রোহিঙ্গা দশ লাখ: নাফ নদীতে লঘুচাপ

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর, ২০১৭ ৭:৪৫ : অপরাহ্ণ

এ,কে,এম মনজুরুল করিম সোহাগ:: নিশ্চিতভাবে একটি বহুজাতিক ষড়যন্ত্রে এবং ব্যবসায়ীক স্বার্থে র্সষ্ট রোহিঙ্গা সমস্যার প্রেক্ষার্পট বাংলাদেশ মায়ানমার দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে নানাপ্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে কিছু আলোচনা করা হল —

বাংলাদেশ-মায়ানমার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কঃ- রাষ্ট্রীয়ভাবে বার্মা বা মায়ানমার বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম দেশ। যে কটি দেশ সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল তন্মধ্যে বার্মা ছিল সপ্তম। ইতিহাস বলে, জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভের ক্ষেত্রেও বার্মার পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল চীনকে পক্ষে আনতে। উভয় দেশের আমদানী-রপ্তানী স্বাভাবিক আছে।

রোহিঙ্গা সমস্যার সূত্রপাতঃ- ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে বার্মার স্বাধীনতা প্রাপ্তির সময় আরাকানী রোহিঙ্গাদের একটি অংশ পৃথক স্বাধীন দেশের দাবী জানিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের অপর একটি অংশ পার্শ্ববর্তী মুসলিম দেশ পাকিস্তানের সাথে একীভূত হওয়ার দাবী জানিয়েছিল। বিষয়টি বার্মিজদের কাছে মানসিকভাবে স্বস্তিদায়ক ছিল না। বার্মার অন্যান্য স্বতন্ত্র স্বাধীনকামী জাতির মত আরাকানী রোহিঙ্গাদের জাতীয় বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব শক্তিশালী, আশাজাগানীয়া নয়। এদেশে বিএনপির শাসনামলে আরএসও স্বাধীনতাকামী আন্দোলন শুরু করলেও ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব স্বেচ্ছাচারিতা এবং দূর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়লে আরাকানীদের স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের স্বপ্ন ভেস্তে যায়। এই দুর্বলতার সুযোগে চলতে থাকে নীরব জেনোসাইড। এভাবে ১৯৭৮ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত দফায় দফায় রোহিঙ্গা রিফিউজি আগমনের ফলে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক রিফিউজি এখন বাংলাদেশে। বিশ্বস্থ পরিসংখ্যন মতে নতুন-পুরনো মিলিয়ে মিয়ানমার কর্তৃক বাংলাদেশে জোড়পূর্বক বিতারিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ।

 কক্সবাজার জেলাবাসী এবং বাংলাদেশীদের ত্যাগ ও মানবতাঃ- ২৫ আগস্ট একটি রহস্যজনক ঘটনার মধ্য দিয়ে আরাকানে জাতিগত নিধন শুরু হয়। আরসার আক্রমণকে রহস্যজনক বলার বিবিধ কারণ আছে। বানের পানির মত সীমান্ত অতিক্রম করে রোহিঙ্গারা আসতে থাকে। বর্বর বর্মীদের নৃশংস আক্রমণে বিপন্ন আরাকানের মানবতা। তাদের আহাজারিতে টেকনাফ-উখিয়ার পরিবেশ বিপর্যস্ত। সন্নিকটে ঈদুল আযহা। মুসলিম সম্প্রদায়ের এই বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানও অস্বস্থিকর হয়ে উঠে। টেকনাফ-উখিয়া ও সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ সর্বোচ্চ ধর্মীয় অনুভূতি ও মানবতা নিয়ে আরাকানী রোহিঙ্গাদের সাহায্যে এগিয়ে এলেন। পরবর্তীতে সমগ্র দেশবাসী, সচেতন বিবেকবান মানুষ। অনেককে দেখেছি গাড়ী ভর্তি খাবার নিয়ে সস্ত্রীক শাহপরীরদ্বীপ সীমান্তে ছুটে গেছেন অভূক্ত শিশু, নারী-পুরুষের হাতে খাবার তুলে দিতে। টেকনাফ, উখিয়াসহ সীমান্তে থৈ থৈ মানুষ। দূষিত পরিবেশ, ময়লা-আবর্জনা, যানবাহনের অভাব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ বিভিন্ন সমস্যা মানুষ মাথা পেতে মেনে নিয়েছে। এর চেয়ে বড় বিসর্জন আর কিভাবে হয়? এছাড়া বাংলাদেশী সংবাদকর্মীরা এ ন্যাক্কারজনক গণহত্যাকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে দারুণ ভূমিকা রেখেছেন। সহজ-সরল বাঙালিরা উদারতার মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে। যদিও ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এপার থেকে যাওয়া শরণার্থীদের/মুক্তিকামী জনগণকে আরাকানী মুসলিমরা ২য় সারীর মুসলিম বা মানুষ হিসেবে গণ্য করেছিলেন। (সূত্রঃ- ১৯৭১ সালে বার্মায় শরণার্থী হয়ে যাওয়া মুক্তিকামী সংগঠক)

