাঝে যে হবে না তা বলা যাবে না। অতএব এবারে ভোটে তা প্রমাণিত হয়েছে যে, বিএনপি ভোটার বিলুপ্তির পথে এবং আওয়ামী লীগ দেশে কানায় কানায় ভরপুর। বিলিভ ইট অর নট।
arzufeni86@gmail
লেখকঃ কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্নেষক।


সর্বশেষ সংবাদ