আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে এক টুকরো মিয়ানমার

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১২:৩৭ : পূর্বাহ্ণ

সূত্র : দি হিন্দু::
আন্দামান দীপপুঞ্জের নাম শুনলেই এক সময় ধারণা করা হতো কোন এক ভয়ঙ্কর জায়গা। যেখানে একবার কোন মানুষ গেলে আর ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে না। বিশেষ করে নির্বসানের প্রসঙ্গ আসলেই প্রথমেই মনে উকি দেয় আন্দামানের কথা। এখনও অনেকেই হাস্যরস কথায় বলে উঠে ‘পাঠিয়ে দাও আন্দামানে’। বর্তমান সময়েও মানুষ আন্দামান সম্পর্কে এই ধারনাই পোষণ করে। কিন্তু আজকের আন্দামান আর আগের আন্দামানের যে আকাশ পাতাল তফাৎ তা হয়ত অনেকেই জানে না। তবে এ কথা সত্যি একটা সময় ভারতীয় উপমহাদেশের শাসকগণ শাস্তিস্বরূপ অপরাধীদের পাঠিয়ে দিত গহীন আন্দামান দীপপুঞ্জে। যেখানে শুধু ঘন বন আর চারদিকে পানি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ত না। সেসব দীপপুঞ্জের সঙ্গে লোকালয়ের যোগাযোগ ছিল দুরূহ ব্যাপার। জানা যায় যাদের পাঠানো হতো তাদের বেশির ভাগই কোন না কোন জীবজন্তুর শিকার হয়ে প্রাণ হারাত। প্রতিকূল অবস্থায় নিজের অস্তিত্ব টিকিয়া রাখা দায় ছিল। যারা হয়ত নিজেদের জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে তাদের হাত ধরেই আজকের আন্দামান দীপপুঞ্জ ধীরে ধীরে নাগরিকতার ছোঁয়া পেয়েছে। বর্তমান আন্দামান দীপপুঞ্জ পুরোপুরি এক পর্যটননগরী। প্রতিবছর এখানে বহু পর্যটক বেড়াতে আসেন। রয়েছে এয়ারপোর্ট, বন্দর থেকে শুরু করে উঁচু দালান। তবে এমারাল্ড গ্রীন ওয়েবি কে খুঁজে পাওয়া যাবে না টুরিস্ট ম্যাপে। কিন্তু ক্যারেনদের কাছে এটিই তাদের বাসস্থান। প্রায় নব্বই বছর আগে ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়ে এই ক্যারেন জাতিটি আন্দামানে এসেছিল মিয়ানমার থেকে। আন্দামান ট্রাঙ্ক রুট ধরে এগিয়ে যাওয়া কর্দমাক্ত সরু সড়ক পথে চার্চ প্ল্যান্টেশন আর পরিত্যক্ত মাঠ পেরিয়ে দেখা মিলবে গ্রামটির। বনভূমি ঘেরা এই ওয়েবি, মধ্য এবং উত্তর আন্দামানের যে বারোটি গ্রামে ক্যারেনরা বসবাস করে তার একটি। ওয়েবি টুরিস্ট ম্যাপে খুঁজে পাওয়া না গেলেও জন ওং থন বলেন, আমরা এখানে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করতে পারি, যেখানে থাকবে আমাদের দেশান্তরের ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতি। আমরা সেখানে ক্যারেনদের ঐতিহ্যবাহী খাবার সমৃদ্ধ রেস্তরাঁ চালু করতে পারি। আমরা চাই মানুষ আমাদের ইতিহাস জানুক।
নব্বই বছর আগে আন্দামান সাগর পেরিয়ে ক্যারেনের মিয়ানমার থেকে এখানে বসতি স্থাপন করে। গবেষক থং তাদের নিয়ে কাজ করছেন। তিনি এই গ্রামে ‘দীপ বাড়ি’ নামে একটি বাড়ি বানিয়েছেন যে বাড়ির বইয়ের তাকে বোঝাই ক্যারেনদের ওপর রচিত বই, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীতে বোঝাই। ক্যারেনরা আশা করে একদিন তাদের গ্রামটিও টুরিস্টদের আকর্ষিত করবে। ঘুরবে তাদের অর্থনৈতিক চাকা। তারা আন্দামানের মূল ধারার জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চায়। একই সঙ্গে চায় নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে। তবে সেভাবে নিজেদের অধিকার এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনও তারা আরও একটু উর্বর জমির আশায় গ্রাম ছেড়ে নতুন বসতির খোঁজে যাচ্ছে। তবে নতুন প্রজন্ম কাজের জন্য শহরমুখী। নিজেদের সম্প্রদায়ের বাইরেও বিয়ে শাদিতে জড়াচ্ছে তারা। তবে ওয়েবির চিত্রটা খুব বেশি বদলায়নি। সেখানকার বিদ্যালয়ে ক্যারেন ভাষার প্রচলন ছিল না। ঊনষাট বছর বয়সী সো মালো‘র মতে নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ভাষা শিখতে হয়েছে ঘরে। সো মালো নিজে একজন শিক্ষক। ২০০৮ এ স্কুলে ক্যারেন ভাষা শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন করা হয়েছে। তার মতে, নিজেদের ভাষা ধরে রাখতে এর কোন বিকল্প নেই। এখন তারা ক্যারেন ভাষাতে বই ছাপছে। নতুন জীবনের আশায় দুরন্ত সাগর পাড়ি দিয়ে আন্দামানে আসা এ মানুষগুলো আরও একটু ভালভাবে বেঁচে থাকতে চায় এখন। সেই সঙ্গে চায় নিজেদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে। সেভাবেই প্রস্তুত করছে নিজেদের। প্রতিষ্ঠা করছে নিজেদের অধিকার।


সর্বশেষ সংবাদ