  বর্তমান সরকারের অবস্থানঃ মায়ানমার বাহিনী কর্তৃক আরাকানী রোহিঙ্গা মুসলিমদের গুলি, বেয়নেট, দা, কিরিচ দিয়ে আক্রমণ, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, নির্বিচারে হত্যা ইত্যাদি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিলনা তাদের অনুপ্রবেশ ঠেকানো। পরিস্থিতি বিবেচনা এবং মানবিকতার কারণে তাদের পুশব্যাক করা সম্ভবপর ছিলনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তড়িৎ সিদ্ধান্তে সীমান্ত খুলে দেয়া হয়। ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বোঝা মাথায় নিয়ে সারাবিশ্বের কাছে নিজের মহানুভবতা ও এদেশবাসীর ত্যাগ বিশ্ব দরবারে তুলে ধরলেন। আপাতত বলা যায় বর্তমান সরকারের জন্য বিষয়টি মন্দের নয়। রোহিঙ্গাদের নিবন্ধিত করে ভাসান চরে স্থানান্তর পরিকল্পনা সরকারের একটি ভাল সিদ্ধান্ত।
 টেকনাফ-উখিয়ার স্থানীয় মানুষের দূর্ভোগঃ- সমস্যা পরবর্তী মাসখানেক স্থানীয় জনগণ আবেগ, বিবেক এবং ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল ছিলেন। স্থানীয়দের চেহারা দেখে বুঝা যায় এখন তাদের মাথায় জানা-অজানা বিশাল বোঝা ছেপে বসেছে। মিথ্যাচারের রাজনীতিতে যে যাই বলুক না কেন এ বোঝা সহজে নামবার মত নয়। যাতায়াতে প্রশাসনকে দেখাতে হচ্ছে আইডি কার্ড, যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধি ও সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ইয়াবার বড় বড় চালান আগমন, স্থানীয়দের সেবাদানকারী অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী রোহিঙ্গা সেবায় নিয়োজিত। ফলে সেবা-প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা,যাত্রী ভাড়া বৃদ্ধি, শত-সহস্র যানবাহনের চাপে রাস্তাঘাটের অবস্থা দূর্বিষহ। স্মরণকালের উল্লেখযোগ্য মানুষ-সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয় ভয়াবহ রূপধারণ করেছে।
ক্স যুদ্ধ হবে কি? ঃ- এ অঞ্চলের অনেক সাধারণ মানুষের প্রশ্ন ছিল যুদ্ধ হবে কি? বিষয়টি নিয়ে অনুমাননির্ভর অনেক মুখরোচক আলোচনা হয়েছে। তবে কখনো কখনো কিছু অনুমান সত্য হয়ে যায়, যেতে পারে। যুগ যুগ ধরে নির্যাতিত, নিপীড়িত রোহিঙ্গারা সামাজিক বাস্তবতায় অপরাধপ্রবণ এবং অকৃতজ্ঞ। টেকনাফে আস্তানাগাড়া রোহিঙ্গা ডাকাত আবদুল হাকিমের ত্রাসের গল্প জেলাবাসীর অজানা নয়। জেলার আইন-প্রয়োগকারী সংস্থা তুচ্ছ একজন হাকিমকে আইনের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে। ভবিষ্যতে হয়ত সহস্র আবদুল হাকিম মধ্যপ্রাচ্য ও পাকিস্তানের বা কোন অশুভ শক্তির সহায়তায় সংগঠিত হয়ে আরাকানে চোরাগোপ্তা হামলা করলে মায়ানমার কি পাল্টা আক্রমণ করবে না? মায়ানমার বাংলাদেশে আক্রমণ করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কক্সবাজার জেলা এবং সীমান্তবর্তী বান্দরবান।
করণীয় :- অতি দ্রুত বাংলাদেশের সমস্ত রোহিঙ্গাকে কম্পিউটার ডাটাবেজের আওতায় এনে ভাসানচর বা এজাতীয় জায়গায় একত্রিত করে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা অতীব প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাজের সুবিধার্থে প্রযুক্তি নির্ভর শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সহায়ক হবে। সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনায় বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশের প্রেক্ষাপটে শ্রমিকের প্রয়োজন মেটাতে তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানো যেতে পারে। যেহেতু আগামী একযুগেও ১০ লাখ রোহিঙ্গার মায়ানমার প্রত্যাবর্তনকে মরীচিকা মনে হচ্ছে।

লেখক একজন সমাজকর্মী ও কলামিস্ট।
০১৮১৬-৮৩২১১২


সর্বশেষ সংবাদ